Vision  ad on bangla Tribune

‘মশা মারতে কামান দাগান’

তপন মাহমুদ১৪:১৮, জুলাই ১৬, ২০১৭

তপন মাহমুদঈদের দিনকয়েক আগে গ্রামে গিয়েছিলাম। শুনলাম আমার এক বন্ধুর ভাইয়ের মেয়ে ঢাকায় চিকুনগুনিয়ায় মারা গেছে। বছর ছয়-সাতের ফুটফুটে মেয়েটিকে আমি চিনতাম। ঈদের ছুটিতে কিংবা অন্য কোনও বন্ধে ও যখন বাড়িতে যেত আমার বন্ধুর সাথে স্কুল মাঠে আসতো। ওর হাসিমাখা সুন্দর মুখটি খুব মনে পড়ছে। খুব কষ্ট পেয়েছিলাম ওর চলে যাওয়ার খবর শুনে। একদম সুস্থই ছিল। হঠাৎই ওকে কেড়ে নিল চিকুনগুনিয়া।
এরকম আরও কিছু মৃত্যুর খবর পাচ্ছি এই রোগে। যদিও চিকিৎসকরা বলছেন, এই রোগে মৃত্যুর সম্ভাবনা কম। যতটা না ডেঙ্গুতে আছে।
তাই, এটা মানতে কারো দ্বিধা থাকার কথা নয় যে, মশা এখন রাজধানী ঢাকার সবচেয়ে আতঙ্কের নাম। যেন মৃত্যু বিভীষিকা। ঘরে মশা দেখলে মনে হয় মৃত্যু পরোয়ানা নিয়ে যমদূত ঘোরাঘুরি করছে। আমাদের সবাইকেই এখন তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে চিকুনগুনিয়া। কখনও ডেঙ্গু।
কিন্তু কথা হলো চিকুনগুনিয়াকে কতটা গুরুত্বেও সঙ্গে নিচ্ছে সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও আমাদের দুই সিটি করপোরেশন। মাত্র দিন কয়েক হলো সারা দেশে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে খোলা হয়েছে চিকুনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণ কক্ষ। জরুরি তথ্য কেন্দ্র খোলাসহ জনসাধারণকে সচেতন করার উদ্যোগ নিয়েছে সিটি করপোরেশন। এছাড়া মশক নিধন কার্যক্রমও নাকি জোরদার করা হয়েছে।
এসব অবশ্যই ভালো খবর। কিন্তু এই খবর আরও আগেই শুনতে চেয়েছিল রাজধানীসহ সারা দেশের মানুষ। তারা দেখতে চেয়েছিল ছড়িয়ে যাওয়ার আগেই যেন যথাযথ প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কিন্তু সেটা একটু দেরি করেই হলো বলে মনে হচ্ছে। কারণ আমাদের মধ্যে একটা প্রবণতা আছে, দেয়ালে পিঠ না ঠেকলে কিছু করতে পারি না। কিন্তু ততক্ষণে তো অনেক কিছু ঘটে যায়। অনেক জীবনও চলে যায়। সবসময় কি তাহলে আমাদের জীবন দিয়েই বুঝতে হবে অবস্থা কতটা ভয়াবহ?
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক দিন ধরেই মানুষজন বলে আসছিলেন দুই সিটি করপোরেশনের উদ্যোগ যথেষ্ঠ নয়। তাদের অনকে আগেই মাঠে নামার জন্য বলা হচ্ছিল। অথচ ঈদের আগ পর্যন্তও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের সব সভায় মন্ত্রীরা পর্যন্ত বলছিলেন চিকুনগুনিয়া নিয়ে ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু এখন তারা বুঝতে পারছেন বিপদ আসলে কতটা মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে।
চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তের যে হিসাব সরকারিভাবে দেওয়া হচ্ছে তা প্রকৃত চিত্র নয় বলে অনেকেই সন্দেহ করছেন। আসলে সব কিছুকে চাপিয়ে রাখার যে সংস্কৃতি আমাদের মধ্যে আছে, এটি তারই বহিঃপ্রকাশ। ‘কিছুই হয়নি বা হবে না’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার মধ্যে যে কোনও কল্যাণ নেই তা আমরা কেন বুঝি না। অন্তত রোগ-বালাই তো আর চেপে রাখা যাবে না। বাস্তবতাকে যত এড়িয়ে যাওয়া হয়, ততই তা কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ হতে থাকে।
