ঈদ গেলো গেলো রব কেন!

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১৪:০৯, জুন ২৫, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১৫, জুন ২৫, ২০১৭

Udisaহুট করে কয়দিন ধরে ঈদ বানান ‘ইদ’ হয়ে গেলো।  সে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে তোলপাড়।  সামনে ঈদ থাকায় এ বিষয়টি এখন নজরে এলেও এর শুরু কিন্তু আজকে না।  দীর্ঘদিন ধরে বাংলা একাডেমি বাংলা বানান নিয়ে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষা চালিয়ে আসছে।  সর্বশেষ মানুষের নজরে পড়েছে 'ঈদ' বানানটি যেটি দীর্ঘ-ই দিয়ে ভালো নাকি হ্রষ-ই দিয়েই চলবে; এসব নিয়ে আলোচনা করছেন না এমন কেউ নেই।  ঈদ শব্দটি বাংলার এবং বাঙালির উৎসবের সঙ্গে সম্পৃক্ত।  কোনও কোনও বানান থাকে যার পরিবর্তন হলে চোখে লাগে।  কখনও কখনও মনে আঘাত করে।  আবার এই পরিবর্তনগুলো ঘটানোর কারণে বাংলা একাডেমিকে এজন্য শুলে চড়ানোর কিছু নেই।  বাংলা একাডেমির চর্চা প্রচার প্রসারের কাজ করতে একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সে যদি কোনও একটি প্রচলনের ব্যাখ্যা দেয় সেটি নিয়ে গ্রহণযোগ্য তর্ক ও সমাধান জরুরি।  একপক্ষ আরেকপক্ষকে নিয়ে বিষোদগারের মধ্য দিয়ে ভালো কিছু হয়নি অতীতে, আগামীতেও হবে না।
আমরা কি ভুলে গেছি, একসময়ের চেনা ‘বাড়ী’ বানান বদলে গেছে ‘বাড়ি’তে, ‘শহীদ’ হয়ে গেলো কখন জানি ‘শহিদ’।  এরপরও এখন দীর্ঘদিনের চেনা ‘ঈদ’ যদি ‘ইদ’ হয় তখন খটকাটা বেশি লাগে।  যদিও অভিধানে এখনও ঈদ আছে এবং ইদও আছে।  ভুলে গেলে চলবে কেন, বিদ্যাসাগর ১৮৯১ তে চন্দ্রবিন্দু দিয়ে ইদ লিখেছেন, তখন আমরা ইঁদ পেয়েছিলাম।  তাহলে সমস্যাটা কী হচ্ছে।  ভাষা কি অপরিবর্তনশীল কোনও বিষয়।  আপনি লেখার ভাষা, সাহিত্যের বর্ণনের ভাষা, প্রতিবদনের ভাষা, কথ্যভাষা বদলে দিতে থাকবেন কিন্তু বানানে পরিবর্তন আসবে না এটা ভাবার কারণটা কী সেই প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে।  কেবল কেউ একজন নির্দেশ দিচ্ছে ‘এটা করা যাবে’ বা ‘এটা করা যাবে না’ এটাই কি সমস্যা।  যদি তাই হয় তাহলে মেনে নেওয়ার সমস্যা।  আরেকটি সমস্যা বড় করে সামনে আসছে।  কেউ বলছেন, একই বানান দুইরকমের কেন হবে।  কারোর যুক্তি দৃশ্যত প্রায় অকাট্য: আমার সন্তান স্কুলে একটি শিখবে পরে সেটি ভুল জানবে।  প্রশ্ন হলো, নব্বইয়ের দশকে বাংলা বানান সংশোধন পরিমার্জন এর প্রকল্প ২০১২ তে এসে ঈদকে ইদ বলা যাবে দেওয়া নির্দেশনা এতদিন পরে কেন সামনে এলো।

