তামাক: উন্নয়নে হুমকি

Send
আমিনুল ইসলাম সুজন
প্রকাশিত : ১২:০৩, মে ৩১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:০৫, মে ৩১, ২০১৭

আমিনুল ইসলাম সুজনতামাক উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সেবন- সব প্রক্রিয়াতেই জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ, অর্থনীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তামাক একটি বহুমাত্রিক ক্ষতিকর ও আগ্রাসী পণ্য। তামাক সেবন বিশ্বব্যাপী প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর প্রধান কারণ। বছরে ৬০ লাখ মানুষ তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনেক বছর আগেই তামাকজনিত মৃত্যুকে মহামারী হিসাবে ঘোষণা দিয়েছে। কারণ, তামাকজনিত মৃত্যু ম্যালেরিয়া, যক্ষা, এইচআইভি/এইডস এর সম্মিলিত মৃত্যুর চাইতেও বেশি। প্রতি ১০টি মৃত্যুর মধ্যে ১ জনের মৃত্যুর জন্য সরাসরি দায়ী তামাক সেবন।
অর্থনীতিতে তামাকের প্রভাব অত্যন্ত নেতিবাচক। ২০০৪ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, জিডিপির ৩% তামাকের কারণে অপচয় হয়। এছাড়া সরকার যে পরিমাণ রাজস্ব আয় করে সব রকম তামাকজাত পণ্য থেকে, তার দ্বিগুণের বেশি অর্থ তামাকজনিত রোগের চিকিৎসার জন্য ব্যয় করতে হয়। তামাক চাষ কৃষি জমির উর্বরতা, পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার করে। তামাক পাতা প্রক্রিয়াজাত করতে নির্বিচারে বৃক্ষনিধন হয়। ১৯৯৯ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ বৃক্ষ কেটে ফেলা হয়, তার ৩০% চুল্লিতে তামাক পাতা প্রক্রিয়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া তামাক চাষ ও প্রক্রিয়াজাত করতে শিশু ও নারীদের নিয়োগ করা হয়। এ সময় শিশুরা লেখাপড়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। চুল্লিতে দীর্ঘসময় প্রক্রিয়াজাত কাজে সম্পৃক্ত থাকার ফলে নারীদের মধ্যে নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়।
জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) ২০১৬-২০৩০ এ যেসব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তার বেশ কয়েকটি তামাক উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্যবহারের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এমডিজির অনেকগুলো লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশ সফল হয়েছে। এসডিজি অর্জনে সফল হতে গেলেও তামাক নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্ব দিতে হবে। তামাক নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক চুক্তি ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি) বাস্তবায়নকে এসডিজির ৩ নং উদ্দেশ্যে (স্বাস্থ্য বিষয়ক) অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। দারিদ্র্য দূরীকরণ, জেন্ডার সমতা, পরিবেশ সুরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন, বন সুরক্ষা, সমুদ্র, মানবাধিকার বিষয়ক এসডিজির আরও কয়েকটি উদ্দেশ্য অর্জনেও এফসিটিসির কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি ।

আর এ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়েই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এ বছরের বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবসের (৩১ মে ২০১৭) প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘Tobacco – a threat to development’ বাংলায় ভাবানুবাদ করা হয়েছে ‘তামাক- উন্নয়নে অন্তরায়’। বৈশ্বিক তামাক নিয়ন্ত্রণে এ দিবসের গুরুত্ব অনেক। তামাক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমকে জোরালো করতে ১৯৮৭ সালের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে বছরের একটি দিন বিশ্ব তামাকমুক্ত দিবস হিসাবে উদযাপন করার সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। ১৯৮৮ সালে ৭ এপ্রিল উদযাপিত হলেও ৮৯ সাল থেকে ৩১ মে তারিখ নির্ধারণ করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সদস্য হিসাবে বাংলাদেশ ৮৮ সাল থেকেই দিবসটি উদযাপিত হচ্ছে।

