‘ঘরের মধ্যে ঘর’

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১২:২১, মে ০১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:২৩, মে ০১, ২০১৭

সালেক উদ্দিনসম্প্রতি ২৩ এপ্রিল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী ছায়েদুল হকের আগমন ঠেকাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরে হরতাল ডেকেছিল স্থানীয় আওয়ামী লীগ।  আর তার একদিন আগে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের  আওয়ামী লীগের  প্রতিনিধি সম্মেলনে কর্মীদের এই বলে হুশিয়ার করে দিয়ে বলেন,  ‘আপনারা ঘরের মধ্যে আর ঘর করবেন না...।  দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িতরা আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন না’।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককে এমন হুশিয়ারি বাক্যমালা উচ্চারণের কারণই হলো বর্তমানে আওয়ামী লীগের ভেতরে যে দলীয় কোন্দল রয়েছে তার থেকে মুক্তি পাওয়ার একটা প্রচেষ্টা মাত্র।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতাল উদ্বোধন ও সুধী সমাবেশ উপলক্ষে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী অ্যাড. ছায়েদুল হকের ব্রাহ্মণবাড়িয়া সফরের প্রতিবাদে ২৩ এপ্রিল উত্তপ্ত হয়ে ওঠে বিজয়নগর, আশুগঞ্জ ও সরাইল উপজেলা।  সেখানে সকাল ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছিল।  উপজেলা আওয়ামী লীগ, মহিলা আওয়ামী লীগ, যুব লীগ, ছাত্র লীগের কর্মীরা সারাদিন মন্ত্রীর বিরুদ্ধে মাঠে রইলেন।  প্রতিবাদ মিছিল করলেন।  ১৪৪ ধারা জারি করা হলো, পুলিশের সাথে আওয়ামী লীগ কর্মীদের সংঘর্ষ হলো।  সংঘর্ষে থানার ওসি আহত হলেন।  আওয়ামী লীগের এত প্রতিবাদের মধ্যে আওয়ামী লীগের মন্ত্রী মহোদয় ঠিকই উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতাল উদ্বোধন করে চলে এলেন।  দলের কর্মীদের মতামতের কোনও গুরুত্বই দিলেন না। 

হরতাল গণতান্ত্রিক অধিকার।  তাছাড়া এদেশ ‘হরতালের দেশ’।  এক সময় বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই আওয়ামী লীগ পুরো সময় কালেই একের পর এক হরতাল ডেকে রেকর্ড তৈরি করেছিল।  আবার গত মেয়াদে আওয়ামী লীগের ক্ষমতা থাকাকালীন সময়ে বিএনপি সেই রেকর্ড অতিক্রম করেছে।  অতএব হরতাল নিয়ে আলোচনার এমন কী-ই বা আছে? তারপরও বিজয়নগরের এই হরতাল গুরুত্ব পায় একারণেই যে এটি সরকারি দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরকারি দলের হরতাল।  সরকারি দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ কোন্দলের বহিঃপ্রকাশ।  আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কলহের এটি একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ।

একটু চোখ মেলে তাকালেই আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কলহের এরকম অসংখ্য ঘটনা দেখা যায়।  যেমন, প্রভাব প্রতিপত্তি ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ২ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে সাংবাদিক আবদুল হাকিম শিমুলের মৃত্যু হয়।  একই দিন মধ্যরাতে পাবনার ঈশ্বরদীতে আমবাগান পুলিশ ফাঁড়ির পেছনে অবস্থিত টাইগার ক্লাবের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে স্থানীয় যুবলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষ ও গোলাগুলি হয়।  এতে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের দুজন কর্মী গুলিবিদ্ধ এবং আরও দুজন ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত হন।

গত বছরের ২২ মার্চ থেকে ৪ জুন পর্যন্ত হয়ে গেলো প্রথমবারের মতো রাজনৈতিক দলের ব্যানারে ছয় ধাপের ইউপি নির্বাচন।  এই নির্বাচনে মূলত আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন।  আর সেই নির্বাচনি সহিংসতায় প্রাণ গিয়েছে ১০৯ জনের।  শুধুমাত্র ভোট গ্রহণের দিনগুলোতেই খুন হয়েছেন ৪১ জন।  নির্বাচন শেষ হয়ে গেলেও সেই সহিংসতা এখনও শেষ হয়নি।  এখনও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নির্বাচনি শত্রুতার জের ধরে চলছে খুন খারাবি। ।নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীর বিরোধের জের ধরে সর্বশেষ ১ ফেব্রুয়ারি রাতে খুন হলেন নড়াইল সদর উপজেলার ভদ্রবিলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রভাষ রায়।

