জঙ্গি পরিবার!

Send
আমীন আল রশীদ১৭:৫০, জুন ১৮, ২০১৭

আমীন আল রশীদপাহাড় ধসে শতাধিক মানুষের প্রাণহানির খবরে যখন সারা দেশ শোকে বিহ্বল, তখন জঙ্গি ইস্যু নিয়ে কথা বলা হয়তো শোভন নয়। কিন্তু পাহাড় ধসে পরিবারশুদ্ধ মানুষের নিহত হওয়ার তুলনায় জঙ্গিবাদের মতো ভয়াবহ ব্যাধিতে একটি পরিবার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার খবরও কম উদ্বেগের নয়।
শুরুর দিকে জঙ্গিবাদ নিয়ে রাষ্ট্রের বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্বেগ কিংবা তৎপরতা ছিল কিছু ব্যক্তি ও সংগঠনের ব্যাপারে। কিন্তু ধীরে ধীরে এই ব্যাধির বিভৎস চেহারা উন্মোচিত হচ্ছে।
বিশেষ করে আমরা যখন দেখছি জঙ্গি আস্তানা থেকে জীবিত অথবা মৃত শিশুদের বের করে নিয়ে আসছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। শুরুর দিকে কেবল এই ব্যাধিতে আক্রান্ত পুরুষদের খবরই আমরা জানতাম, কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যেখানেই জঙ্গি আস্তানা, সেখানেই নারী ও শিশু রয়েছে। অর্থাৎ এখন আর কেবল একজন ব্যক্তি পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়ে জঙ্গিবাদে দীক্ষিত হচ্ছে, বিষয়টা এমন নয়, বরং সে পুরো পরিবারকেই নিয়ে আসছে এই মারণখেলায়। সম্ভবত এটি তাদের একটি কৌশল। কেননা, যখন কোনও একটি বাসায় একসঙ্গে কয়েকজন পুরুষ বসবাস করে, তখন তাদের প্রতি প্রতিবেশীদের সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক। তাদের গতিবিধি মানুষের নজরে আসে। কিন্তু যখন কোনও বাড়িতে নারী-পুরুষ-শিশু মিলেমিশে থাকে, তখন তাদের নিয়ে মানুষের কোনও সন্দেহ তৈরি হয় না। এমনকি তারা বাড়ির ভেতরে বোমা ও গ্রেনেড তৈরির কারখানা গড়ে তুললেও, সেটিও কারো নজরে আসার কথা নয়। মূলত জঙ্গিরা এই সুযোগটিই নেয় এবং সম্প্রতি একাধিক জঙ্গি আস্তানায় অভিযানে সেসব বিভৎসাই ফুটে উঠেছে।

সবশেষ রাজশাহীর তানোর উপজেলার পাঁচন্দর ইউনিয়নে দাঙ্গাপাড়া গ্রামে ‘জঙ্গি আস্তানা’ সন্দেহে একটি বাড়িতে অভিযান চালিয়ে একই পরিবারের ১২ জনকে আটক করে পুলিশ। এদের মধ্যে চারজন শিশু। পুলিশ বলছে, প্রতিবছর ওই পরিবারটি বাড়িতে ভিন্ন কায়দায় ঈদের নামাজ পড়তো। গত বছর ঈদের পর থেকে তাদের মধ্যে আরও পরিবর্তন আসে। নিজেরা ঈদের আগের দিন বাড়ির উঠানে ঈদের জামাত করতো। এলাকার লোকজনের সঙ্গে তারা মিশতো না। আটককৃতদের মধ্যে একজন সরকারি প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক, একজন সার ব্যবসায়ী, একজন হোমিও চিকিৎসক এবং একজন কাঠমিস্ত্রি।

এর আগে রাজশাহীর গোদাগাড়ি উপজেলায় অভিযান চালায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ সময় ৫ জঙ্গি আত্মঘাতী বিস্ফোরণে নিহত হলেও দুই শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয় এক নারী আত্মসমর্পণ করে। নিহতরা সবাই একই পরিবারের; সাজ্জাদ, তার স্ত্রী বেলি, ছেলে আল আমিন, সোহেল ও মেয়ে কারিমা।  