তামাকজনিত মৃত্যুর মিছিল কমিয়ে আনতে উন্নত দেশগুলো শক্তিশালী আইন প্রণয়ন ও কার্যকর বাস্তবায়ন, তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে বৃহৎ আকারের সচিত্র স্বাস্থ্য সতর্কবাণী ও প্লেইন প্যাকেজিং প্রবর্তন, তামাকের ওপর করহার ও মূল্য বৃদ্ধিসহ বহুবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। যে কারণে উন্নত দেশগুলোতে তামাকের ব্যবহার ১.১ হারে কমছে। কিন্তু তামাক কোম্পানিগুলোর আগ্রাসী প্রচারণা, দুর্বল আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তামাক কোম্পানির প্রভাব, স্বল্পমূল্য হওয়ায় বাংলাদেশের মতো ঘনবসতি ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে তামাকের ব্যবহার ২.১ হারে বাড়ছে। 

এদিকে গ্লোবাল এডাল্ট টোব্যাকো সার্ভে (গ্যাটস) অনুযায়ী, ৪৩.৩% (প্রায় সোয়া ৪ কোটি) মানুষ বিভিন্নরকম তামাক ব্যবহার করে। ২৭.২% (২ কোটি ৫৯ লক্ষ) ধোঁয়াবিহীন তামাক সেবন ও ২৩% (২ কোটি ১৯ লক্ষ) ধূমপান করেন। এছাড়া বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ৪৫% অর্থাৎ প্রায় ৪ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ জনসমাগমস্থল ও গণ পরিবহণে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। এর মধ্যে, ৩০% প্রাপ্তবয়স্ক নারী কর্মস্থলে ও ২১% (১ কোটির বেশি) নারী জনসমাগমস্থলে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হচ্ছেন।

তামাকের ব্যবহার যেহেতু বেশি, তাই মৃত্যুসংখ্যাও অনেক। সর্বশেষ টোব্যাকো এটলাস এর তথ্য মতে, বাংলাদেশে তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতি ঘণ্টায় ১০.৫ জন, প্রতিদিন ২৫২ জন, মাসে ৭,৬৬৭ জন এবং বছরে ৯২,০০০ মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশে অন্য কোনও কারণে এত মানুষের মৃত্যু হয় না! সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের জন্য দুর্ভাগ্যজনক ও আলোচিত বিষয়। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুহার এর চাইতে অনেক কম, বেসরকারি হিসাবে প্রায় এক-চতুর্থাংশ ও সরকারি হিসাবে প্রায় ৬ ভাগের ১ ভাগ।

বাংলাদেশে তামাক ব্যবহার ও ধূমপানজনিত যে মৃত্যুর মিছিল চলমান, তা কমিয়ে আনতে কার্যকরভাবে তামাক নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। যারা ধূমপান ও তামাক সেবন করেন, তাদের প্রতি দু’জনের একজন তামাকজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তামাকের কারণে ক্যান্সার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, ডায়বেটিস, এজমাসহ নানাবিধ প্রাণঘাতী রোগ সৃষ্টি হয়। তামাকজনিত অসংক্রামক রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদী এবং এসব রোগ একবার দেখা দিলে কখনও ভালো হয় না। ফলে যে পরিবার এসব রোগে আক্রান্ত হয়, সে পরিবার নানা সঙ্কটে পড়ে। এসব রোগের চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে সরকারেরও স্বাস্থ্যখাতে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। পাশাপাশি বিত্তবানদের অনেকে দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে গিয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রা চলে যাচ্ছে।

তাই তামাক নিয়ন্ত্রণে কঠোর হওয়ার সময় এসেছে। বাংলাদেশ যে নিম্ন মধ্য আয়ের দেশ হিসাবে পদার্পন করেছে এবং মধ্য আয়ের দেশ হওয়ার পথে রয়েছে- এ ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তামাক নিয়ন্ত্রণকে নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। ইতোমধ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০৪০ সালের মধ্যে দেশকে তামাকমুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। সাধারণত, তামাক সেবনের হার ৫% এর মধ্যে থাকলে তাকে তামাকমুক্ত হিসাবে অভিহিত করা হয়। বাংলাদেশে ধূমপান ও তামাক সেবনের হার ৫% এর নিচে কমিয়ে আনতে বহুমাত্রিক, সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

