behind the news
Vision  ad on bangla Tribune

বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা, ভারতের ‘উদ্বেগ’

আমীন আল রশীদ১৩:২১, মার্চ ২০, ২০১৭

আমীন আল রশীদপ্রধানমন্ত্রীর আসন্ন ভারত সফরে দুদেশের মধ্যে কি কোনও প্রতিরক্ষা চুক্তি হচ্ছে? সরকারের তরফে এ নিয়ে পরিষ্কার কিছু বলা না হলেও ভারতীয় গণমাধ্যমে খবরের বরাতে উত্তপ্ত দেশের রাজনীতি।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মন্তব্য করেছেন, ‘ভারতের সাথে সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তি রহস্যজনক।’ তিনি এ জাতীয় কোনও চুক্তি করতে হলে তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার দাবি জানান। যদিও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘ভারতের সাথে কোনও গোপন চুক্তি করবে না বাংলাদেশ।’ দেশের সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে যায়, এমন কোনও চুক্তি না করারও আশ্বাস ক্ষমতাসীন দলের।
আলোচনাটি উঠেছে মূলত ভারতের সাংবাদিক ও বিশ্লেষক সুবীর ভৌমিকের একটি প্রতিবেদনের পর। তিনি ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সাথে ভারতের সম্ভাব্য প্রতিরক্ষা চুক্তির বিষয়ে কয়েকটি বিষয়ের উল্লেখ করেছেন। সুবির ভৌমিক বলেন, সামরিক ক্ষেত্রে আরও বাড়তি যোগাযোগ, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি ব্যাপারে দুদেশের সেনাবাহিনীর মধ্যে যোগাযোগ চায় ভারত। সেইসাথে তাদের কাছ থেকে বাংলাদেশ বেশি পরিমাণে অস্ত্রশস্ত্র কিনুক, এটিও চায়। তাছাড়া সন্ত্রাসবাদী তৎপরতার ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে যৌথ বা সম্মিলিত অভিযান চালানোর মতো সুযোগও এই চুক্তির মধ্যে ভারত রাখতে চাইছে বলে সুবির ভৌমিক উল্লেখ করেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মধ্যে যেকোনও রাষ্ট্র অন্য একটি রাষ্ট্রের সম্ভাব্য শত্রু। এমনকি মিত্র রাষ্ট্রও কখনও শত্রুতে পরিণত হতে পারে। আর ছোট দেশগুলোর ওপর বড় দেশের সম্পর্ক সাধারণত হয় আধিপত্যমূলক। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কও তার ব্যতিক্রম নয়। যদিও ভারতের আঞ্চলিক অধিপতিসুলভ মনোভাব এবং সীমান্তবর্তী ছোট দেশগুলোকে তার নিজের বলয়ে রাখা তার নিজের নিরাপত্তার জন্যও জরুরি। যে কারণে অনেক সময়ই বাংলাদেশের সাথে ভারতের আচরণ যতটা না বন্ধুসলভ, তার চেয়ে বেশি অভিভাবকসুলক। কিন্তু ছোট রাষ্ট্র হলেও স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশেরও নিরাপত্তার প্রশ্ন আছে। আছে তার প্রতিরক্ষা এবং আঞ্চলিক সম্পর্কের নীতি।

বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত ও তার সবচেয়ে বড় শত্রু পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের সহযোগী চীনও পারমাণবিক বোমার অধিকারী। বাংলাদেশের আরেক প্রতিবেশী মিয়ানমারও পরমাণু ক্ষমতা অর্জনের ধারাবাহিক চেষ্টা করছে বলে মাঝেমধ্যেই খবর আসে। তাছাড়া ভূরাজনৈতিক কারণে বাংলাদেশ যখন বঙ্গোপসাগরের তীরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অবস্থিত; যখন বাংলাদেশের রয়েছে ১৭ কোটি মানুষের বিশাল বাজার, বিশাল সমুদ্র এলাকা এবং সেখানে রয়েছে তেল-গ্যাস ও মৎস্যসম্পদের বিশাল সম্ভাবনা এবং তার ওপরে জঙ্গিবাদের বিপদ- তখন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতি ও সামরিক কৌশল কী হবে-সেটি খুবই জরুরি প্রশ্ন।

