সন্তান পালনে মা-বাবার ভূমিকা প্রসঙ্গে

Send
জেসমিন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৩:৫০, মার্চ ১০, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৩, মার্চ ১১, ২০১৭

জেসমিন চৌধুরীদু’বছর আগে একটা স্কুলে আমার একটা চাকরির ইন্টারভিউ ছিল, ছোট বাচ্চাদের সঙ্গে ভাষার মান উন্নয়নের কাজ।  বাসে যেতে যেতে প্রস্তুতি হিসেবে প্রাইমারি এডুকেশন অ্যাক্ট নেড়েচেড়ে দেখছিলাম।  এখন আর খুঁটিনাটি সব মনে নেই, কিন্তু একটা ছোট কথা মনে গেঁথে আছে- শিশুদের জন্য স্কুলে, বাসায় এবং সর্বত্র একটি নিরাপদ ও নিশ্চয়তাপূর্ণ পরিবেশ অবশ্যই গড়ে তুলতে হবে যেখানে সে যথাযথ ভাবে তার সমস্ত সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটানোর সুযোগ পাবে।  এটা প্রতিটি শিশুর অধিকার, এবং এই অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব সমাজের সকল মানুষের।
আমি একদিক থেকে অনেক শক্ত হলেও অন্যদিকে খুব আবেগপ্রবণ একজন মানুষ।  এই কথাটা পড়ে আমার চোখে পানি এসে গেল।  আমার নিজের বাচ্চাদের শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা সহ সকল মৌলিক চাহিদা পূরণের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেছি সারাজীবন।  যৌন ও শারীরিক নির্যাতন থেকেও তাদেরকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছি ।  কিন্তু নিরাপত্তা দিতে পারলেও নিজের বৈবাহিক সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে তাদেরকে একটি নিশ্চয়তাপূর্ণ পরিবেশ, ইংরেজিতে যাকে বলে ‘আ সিকিউর এনভায়রনমেন্ট’ দিতে পেরেছি কী?
আমার মনে হয় শিশুদের জন্য ‘সিকিউর এনভায়রনমেন্ট’ এর বিষয়টা আমরা ঠিক বুঝি না।  নিশ্চয়তা বলতে আমরা যা বুঝি তা হলো ভবিষ্যতের ভাত কাপড়ের সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা।  আমাদের মা-বাবারা নিজে না খেয়ে, আধপেটা খেয়ে টাকা পয়সা জমিয়ে আমাদের জন্য জায়গা জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি কিনে রাখেন।  তারা আমাদেরকে ভালো স্কুলে, কলেজে পাঠানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেন, কিন্তু বেড়ে ওঠার সময়টাতে শিশুর ব্যক্তিত্বের এবং অন্তর্নিহিত গুণাবলীর বিকাশ ঘটানোর জন্য যে ধরনের পরিবেশ বা আচার আচরণ দরকার তা নিয়ে অনেকেই তেমন একটা ভাবেন না, কারণ আমাদের সংস্কৃতিতে এই বিষয়টাই নেই।

আমি বাইরের কথা বলছি না, পরিবারের ভেতরের পরিবেশের কথা বলছি যেখানে একান্তে মা-বাবার সহচর্যে কাটে শিশুর জীবনের অধিকাংশ সময়।  মা-বাবা হওয়ার জন্য কোনও যোগ্যতার প্রমাণ দিতে হয় না, সন্তান জন্ম দিতে পারার শারীরিক ক্ষমতাই এখানে একমাত্র যোগ্যতা।  এ শুধু আমাদের নয়, পুরা মানব জাতির জন্যই একটা ঝুঁকিপূর্ণ ব্যাপার।  আমাদের সমাজে এর সাথে যুক্ত হয়েছে মা-বাবা সংক্রান্ত কিছু অবিসংবাদিত ধারণা- মা বাবা কিছুতেই অন্যায় করতে পারেন না, তারা যা করেন ছেলেমেয়ের ভালো’র জন্যই করেন, সন্তানের কিসে মঙ্গল তা মা-বাবার মতো করে আর কেউ বোঝে না ইত্যাদি ইত্যাদি।

কিছুদিন আগে আমার এক বন্ধু ফেসবুকে একটা পোস্টে মন্তব্য করেছিলেন ‘কু-পুত্র যদ্যপি হয়, কুমাতা কখনও নয়’।  উত্তরে আমি বলেছিলাম ‘সোশ্যাল ওয়ার্কারদের সাথে দোভাষীর কাজ করতে গিয়ে মা-বাবা কতটা ‘কু’ হতে পারে তা জানার দুর্ভাগ্য আমার হয়েছে’।   তিনি প্রতিবাদ করে বলেছিলেন 'সোশ্যাল ওয়ার্কারদের সঙ্গে কাজ করে জীবনের এসব সত্য জানা যাবে না।'

আসলে আমরা ধরেই নেই মা বাবা সন্তানের প্রতি অবিচার করতে পারেন না, যার ফলে সবার অগোচরে ঘরে ঘরে নির্যাতিত হচ্ছে বহু শিশু।  মা-বাবার হাতেই শিশুরা সবচেয়ে বেশি অসহায় এবং বিভিন্ন শিশু নির্যাতন সমীক্ষায় দেখা গেছে মা-বাবাদের হাতেই শিশুরা নির্যাতিত হয় সবচেয়ে বেশি।  এর কারণ হচ্ছে তাদের সাথেই সবার দৃষ্টির অগোচরে কাটে শিশুর সিংহভাগ সময় এবং শিশুর প্রতি তাদের আচার আচরণকে সমালোচনার আওতায় আনাকে একটা ধৃষ্টতা ছাড়া কিছুই ভাবা হয় না।  অথচ নির্মম হলেও সত্য যে মা-বাবার হাতে শিশু নির্যাতনের ব্যাপারটা শুধুমাত্র শারীরিক শাসনের নয় বরং আবেগিক নির্যাতন, নেগলেক্ট, এবং যৌন নির্যাতনেরও।  আমদের দেশে এই বিষয়টা ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হয় না বলে এ নিয়ে কোনও গবেষণাও করা হয় না।

কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শিশুর প্রতি মা-বাবাদের ব্যবহার কোনোক্রমেই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।  বয়স, অভিজ্ঞতা, ও জ্যেষ্ঠতার ক্ষমতা ব্যবহার করে অনেক মা-বাবা সন্তানের সাথে যে মাপের অপরাধ করেন সন্তানের পক্ষে তা কখনোই করা সম্ভব নয় কারণ বৃদ্ধ বয়সে মা-বাবা সন্তানের ওপর নির্ভর করলেও তাদের সমস্ত জীবনের ইঞ্জিনিয়ারিং এর সুযোগ সন্তানদের হাতে কখনোই আসে না।  কাজেই আমার মতে উপরোক্ত প্রবাদটি ভুলে যেতে হবে, মনে রাখতে হবে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ সন্তান পালনের জন্য লাইসেন্স লাগে না বলেই আমরা লাইসেন্সবিহীন চালকেরা প্রতিনিয়ত ঘটিয়ে চলেছি মারাত্মক সব অসংশোধনীয় দুর্ঘটনা যা অপরাধেরই নামান্তর। 

মা-বাবার মাহাত্ম নিয়ে অনেক কাব্য রচিত হয়েছে, এই বিষয়ে  অনেক গল্প ইতিহাস আমরা পড়েছি।  কিন্তু নিজের জন্মের ওপর যে সন্তানের কোনও হাত নেই, তার প্রতি মা-বাবার আচরণ নিয়ে অন্তত আমাদের দেশে তেমন আলোচনা নেই, তাদের ওপর নির্যাতনের ক্ষেত্রে সরকারি হস্তক্ষেপের কোনও সুষ্ঠু সুপরিকল্পিত ব্যবস্থা নেই।  একটি শিশু হিসেবে বেড়ে ওঠার দিনগুলোতে এবং চাকরি জীবনে আমি নিজে ঘরে-বাইরে শিশুদের প্রতি যেসব অসঙ্গত আচরণ দেখেছি, তার ওপর একটি বই লেখা যায়।  এর ফলে শিশু বিকাশের বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন থেকেছি চিরদিন, কর্মজীবনে দেশে বিদেশে শিশুদের সঙ্গেই কাজ করে এসেছি সবসময়।  তাছাড়া  সামাজিক অসঙ্গতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ছোট পরিসরে কাজ করে আসছি এবং এই বিষয়গুলো নিয়ে প্রচুর চিন্তাভাবনা করি বিধায় অনেক কিছু আমার চোখে পড়ে যা অনেকের চোখ এড়িয়ে যায়। আমি লক্ষ্য করেছি মা-বাবার আচরণের ভালো জিনিসগুলো গর্বের সঙ্গে দেখানো হয়, কিন্তু সব অবিচারের কাহিনিগুলো আড়ালেই থেকে যায়। 

দুঃখজনক হলেও সত্যি আমাদের সমাজে এসব আলোচনাকে ভালো দৃষ্টিতে দেখা হয় না।  এসব কথা শুনলে আমরা চমকে উঠি।  আমি দেখেছি সামাজিক অহংবোধই সমাজ সংস্কারের পথে সবচেয়ে বড় বাধা।  যখনই আমি নিজের দেখা মারাত্মক কোনও সমস্যার কথা তুলে ধরি বিভিন্ন অভিজ্ঞতা ও সংগৃহিত তথ্যের আলোকে, তখনই কিছু লোক শুধুমাত্র ব্যক্তিগত মতামতকে পুঁজি করে উঠে পড়ে লাগেন প্রমাণ করতে যে এরকম কোনও সমস্যা আসলে নেই।  বিষয়টা অনেকটা এরকম, আমি যে নৌকায় বসে আছি তাকে ডুবে যেতে দেব তবু তার মধ্যে যে কোনও ফুটা আছে তা স্বীকার করবো না।  বিশেষ করে শিশুবিকাশের সমস্যা সংক্রান্ত বিষয়গুলো নিয়ে আমরা কথা বলতে অনিচ্ছুক কারণ তা করতে গেলে কেঁচো খুড়তে সাপ বেরিয়ে আসবে, প্রাপ্ত বয়স্কদের গাফিলতি ধরা পড়বে।  আমাদের কাছে প্রাপ্তবয়স্কদের সম্মানের গুরুত্ব শিশুদের সার্বিক মঙ্গলের চেয়ে অনেক বেশি।

একজন মা হিসেবে নিজের দায়িত্ব স্মরণ রেখেই বলছি, শিশুদের ভালোমন্দ নিয়ে আমাদেরকে আরো অনেক বেশি ভাবতে হবে, কারণ তারাই দেশের এবং সমাজের ভবিষ্যৎ।  যে শিশু অন্যায় আর অবিচার সয়ে সয়ে বড়দের জোরপূর্বক শ্রদ্ধা করে বড় হবে, সে নিজেকে বা অন্যকে শ্রদ্ধা করতে তো শিখবেই না, বরং নানান সামাজিক অপরাধে জড়িয়ে পড়াই তার জন্য স্বাভাবিক।  সঠিক যত্নে লালিত শিশুর তুলনায় নির্যাতিত শিশুর সংখ্যা কম হতে পারে, কিন্তু এইসব শিশুদের সমস্যাগুলোকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজনকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না।

লেখক: অভিবাসী শিক্ষক ও অনুবাদক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