behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

হায়রে মানুষ!

শেগুফতা শারমিন১৭:২৬, মার্চ ১৯, ২০১৭

শেগুফতা শারমিনকমলাপুর রেল স্টেশন থেকে রাতের ট্রেনে উত্তরবঙ্গে যাচ্ছিলাম। গত কয়েক বছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। নতুন নতুন কোচ, সুন্দর ব্যবস্থা। টাইম টেবিল মেনে চলে। তাই নিশ্চিন্তে উঠে পড়া যায়, একাই হোক বা দলবলসহ। তবে সিস্টেম যাই হোক, যন্ত্রপাতি যেমনই থাকুক, এদেশে তা বেশিদিন ভালো থাকে না। কেন? সে কথাই বলছি। আর বলার জন্যই এই ভূমিকা। তো যা বলছিলাম। রাতের ট্রেন। স্বভাবতই ঘুম পায়। অনেকেরই। কিন্তু এর মাঝেও নিশ্চয় কেউ থাকে, যার ঘুম পায় না, ক্লান্তি লাগে না। তখন সে কী করে? ফোনে কথা বলে উচ্চস্বরে। আমার পেছনের সিটের এক যাত্রী অনবরত ফোনে কথা বলে গেলেন অতি উচ্চস্বরে, একটানা। এক পর্যায়ে সম্ভবত তার ফোনের কনটাক্ট লিস্টের লোকজন ঘুমিয়ে পড়লো। তখন শুরু হলো তার পাশের যাত্রীর সঙ্গে আলাপ।
একে তো রাতের ট্রেন, তারপর পুরো কামরা মানুষে পরিপূর্ণ। তার মধ্যে কেউ যদি এত জোরে কথা বলতে থাকে, তাইলে যে সেটা কতটা বিরক্তিকর, এই তথ্যটা আমাদের জানা নেই। কোনও দিন কেউ এই শিক্ষাটাও শিখিয়ে দেয় না যে, লোকভর্তি গণপরিবহনে অন্যের বিরক্তি তৈরি করে, এমন আচরণ করতে নেই। অথবা কেউ শেখালেও আমরা শিক্ষাটা নিতেই পারি না। শুধু ট্রেনে বা বাসে নয়, আমাদের মানুষরা কতটা বিরক্তিকর আচরণ করে উড়োজাহাজে চড়ে! সে গল্প লিখতে গেলে আরেক উপন্যাস হবে। প্রথমত, মোটামুটি একটা ইন্টারভিউ নেবে পাশের যাত্রীর। কোথায় যায়, কেন যায়, কার কাছে যায়, একা যায় কেন ইত্যাদি। তারপর বাড়ি কই, কে কে আছে ইত্যাদি নিয়ে আরেক প্রস্থ। উত্তর না দিয়ে ঘুমের ভান করে পড়ে থাকলে তার একটু পর পর ওয়াশরুমে যেতে হয়।
এ তো গেল সহযাত্রীদের ভদ্রতা সভ্যতার অভাব। যাদের সঙ্গে ক্ষণিকের দেখা, সামান্য পরিচয়। গন্তব্য এসে গেলেই চিরবিদায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে সত্যি যে, এ রকম অভব্য মানুষ প্রচুর থাকে আত্মীয়, বন্ধু ও স্বজনদের মধ্যেও। যারা এখনও শেখে উঠতে পারেনি কী বলতে হয়, কী বলতে হয় না। কখন বলতে হয়, কখন হয় না। কোন আচরণটা জনসন্মুখে করা যায়, কোনটা যায় না। আমার পরিচিত এক ভদ্রলোক, বিদেশে থাকেন অনেক বছর। তিনি সেখানে সিঙ্গেল প্যারেন্ট। তাও প্রায় ২০/২২ বছর। সবাই জানে। কোনও লুকোচুরির ব্যাপার নেই। একদিন সেই ভদ্রলোক ফেসবুকে একটি ছবি পোস্ট করলেন, তিনি আর তার দুই সন্তানের শিশুকালের ছবি। সেই ছবি দেখে হুমড়ি খেয়ে পড়লো চেনা মানুষদেরই কমেন্ট। ‘ভাই, আপনাদের ছবি দিলেন, ভাবীর ছবি কই?’ ‘ভাবী থাকলে আরও ভালো লাগতো’- এ রকম কমেন্ট লিখলেন তারই কাছের লোকজন নিদেনপক্ষে ফেসবুকের বন্ধুতো বটেই। যারা জানেন তার বিস্তারিত। এই যে একটা অভব্যতা তারা করলেন, এটা কিন্তু না বুঝে, নাকি না জেনে, বুঝতে পারি না। তারাও কিন্তু বিদেশেই থাকেন। তারপরও এই শিক্ষা হয় না!
