ফুটন্ত গোলাপ নাকি শুধুই কাঁটা?

Send
ফারজানা হুসাইন
প্রকাশিত : ১৩:৩১, মে ০৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৩৯, মে ০৭, ২০১৭

ফারজানা হুসাইনআমাদের এক বন্ধুর গল্প বলি। ধরি ওর নাম ‘স’। খুব পড়ুয়া মেয়েটির জীবন বাসার চার দেয়াল আর স্কুলের বইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। বন্ধু মহলে আমরা মজা করে বলতাম- হঠাৎ কেউ যদি ‘স’-কে প্রশ্ন করে তার প্রিয় খাবার কী, সে খুব বিচলিত হয়ে পড়বে নিশ্চয়ই। কারণ স্কুলের বইয়ে নিজের প্রিয় খাবারের কথা বলা নেই যে! কোন খাবারকে প্রিয় বললে সবার চেয়ে সে উত্তর আলাদা হবে আর একটু বেশি নম্বর পাওয়া যাবে সে নিয়ে চিন্তায় পড়ে যেত মেয়েটি। স্কুলের শেষ পরীক্ষার পর ওকে বলেছিলাম- ‘সামনে তো প্রায় মাস তিনেকের ছুটি আছে, তুই এবার গল্প -উপন্যাস পড়ে ফার্মের মুরগি থেকে একটু মানুষ হ!’
যাই হোক, মাত্র তখন এসএসসি পরীক্ষা শেষ করে অবসর সময় কাটাচ্ছি। একদিন আমরা দুই বন্ধু মিলে হুট করে ‘স’-এর বাড়িতে চলে গেলাম। ‘স’ খুব উৎসাহের সঙ্গে আমাদের জানালো সে উপন্যাস পড়ছে, সমরেশ মজুমদারের সাতকাহন। আমাদের বিস্মিত দৃষ্টির সামনে 'স' নিজেকে আমাদের ভাষায় মানুষ প্রমাণের জন্য বইটা আমার হাতে দিয়ে চোখ ছোট ছোট করে ষড়যন্ত্রকারীদের মতো নিচু গলায় বললো, বইয়ের অমুক অমুক পৃষ্ঠাগুলো পড়ে দেখো। পৃষ্ঠাগুলো খুলে দেখি সেখানে খুবই পরিশীলিত ভাষায় কিছুটা শারীরিক সম্পর্কের বর্ণনা দেওয়া আছে। গল্পের বইয়ের পোকা আমি ইতোমধ্যে বড়দের অনেক উপন্যাসই পড়ে ফেলেছি, ওরকম অনেক বর্ণনা ততদিনে আমার পড়া হয়ে গেছে। তার সঙ্গে সাধারণ বিজ্ঞান বইয়ের সেই বিশেষ অধ্যায়টি পড়ে শুক্রাণু-ডিম্বাণুর মিলনের রসকষহীন বায়োলজিও জানা হয়েছে বিধায় হ্যাংলা রোগা বরটা বিয়ের রাতে দীপাবলীকে যখন বলে তাড়াতাড়ি শাড়ি-কাপড় খুলে বিছানায় চলে আসো, বাবার আদেশ; তখন আর যাই হোক বিছানায় ঘটতে যাওয়া অঘটনকে কল্পনা করে সেই কিশোরী আমার গাল লাল হয়ে যায় না, বইয়ের পৃষ্ঠা নম্বরও মুখস্ত করে রাখা লাগে না।
কিন্তু সেই ইঁচড়ে পাকা কিশোরী আমি বা আমার মতো গুটি কয়েক অকালপক্ক কিশোর-কিশোরী বাঙালি পাঠক সমাজের প্রতিনিধি নই মোটেই। বরং বন্ধুদের সঙ্গে গোপনে চটি বই পড়া কিংবা পর্ন মুভি দেখে অবাক চোখে নারী-পুরুষের আদিমতম সম্পর্ককে জানা হয় অধিকাংশ কিশোরের। বেশিরভাগ কিশোরী হয়তো বান্ধবীদের সঙ্গে বিকেলে ছাঁদে ওঠে কানাকানি করে কিংবা উপন্যাসের সেই বিশেষ পাতাগুলো পড়েই আবছা ধারণা পায় সেক্স সম্পর্কে। প্রেম মানে ফিসফিসানি, প্রেম মানে লুকানো অভিসার; আর শারীরের ছোঁয়াছুয়ি তো গর্হিত অপরাধ, এ সম্পর্কে কথা বলাও রীতিমত ট্যাবু। অথচ আমাদের জন্ম প্রক্রিয়া এই শরীরকে ঘিরেই, সেই কিছুক্ষণের শারীরিক আনন্দেই।
২.