আমরা মনে করতে পারি, ২০০৬ সালের ১৩ মার্চ কুমিল্লায় এক জঙ্গি আস্তানায় র‍্যাবের অভিযানের সময় জেএমবির মোল্লা ওমরের স্ত্রী সাইদা নাঈম সুমাইয়া তার দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে আত্মঘাতী হয়েছিলো। তার আগে ওই অভিযানে জেএমবির ‘বোমা বিশেষজ্ঞ’ মোল্লা ওমরও নিহত হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্যমতে, জঙ্গিবাদে নারীদের নানাভাবে সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। একটি হলো জঙ্গি পরিবারের সদস্য নারী জঙ্গি হন। স্বামী হঠাৎ জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হলে স্ত্রীও একপর্যায়ে এতে যুক্ত হন। আবার পুরোপুরি যুক্ত হন না, এমনও আছে। আরেকটি হচ্ছে, জঙ্গি পরিবারের কোনও ছেলের সঙ্গে আরেক জঙ্গির মেয়ে, বোন বা নিকটাত্মীয়কে বিয়ে দেওয়ার মাধ্যমেও নারীদের যুক্ত করা হয়।

পাঠকের নিশ্চয়ই মনে আছে, গত ২৬ ডিসেম্বর গণমাধ্যমের একটি শিরোনাম ছিল:  ‘জঙ্গি আফিফ কাদেরীর ‍মৃত্যু হয়েছে গুলিতে: ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক।’ আফিফ কাদেরীর বয়স ১৪। তাই এই বয়সে কেউ জঙ্গি হয় কি না বা হতে পারে কি না-তা নিয়ে আলোচনা হওয়া দরকার। এর আগেরদিন ২৫ ডিসেম্বর জঙ্গি আস্তানা থেকে উদ্ধার হওয়া রক্তাক্ত এক শিশুর মর্মস্পর্শী ছবিও সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়।

১৪ বছর বয়সের একজন কিশোর যদি সত্যিই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে যায়, বুঝতে হবে হয় সে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো জঙ্গির খপ্পরে পড়েছে অথবা ওই পরিবারের অভিভাবক, বিশেষ করে তার বাবা মা তাকে এই পথে নিয়ে এসেছে। ফলে জঙ্গিবাদ নিয়ে আলোচনায় এটি এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের দাবি রাখে যে, সারা দেশে এরকম কতগুলো পরিবার জঙ্গি হয়েছে? আরও বিপজ্জনক ব্যাপার হলো, সাম্প্রতিক অভিযানগুলোয় জঙ্গিদের আত্মঘাতি হবার প্রবণতা। এর মধ্যে নারীরাও আত্মঘাতি বোমার বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছে। সুতরাং জঙ্গি দমনে একদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকার যেমন নিজেদের সাফল্য দাবি করছে, পক্ষান্তরে জঙ্গিরা আরও বেশি ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করছে। কেননা, মানুষ যখন আত্মঘাতি হয়, তখন সে নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে যেকোনও জায়গায় গিয়ে যেকোনও সময় আত্মঘাতী বোমার বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে এবং যার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। আবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে সারা দেশের প্রতিটি জায়গায় নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলাও সম্ভব নয়। তার ওপরে জঙ্গিরা যখন নারী ও শিশুদের মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করে, সেটিও অনেক বড় উদ্বেগের বিষয়। এটি এখনই প্রতিরোধ করা না গেলে ভবিষ্যতে বিভিন্ন জঙ্গি হামলায় দেখা যাবে নারীরাই নেতৃত্ব দিচ্ছে। কেননা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সাধারণত রাস্তায় চলাচলকারী নারীদের সন্দেহ করে না।

তবে শুরুর দিকে জঙ্গিবিরোধী বিভিন্ন অভিযানে কাউকে জীবিত ধরতে না পারায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমালোচনার মুখে পড়তে হলেও সাম্প্রতিক অভিযানগুলো ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। অর্থাৎ অনেককেই জীবিত ধরা সম্ভব হচ্ছে। এটিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বড় সাফল্য বলেই বিবেচনা করা উচিত।  