১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা নীতি প্রণীত হয়। তার আলোকে প্রণিত হয় ফোর্সেস গোল ২০৩০। এর মাধ্যমে সেনা, নৌ বিমান বাহিনীকে আরও সুসজ্জিত, আধুনিক ও পুনর্গঠিত করা হচ্ছে। সেনাবাহিনীর জন্য অত্যাধুনিক হেলিকপ্টার, মাঝারি পাল্লার বিমান, এসপি গান, এপিসি, ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য যুদ্ধাস্ত্র কেনা হয়েছে। আর নৌবাহিনীতে সবশেষ যুক্ত হয়েছে দুটি সাবমেরিন; যার মাধ্যমে সাবমেরিনের মালিক হিসেবে বিশ্বের ৪১তম দেশের তালিকায় নাম লিখিয়েছে বাংলাদেশ।

তবে বাংলাদেশ যেহেতু বেশিরভাগ অস্ত্র কেনে চীনের কাছ থেকে, ফলে এটি ভারতের জন্য কিছুটা উদ্বেগের এবং বলা চলে অস্বস্তির। সম্প্রতি চীন থেকে বাংলাদেশ দুটি সাবমেরিন কেনার ব্যাপারে ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের অনেকে উদ্বেগ জানিয়েছেন। বাংলাদেশের সাবমেরিনের প্রয়োজন পড়লো কেন, এমন প্রশ্নও নাকি তারা তুলেছেন।

যদিও প্রতিরক্ষানীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র না কেনা। কেননা, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে যত ভালো সম্পর্কই থাকুক, সমস্যাও তার সাথে বেশি থাকে বা সৃষ্টির আশঙ্কা থাকে। ফলে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছ থেকে অস্ত্র কেনার মানে হচ্ছে ওই রাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে প্রতিবেশী বড় রাষ্ট্র ওয়াকিবহাল থাকে; যা অপেক্ষাকৃত দুর্বল বা ছোট রাষ্ট্রের জন্য নিরাপদ নয়। সুতরাং কৌশলগত কারণেই ভারতের কাছ থেকে বাংলাদেশ বেশি অস্ত্র কিনবে না, এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু ভারত চায় বাংলাদেশের সামরিক বা প্রতিরক্ষার যাবতীয় বিষয় সে ওয়াকিবহাল থাকবে।

ভারত এটি চায় নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে। কারণ তার কোনও প্রতিবেশী এমনকি তার নিজের রাষ্ট্রের ভেতরেও যেসব রাজ্য স্বাধীনতা চায় কিংবা যেসব রাজ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদীরা তৎপর-তাদের ওপর নজরদারির জন্য প্রতিবেশী ও বন্ধুরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের সাথে একটা প্রতিরক্ষা চুক্তি থাকা তার জন্য সুবিধাজনক। কিন্তু ভারতকে সেই সুবিধা দিতে গিয়ে বাংলাদেশ কোনও অসুবিধায় পড়বে কিনা, সেই বিবেচনাও নিশ্চয়ই বাংলাদেশের রয়েছে। অতএব ভারত চাইলেই যে বাংলাদেশর সঙ্গে তাদের সুবিধামতো একটা প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়ে যাবে, বিষয়টা এত সহজ নয়; বিশেষ করে ক্ষমতায় যখন মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী দল এবং কূটনীতিতে শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা নানা ঘটনায়ই প্রমাণিত। অতএব বাংলাদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলোর (বিশেষ করে তিস্তার পানি বণ্টন এবং গঙ্গা ব্যারাজ তৈরি) সুরাহা না করে শেখ হাসিনা ভারতের সাথে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করে আসবেন, সেটি ভাবার আপাতত কোনও কারণ নেই।

আবার অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর সুরাহা হয়ে গেলেও প্রতিরক্ষার মতো অতি স্পর্শকাতর বিষয়ে শেখ হাসিনার সরকার অদূরদর্শী কোনও চুক্তি করে ফেলবে, সেটিও ভাববার কোনও কারণ আছে বলে মনে হয় না। তবে আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে শুধু ভারত নয়, অন্য রাষ্ট্রের সাথেও বাংলাদেশের সমঝোতা সই হতে পারে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক চুক্তি বলতে যা বোঝায়, সেরকম কিছু আদৌ হবে কি না, সে বিষয়ে হয়তো প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের আগেই কিছুটা ইঙ্গিত মিলবে। কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক এবং ব্যক্তি শেখ হাসিনার ওপরে দেশের মানুষের নিশ্চয়ই এই বিশ্বাস রয়েছে যে, দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় বা বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা হুমকির মুখে পড়ে, এরকম কোনও কাগজে তিনি সই করবেন না।

লেখক: সাংবাদিক ও লেখক।

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

Global Brand  ad on Bangla Tribune

লাইভ

টপ