গত কিছুদিন আগে হঠাৎ করেই কাসেম বিন আবুবাকার নামের একজন লেখককে নিয়ে বিদেশি কয়েকটি মিডিয়ায় লেখা হওয়ায় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোতে তার পক্ষে-বিপক্ষে বেশ গুঞ্জন উঠেছে। বিশেষ করে প্রেমকে উপজীব্য করে ইতিমধ্যে আশিটির বেশি উপন্যাস লিখেছেন ৮০ বছর বয়সী এই লেখক; সুতরাং সমর্থকের পাশাপাশি তার সমালোচকের ও অভাব নেই। তার লেখা নির্দিষ্ট একটি পাঠকগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে, লেখার মূল ভাবধারাও সুনির্দিষ্ট এবং এককেন্দ্রিক। তার লেখায় নায়ক-নায়িকারা ইসলাম-মনস্ক। তিনি প্রেমের উপন্যাস লেখেন, সুতরাং তার উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্রগুলোও তথাকথিত শরীয়ত মেনে(!) প্রেম করে। প্রেমের সংলাপগুলোতে কিছু আরবি শব্দ জুড়ে দিয়ে তিনি নির্দ্বিধায় নায়ক-নায়িকাকে দিয়ে গোপন অভিসারে পাঠান, চুমু খাওয়ান এবং জড়িয়ে ধরান। এগুলো তো অন্যসব উপন্যাসের নায়ক-নায়িকাও করে, তাহলে তার উপন্যাসগুলো কেমন করে ইসলামি প্রেমের উপন্যাস হলো? ওই যে, কিছু আরবি শব্দ আর ইসলামি আচার-রীতি তিনি সংযুক্ত করেছেন সংলাপে, সেই কারণে তার লেখা উপন্যাস শরীয়তপন্থী। আসলে এ কেবলই বাজার ধরার ধান্দা। কাসেম সাহেবের আশিটি উপন্যাসের মধ্যে কেবল একটি উপন্যাস আমার পড়া হয়েছে, তাই তার সামগ্রিক সাহিত্যকর্ম নিয়ে পাঠক হিসাবে মন্তব্য করা ঠিক হবে না, তবে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের দরুণ তার উপন্যাসের নায়ক-নায়িকার বেশ কিছু সংলাপ জানতে পেরেছি। নতুন বোতলে পুরোনো মদের মতই সে সংলাপগুলো ইসলামি মোড়কে শালীন চটি গল্প। কয়েকটি সংলাপ বলি?
