ফিফথ কলামের রাজনীতি

Send
মারুফ রসূল
প্রকাশিত : ১৪:৪৮, জুলাই ১৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৫, জুলাই ১৭, ২০১৭

মারুফ রসূলস্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় ‘ফিফথ কলাম’ শব্দটির প্রচলন হয়েছিলো; পরবর্তীতে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে এই নামে একটি নাটকও লিখেছিলেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই ফিফথ কলামের চর্চা বহুদিনের। সাম্প্রতিক সময়ে প্রেক্ষিত এমন দাঁড়িয়েছে যে, রাজনীতির অনেকাংশই নিয়ন্ত্রণ করছে এই ফিফথ কলামিস্টরা। ফলে রাজনৈতিক সংস্কৃতির যে সুস্থ ধারা, তা থেকে বহুদূরে ছিটকে পড়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেশ চোখে পড়ার মতো উন্নয়ন হচ্ছে— এ কথাটি যেমন অত্যুক্তি নয়; তেমনি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির উন্নয়নের চাকা কাদা-জলে ফেঁসে গেছে— এ কথাটিও কটূক্তি নয়। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর সহকর্মীদের কখনোই ‘ভাবমূর্তি’, ‘সম্মানহানি’, ‘অনুভূতি’ ইত্যাদি বায়বীয় শব্দমালা নিয়ে রাজনীতি করতে হয়নি। কেননা তাঁদের করতল ছিল বাংলার মানুষের মানচিত্র। তাঁদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞার কাছে জনগণ নির্দ্বিধায় সমর্পন করেছেন নিজস্ব আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন আর অধিকারের দাবি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক অবশ্য পাঠ্য হলো বঙ্গবন্ধুর জীবনী। তিনি ও তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ইতিহাস ও বাংলাদেশের ইতিহাস পথ চলেছে সমান্তরালে।
সাতচল্লিশ সাল থেকে আজ অবধি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস পাঠ করলে আমরা বারবার ফিফথ কলামিস্টদের আবির্ভাব দেখতে পাই। স্বাধীনতার পর যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ পুনর্গঠনে যখন কাজ করছে বঙ্গবন্ধু সরকার, তখনও এই ফিফথ কলামিস্টরা সক্রিয়। বস্তুত তাদের কূটকৌশলের কারণেই বাংলার মানুষকে পঁচাত্তরের ট্র্যাজিডি বরণ করে নিতে হয়েছে। ফিফথ কলামিস্টদের অপতৎপরতা এতোটাই ভয়াবহ যে, স্বাধীনতা লাভের মাত্র চার বছরের মাথায় দেশ আবার চলে যায় পাকিস্তানি মৌলবাদের ভয়ঙ্কর থাবায়। এরপর স্বৈরতন্ত্রে আর মোল্লাতন্ত্রে দল-বদল করেছে ফিফথ কলামিস্টরা। নব্বইয়ের পর স্বৈরাচারের ছাতার তলে থাকা লোকগুলোও বড্ড গণতান্ত্রিক হয়ে ওঠে। সুতরাং গণতন্ত্রের আক্রান্ত হওয়া ছাড়া আর কোনও গতি ছিল না। পঁচাত্তর থেকে ছিয়ানব্বই— এ দীর্ঘ সময় বাংলার মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রতিটি মানুষকে টিকে থাকার জন্য কী অবর্ণনীয় লড়াই করতে হয়েছে, তা রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নিশ্চয়ই বুঝতে পারে। কেননা, দমন-নিপীড়নের একই যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হয়েছে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে।