ধরুন, কেউ বিয়ে করছেন না বা বিয়ে হচ্ছে না। সেটা যাই হোক, বিষয়টা তার জন্য স্পর্শকাতর। অথচ দেখবেন, যে পুরুষটি একটি নির্দিষ্ট বয়সের পরও অবিবাহিত সে যেখানেই যাক, তাকে ঘিরে একটা আলোচনা। এক ধরনের স্থূল রসিকতা চলেই। আর মেয়ে হলে, বা মেয়ের পরিবার হলে তো কথাই নেই। চোখেমুখে করুণার ঝর্ণা নিয়ে মানুষ এই প্রশ্নটিই প্রথম করবে, কী বিয়ে হচ্ছে না? এতদিন হয়ে গেল! এই যে এতদিন হয়ে গেল! কথাটা সেই মেয়ে বা মেয়ের পরিবার ভালো করেই জানে। কিন্তু এই স্বজন, বান্ধবরা মনে করিয়ে দিয়ে তার দায়িত্ব পালনে পিছপা হবেন না।
একজন নারী ও একজন পুরুষ একসঙ্গে কোথাও যাচ্ছেন। হয়তো তারা সম্পর্কে ভাই-বোন, চাচা-ভাতিজি বা অন্য যেকোনও কিছু। আমাদের মাথায় আসে- হয় স্ত্রী নয় প্রেমিকা। ফট করে পাশ থেকে কেউ জিজ্ঞেস করে বসে, কি ভাবী নাকি?
হয়তো কেউ বিদেশে যাচ্ছে। চেনা একজন ধরিয়ে দিল বাজারের ফর্দ। সঙ্গে বলে দিল, অসুবিধা নেই টাকা দিয়ে দেব। আরে! টাকাটা তো এখানে মুখ্য না। একজন মানুষ দেশের বাইরে যাচ্ছে, কাজে হোক বা ঘুরতে। তার প্রতিটি মিনিট সেখানে হিসাব করে ধরা। সেই হিসাব করা সময়ের ভেতর তার সময় কোথায় আরেকজনের জিনিস কেনার জন্য সময় নষ্ট করার?
বাংলাদেশ সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যেখানে ধীর গতির গাড়ি চলে প্রথম লেনে! অন্যান্য গাড়ি তাকে ওভারটেক করে বাম পাশ দিয়ে। কারও এই নিয়ে কোনও মাথাব্যথা নেই।
এই যে মনুষ্য আচরণের কথা বলছি, এই আচরণ কিন্তু আপাত শিক্ষিত শহুরে মানুষেরই আচরণ। তাদের শিক্ষা-দীক্ষার কোনও স্তরেই সভ্যতা-ভব্যতা শেখানোর পাঠ ছিল না। যে কারণে প্রতি পদে অন্যকে বিরক্ত করেন। একেক জন হয়ে ওঠেন মূর্তিমান আতঙ্ক অন্য আরেক জনের জন্য। তাদের চেয়েও আরেক স্তর ওপরে যারা বাস করেন, তাদের আচরণ আরেক ধাপ ভয়ঙ্কর। শিক্ষিত মানুষের সুবিধা হলো যেকোনও কিছুকে তার মতো করে ব্যাখ্যা করতে পারেন।
এদেশের শিক্ষিত মানুষরা মনে হয় সেক্ষেত্রে দুই কাঠি এগিয়ে। নতুন এক ধারা তৈরি করছেন তারা। সেটা এমন যে, তিনি যেটা বলছেন, সেটাই ঠিক। তার যে জীবনযাপন, তার যে পছন্দ-অপছন্দ সেটাই উদাহরণযোগ্য। সবাই যেন জলজ্যান্ত একেকটা তত্ত্ব। তার নিজের তত্ত্বের বাইরে কোনও মানুষ মানুষ নয়, কোনও জীবন জীবন নয়। ভুল সবই ভুল। তিনি একাই ঠিক। যিনি পরিবার পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন, তিনি তত্ত্ব দিচ্ছেন পরিবারই সকল সুখের মূল। যিনি একা থাকছেন, তিনি তত্ত্ব দিচ্ছেন, একা থাকাই আরাধ্য। কিন্তু এইযে একেক জনের একেক রকম জীবন, তার পেছনে অনেক শ্রম, অনেক গল্প, অনেক বাঁক। কোনও কিছুই অস্বীকারের নেই। অবহেলার নেই। অসন্মানের নেই। সেটা ভুলে যাচ্ছি যার যার নিজস্ব বৃত্তে ঘুরপাক খেতে খেতে।