‘শফিক বিসমিল্লাহ বলে শফিকুনের ঠোঁটে কিস করা শুরু করলো’।
‘সুবাহানাল্লাহ। আপনার মতো সুপুরুষ আমি জন্মের পর থেকেই আশা করেছিলাম’। এই বলেই সে স্বামীকে জড়িয়ে ধরলো।
‘রফিকুন বোরখা পরে ডেটিং-এ যায়। কারণ বোরখা ছাড়া ডেটিং নাজায়েজ।’
শাকিলা তার স্বামীকে বললো, ‘বাসর রাতে কি করতে হয় আমি জানিনা। আমাকে শিখিয়ে দাও না গো’।
কাসেম আবুবাকার একজন সাহিত্যিক কিনা সে বিচার অন্য দিনের জন্য তোলা থাক, কিন্তু তিনি একজন বুদ্ধিমান ব্যবসায়ী একথা সন্দেহাতীত। নব্বই ভাগ মুসলমানের এই দেশে রক্ষণশীন বাঙালি স্বল্পশিক্ষিত মুসলমান পাঠকগোষ্ঠীকে বাগে আনতে ধর্মের মোড়কে প্রেমসুধা পান করানোর আইডিয়া যে খুবই কার্যকর তা কাসেম সাহেবের প্রকাশিত উপন্যাসের সংখ্যাই বলে দেয়।
তখন সবে নতুন কলেজে উঠেছি, একদিন কলেজ ফিরতি পথে শীর্ষেন্দুর যাও পাখি বইটি কিনে বাড়ি ফিরলাম। টেবিলে রাখা মাত্রই কোথা থেকে মা এসে হাজির। উপন্যাসখানা নেড়ে চেড়ে প্রথম পাতা খুলতেই ঠাস করে আমার গালে চড় বসালেন। উপন্যাসের নামটির মতো প্রথম লাইনটিও তো চড় খাওয়ার মতই ছিল- প্রেমের মধ্যেও ভাইটামিন আছে! আজ এই লেখা লিখতে বসে হঠাৎ মনে হলো সেদিন যদি যাও পাখি না হয়ে উপন্যাসটির নাম বোরকা পরা সেই মেয়েটি হতো, তবে আর যাই হোক চড় খাওয়া লাগত না হয়ত। এখানেই কাসেম আবুবাকারের ব্যবসায়িক বুদ্ধির সার্থকতা।
যতদিন প্রেম আর শারীরিক সম্পর্ককে ট্যাবু করে রাখা হবে, ততদিন কিশোর-কিশোরী পাঠকেরা চমৎকার কিছু উপন্যাসের বাকি সব বাদ দিয়ে নির্দিষ্ট কিছু পাতা শুধু মনে রাখবে, ততদিন কাসেম আবুবাকারেরা ধর্মের পোশাকে মুড়িয়ে যাচ্ছেতাই প্রেমের উপন্যাস গিলিয়ে খাওয়াবে উঠতি পাঠককে।
৩.

কাসেম আবুবাকরদের নিয়ে আমরা হাসাহাসি করতে পারি, দুয়েকদিন ফেসবুকে টিপ্পনি কাটতে পারি, তারপর আবার আমাদের উচ্চমার্গীয় সাহিত্য আলোচনায় ডুবে যেতে পারি নির্দ্বিধায় । কারণ বাকারেরা আমাদের তলার মানুষদের পাঠকক্ষে কখনও ঢুকতে পারে না।
একজন লেখক নিজের খেয়াল খুশিতে ইসলামিক বা অনৈসলামিক যে কোনও মানসিকতার উপন্যাস লিখতে পারেন, রগরগে প্রেমের গল্প কিংবা অবাস্তব ভুতের গল্প যা ইচ্ছে তাই লিখতে পারেন, একজন প্রকাশককে খুঁজে বের করে সেই বস্তাপঁচা কাহিনি ছাপার অক্ষরে বই আকারে বের করে ফেলতে পারেন অনায়াসে। যে কেউ সেই বই নিজের পকেটের টাকা খরচ করে কিনেও ফেলতে পারেন। কিন্তু যখন একজন লেখকের একটা বিশাল পাঠকগোষ্ঠী তৈরি হয় তখন সেই লেখনি সমাজের ওপর সামগ্রিকভাবে কী প্রভাব ফেলতে পারে তা ভেবে দেখার বিষয় হয়ে দাঁড়ায় বৈকি।
