নারী যখন সমালোচনার কাঠগড়ায়

Send
জেসমিন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১২:২৪, মার্চ ১৯, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২৭, মার্চ ১৯, ২০১৭

জেসমিন চৌধুরীনারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলন যত শক্তিশালী হচ্ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমান তালে জোরদার হচ্ছে এই আন্দোলনের বিরোধী মিসজিনিস্টদের প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরও। লক্ষ্য করেছি ‘পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা’ কথাটা শুনলে যারা ক্ষেপে যান তারাই দীর্ঘ দিনের সামাজিক কন্ডিশনিং এর বদৌলতে সৃষ্ট নারীর আচার-আচরণ নিয়ে অসংবেদনশীল ঢালাও মন্তব্য করতে থাকেন। ইদানিং নারীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু অভিযোগ ঘুরে ফিরে আসছে- 
নারী সাজগোজ করে, পার্লারে যায়, চুল কাটে।
নারী ছলনাময়ী, তাকে ঠিক বোঝা যায় না।
নারী বাসে আলাদা সিট চায়। 
নারী সিগারেট খায়, প্যান্ট শার্ট পরে ঘুরে বেড়ায়।
নারী মোটরবাইকে দু’দিকে পা ছড়িয়ে বসে।

নারী বিয়ের দিন লাজুক মেয়েটি হয়ে বসে না থেকে উঠে হাঁটাহাঁটি করে।

আচ্ছা নারী ঠিক কী করলে আপনারা খুশি হবেন বলুন তো? সে পার্লারে গিয়ে চুল কাটলে আর সাজগোজ করলেও সমস্যা, আবার প্যান্ট শার্ট পরে বাইকে পা ছড়িয়ে বসে সিগারেট খেলেও সমস্যা? সমস্যা নেই কোনটায়? কোনও অভিব্যক্তি না থাকায়? কোনও প্রকাশ না থাকায়? চুপ করে শুধু রান্নাবাড়া গোছগাছ করে যাওয়ায়? 

নারীর রূপ নিয়ে কাব্য রচনা করে আসছে পুরুষ সেই আদিম কাল থেকে। এসব কাব্য পড়ে বড় হয়েছে যে নারী, ছোট থেকেই যার মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে দেখতে সুন্দর না হলে বিয়ে হবে না, সেই নারী সাজবে না তো কী করবে? যে সমাজে কালো মেয়ের বিয়ে হয় না, আবার বিয়েই মেয়েদের জীবন আর জীবিকার একমাত্র নিশ্চয়তা, কুড়িতেই যে সমাজে নারীকে বুড়ি ধরা হয়, সেই সমাজে ইনসিকিউরিটির অনুভূতি থেকে মেয়েরা এসব করবে সেটাই কি স্বাভাবিক নয়? অনেক সময় দেখা যায় শিক্ষিত সুযোগ-পাওয়া মেয়েরাও নিজেকে পণ্যের মতো উপস্থাপন করছে কিন্তু মনে রাখতে হবে বিষয়টা একদিনের নয়, এক নারীরও নয় বরং হাজার বছরের কন্ডিশনিং এর, একটা প্রতিষ্ঠিত ট্রেন্ডের।  ভেবে দেখতে হবে, নিজের ব্যক্তিত্ব বা চিন্তাভাবনা বিকাশের কতটুকু সুযোগ একজন নারী পায়? শিক্ষা দীক্ষার সুযোগ কতদিন ধরে নারীর হাতে এসেছে? এসব হুটহাট করে মন্তব্য করার নয় বরং গভীর ভাবে ভেবে দেখার, উপলব্ধি করার বিষয়।

