জাতির কঠিন পরীক্ষা আগামী নির্বাচন

Send
আনিস আলমগীর
প্রকাশিত : ১৬:১৫, জুলাই ১১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫০, জুলাই ১১, ২০১৭

আনিস আলমগীরএকাদশ সংসদ নির্বাচন ২০১৮ সালের শেষদিকে শাসনতন্ত্রের নিয়ম অনুসারে অনুষ্ঠিত হবে। অবশ্য সরকার ইচ্ছে করলে শাসনতন্ত্রের নিয়ম অমান্য করে আগেও নির্বাচন দিতে পারেন। রাজনীতির সেবকেরা ধীরে ধীরে মাঠমুখী হচ্ছেন। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি একাদশ সংসদ নির্বাচনের যুদ্ধকে মনে হয় শেষ পর্যন্ত তাদের অস্তিত্বের লড়াইয়ে পরিণত করবে। তাদের প্রস্তুতিটা প্রায় অনুরূপ।
নির্বাচন আগেও হয়েছে। কিন্তু এবার পরিস্থিতির কারণেই তারা এমন প্রস্তুতি নিতে বাধ্য হচ্ছে। বিএনপি দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়নি। নির্বাচন ব্যর্থ করে দেওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে তারা মাঠে ছিলে। দেড় শ’ নির্বাচনি কেন্দ্রে আগুন লাগিয়ে, নির্বাচনি কর্মকর্তা হত্যা করে আংশিক সফলতার দাবি করতে পারলেও আওয়ামী লীগ নির্বাচনের সে ক্ষতের প্লাস্টিক সার্জারি করে ইতিমধ্যে পাঁচ বছর কাটিয়ে দেওয়ার পথে। আগামী নির্বাচন যথা সময়ে অনুষ্ঠিত হলে আওয়ামী লীগ টানা দশ বছর ক্ষমতায় থাকবে। এত দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকার পর নির্বাচন করা মূলত শক্ত ব্যাপার। এ অঞ্চলের লোকরা কাউকে পাঁচ বছরেই বেশি ক্ষমতায় দেখলে বিরক্ত হয়ে পড়ে। মানুষ ঘুরে ফিরে দীর্ঘ সময়ব্যাপী একই মুখ ক্ষমতায় দেখতে চায় না। কিন্তু আওয়ামী লীগের ললাট ভালো। অষ্টম সংসদ নির্বাচনের পরে বিএনপি ক্ষমতায় ছিল সত্য কিন্তু সরকারের কোনও সফলতা ছিল না। এমনকি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ধারাবাহিকতাও রক্ষা হয়নি। মাঝে ২ বছর ক্ষমতা চলে যায় সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে। আবার গত দশ বছর বিরোধী দলে অবস্থান করেও বিএনপি জনগণের স্বার্থে কোনও গৌরব উজ্জ্বল ইতিহাস রচনা করতে পারেনি। মানুষের স্মৃতি থেকে তাদের শাসনামলের লুটপাট, হাওয়া ভবনের দাপট মুছে দেওয়া সহজ হচ্ছে না।

১৯৭৫ এর পর থেকে দেশ অনিয়ম, বিশৃঙ্খলার মাঝে ডুবে আছে। কেউই এ অনিয়ম বিশৃঙ্খলা থেকে জাতিকে উদ্ধার করতে পারেনি। এমনকি আওয়ামী লীগও নয়। তবে দীর্ঘ সময়ের এ অনিয়ম বিশৃঙ্খলা অন্য এক রকম নিয়ম শৃঙ্খলায় পর্যবসিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ গত দশ বছরের মাঝে একটা বিষয়ে পারঙ্গমতার পরিচয় দিয়েছে তা হলো দেশকে উন্নয়নের পরিকাঠামোর মধ্যে ফেলে উন্নয়নমুখী করে তুলেছে। দেশের জনসংখ্যা যখন ৫/৬ কোটি ছিল তখনও দেশে ভূখামিছিল হয়েছে। এখন ১৬ কোটি মানুষ এক ছটাক জমিও বাড়েনি তবুও ভূখামিছিল আর হচ্ছে না। কারণ  মানুষ না খেয়ে থাকে না। এমন কী উত্তরবঙ্গের মঙ্গা পীড়িত এলাকা কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারীতেও আর মঙ্গার কথা শোনা যায় না। আওয়ামী লীগ দাবি করে দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। ধন্যবাদ জানাই কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীকে। তিনি কৃষি ব্যবস্থাকে মনোযোগ দিয়ে দেখেছেন আর আন্তরিকতা দিয়ে কৃষি ব্যবস্থার পরিচর্যা করে চলছেন।

