স্বাধীন দেশের নারী কি স্বাধীন?

Send
জেসমিন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৩:০৯, মার্চ ২৬, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২১, মার্চ ২৬, ২০১৭

জেসমিন চৌধুরীস্বাধীনতার প্রাক্কালে মুক্তিযুদ্ধের একজন অন্যতম কর্ণধারের ঔরসে জন্মে, স্বাধীন বাংলাদেশে বড় হলেও  আমি শেষমেষ বুঝেছি দেশ স্বাধীন হলেও এদেশের সমাজ নারীর জন্য কারাগার বই কিছুই নয়। আমি ঠিকই বুঝেছি দেশ স্বাধীন হলেও আমি স্বাধীন নই। হতে পারে আমি একজন স্বাধীনতাকামী মানুষ কিন্তু দিনের শুরুতে, মাঝখানে, বা শেষে আমাকে নারী বলে ডাকা হয়।
আপনারা যারা মনে মনে ভাবছেন, ‘এই শুরু হলো ধান ভানতে শিবের গীত গাওয়া অথবা স্বাধীনতা দিবসেও তিনি গাইছেন হেটির মা’র বারোমাসি গান, তাদের সাথে আমি সম্পূর্ণ একমত। এই একই বিষয়ে লিখতে লিখতে বলতে বলতে আমার নিজেরও মাঝে মধ্যে বিরক্তি বোধ হয়, কিন্তু কী করবো বলুন? নারীর স্বাধীনতা বা সম-অধিকার নিয়ে কথা বলতে গেলেই যখন আপনারা ধর্মের বর্ম আর সামাজিক রীতিনীতির হাতিয়ার নিয়ে আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েন, অথবা নারীর সম-মর্যাদার বিষয়টিকে আপাত দৃষ্টিতে মেনে নেওয়ার পরও যখন তাকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ করে উপস্থাপিত কোনও কুরুচিপূর্ণ কৌতুকে সামষ্টিকভাবে অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন, আমাকে তখন আবারও কী-বোর্ডের ওপর অনিচ্ছুক আঙুলগুলো চালাতেই হয়। আমার আর কোনও হাতিয়ার নেই, নেই কোনও বর্ম। আমার কলমের বারোমাসি তাই বারোমাস ধরেই চলতে থাকে, হোক সে মাস স্বাধীনতার অথবা বিজয়ের।
মার্চ মাসের শুরু থেকেই যখন চলছে স্বাধীনতার উদযাপন আর গান কবিতার উৎসব, আমার মনে ঘুরে ফিরে একটা লাইনই বাজছে, ‘আমি স্বাধীন দেশের একজন পরাধীন মানুষ’। এই লাইনটি আমার কাছে স্বাধীনতার সমস্ত কবিতার সারমর্ম যার ভাব সম্প্রসারণ-আপনি নিজের ইচ্ছামতো করে নিতে পারেন, কিন্তু তাতে বাস্তবতা এক বিন্দুও পাল্টায় না। শিক্ষা ও স্বনির্ভরতার জোরে ব্যক্তিগত জীবনে নিজের চারপাশের দুই/চার ফুট জায়গার ভেতরে স্বাধীনতা অর্জন করে নিতে পারলেও নিজের দরজার বাইরের জগতে লিঙ্গ-সমতা প্রতিষ্ঠিত না হলে, সমাজে নারী স্বাধীনতার বৃহত্তর বোধ সৃষ্টি না হলে আমার নিজের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা-বোধ প্রতি পদে পদে আমার জন্য আরও বেশি প্রতিবন্ধকতারই সৃষ্টি করে।

যে দেশে আজ পর্যন্ত নারীর অধিকারের অভাবের সার্বজনীন স্বীকৃতিই সৃষ্টি হয়নি, যে দেশে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার ক্ষমতা নিয়ে বড় হয় না মেয়েরা, জাতীয়তা বোধের অবস্থান থেকে সেই দেশের স্বাধীনতা একজন নারীর জন্য যত গৌরবেরই হোক না কেন, তার নিজের দৈনন্দিন জীবনে সেই দেশের স্বাধীনতা কতটুকু ভূমিকা রাখে, তা ভেবে দেখবার বিষয়। নারীর অধিকারের প্রসঙ্গ তুললেই মানবতার ধ্বজা উড়িয়ে নিজেকে মানুষ ভাবতে উপদেশ দিতে আসেন যারা তারা নিজেরা আসলে নারীকে কতটুকু মানুষ ভাবেন?  তারা নিজেরাই বা কতটুকু মানুষ?

বিলেতে কিছু বিষয়ে সূক্ষ্মভাবে নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য থাকলেও প্রতিদিনের চলাফেরা, কাজকর্ম, জীবন যাপনে আমার মনেই থাকে না যে আমি একজন নারী। অথচ বাংলাদেশের মাটিতে পা দেওয়ার মুহূর্ত থেকে প্রতি পদে পদে আমাকে একথা মনে করিয়ে দেওয়া হয় নানান ভাবে, নানান প্রেক্ষিতে। অনেক ত্যাগ আর তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত দেশটাকে বড় ভালোবাসি বলেই বছরে কয়েকবার দেশে ছুটে যাই, কিন্তু সেখানে যাওয়ার পর আমি আর মানুষ থাকি না। দেশের অধিকাংশ অধিকার-বঞ্চিত নারীদের ভীড়ে আরও একজন নারী হিসেবে আমিও ‘ঊনমানুষ’ হয়ে যাই। এই বিষয়টা আমাকে ভীষণ কষ্ট দেয়।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে দুই লক্ষ মা বোনের ‘ইজ্জতহানি’ নিয়ে বক্তৃতায় আগুন ঝরানো হয়, বীরাঙ্গনাদের নিয়ে সভা সমিতির আদিখ্যেতা করা হয়, কিন্তু যে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের ধারাবাহিকতায় লাঞ্ছিত হয়েছেন অগণিত নারী, সেই দেশের সমাজ নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য কী করেছে গত অর্ধদশকে? যে দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য লড়েছেন আমার বাবা, উঠতি বয়সের বোনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ঘর থেকে ঘরে, গ্রাম থেকে গ্রামে, এমনকি দেশান্তরে পায়ে হেঁটে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে বেড়িয়েছেন আমার মা, আত্মীয়স্বজনদের আশ্রয়ে সহ্য করেছেন নানান গঞ্জনা সেই দেশে নারী হিসেবে আমার অবস্থান কতটা সম্মানের, কতটা নির্ভরতার, কতটা স্বাধীনতার? ধর্ষিত নারীর ‘ইজ্জতহানী’ কথাটাতেই আমার তীব্র আপত্তি।

লেখক: লেখক: অভিবাসী শিক্ষক ও অনুবাদক 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