এজন্য সর্বাগ্রে বিদ্যমান আইনের কঠোর বাস্তবায়ন জরুরি। বিশেষত, আইন লঙ্ঘন করে তামাকের বিক্রয় কেন্দ্রে (পয়েন্ট অব সেলস্) বিজ্ঞাপন ও প্রচারণার জন্য দায়ী সব তামাক কোম্পানিকে সাজা প্রদান নিশ্চিত করতে হবে। তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কের উপরিভাগের ৫০% স্থান জুড়ে ছবিযুক্ত স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর ব্যবস্থা এবং শিশু ও কিশোরদের তামাক আসক্তি থেকে দূরে রাখতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে ও গেটের সামনে তামাকের বিক্রয় কেন্দ্র নিষিদ্ধ করতে হবে। উপরন্তু তামাকের সহজলভ্যতা দূর করতে খোলা বা খুচরা বিক্রি, যত্রতত্র তামাকের বিক্রয় কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে নিবন্ধন (লাইসেন্সিং) প্রথা চালু করা জরুরি। তামাকের ওপর সম্পূরক কর ও নির্দিষ্ট কর বাড়াতে হবে। এমনভাবে কর বাড়াতে হবে, যেন তামাকের প্রকৃত খুচরা মূল্য বৃদ্ধি পায়। যা একদিকে তামাকের ব্যবহার কমাবে, অনদিকে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াবে। প্রতিবছর মুদ্রাস্ফিতী ও মূল্যস্ফিতী, জাতীয় আয় ও ব্যক্তিগত আয়ের চাইতে তামাকের দাম যেন বাড়ানো হয়, সে লক্ষ্যে জাতীয় কর নীতিমালা প্রণয়ন করা দরকার। 

তামাক থেকে আহরিত স্বাস্থ্য উন্নয়ন কর জনস্বাস্থ্য উন্নয়নসহ রোগ প্রতিরোধে ও তামাক নিয়ন্ত্রণে কাজে লাগাতে হবে। এজন্য প্রক্রিয়াধীন স্বাস্থ্যকর ব্যবস্থাপনা নীতিমালা দ্রুততার সঙ্গে পাস হওয়া জরুরি। তামাক চাষ পরিবেশ, প্রকৃতি, কৃষি জমির ক্ষতিসাধন করছে। গ্রিন টোব্যাকো সিকনেস-এর প্রাদুর্ভাবসহ জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। তামাক পাতা প্রক্রিয়াজাত করতে বিপুল পরিমাণ বৃক্ষ নিধন হচ্ছে। তামাক চাষ ও চুল্লিতে আগুনের তাপে কাঁচা তামাক পাতা শুকানোর সময় সংশ্লিষ্ট এলাকা বায়ুতে নিকোটিন ছড়িয়ে পড়ে। তামাক চাষ ও প্রক্রিয়াজাত করণে সম্পৃক্ত থাকায় শিশুদের লেখাপড়ায় ব্যাঘাত ঘটছে। উপরন্তু খাদ্যের জমিতে তামাক চাষ খাদ্য নিরাপতায় হুমকি সৃষ্টি করছে। তাই তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণে প্রক্রিয়াধীন নীতিমালা দ্রুত পাস হওয়া জরুরি। 

তামাক কোম্পানিগুলো নানাভাবে সরকারের নীতি নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে। ফলে তামাক কোম্পানির বিরুদ্ধে প্রায়ই কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে তামাক কোম্পানির প্রভাব দূর করতে এফসিটিসির আর্টিকেল ৫.৩ এর আলোকে নির্দেশনা প্রণয়ন করা জরুরি।

বিদ্যমান আইনের দুর্বলতাগুলো দূর করে শক্তভাবে নতুন সংশোধনী পাস করা দরকার। যেখানে তামাকজাত দ্রব্যের মোড়ক সাদামাটা করা অথবা ৯০ভাগ স্থানে ছবিযুক্ত স্বাস্থ্য সতর্কবাণীর প্রচলন করতে হবে। পাশাপাশি তামাকজাত দ্রব্যের মোড়কে উৎপাদন ও মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখ বাধ্যতামূলক করতে হবে। তামাক কোম্পানিতে সরকারের শেয়ার ও সরকারি প্রতিনিধিদের প্রত্যাহার করে নিতে হবে। তবেই কার্যকর তামাক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হবে, যা উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।

লেখক: সাংবাদিক ও সদস্য, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন

aisujon@yahoo.com

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