পশ্চিমবঙ্গে ৩৩ বছর বাম রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় ছিল। তাদের উল্লেখ করার মতো অবদান হলো খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন। মাছে-ভাতে বাঙালি। তাতে টান না পড়লেই বাঙালি খুশি। আর রোজগারের পথও খুলেছে ভালোভাবে। অথর্ব লোক ছাড়া কেউ বসে নেই। সর্বত্র মানুষ কর্মচঞ্চল। ঢাকা শহরে যে পানের ডালা পেতে পান বিক্রি করে, তাকে জিজ্ঞেস করে দেখেছি সেও নাকি দৈনিক ন্যূনতম ৫০০ টাকা রোজগার করে। অভাব থেকে মানুষ মুক্তি পাচ্ছে বলে সে কারণে সম্ভবতো রাজনৈতিক অস্থিরতাও নেই। সমাজের ভিত্তি যথেষ্ট মজবুত হয়ে মধ্যবিত্তের বিকাশ ঘটেছে খুবই সুন্দরভাবে। মধ্যবিত্তের বিকাশ ধীরে ধীরে নিম্নবিত্তকে উৎসাহিত করছে। আর একদশক এভাবে দেশ চললে দারিদ্র্যতা পরিপূর্ণভাবে নির্মূল হবে। বাংলাদেশ ছিল দরিদ্র কৃষকের বস্তি। লেংটি পরা কৃষকের আজকের এ অবস্থা তো কল্পনাতীত বিষয় ছিল। আনার, আঙুর, কমলা, নাসপাতিকে বলতো রোগীর পথ্য। এখন গ্রামের মোড়ে মোড়ে আনার, আঙুর, কমলা, নাশপতির পসরা সাজিয়ে বসেছে দোকানিরা আর রোগী অরোগী সবাই সবাই খাচ্ছে মনভরে। খাবার দোকানে মানুষের ভিড়ে আসন পাওয়া যায় না। এসবই সঙ্গতির লক্ষণ। এ সঙ্গতির অব্যাহত গতি প্রয়োজন। আমরা আতঙ্কিত হই যখন জাতি কখনও কখনও রাজনৈতিক সংঘাতের মোড়ে এসে উপস্থিত হয়। মনে হচ্ছে যে আগামী নির্বাচনে যেন আমরা অনুরূপ এক মোড়ের কিনারায় গিয়ে দাঁড়াবো। নির্বাচন নিয়ে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

বাংলাদেশ সার্বভৌম দেশ। ছোট দেশ। আর ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বড় দেশগুলো চায় যে এখানে ‘তাদের কথায় চলে’ এমন সরকার প্রতিষ্ঠিত থাক। সুতরাং সাধারণ মানুষকে বড় দলগুলোর পক্ষে বেপরোয়া না হয়ে নীরবে বুঝে সুঝে ভোটের অধিকার প্রয়োগ করতে হবে। যেন এমন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয় যে উন্নয়ন অব্যাহত রাখতে পারবে। দেশের সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখতে পারবে। প্রতিহিংসার রাজনীতি যাতে দেশ থেকে চিরতরে শেষ হয়।

১৯৭১ সালের বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। জনগণকে মনে রাখতে হবে কারা স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি কারা স্বাধীনতার বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ছিল। ফরাসি দার্শনিক রুশো তার ‘সোশ্যাল কন্ট্রাক থিওরি’-তে বলেছেন, ‘দুইটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেলে বিজয়ী সৈনিকের কাছে পরাজিত সৈনিকেরা আর সৈনিক থাকে না, তারা সাধারণ মানুষ হয়ে যায়।’ আমাদের দেশে যে দলটি সর্বাত্মক যুদ্ধ চালালো আমাদের স্বাধীনতাকামী মুক্তিযোদ্ধাদের বিরুদ্ধে আর পরাজিত হয়ে কেউ দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলো, কেউ আত্মগোপনে গিয়ে সাধারণ মানুষ হয়ে গিয়েছিলো। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাদেরকে দেশ-বিদেশ থেকে এনে বাংলাদেশের মাটিতে আবার সৈনিকের পোষাক পরিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে গেছেন। বেগম খালেদা জিয়াও বিগত বছরগুলোতে তাদের আদর কম করেননি। এখনও করছেন।

আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছে। সুতরাং দেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধশক্তির বাড়াবাড়ি দেখলে তো তাকে আতঙ্কিত হতে হয়। সে কারণে আওয়ামী লীগ ২০০৮ সালের নির্বাচনে তার নির্বাচনি মেনিফেস্টোতে প্রথমবারের মতো উল্লেখ করেছে যে তারা ক্ষমতাসীন হলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করবে। দেশের বিপুল ভোটে, বিশেষ করে তরুণ গোষ্ঠীর ব্যাপক সমর্থনে আওয়ামী লীগ দুই তৃতীয়াংশের চেয়েও বেশি আসন পেয়ে জিতেছে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারও করছে। অনেক চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসিও হয়েছে।

আগামী নির্বাচনে এই ফাঁসি একটি মস্ত বড় ইস্যু। ফাঁসির ফলাফল নিয়ে চূড়ান্ত অর্জনের দিকে যেতে চায় আওয়ামী লীগ। গত ৮ জুলাই দলের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে দেওয়া বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লীগ  সভানেত্রী শেখ হাসিনা জানান, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং ২০২০ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালন করবে। স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী একটি দলের জন্য এই আকাঙ্ক্ষা উচ্চাবিলাস নয়, ন্যায় সঙ্গত। স্বাধীনতার স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী আওয়ামী লীগের চাইতে কারা আছে বর্ণাঢ্যভাবে পালন করার!

অন্যদিকে, যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির ইস্যুর প্রতিশোধ নিতেই স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তি ক্ষমতায় আসার এটাই সুবর্ণ সুযোগ। বিএনপির নেতৃত্বে তারা এক জোট হয়ে সে লড়াই করবে। আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে তারা প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগের সন্ধানে আছে। ১০ বছর একটানা ক্ষমতায় থাকছে আওয়ামী লীগ। সে কারণে একটা শ্রেণি, গোষ্ঠীর ক্ষোভ সরকারের ওপর বাড়া স্বাভাবিক। এছাড়াও আমাদের মতো দেশগুলোর নীতি হচ্ছে- উইনার্স টেক ইট অল। আর পরাজিতের জন্য থাকে মামলা, গঞ্জনা, নির্যাতন, গুম। একটা গোষ্ঠীর পাওয়া এবং একটা গোষ্ঠীর না পাওয়ার দীর্ঘ ব্যবধান নির্বাচনকে যুদ্ধে পরিণত করবে। অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আগামী নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করার ব্যাপারে তাই বেশ আত্মবিশ্বাসী বিএনপি।

রবার্ট ব্রুসের কথা অনেকে জানেন। স্টারলিং দুর্গের দখল নিতে বানুকবার্ন নদীর তীরে যুদ্ধের অবতীর্ণ হয়েছিলেন ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় এডওয়ার্ড আর স্কটল্যান্ডের ‘যোদ্ধা রাজা’ রবার্ট ব্রুস। প্রবল শত্রুর কাছে বার বার পরাজিত হয়ে শেষটায় রাজ্যের আশা ছেড়ে দিয়ে এক পাহাড়ের গুহায় লুকিয়ে ছিলেন। এমন সময় তিনি দেখলেন একটা মাকড়সা একখানি সুতো ধরে বার বার গুহার মুখটাকে বেয়ে ওঠবার চেষ্টার পর শেষে সে ঠিকমত উঠতে পারলো। তারপর মাকড়সার জীবন সংগ্রাম দেখে তিনি নতুন করে অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। আমরাও পশ্চিমাদের হাতে সব হারিয়ে গুহায় গিয়ে পড়েছিলাম। শেখ মুজিবের অনুপ্রেরণা পেয়ে দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করে অমূল্যধন স্বাধীনতা পেয়েছি। সাবধান থাকতে হবে সবাইকে। কোনও ভুল সিদ্ধান্তে যেন তা হারিয়ে না ফেলি। আর আবার গুহায় ফিরে না যাই। সুতরাং আগামী নির্বাচন শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষমতার লড়াইয়ে জরুরি নয়, জাতির জন্যও অনেক গুরুত্বের।

লেখক: সাংবাদিক ও শিক্ষক

anisalamgir@gmail.com

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