নববর্ষের সেকাল-একাল

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১০:০৫, এপ্রিল ১৪, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:১২, এপ্রিল ১৪, ২০১৭

সালেক উদ্দিনবাংলা ১৪২৪ সালের যাত্রা শুরু আজ।  এই দিনের সূর্যোদয়ের মধ্য দিয়ে শুভ সূচনা হবে আরও একটি বাংলা বর্ষের।  আরবি বর্ষ যেমন সূর্যাস্ত থেকে শুরু হয় তেমনি  ইংরেজি বর্ষ শুরু হয় মধ্যরাত থেকে।  আর বাংলা বর্ষযাত্রার শুরু সূর্যোদয় থেকে।
বাংলা বর্ষের যাত্রা শুরু হয়েছিল ৫ নভেম্বর ১৫৫৬ সালে।  আর এই বর্ষ প্রবর্তন করেছিলেন মুঘল সম্রাট আকবর।  প্রজাদের খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে সম্রাট আকবরের আমলে ইংরেজি ও আরবি সনের পাশাপাশি এক নতুন সন প্রবর্তিত হয়।  সম্রাটের নির্দেশে তৎকালীন বিখ্যাত চিন্তবিদ ফতেহউল্লাহ সিরাজি ফসল তোলা ও খাজনা আদায়ের সময় বিবেচনায় রেখে ইংরেজি সৌর সন এবং হিজরি চন্দ্র সনের ওপর ভিত্তি করে এই নতুন সনের নিয়ম প্রবর্তন করেন।  এই সনের নাম শুরুতে ছিল ফসলি সন, পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ হিসেবে পরিচিতি পায়।
মুঘল সম্রাট আকবরের সিংহাসন আরোহনের দিন থেকে এই সনের গণনা কার্যকর হয়।  যাত্রা শুরু হয় নতুন ফসলি সনের।  এই ফসলি সনটি এদেশের প্রকৃতি ও মানুষের জীবন চারণ কেন্দ্রিক হওয়ায় ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে মানুষ একে মনে প্রাণে গ্রহণ করে।  পরবর্তীতে ফসলি সন রুপান্তরিত হয় অসাম্প্রদায়িক বাংলা বর্ষে।  যার অবয়বে রয়েছে ছয় ঋতুর বার মাস।  এই বারটি মাসের নামকরণ করা হয়েছে নক্ষত্র মণ্ডলের চন্দ্রের আবর্তনে বিশেষ তারার অবস্থানের ওপর ভিত্তি করে।

সম্রাটের সময়ে মানুষদের চৈত্রের শেষ দিনের মধ্যে খাজনা শোধ করতে হত।  পরের দিন পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসিদের মিষ্টিমুখ করাত।  বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো পুরো মুঘল আমল, ইংরেজ আমল, পাকিস্তান আমলএই সনটি অনুসরণ করে বাঙালি হিন্দু মুসলমান চাষাবাদ ও ব্যবসা বাণিজ্য করেছে।  তখনকার সময় পহেলা বৈশাখের প্রধান ঘটনা ছিল একটি নতুন হিসাব বই বা হালখাতা তৈরি করা।  অল্প পরিসরে হলেও এদেশে এখনও হালখাতার প্রচলন রয়েছে।

তারওপরে ক্রমে-ক্রমে নববর্ষ বাঙালির সামাজিক অনুষ্ঠানে রূপ নেয়।  বৈশাখ মাসের প্রথমদিন নববর্ষ উদযাপন শুরু হয়।  প্রবর্তিত হয় শুভ নববর্ষ কথাটি।  সকল দুঃখ-গ্লানি ও জরা মুছে ফেলে পুরনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণ করার লক্ষেই শতশত বছর ধরে বাঙালি জাতি উদযাপন করে অসাম্প্রদায়িক বাংলা নববর্ষ উৎসব।  এই উৎসবে দেশের সকল ধর্মের মানুষই অংশগ্রহণ করে থাকে।  তখন থেকেই নববর্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ সকালে মরিচ-পেয়াজ দিয়ে ঢেঁকি ছাঁটা মোটা চালের পান্তা ভাত খেয়ে দিন শুরু করতো বাঙালিরা।  রান্না করা হত শতপদের শাকসবজি।  খাবারের সঙ্গে থাকতো বিভিন্ন ফলমূলের আয়োজন তারপর সারা মাস ধরে চলতো বৈশাখী মেলা।  গ্রামীণ ব্যবসায়ীরা কদমা, বাতাসা, খই, মুড়কি, নাড়ু ইত্যাদি বিক্রি করত বৈশাখী মেলায়। বিক্রি করতো হাতপাখা, খেলনা হাতি, খেলনা ঘোড়া, একতারা, ডুগডুগি, ঢোল ইত্যাদি।  উৎসবমুখর ঘরোয়া আমেজ ছিল মেলাতে।  বিনোদনের জন্য মেলায় বৌ-নাচুনি, পুতুল নাচ, চরকা ঘুরানো সহ নানাবিধ আয়োজন থাকতো।  এই দিন মানুষেরা নতুন কাপড় পড়তো, আনন্দ উল্লাসে সময় কাটাতো এবং প্রার্থনা করতো সারা বছর যেন এমনই আনন্দঘন থাকে।