এখন আটককৃতদের কাছ থেকে যদি তাদের জঙ্গিবাদে দীক্ষিত হওয়া এবং জঙ্গি তৎপরতার বিষয়ে বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়, তাহলে এটি জঙ্গিবিরোধী অভিযান এবং জঙ্গিবাদ নির্মূলে সরকারের কৌশল প্রণয়নে সহায়ক হবে। বিশেষ করে পুরো পরিবারসহ কেন এই ধ্বংসের পথে তারা পা বাড়াচ্ছে, এটি কি কেবলই বিশ্বাস নাকি এর পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থ জড়িত রয়েছে, তাদের এই পথে আনার পেছনে বড় কোনও গোষ্ঠী সক্রিয় কিনা এবং যদি থাকে তাহলে তারা কিভাবে উদ্বুদ্ধ হলো, ইত্যাদি বিষয়ে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান জঙ্গিবিরোধী অভিযানের জন্য অত্যন্ত জরুরি। তবে সেইসাথে এটিও নিশ্চিত করা জরুরি যে, ভিন্ন তরিকায় ধর্মকর্ম পালন করলেই যে তার জঙ্গি সম্পৃক্ততা থাকতে পারে, এমন উপসংহারেও পৌঁছানোও উচিত নয়। বরং এসব ক্ষেত্রে দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ এবং প্রতিবেশীদের আলাপ জরুরি।

জঙ্গিবাদ নিয়ে যারা গবেষণা বা চিন্তা-ভাবনা করেন তাদের মতে, জঙ্গি সংগঠনে নারীরা মূলত তাদের স্বামী, ভাই বা বাবার দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয় এবং তাদের সহযোগী হিসেবে কাজ করে। নারী ও শিশু সাথে থাকলে চলাফেরা এমনকি বাসা ভাড়া নেওয়াও সহজ হয়। কিন্তু নারীদের আলাদাভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় কিনা, সে বিষয়ে এখনও পরিষ্কার কিছু জানা যায়নি। তবে এ বিষয়ে গোয়েন্দারা নিশ্চয়ই তদন্ত করছেন। জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমান ২০০৬ সালে গ্রেফতারের পর টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন (টিএফআই) সেলে যে জবানবন্দি দিয়েছিলেন, সেখানে তিনি বলেছিলেন, জেএমবিতে নারী ইউনিট বলে কিছু নেই। নারীদের কেবল সংগঠনের মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ করা হয়, যাতে পরিবারের পুরুষ সদস্যদের সহযোগী হিসেবে কাজ করতে পারে।

জঙ্গিবাদ কী করে একটি পরিবারকে ধ্বংস করে দিতে পারে, এরইমধ্যে তার বেশ কিছু উদাহরণ তৈরি হয়েছে। অসুন্ধানে দেখা যাবে, এসব পরিবারের কর্তা ব্যক্তি কোনও একটি বট্টরপন্থী রাজনৈতিক দল বা সংগঠনে যুক্ত হওয়ার পর ধীরে ধীরে পরিবারের বাকি সদস্যদের উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করে। রাজধানীর খিলগাঁওয়ে এক চিকিৎসক পরিবারের ‘উধাও’ হওয়ার খবর এসেছে গণমাধ্যমে। বলা হচ্ছে, তারা বিদেশে পালিয়ে গিয়ে জঙ্গিবাদের প্রশিক্ষণ নিচ্ছে।

এভাবে পুরো একটি পরিবার যখন জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ হয় এমনকি আত্মঘাতী হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে, সেটি অনেক বেশি আতঙ্ক তৈরি করে। দেখা যাবে, জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার আগে এসব পরিবারের লোকেরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল। অর্থাৎ তাদের পারিবারিক ও সামাজিক যোগাযোগ শিথিল ছিল। তারা নিজেদের মতো করে চিন্তা-ভাবনায় অভ্যস্ত। তারা এমন এক বিশ্বাস লালন করছে যেখানে তারা ভিন্ন অন্য সবাইকে তারা শত্রুজ্ঞান করে। এটি হয় তাদের জ্ঞানের সীমাবদ্ধতা অথবা তারা জাতীয় আন্তর্জাতিক বিবিধ ষড়যন্ত্রের ফাঁদে আটকা পড়েছে। ফলে যেসব জঙ্গি পরিবারের সন্ধান মিলছে, তাদের আইনের আওতায় এনে বিচারে মৃত্যুদণ্ড দেওয়াই চূড়ান্ত সমাধান নয়; বরং এটি এখন নিরপেক্ষ আর গভীর বিশ্লেষণের বিষয় যে, কেন এবং কিভাবে পুরো একটি পরিবার জঙ্গিবাদের মতো ভয়াবহ পথ বেছে নিচ্ছে। সেইসাথে এ প্রশ্নেরও উত্তর জানা দরকার যে, তারা যে আদর্শ বা বিশ্বাসের বাস্তবায়ন দেখতে চায়, সেটি অর্জনের একমাত্র পথই কি এই জঙ্গিবাদ?  

লেখক: সাংবাদিক ও লেখক।

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