মায়ের দোয়া বনাম বাবার আদেশ

Send
ফারজানা হুসাইন
প্রকাশিত : ১৪:৫৩, এপ্রিল ১৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৯, এপ্রিল ১৩, ২০১৭

 

ফারজানা হুসাইনআমাদের পাড়ার মোড়ে একটি ছোট পান-সিগারেটের ঝুপড়ি দোকান ছিল। দোকানি ছিলেন একজন মহিলা যাকে পাড়ার সবাই একনামে ‘পানওয়ালি খালা’ বলে ডাকত। সেই খালার সংসারে ছিল কালো কালো তিনটে মেয়ে আর হাঁপানি রোগী উপার্জন ক্ষমতাহীন স্বামী। সেই স্বামী ভদ্রলোক জরাগ্রস্ত আর উপার্জনহীন হলে কী হবে, তিনি তো মহান স্বামী! তাই তিনি প্রতি দু-তিন বছর পর পর দোকানের সব জমানো টাকা-পয়সা নিয়ে একদিন হঠাৎ উধাও হয়ে যান। ছয় মাস-নয় মাসে সেই টাকা-পয়সা নয়-ছয় করে একটি নতুন বউসহ ‘পানওয়ালি খালা’র সংসারে ফিরেও আসেন। বছর ঘুরতেই আর ও একটি কালো কন্যা সন্তানের জন্ম হয় নতুন বউয়ের ঘরে। দু-তিন বছর পর আবারও রাজপুত্র জন্ম দেওয়ার আশায় স্বামী ব্যক্তিটি দোকানের সবকিছু রাতের আঁধারে বিক্রি করে টাকা-পয়সা নিয়ে উধাও হয়ে যান।
এ রকম একবার যখন পুরো একবছরে ও সেই স্বামীর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না তখন ‘পানওয়ালি খালা’ বেশ চিন্তায় পড়ে গেলেন। বিভিন্ন মাজারে তার নিত্য আসা যাওয়া শুরু হলো স্বামীর খোঁজে। যে স্বামী ভাত-কাপড়ের সংস্থান করতে পারে না, চুন থেকে পান খসলেই মারধোর করে, বস্তির এক কক্ষের সংসারে তিন সতীনসহ বসবাস; সেই স্বামীর জন্য তাবিজ-কবজ কেন করা? ‘পানওয়ালি খালা’ কালো তরমুজের বিচির মতো দাঁতগুলো বের করে একগাল হেসে বলেন, 'ছোট আপা, আফনাগো খালু লোক খুব ভালো, জিন-পরী দোষ আছে তার ওপর, তাই তো সংসারে মন নেই। আর আমার তিনটে মেয়ে গো আপা। ওদের বিয়ে দেওয়া লাগবে না? তখন তো বাপের দরকার পড়বে। একা আমি মেয়েদের নিয়ে কোথায় দাঁড়াব। সমাজে বাঁচতে হলে পুরুষ মানুষের ছায়া দরকার। তাই তো মুখ বুজে সতীনের ঘর করি!’-আবেগে চোখ মোছেন তখন খালা।
গত কয়েকদিন আগে একজন চলচ্চিত্রের নায়িকা টিভি পর্দায় সন্তানের পিতৃপরিচয় চেয়ে এক আবেগঘন সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন বাংলা সিনেমার ‘নাম্বার ওয়ান’নায়ক তার স্বামী, কোলের পুত্র সন্তানটির পিতা। ওদিকে নায়কের কানে এই সাক্ষাৎকারের কথা যাওয়া মাত্র নায়ক সন্তানকে মেনে নিয়েছেন কিন্তু নায়িকাকে নয়। কারণ ওই নায়িকা দীর্ঘ আট বছরের বিবাহিত জীবন আর ছয় মাসের সন্তানের কথা কেন এভাবে সবার কাছে প্রকাশ করলো? নায়কের সেরা পজিশনের কথা চিন্তা করে আরও আট বছর কেন লুকিয়ে রাখলো না এই বিয়ে আর সন্তানের কথা? সব চক্রান্ত, সব নায়কের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র!
নায়ককে নিয়ে বলার কিছুই নেই। কারণ নায়ক বার বার দাবি করেছেন তিনি স্ত্রী-সন্তানের সব দায়িত্ব পালন করেছেন লাখ-লাখ টাকা দিয়েছেন, নিজের ক্যারিয়ারের কথা চিন্তা করে গর্ভবতী স্ত্রীকে ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর আর কলকাতায় লুকিয়ে রেখেছেন, মাঝে মাঝে লোকচক্ষুর অগোচরে নায়িকার বাসায় এসে সন্তানকে আদর করে গেছেন গত ছয় মাস। আর কী চাওয়ার আছে নায়িকার?
আমাদের সেই ‘পানওয়ালি খালা’র মতো জনপ্রিয় এই নায়িকারও একটাই চাওয়া জনসম্মুখে স্বীকৃতি, সন্তানের পিতৃপরিচয়। এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজে ‘পানওয়ালি খালা’র মেয়েদের বিয়ের জন্য বাবার পরিচয় দরকার হয়, ছেলের এক বছরের জন্মদিনে জনসম্মুখে ছেলেকে দাঁড় করাতে হলে নায়িকার প্রয়োজন হয় তার সন্তানের পিতাকে। ছেলেকে টিকা দিতে নিয়ে যাওয়া হয় রাতের অন্ধকারে, কারণ ছেলের বাবা ছেলেকে সামাজিক স্বীকৃতি দেয়নি।
হতদরিদ্র পানওয়ালি খালা আর উঁচুতলার জনপ্রিয় নায়িকার মাঝে পার্থক্য কোথায়? দুই নারীই উপার্জনক্ষম, কিন্তু সমাজের চোখে তাদের অবস্থান নির্ধারিত হয় একজন পুরুষের নামে। পুরুষের কাছে স্বীকৃতির দাবিতে তাই শ্রেণিবিশেষে নারীকে কখনও গুনীনের বাড়িতে আবার কখন টেলিভিশন পর্দায় অশ্রুসজল চোখে উপস্থিত হতে হয়। নতমুখে ভিক্ষা চাইতে হয় সামাজিক মর্যাদা। পিতৃতান্ত্রিক সমাজে তাই অর্থনৈতিক মুক্তি কিংবা শিক্ষা আমাদের নারীদের কতখানি স্বাধীনতা এনে দিতে পেরেছে তা আজও প্রশ্নবিদ্ধ।
দিন শেষে পুরুষটি মেনে নিল তো হাসিমুখে পতি-পরমেশ্বরের বন্দনা করা নারীর ধর্ম। রূপকথার গল্পের মতো, অতপর তাহার সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল।।

