বিলেতে যারা গৃহহীন

Send
জেসমিন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:০৩, এপ্রিল ১৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৬, এপ্রিল ১৩, ২০১৭

জেসমিন চৌধুরীসেদিন কলেজে বিশ্ব খাদ্য উৎসবে ছাত্ররা বিভিন্ন রকম খাবার নিয়ে এসেছিল। ইতালিয়ান পিৎজা, স্প্যানিশ অমলেট, এরাবিয়ান কেবসা, জাপানিজ সুশি আর ক্লাব স্যান্ডুইচ সাধ মিটিয়ে খাবার পর যখন পেটে তিল পরিমাণ জায়গা নেই, তখন একজন ছাত্র কিছু মরোক্কান মিষ্টি এগিয়ে দিল। লোভ সামলাতে না পেরে দু’চারটি টিস্যু পেপারে মুড়ে নিয়ে নিলাম, বাসায় গিয়ে প্রাণভরে উপভোগ করব বলে।


















কলেজ থেকে বের হতেই টেসকো সুপারস্টোরের সামনের লাইটপোস্টে হেলান দিয়ে বসে থাকা স্লিপিং-ব্যাগমোড়া গৃহহীন ইংরেজ লোকটির ওপর চোখ পড়ল। আমি সাধারণত ভিক্ষা দেই না, দু’টো কারণে। প্রথমত, অনেক কিছু জানা-বোঝার পরও এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে, জনকল্যাণ ভিত্তিক সমাজব্যবস্থার এই দেশে কারও ভিক্ষা করার প্রয়োজন থাকতে পারে। দ্বিতীয়ত, সাতাশ বছর আগে হতদরিদ্র বাংলাদেশ থেকে এদেশে এসে ধনী দেশের ‘ধনী ভিক্ষুক’কে ভিক্ষা দিয়ে ছেলেমানুষী আনন্দ পাওয়ার অপরিপক্কতা এখন কাটিয়ে উঠেছি। কারও থালায় পয়সা ছুড়ে দিয়ে বড়ত্বের অবস্থান দেখাতে নিজের কাছেই সংকোচ হয়। এ যেন পঞ্চাশ পেনির একটি মুদ্রার সঙ্গে পঞ্চাশ পাউন্ডের একটি অপমান ছুড়ে দেওয়া, ‘দেখো, প্রয়োজনের তুলনায় আমার অনেক বেশি আছে, তাই তোমাকে একটুখানি দিচ্ছি।’
কিন্তু সেদিন দৃশ্যতই ক্ষুধার্ত লোকটির সামনে দিয়ে ভরপেটে হাতে মিষ্টি নিয়ে অবলীলায় হেঁটে যেতে খারাপ লাগল। খানিকটা ইতস্তত করে এগিয়ে গেলাম, কণ্ঠে যতটা সম্ভব সহ-অবস্থান সূচক সুর এনে বললাম, ‘হ্যাভ ইউ এভার ট্রাইড মরক্কান সুইটস?’
স্নিগ্ধ অথচ করুণ একটা হাসির মাধ্যমে সে জানিয়ে দিল—‘না, করিনি। রুটিই জোটে না, তায় আবার মরক্কান সুইট!’
যথাসম্ভব নম্র শারীরিক ভঙ্গিতে হাতের মোড়কটা তার দিকে এগিয়ে দিলে লোকটার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, ‘গড ব্লেস ইউ মাই লাভ।’
বহুতল বিশিষ্ট কার পার্ক থেকে গাড়ি চালিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার সময় দেয়ালে লাগানো একটি বিশাল নোটিশ এই প্রথম চোখে পড়ল, ‘পথেঘাটে ভিক্ষুকদের সাহায্য করার মাধ্যমে গৃহহীনতার সমস্যা কমে না। গৃহহীন ভিক্ষুককে খাদ্য, পানীয় বা অর্থ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন, কারণ এর মাধ্যমে তাদের প্রকৃত সাহায্য গ্রহণের পথ খুঁজতে নিরুৎসাহিত করা হয়।’ আরেক নতুন অপরাধ বোধ এসে পুরনোটার স্থান দখল করল, কিন্তু আসলে কি তাদের জন্য প্রকৃত সাহায্য বলে কিছু আছে?
এছাড়া এই মুহূর্তে ক্ষুধায়, তৃষ্ণায়, ঠাণ্ডায় যে মানুষটি কষ্ট পাচ্ছে, তাকে সাহায্য করা থেকে কি আসলেই বিরত থাকা যায়? বিবেক ও সুবুদ্ধি সবসময় হাত ধরাধরি করে চলতে পারে না বোধ হয়। মানুষ যখন কষ্টে থাকে, তখন কী ঠিক আর কী ভুল কে জানে?