আর এটা তো বোঝা কোনও কঠিন কাজ নয় যে, সংক্রমক রোগ যত তাড়াতাড়ি প্রতিরোধ করা যাবে ততই সেটি কম ছড়াবে। কিন্তু তার জন্য আমরা যদি ‘ভয়ের মতো কিছু হওয়ার’ অপেক্ষা করি, সেটা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। কিন্তু অপ্রিয় হলেও সত্য, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, অধিদফতর বা সিটি করপোরেশন সেই কাজটিই করেছে। তারা হয়তো ভেবেছে, মশা মারতে গিয়ে কামান দাগানোর কি আছে? কিন্তু সব সময় সংখ্যা বা আকার দেখে নয়, বরং বিপদের মাত্রা দেখে কামান দাগানোর দরকার হয় বৈকি। ‘সময়ের এক ফোঁড় অসময়ে দশ’ এ প্রবাদ বাক্য মনে হয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা মেয়র, সবারই ভালো করে জানা আছে।
নানা ধরনের লিফলেট ছড়িয়ে টাকা লোপাট ছাড়া মনে হয় খুব একটা লাভ হয় না। এরচেয়ে গণমানুষের সাথে বসুন, তাদের বলুন। তারা বিনামূল্যেই সব প্রচার করে দেবেন। সেটা অনেক কার্যকরও হবে বটে। এছাড়া সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও ব্যবহার করতে পারেন।
তবে সবচেয়ে জরুরি হলো মশা নিধনের জন্য পর্যাপ্ত ওষুধ ছিটানো ও এর চিকিৎসা নিয়ে আরো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া। শুনেছি এখন পর্যন্ত নাকি শুধুমাত্র সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ( আইইডিসিআর) ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকুনগুনিয়া শতভাগ সনাক্তকরণের প্রযুক্তি আছে। তাই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচিত হবে দ্রুত সনাক্তকরণ যন্ত্রের সংখ্যা বাড়ানো। কারণ রোগ সঠিকভাবে সনাক্ত না হলে, ভুল চিকিৎসার শিকার হবে মানুষ। বাড়বে শঙ্কা। ছড়াবে বিভ্রান্তি।
এই বিভ্রান্তির একটি হলো চিকুনগুনিয়া মহামারী হয়ে ওঠা নিয়ে। সেদিন এক গোলটেবিলে অনেক বিশেষজ্ঞ দাবি করেছেন, ঢাকায় চিকুনগুনিয়া মহামারী আকারেই ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও উত্তরের মেয়র আনিসুল হক বলেছেন, মহামারী হোক বা না হোক এটা প্রতিরোধে কাজ করতে হবে। তবে এজন্য বাসায় বাসায় গিয়ে তার পক্ষে মশা মারা সম্ভব নয়। সত্যিই তো। তাকে তো ডাকেনওনি। সেটা তার কাজও নয়। তার কাজ বাসার আশপাশে বা মশার আবাসস্থলে লোক পাঠিয়ে কামান দাগানো। মানে মশার ওষুধ ছিটানো। সেটা করলেই জনগণ খুশি হবে।
আর দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন তো বলেই দিয়েছেন, উত্তর কী বলল, তাতে তার কিছু যায় আসে না। দক্ষিণে চিকুনগুনিয়াকে মহামারী বলা যাবে না। তিনি আশ্বস্ত করেছেন, চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্যে সমস্যার সমাধান হবে। আমরাও সেটিই চাই। কিন্তু তাকে মনে রাখতে হবে মশা কিন্তু উত্তর দক্ষিণ চিনে না। তাই সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়াও চিকুনগুনিয়া দমন করা সম্ভব না।
তাই বলি, প্লিজ মেয়র মহোদ্বয়, কথার কামান না দাগিয়ে, মশা মারতেই আপাতত কামান দাগান। সব কিছু নিয়ে দেরি করা ভালো কিছু নয়। ঠিক সময়ে ঠিক কাজটা করলে বিপদ অনেক কম হয়। সিটি করপোরেশন যদি তার মশক নিধন কার্যক্রম নিয়মিত করতে তাহলে ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়ার ঝুঁকি এমনিতেই অনেক কম থাকতো। মশায় পুরো ঢাকা ভরে যাবে, তারপর কামান গোলা-বারুদ নিয়ে আসবেন, এটা সঠিক কোনও প্রক্রিয়া হতে পারে না, মাননীয় মেয়র মহোদ্বয়। শত্রু অল্প থাকতেই কামান দাগানো ভালো, চারদিক থেকে ঘিরে ফেলার পর, কামান দাগিয়ে আর লাভ নাও হতে পারে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ প্রভাষক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