২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত জেলা পরিষদ নির্বাচনের সময় সৃষ্ট দলের অভ্যন্তরীণ বিরোধের জের ধরে ২ ফেব্রুয়ারি রাতে শেরপুর জেলা আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী পরিষদের সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আতাউর রহমান মডেল কলেজের অধ্যক্ষ গোলাম হাসান খানকে (৫২) কুপিয়ে আহত করেছে নিজ দলের প্রতিপক্ষ।

গত বছরের শেষ দিন ৩১ ডিসেম্বর খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক জেড এ মাহমুদকে লক্ষ্য করে গুলি করে তার প্রতিপক্ষ।  গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে নিহত হন পথচারী এক নারী।
অভ্যন্তরীণ কোন্দলে গত বছরের জুলাই মাসে পৃথক তিনটি ঘটনায় ছাত্রলীগের ৩ নেতা ও কর্মী খুন হন খুলনা ও কুমিল্লায়।  এবছর ১৬ জানুয়ারি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ায় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে বড়মাছুয়া ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি কাইউম হোসেনকে কুপিয়ে জখম করে প্রতিপক্ষ।  ১৭ জানুয়ারি সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় একটি জলমহালের দখলকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের দুই পক্ষে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়।  এতে গুলিবিদ্ধ হয়ে ৩ জন নিহত ও ২২ জন আহত হন।

অতি সম্প্রতি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখলাম, মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ১২ মাসে আওয়ামী লীগ ও তার প্রধান প্রতিপক্ষ দল বিএনপির সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ১৩টি, নিহত হয়েছেন ১ জন, আহত হয়েছেন ১৯০ জন।  কিন্তু আওয়ামী লীগের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ৮৮টি, নিহত হয়েছেন ১৭ জন, আহত হয়েছেন ১ হাজার ৫২ জন।

পরিসংখ্যানটি বলে দেয় যে, বর্তমানে সরকারি দলের রাজনীতিতে যে সংঘাত হচ্ছে, তার মধ্যে রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কারণ খুবই কম।  এলাকার প্রভাব বিস্তার, চাঁদাবাজি, জমি দখল, বাড়ি দখল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল, ঠিকাদারির নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদিকে কেন্দ্র করেই এসব হচ্ছে।  আর সরকারি দলের মধ্যে এই অবস্থা চলতে থাকলে আওয়ামী লীগের মতো একটি দলকে পড়তে হবে এক করুন দূরাবস্থায়।

তাইতো আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, জনাব ওবায়দুল কাদেরকে চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি সম্মেলনে বলতে হয়, ‘আমরা যেভাবে চলছি এ ধারা অব্যাহত থাকলে বিএনপি আমাদের প্রতিপক্ষ হবে না।  আমাদের প্রধান প্রতিপক্ষ হবে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ হলে আওয়ামী লীগকে কেউ রক্ষা করতে পারবে না’।  তাকে বলতে হয়, ‘ঘরের মধ্যে আর  ঘর করবেন না।  খারাপ খবরের শিরোনাম হওয়া যাবে না।  অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জড়িতরা আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পাবেন না’

জনাব ওবায়দুল কাদের  যথার্থই বলেছেন।  সরকারি দল আওয়ামী লীগ যে দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের চূড়ান্ত পর্যায়ে অবস্থান করছে তাতে কোনও সন্দেহ নেই।  যেখানে তিনি এমন হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন সেখানেই অর্থাৎ চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগের দুই শীর্ষ নেতা এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী ও আ জ ম নাছির উদ্দীনের মধ্যে বর্তমানে চরম বিরোধ চলছে।  প্রকাশ্যে একে অপরের বিষোদগার করছেন।

শুধু চট্টগ্রাম আর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগরেই নয়, দেশের অধিকাংশ জায়গাতেই আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে এমন ভাবে জড়িয়ে গেছেন যে এটাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব না দিলে বা এর নিস্পত্তি না করলে দলটিকে চরম মূল্য দিতে হবে। 

লেখক: কথাসাহিত্যিক

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