বিলেতে, বিশেষ করে ম্যানচেস্টার শহরের কেন্দ্রবিন্দু এবং এর আশেপাশে গৃহহীনদের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে। আমি যে সরু গলি পথে হেঁটে কলেজে যাই, সেটিকে তারা টয়লেট হিসেবে ব্যবহার করে, কার পার্কের লিফটে উঠলে ফ্লোরের হলুদ তরল পদার্থের ভয়াবহ গন্ধে প্রায়ই ছিটকে বেরিয়ে আসি, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেলেও ঘুমন্ত কোনও গৃহহীনকে প্রায়ই মাড়িয়ে যেতে হয়। গাঁজার গন্ধে ভারী হয়ে থাকে আশেপাশের বাতাস, গায়ে দুর্গন্ধ আর ময়লা কাপড়ের বোঝা নিয়ে দাঁড়িয়ে বা বসে থাকা গৃহহীন নারী-পুরুষগুলোকে গাঁজা ফুঁকতেও দেখি প্রায়ই। গা বাঁচিয়ে একটু দূরত্ব রেখে হেঁটে চলে যাই, কিন্তু ভুলতে পারি না, যে ভিনদেশ আমাকে কর্ম আর বাসস্থানের নিশ্চয়তা দিয়েছে, এরা সেই তথাকথিত উন্নত দেশেরই নাগরিক। তাদের কি আসলে পাশ কাটিয়ে যেতে পারি আমি?
অনেকে মনে করেন, এই অবস্থা পুরোপুরি ইচ্ছাকৃত। আমিও আগে এ রকমই ভাবতাম কিন্তু রবার্ট সুইন্ডেলের ‘স্টোন কোল্ড’ উপন্যাসটি পড়ে প্রথম বুঝতে পারলাম, কিভাবে একটি নিয়মতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায়ও একজন মানুষ দুর্বল পারিবারিক কাঠামো, সামাজিক অসংবেদনশীলতা, স্বজনদের স্বার্থপরতা এবং সিস্টেমের জটিলতার কারণে সিস্টেম থেকে ছিটকে পড়তে পারে, গৃহহীনতার নিষ্ঠুর আবর্তে ঘুরপাক খেতে বাধ্য হতে পারে। লিংক নামের ষোল বছর বয়সের ছেলেটি মায়ের বয়ফ্রেন্ডের হাতে নির্যাতিত হতে হতে একসময় একটি মাত্র পোটলা হাতে ঘর ছাড়তে বাধ্য হলে তার মা মনে মনে খুশিই হয়, বাঁচা গেলো। নিজের নিরাপত্তাহীন জীবনে অনির্ভরশীল ছেলের চেয়ে বয়ফ্রেন্ডই তার কাছে বেশি গুরুত্ব রাখে। জন্মদিনে মা আর বোন মিলে তাকে একটা স্লিপিং ব্যাগ কিনে দিয়ে দায় সারলে ফুটপাথই লিংকের নতুন স্থায়ী ঘর হয়ে পড়ে, যেখানে নানারকম বিপদের মোকাবিলা করে কাটে তার নিরুপায় জীবন। নতুন করে কিভাবে ঘর খুঁজে নিতে হয়, তা জানে না ষোল বছরের অর্বাচীন ছেলেটি।
রবার্ট সুইন্ডেলের এই উপন্যাসটি একসময় এদেশের অষ্টম শ্রেণির পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হয়েছিল, যেন বাচ্চারা গৃহহীনতা নামের অভিশাপ থেকে মুক্ত থাকতে এবং গৃহহীনদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শেখে। এই বইটির কোর্সওয়ার্কে ছাত্রদের সহায়তা করতে গিয়ে আমি নিজেও এদেশের গৃহহীনদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে শিখেছি, তাদের উপায়হীনতা বুঝতে শিখেছি। তাদের অনেকে মাদকাসক্তির কারণে এই অবস্থায় উপনীত হয় সত্যি, কিন্তু সেক্ষেত্রেও সমাজ পুরোপুরি দায়মুক্ত নয়। অনেকে আবার মানসিক স্বাস্থ্যগত কারণেও এই পরিস্থিতির শিকার হয়। উন্নত বিশ্বের