এই যে একটা মেয়ে শার্টপ্যান্ট পরলেই আপনারা বলেন সে পুরুষালী আচরণ করছে, এটা কতটা অযৌক্তিক তা কখনও ভেবে দেখেছেন? একটা মানুষ যে পোষাকে আরাম পায়, তা পরার অধিকার তার কেন থাকবে না? তাছাড়া শার্টপ্যান্ট তো বাঙালি পুরুষেরও পোষাক নয়। আপনারা নিজেদের আরাম আর সুবিধার্থে লুঙ্গি গামছা ধুতি ছেড়ে পশ্চিমা সংস্কৃতির কাপড়কে নিজেদের কাপড় বানিয়ে নিয়েছেন, কিন্তু এই একই সুবিধা মেয়েদেরকে দিতে আপনারা প্রস্তুত নন। কারণটা কী? নিভৃতে একা পাওয়া কোনও মেয়ের শাড়ি যত সহজে টান মেরে খুলে ফেলা যায় তত সহজে জিন্সের প্যান্ট খসানো যায় না বলে? নাকি আপনারা নিজেরা শাড়ি পরার সাহস সঞ্চয় করতে পারছেন না বলে প্যান্টধারী মেয়েদের সাহসের প্রতি ঈর্ষা থেকে এসব বলেন? ওহ! ভুলেই গিয়েছিলাম, আপনারা কেন শাড়ি পরবেন? ওটা তো দুর্বলের পোষাক; যার দ্রুত চলাফেরার প্রয়োজন নেই, যাকে শুধু পটের বিবি হয়ে বসে থাকতে হবে সারাজীবন ওটা তো শুধু সে’ই পরবে, তাই না?  

নিজের সুবিধার্থে নারীকে মোটরবাইকের পেছন পর্যন্ত ওঠার ভিসা দিয়েছেন আপনারা, কিন্তু তাকে বসতে হবে বিপজ্জনকভাবে একদিকে দু’পা ঝুলিয়ে, তাকে বসতে হবে শাড়ি পরে বাচ্চা কোলে নিয়ে। সেটাই আপনাদের চোখে শালিন, আর মেয়েদের নিরাপত্তার ব্যবস্থার চেয়ে শালীনতাই আপনাদের কাছে বেশি গুরুত্বের দাবিদার? যে নারী সবেমাত্র নিজের চেষ্টায় যুদ্ধ করে ঘরের বাইরে বেরুনোর অধিকার অর্জন করেছে, একা বাসে চলাচল করতে শুরু করেছে সে আপনাদেরই বোন, মা অথবা কন্যা এবং সে ঘরের বাইরে বেরিয়েছে ঘরকে আরেকটু সুন্দর করার জন্যই, একথা ভুলে গেলে চলবে কেন? বাইরের জগতের নিরাপত্তাহীনতার কথা বলে শতশত বছর নারীকে গৃহবন্দী করে রেখেছেন আপনারা, অথচ আজ যখন সে বাইরে বেরিয়েছে, তখন সেই নিরাপত্তাহীনতার কথা বেমালুম ভুলে গেছেন? বাসে ট্রেনে একা চলাচলকারী একজন নারীকে কতধরনের ঝক্কি পোহাতে হয় জেনেও তার জন্য আলাদা সিট বরাদ্দে বহু পুরুষের আপত্তি দেখে সত্যিই অবাক লাগে। পুরোপুরি স্বাবলম্বি ও সাহসী হতে নারীর আরও কিছুটা সময় যে লাগবে এটুকু বুঝতে কতটুকু বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন? এটুকু মেনে নিতে কতটুকু সহমর্মিতার প্রয়োজন? আমাদের কি সেটুকুও নেই?   

বিয়ের দিন একটা মেয়ে তার অনিশ্চিত ভবিষ্যত আর দুর্বল সামাজিক অবস্থানের কথা ভেবে ভয়ে কাঁপছে, অসহায়ের মতো কাঁদছে- এই দৃশ্যের অভ্যস্ততা কাটিয়ে উঠতে কষ্ট হচ্ছে আপনাদের। একটা মেয়ে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছে, তার মনের মত সঙ্গী খুঁজে নিয়েছে, বিয়ের দিন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মাথা সোজা করে হাঁটতে পারছে, অতিথিদের সঙ্গে আনন্দের হাসি হেসে কথা বলছে এর মধ্যে কেন সৌন্দর্য দেখবেন আপনারা? পরিবর্তনের এই বাতাসে তিরতির করে কাঁপছে আপনাদের হৃদয় তাই প্রতিবাদের ঝড় তুলছেন, কিন্তু সেই ঝড়ে এই পরিবর্তনের পালে আরও বাতাস লাগবে বলেই আমার বিশ্বাস।

পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কর্তারা ও তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা আনন্দে থাকেন নারীরা নীরব হলে, সহনশীল হলে। যে মেয়ে যত বেশি অনাদর অবহেলা সহ্য করে বিনিময়ে প্রাণ ঢেলে সংসার সাজিয়ে যায় তার প্রশংসা সমাজে তত বেশি। কিন্তু এতে খুব বেশি খুশি হওয়ার কোনও কারণ নেই। নারী আজ নীরবে মেনে নিচ্ছে যে অবজ্ঞা, যে অবমূল্যায়ন, তা কিন্তু তার অবচেতনে গিয়ে জমছে আগ্নেয়গিরির ভেতরের গলিত লাভার মতো। এই লাভা যেদিন বেরিয়ে আসবে, সেদিন তার সামনে কিছুই টিকবে না। এর কিছুটা তাপ আমরা এর মধ্যেই টের পাচ্ছি।

আর নারীকে বুঝতে অক্ষমতা সম্পর্কে বলবো, নারী আপনাদের ভাবনার ক্ষমতার চেয়েও বেশি কিছু বলেই হয়তো এতোটা হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন আপনারা। আধুনিক নারী পড়াশোনা শিখে চাকরি বাকরি করে সংসারের স্বচ্ছলতায় ভূমিকা রাখছে। অফিস থেকে বেরিয়েই বাজার সেরে রান্নাঘরে ঢুকছে, বাচ্চাদের পড়াশুনা দেখছে, আবার একফাঁকে নিজের চুলও সুন্দর করে বেঁধে নিচ্ছে। আপনি তার বানানো এক কাপ চমৎকার চা হাতে নিয়ে আয়েশ করে পত্রিকা পড়ছেন। আপনি খুশি। কিন্তু আপনার জীবনের সর্বগুণে গুণান্বিতা নারীটি কিন্তু নিজের অজান্তেই আপনার এবং আপনার স্বগোত্রীয়দের বিরুদ্ধে এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। সে একহাতে ঘর আর বাহির দু’টোই সামলাতে সক্ষম হয়ে উঠছে। সে প্রতিনিয়তই নিজের ক্ষমতা বাড়িয়ে চলেছে, এবং এক পুরুষে না ঘটলেও একসময় এই নারীর বংশধর নারীরা আপনাদেরকে অনেক ছাড়িয়ে যাবে। আপনার জীবনে তার প্রয়োজন আর তার জীবনে আপনার প্রয়োজনের মধ্যে যোজন যোজন পার্থক্য দেখা দেবে একদিন। আমি এরই মধ্যে তার আগমনী গান শুনতে পাচ্ছি, আপনারা পাচ্ছেন না?

আধুনিক নারীকে নিয়ে আপনাদের অনেক ভাবনা এবং অভিযোগ, তাদের আচার আচরণ পোষাক পরিচ্ছদ নিয়ে অনেক আপত্তি, তাদের প্রকাশের প্রকৃতি কেমন হওয়া উচিৎ তা নিয়ে অনেক জল্পনা কল্পনা। চলতে থাকুক, মন্দ কী? নারী ফুলের মতো নরম, তার চুল মেঘের মতো কালো, তার ঠোঁট গোলাপের পাঁপড়ির মতো সুন্দর, সে ভালো রাঁধুনী, তার গুণেই সংসার সুখের হয়- এসব ভাবনার সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে এসে তাকে মানুষ হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বিচার করতে শুরু করেছেন আপনারা এটাকে একটা ইতিবাচক ব্যাপার বলেই ধরে নিচ্ছি।

লেখক: অভিবাসী শিক্ষক ও অনুবাদক 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