বিন্দুমাত্র সিভিক সেন্স নেই যেই মানুষের, সেই মানুষই হয়ে যাচ্ছি আধুনিকতার ধারক-বাহক। যে আধুনিকতার আতশকাঁচে নিজেকে নিজে বড় করে দেখছি কিন্তু অন্যরা যে দূর থেকে ছোট হওয়া দেখছে, সেটা ধরাই পড়ছে না, কোনও মিটারেই। আজন্ম বাঙালি মুসলমান নিজেকে ‘আধুনিক’ প্রমাণ করার আপ্রাণ চেষ্টায় ক্রিসমাস বা দুর্গা পূজায় গলা ফাটাচ্ছে ধর্ম যার যার উৎসব সবার বলে। আর সেই একই মানুষ নাক সিটকাচ্ছে ছোটবেলা থেকে পালন করে অভ্যস্ত ঈদের মৌসুমে। বিশেষ করে কোরবানি ঈদ এলে তাদের আধুনিকতা বিপুলভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তারা সবাই হঠাৎ করেই পশুপ্রেমী হয়ে ওঠেন। অথচ এদেশের অর্থনীতিতে কোরবানি ঈদের যে একটি অর্থ মূল্য আছে, তারা বেমালুম ভুলে যান। এদেশের কৃষকসহ আরও কিছু প্রান্তিক পেশাজীবীর সারাবছরের অর্থনীতি আবর্তিত হয় কোরবানি ঈদকে ঘিরে। তাকে অস্বীকার করার মতো পরিস্থিতি বা বিকল্প এখনও তৈরি হয়নি, তা আমরা যতই তথাকথিত আধুনিক হয়ে উঠি না কেন।
মাত্র ১০ বছর আগেই, সরস্বতী পূজার মণ্ডপে গিয়েছি শুনে যে পরিবারের লোকজন বলে গিয়েছে ওইসব জায়গায় গেলে ধর্ম চলে যায়। মাত্র ১০ বছরের ব্যবধানে সেই সব পরিবারের লোকজন এখন হোলি করে, রং মাখে! ভাবছেন, বাহ মানুষ অসম্প্রদায়িক হয়ে উঠেছে? দুঃখিত, আপনি শতভাগ ভুল ভাবছেন। এরাই আড়ালে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কটূ কথা বলে। এই বাইরের আবরণে পরিবর্তন। এটা কোনও অসাম্প্রদায়িক মনোভাবের প্রকাশ নয়। সস্পূর্ণ আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব। তারা থাকছেন বাংলাদেশে, সালাম সাহেব কালাম সাহেবের পরিবারে। কিন্তু মনে মনে বাস করছেন রাশি, গোপী বউদের সঙ্গে। সিরিয়ালে হোলি হচ্ছে, পূজা হচ্ছে। তারা নাচছেন। এরাও নাচছেন। এদের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছেন গুজবে মাতাল আমাদের শহুরে শিক্ষিত বাঙালি মানুষ।
যে মানুষ অল্প দিনের রঙচঙে খুশি। যে মানুষ তার সংস্কৃতিকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখার কথা ভুলে গেছে। একটা জিনিস বহুবছর যত্ন করে ব্যবহারের শিক্ষা পায়নি। যে মানুষ সম্পদ নয়, সম্পত্তিতে মনোযোগী। যে মানুষের উন্নয়ন পরিকল্পনায় শুধু কেনার জন্য ব্যয়ের খাত থাকে, যত্নের জন্য নয়; সেই মানুষের ট্রেন বলি বা আর যাই বলি, নিজের জন্য সবচেয়ে ভালো জিনিসটাই পছন্দ করে সে। কিন্তু অযত্ন আর অবহেলায় বেহাল হয়ে পড়ে সেই জিনিসও। এ আর এমন নতুন কী?

লেখক: উন্নয়নকর্মী

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

IPDC  ad on bangla Tribune
টপ