কাসেম আবুবাকারেরা সাহিত্যকে বাজারের ফর্দে নামিয়ে এনে ক্ষ্যান্ত দেয় না, তারা এক বিশাল পাঠকগোষ্ঠীকে জিম্মি করে সমাজের একটা বিশাল অংশের মনোজগতে বৈকল্য ঘটিয়ে ফেলে ধীরে ধীরে। যে মেয়েটি কাসেমকে পড়ে, সে ধীরে ধীরে নিজ সত্তা হারাতে থাকে, পুরুষ সঙ্গীর বাধ্যগত পুতুলে পরিণত হতে থাকে। যে ছেলেটি কাসেমকে পড়ে বড় হয়, সে জানে নারী সঙ্গীটি আপদমস্তক কালো কাপড়ে মোড়ানো বোবা খেলনা, তার খেয়াল খুশি মতো একে বুকে জড়িয়ে ধরা যাবে আবার ইচ্ছেমত ছুড়ে ফেলা যাবে। সে শেখে পুরুষ মানেই প্রভু, আর নারী মানেই অধীনস্ত দাসী, পুরুষের মনোরঞ্জনই নারীর একমাত্র কাজ। চতুর কাসেমরা শুধু কথার ফাঁদেই এই পাঠকগোষ্ঠীকে আটকায় না, তারা ধর্মের মায়াজালে তরুণ পাঠককে মুক্তচিন্তা করতে বাঁধা দেয়। কাসেমরা ইসলামিক মানসিকতার নামে যে প্রেমের উপন্যাস লেখে সেখানে ইসলাম কতখানি থাকে তা জানি না, বরং এর পুরোটাই কাসেমের ব্যক্তিগত ধর্মীয় চিন্তা আর মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। ব্যক্তি কাসেম মনে করে যে দ্বিতীয় শ্রেনিতে পড়ুয়া বছর সাতেকের একটি মেয়ের সাথে পূর্ণাঙ্গ যুবকের প্রেম কোনও মানসিক বিকলতা নয় বরং সংবাদপত্রে ফলাও করে প্রচার করার মতো বিষয়।
হুমায়ুন আহমেদের একটি গল্প ছিল একটা পাথরকে কেন্দ্র করে। এক বয়স্ক ভদ্রলোকের প্রেমে পড়ে কিশোরি মেয়েটি, ভদ্রলোক তাকে একটা পাথর উপহার দেয়। পাথরটির গায়ে এঁকে দেয় ক্রসচিহ্ন, এই ক্রসচিহ্নের অর্থ যেখানে দুজন প্রেমিক-প্রেমিকা মিলিত হয়। গল্পটি প্রকাশিত হওয়ার পর পাঠকমহলে বেশ নেতিবাচক আলোচনা ওঠে। ওই সময়ের আরও বেশ কয়েকটি গল্পেই হুমায়ুন অসম বয়সী প্রেমের গল্প ফেঁদেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে তখন কিন্তু লেখক শাওনের প্রেমে পড়েছেন। এতগুলো বছর পর সম্প্রতি শাওন এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করলেন যে পাথর গল্পটি হুমায়ুন-শাওনের প্রেমের ছায়া অবলম্বনে লেখা।
এখন যদি প্রশ্ন করি হুমায়ুন আর কাসেমের এধরনের গল্পের মধ্যে সমাজের জন্য কোনটা বেশি অহিতকর, তবে স্বভাবতই মনে হতে পারে হুমায়ুনের পাঠকগোষ্ঠীর কাছে তো কাসেমের পাঠকসংখ্যা নস্যি। কিন্তু ভয়ঙ্কর বিষয় হলো, হুমায়ুনের পাঠকশ্রেণি শহুরে শিক্ষিত সমাজ, যারা হুমায়ুনভক্ত হয়েও তার লেখার সাহিত্যমান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পিছপা হয় না, দৃষ্টিকটূ অসম প্রেমের গল্পকে সমালোচনা করতে ছাড়ে না। ওদিকে কাসেমের পাঠক গ্রামীন সমাজের অর্ধ-শিক্ষিত ধর্মপ্রাণ তরুণ জনগোষ্ঠী, যারা কাসেমের একান্তই নিজস্ব ইসলামিক চিন্তাধারাকে ব্যপ্তিক অর্থে শ্রদ্ধাভরে গ্রহণ করে।
আমরা উঁচুতলার পাঠকেরা যখন দেশি-বিদেশি লেখকদের বইয়ের আলোচনা-সমালোচনা করায় বুঁদ হয়ে থাকি, অশিক্ষিত-অর্ধ শিক্ষিত গ্রামের পাঠককে ‘ছ্যা’ বলে নাক শিটকাই, কাসেমরা তখন ঘুণপোকা হয়ে একটু একটু করে ধসিয়ে ফেলে সমাজকে। আমরা ভুলে যাই শাহবাগ আর একুশে বইমেলার লেখক-পাঠকেরা বাংলাদেশের মুখচ্ছবি নয়, বরং কাসেমদের ওই পাঠকশ্রেণি হলো বাংলাদেশ। ওদের আত্মিক আর বৌদ্ধিক মুক্তি না ঘটিয়ে বাংলাদেশের মুক্তি সম্ভব নয়।

লেখক: আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