ঝকঝকে আলো, ঝলমল জগতের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে থাকা এসব গৃহহীন মানুষকে আমার কাছে দরিদ্র দেশগুলোর ভিখারিদের চেয়েও বেশি অসহায় মনে হয়। কারণ একটি মজবুত অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত জীবন ব্যবস্থার মধ্যে আবর্জনার মতো বাস করছে তারা। চারদিকের প্রাচুর্য আর নিশ্চয়তার সোনালি ফ্রেমে তাদের অভাবক্লিষ্ট জীবনছবি যেন আরও অনেক বেশি করুণ আর বেমানান। এই বৈপরীত্য, বৈষম্য ও অসঙ্গতি থেকে উদ্ভূত শারীরিক কষ্ট থেকে মানসিক যন্ত্রণা অনেক বেশি তীব্র যা থেকে মুক্তি লাভের জন্যই হয়তো ভিক্ষালব্ধ অর্থ দিয়ে খাবার না কিনে তারা ড্রাগস কিনে খায়।
মজার ব্যাপার হলো লন্ডন ও ম্যানচেস্টারে দীর্ঘদিনের জীবনে আমি পথে-ঘাটে কখনও কোনও বাঙালি বা ভারতীয় ভিক্ষুক দেখিনি। এদেশে ভারতীয়দের পারিবারিক জীবন ঘনিষ্ঠভাবে দেখার সুযোগ হয়নি আমার, তবে সামাজিক মেলামেশা ও কর্মসূত্রে বাঙালিদের জীবন যতটুকু দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে আমাদের মজবুত পারিবারিক কাঠামোর জন্যই এ ধরনের পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা খুব কম। এখানে বাঙালি মা-বাবাদের অনেকেরই বেশি শিক্ষাদীক্ষা নেই, অনেক কষ্টে আয়-রোজগার করে দিনযাপন করেন, কিন্তু বাচ্চাদের প্রতি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তারা আপসহীন। নিজের বর্তমানের চেয়ে বাচ্চাদের ভবিষ্যৎ তাদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্ব রাখে। তারা বাচ্চাদের আবেগিক বা মানসিক চাহিদার বিষয়টা হয়তো তেমন একটা বোঝেন না। ফলে অনেক সময় অনেক করুণ পরিস্থিতিরও সৃষ্টি হয়, কিন্তু ঘর ছেড়ে পথে দাঁড়ানো বা সিস্টেম থেকে ছিটকে পড়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় না খুব একটা। এদেশের বাঙালিদের জন্য গৃহহীনতার অর্থ হচ্ছে নিজস্ব স্থায়ী বা নিজস্ব মালিকানার বাড়িঘর না থাকা, ভাড়া বাসায় থেকে সরকারি হাউজিং বেনিফিটের ওপর নির্ভর করে চলা। আসলে সব মিলিয়ে আমরা বাঙালিরা এদেশে অনেকের চেয়েই অনেক ভালো আছি, কৃতিত্ব যারই হোক না কেন।
এ ক্ষেত্রে আমাকে যা সবচেয়ে বেশি বিব্রত করে, তা হচ্ছে এই ভিনদেশের নাগরিকত্ব লাভ করে, এখানের সিস্টেমের সমস্ত সুযোগ-সুবিধা সুন্দরভাবে ভোগ করে, চিকেনকারি দিয়ে ভাত খেয়ে ঢেঁকুর তুলে এখানকার সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলোর প্রতি আমাদের উন্নাসিকতা প্রদর্শন করা, তাদের দেখে নাক সিঁটকানো। সহমর্মিতা দেখানোর পরিবর্তে ‘তাদের অবস্থার জন্য তারাই দায়ী’ বলে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া। আমরা যেখানেই থাকি, যেভাবেই থাকি, যেকোনও মানুষের কষ্ট যেন আমাদের ব্যথিত করতে পারে— এরই নাম মানবতা।

লেখক: অভিবাসী শিক্ষক ও অনুবাদক 

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