পাকিস্তান আমলে বাঙালির নববর্ষের আয়োজন প্রধানত ছিল গ্রাম কেন্দ্রিক।  গ্রাম থেকে ক্রমেই শহরমুখি হয় নববর্ষ উদযাপন উৎসব।  সে সময় শহরে এর প্রসার বিস্তারে প্রধান প্রতিবন্ধকতা ছিল পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর অবহেলা ও ঘৃণা।  ফলে শহরে পহেলা বৈশাখ শুধু পারিবারিক ভাবে পালিত হত।  এটাকে সামাজিক ভাবে পালন করার ক্ষেত্রে ছায়ানটের ভূমিকা অনেক।  ষাটের দশকে রমনা বটমূলে ছায়ানট বর্ষবরণ উৎসবের আয়োজন করার মধ্যদিয়ে ঢাকাসহ সারাদেশের শহরাঞ্চলে বাংলা নববর্ষ সামাজিকভাবে উদযাপনে শহরবাসীদের উদ্বুদ্ধ করে।  নববর্ষের সামাজিক উৎসব সমূহ গ্রামের মতো পালিত হতে শুরু করে শহরেও বর্তমানে রমনার বটমূল থেকে এদেশের শহর বন্দর গ্রামগঞ্জ সর্বত্র মহাসমারোহে পালিত হচ্ছে বাঙালির আত্মার সঙ্গে সম্পর্কিত বাংলা নববর্ষের নানা উৎসব।  এখনও নববর্ষে সংযোজিত হচ্ছে নতুন নতুন উৎসব যেমন, লাল সাদা রংয়ের বস্ত্র পরিধান, পান্তা ইলিশ, মঙ্গল শোভাযাত্রা ইত্যাদি।  পহেলা বৈশাখে পান্তা-ইলিশ খাওয়া নববর্ষ উৎসবে মাত্র একদশক আগে যুক্ত হওয়া হয়েছে এবং লাল-সাদা রঙয়ের কাপড় পরিধান যুক্ত হয়েছে অতিসম্প্রতি।

পান্তা ইলিশ মূলত কয়েকজন ব্যবসায়ীর অতি উৎসাহের কারণে রমনার নববর্ষ অনুষ্ঠানে চালু হয়েছিল।  সেই থেকে কিছুকাল প্রসারও পেয়েছিল বেশ।  পরে এর কুফল তুলে ধরায় গত বছর থেকে এটি বন্ধের জন্য সরকারি ও বেসরকারি সকল পর্যায়েই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।  ভাটা পড়েছে নববর্ষের ভোরে পান্তা ইলিশ খাওয়া।  তাছাড়া প্রাচীন কাল থেকে গ্রাম বাংলায় নববর্ষের যে উৎসব হতো তাতে 'পান্তা ইলিশ'-এর কোনও অস্তিত্বও ছিল না।     

সেপ্টেম্বর- অক্টোবর মাস ইলিশ মাছের ডিম পাড়ার সময়।  ইলিশ মাছেরা দল বেঁধে থাকে।  এসময়ে সমুদ্রের গভীরে বসবাস করা ইলিশেরা দেশের বড়বড় নদীতে ডিম পাড়তে আসে।  মা ইলিশ যেন মারা না পড়ে সেই লক্ষে কিছুদিন ইলিশ ধরা বন্ধ রাখার সরকারি নিয়ম রয়েছে।  এরপর মার্চ –এপ্রিলে জাটকা ইলিশের বড় হওয়ার সময় বলেও এসময় জাটকা না ধরার জন্য সরকারি নির্দেশ আছে।  আর এই সময়টাতেই আসে বাংলা নববর্ষের প্রথম মাস বৈশাখ।  আসে পহেলা বৈশাখ।  শুরু হয় নববর্ষের উৎসব।দেশের ইলিশ সম্পদ রক্ষার্থে নববর্ষে পান্তা –ইলিশ খাওয়া বন্ধ হওয়াটা যুক্তিসঙ্গত।    

নববর্ষের অনুষ্ঠানমালায় রমনার বটমূলে ছায়ানট বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সংযোজন হয় ষাটের দশকে।  এরপর আশিরদশকে সংযোজন হয় মঙ্গল শোভাযাত্রার।  ১৯৮৭ সালে যশোরে উদীচীর পৌর পার্কে বর্ষবরণ অনুষ্ঠান থেকে শুরু হয়েছে এই মঙ্গল শোভাযাত্রা।  সেখানে যশোরের সব সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অংশ গ্রহণে পৌর পার্ক থেকে বের হয় এক আনন্দ মিছিল।  নাম ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’।ঢোল, খোর-করতালের মুখরিত হয়ে সমাজের সব স্তরের মানুষের অংশগ্রহণে সেদিনের মঙ্গল শোভাযাত্রা পেয়েছিল সর্বজনীনতার মর্যাদা।  এই মঙ্গল শোভাযাত্রা অচিরেই দেশের সব মানুষের নজর কাড়ে।  ১৯৮৯ সাল থেকে ঢাকায় চারুকলা ইনস্টিটিউট যশোরের আদলে আয়োজন করে চলছে বর্ষবরণ উপলক্ষে আনন্দ শোভাযাত্রা প্রকারান্তরে মঙ্গল শোভাযাত্রা।  

এখন আর পহেলা বৈশাখ বা নববর্ষ উৎসব গ্রাম ভিত্তিক নেই।  রাজধানী সহ সকল বিভাগ জেলায় থানায় গ্রামে গঞ্জে বিপুল সমারহে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান মালার আয়োজন হয়।  বাঙালি পালন করে নববর্ষের সকল উৎসব।  পহেলা বৈশাখে নতুন করে নিজেরা সাজি, সাজাই বাসা থেকে অফিস।  বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান নানান অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