২.
একজন নারী কি এই সমাজে নেই যে সন্তানের জন্য ওই কুলাঙ্গার পিতৃপরিচয় দাবি করবে না বরং উচ্চশিরে সমাজকে চোখ রাঙিয়ে বলবে, এ সন্তান জারজ নয়, এ সন্তানের মাতৃপরিচয় আছে, সে একমাত্র আমার। যে স্বামী বছরের পর বছর স্ত্রীকে সমাজের কাছে লুকিয়ে রাখে, যে জন্মদাতা শুধু জন্মই দেয় কিন্তু বাবা হয়ে ওঠে না, সে কীটতুল্য। কীটের পরিচয়ে মানব সন্তান পরিচিত হয় না, কীটকে পায়ে মাড়িয়ে দিতে হয়।
গর্ভের চেয়ে বীর্য শ্রেয়তর, পিতৃতন্ত্র এই ঘোষণা দেয় ধর্মের ঢালে গা ঢাকা দিয়ে। আর লোকাচার ও সংস্কারের বুলি আউড়ে সমাজ সেই অপু বিশ্বাসকে টেনে নেয় শতাব্দীর পর শতাব্দী। বাহুবলে নারীকে কোণঠাসা করে পুরুষ হয়ে ওঠে লৌকিক ঈশ্বর।
কোনও মানুষ নারী বা পুরুষ হয়ে জন্ম নেয় না। বরং পুরুষের সৃষ্ট সমাজ শারীরিক গঠনের ভিত্তিতে কাউকে অবলা ঘোষণা করে, নারী বানিয়ে দেয়, নারীর জন্য সে সৃষ্টি করে কোমলতর রূপ। নারীর পরিচয় সে কারও মা, কারও কন্যা কিংবা কারও স্ত্রী। বাবার হাত থেকে স্বামীর হাতে, অতপর ছেলের হাতে হস্তান্তরিত হয় এই প্রাণসর্বস্ব সম্পত্তি।
এক বিন্দু শুক্রাণুর কাছে নয় মাসের গর্ভধারণের কষ্ট ছোট হতে পারে না। রাতের অন্ধকারে যে বীর্যপাত ঘটেছে, লোকচক্ষুর সামনে দিনে দিনে ফুলে-ফেঁপে ওঠা মাতৃগর্ভের কাছে সে বীর্য শৌর্যের প্রতীক নয় মোটেই। মাতৃজঠরের চেয়ে পবিত্র আর গৌরবের কিছুই হতে পারে না। সন্তানের জন্য একজন নামওয়ালা বাবার প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন শুধু একজন বলিষ্ঠ অভিভাবকের। কেন একজন মা সেই অভিভাবক হতে পারেন না?
জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা, হ্যাঁ আপনাকেই বলছি। আপনি অথর্নৈতিকভাবে সাবলম্বী, সমাজে নন্দিত। আপনি যখন টিভি চ্যানেলে কান্নাকাটি করে সন্তানের পিতৃপরিচয়ের দাবি জানান, তখন নারী হিসেবে কেবল আপনি নিজেকে ছোট করেন না বরং মানুষ হিসেবে আমাদের মাথা হেট হয়ে যায়। আপনি অনেকের স্বপ্নকন্যা, দুঃসাহসী অনেক চরিত্রে আপনার অভিনয় দর্শকপ্রিয় হয়েছে। রূপালি পর্দায় আপনি কতবার ভিলেনকে পিটিয়েছেন নির্দয়ভাবে, কেন তবে বাস্তবের দাম্ভিক অসূরকে বধ না করে তারই কাছে নতশিরে স্বীকৃতি ভিক্ষা চাওয়া? কেন?

 

লেখক: আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