গত তিন চারদিনের আলাপ পড়তে পড়তে এক পর্যায়ে মন হয়েছে বাংলা একাডেমির কমিটির বাইরে একটি চর্চার বুদ্ধিজীবী সমাজ অপেক্ষাকৃত তরুণদের মধ্যে তৈরি হয়েছে, তারা ‘মোড়লগিরি’ মানতে চান না।  বাংলা একাডেমিকে এই বদলে দেওয়ার ক্ষমতা কে দিল।  এখন এই নিয়ম মেনে আপনার শিশু কি কাল থেকে ইদ বানান ‘ইদ’ হিসেবে শিখবে না।  মনে রাখবেন বাংলা একাডেমি কী নির্ধারণ করলো তাতে কিছু যায় আছে না, আপনার শিশু পাঠ্যবই নির্মাণের দায়িত্বে যারা আছেন তারা নিজেদের সিদ্ধান্তেরই শিশুকে শেখাবেন।  কিন্তু আমাদের দেশের ধরন স্বতন্ত্রভাবে কাজ করার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায় না বলেই শঙ্কার জায়গা তৈরি হয়।  বাংলা একাডেমি নির্ধারণ করে দিলে তাই পাঠ্যবই নির্মাণের সঙ্গে জড়িতরা সেইপথেই হাঁটা ধরবেন।  সমস্যা হবে তখনই যখন স্থান কাল পাত্র ভেদে প্রজন্ম ঈদ ও ইদ দুটোই শিখবে কিন্তু কোনোটা তার পরীক্ষার খাতার সঠিক হবে তা জানবে না।  সেই দিকে নজর দেওয়া জরুরি।

ভাষার একটা নিজস্ব চলন আছে।  ভাষা নির্মাণ হয় প্রতিনিয়ত।  কিন্তু যখন পরিবর্তনটি ঘটবে তখন গণহারে পরিবর্তনে সচেতন থাকা জরুরি।  বাংলা ব্যাকরণ কোনও বিষয়ে সিদ্ধান্তের বাইরে উদাহরণ হলে সেটিকে নিপাতনে সিদ্ধ হিসেবে অটুট রাখার বিধি রেখেছে।  সেই নিয়ম মেনে সংস্কৃতি জীবনাচরণের সাথে জড়িত বিষয়গুলোতে পরিবর্তন আনা থেকে বিরত থাকা যেতেই পারে।

বলা হচ্ছে, বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান (২০১৬) ও বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান (২০১৫) অনুযায়ী ঈদ শব্দের প্রমিত ও গ্রহণযোগ্য বাংলা বানান ‘ইদ’।  প্রমিত বানান রীতি অনুযায়ী বিদেশি শব্দে ‘ঈ’ বা ‘দীর্ঘ ঈ-কার’ ব্যবহৃত হয় না।  কথাসাহিত্যিক স্বকৃত নোমান ফেসবুকে লিখেছেন, 'আমরাও ‘ঈদ’ লিখতে অভ্যস্ত।  কিন্তু কেউ যদি ‘ইদ’ লেখেন, তাও ভুল হবে না।  কারণ আরবি শব্দকে আমরা পুরোপুরি ‘মাখারাজ’ বা ব্যাকরণ মেনে বাংলায় উচ্চারণ করি না।  করতে আমরা বাধ্য নই।  কেননা আরবের উপনিবেশ নয় বাংলাদেশ। বেশিরভাগ আরবি শব্দকে আমরা আমাদের মতো উচ্চারণ করি। '
আবার সব বিদেশি শব্দের ক্ষেত্রেই কি আমরা এসব নিয়ম মানি? তাই যদি হয় বিদেশি যেকোনও শব্দে ‘অ্যা’ বা য-ফলা আকার দিয়ে ব্যবহার করতে হবে এবং সেক্ষেত্রে খোদ বাংলা একাডেমি বাংলা অ্যাকাডেমি হতে হবে।  ভুলে গেলে চলবে কেন একসময় বিদেশি শব্দ Dacca থেকে Dhaka করা হয়েছে, তাতে আমাদের একইরকম খটকা লেগেছে কিন্তু এখন পরের ঢাকা-ই বেশি চেনা।

লেখক: সাংবাদিক, বাংলা ট্রিবিউন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