আওয়ামী লীগ ছিয়ানব্বই সালে সরকার গঠন করে এবং বাংলাদেশ ফিরতে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অক্ষবিন্দুতে। কিন্তু রঙ বদলানো গিরগিটিরা সক্রিয়, সুতরাং বাংলাদেশকে তখনও ঠেলতে হয়েছে প্রবল বাধা। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগের ও পরের ইতিহাস সকলেই কম-বেশি জানেন। নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ, সারাদেশের মানুষের ওপর যে ভয়াবহ নির্যাতন নেমে এসেছিলো— তা বোধ করি কোনোদিন মানুষ ভুলতে পারবে না। একই সঙ্গে মানুষ ভুলতে পারবে না, ১/১১- এর সামরিক বাহিনী নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আওয়ামী লীগ ও তার বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনের অনেক নেতার বক্তব্য-বিবৃতি-আলোচনা। একদল ফিফথ কলামিস্ট নানা রঙে ১/১১- এর কুশীলব হিশেবে ভূমিকা পালন করেছিলো, অন্যদল বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ভেতরে থেকে তাতে তাল দিয়েছিলো। সৌভাগ্য হলো, জাতির কাছে এদের মুখোশ খুলে গেছে। ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে সরকার গঠন করেছে, যুদ্ধাপরাদীদের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তাদের এই নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিতে এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রশ্নে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আপোষহীন অবস্থানের প্রতি জনগণের কী বিপুল সমর্থন ছিল— তার প্রমাণ ছিল ২০১৩ সালের শাহাবাগ আন্দোলন। শাহাবাগ আন্দোলনই প্রথম চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছিলো আইসিটি আইনের ত্রুটি। সরকার সেই জনদাবির প্রতি শ্রদ্ধাশীল হয়ে আইন পরিবর্তন করে বিচার কার্যকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। এই কাজে সরকারকে যেমন আন্তর্জাতিক নানা চাপ উপেক্ষা করে শক্ত হাতে সব সামলাতে হচ্ছে, তেমনি এই দাবি আদায়ে উগ্র ধর্মান্ধ ও স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তির হাতে প্রাণ দিয়েছেন বেশ কয়েকজন তরুণ, যাদের কাজের মধ্য দিয়ে দেশকে আরও অনেক কিছু দেওয়ার ছিল।

দুই.

ওপরের লেখাটিতে যা কিছু বলার চেষ্টা করা হয়েছে, বর্তমান সরকার পরিস্থিতি তার চেয়েও গভীরভাবে উপলব্ধি করতে পারেন বলে আমার বিশ্বাস। কেননা, আওয়ামী লীগকে অনেক ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ পথ অতিক্রম করে আজকের অবস্থানে আসতে হয়েছে এবং এখনও সে-ই কণ্টকাকীর্ণ পথই তাকে অতিক্রম করতে হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো বাংলাদেশের রাজনীতিতে সদা-সক্রিয় এই ফিফথ কলামিস্টদের বিষয়ে আওয়ামী লীগ কী ভাবছে। অতীতে এইসব চাটুকার ও দালালদের জন্যই আওয়ামী লীগ বারবার বিপদে পড়েছে। দলীয় শক্তি ও শক্ত নেতৃত্বের ওপর ভর করেই সে বিপদগ্রস্ত সময়গুলো আওয়ামী লীগ পার করেছে। আজকে যারা আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের নামে নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলনরত মানুষের ওপর চড়াও হচ্ছে, তারা কি আদৌ আওয়ামী লীগের ভালো চাইছে?

গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার গত ১৬ জুলাই আদালতে তার বিরুদ্ধে করা মামলার হাজিরা দিতে যান। তার সঙ্গে ছিলেন বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর সদস্য সাংস্কৃতিক কর্মী সনাতন মালো উল্লাস। তাদের বিরুদ্ধে ছাত্রলীগই মামলা দায়ের করেছে এবং তারা আইনের পথেই তা মোকাবিলার উদ্দেশে আদালতে হাজিরা দিতে গিয়েছিলেন। আদালত প্রাঙ্গণে যে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা তাদের ওপর হামলা চালালেন, তারা কি জানেন তাদের সংগঠনের অতীতের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস?

আদালত প্রাঙ্গণে গিয়ে কারও ওপর হামলা করাটা যে একটি অপ-রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সেটা কি তারা তাদের পূর্বসুরীদের কাছ থেকে শেখেননি? ছাত্রলীগের রাজনৈতিক যে স্খলন, তা কেবল ছাত্রলীগের ক্ষেত্রেই নয়, গোটা রাজনৈতিক পরিস্থিতির ক্ষেত্রেই সত্য। কিন্তু নিয়মতান্ত্রিকভাবে আদালতে হাজিরা দিতে যাওয়ার সময় তাদের এই যে সন্ত্রাসী আচরণ— তাকে কোনও রাজনৈতিক বিবেচনাতেই বৈধতা দেওয়া যায় না। তারা গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ও উদীচীর সদস্য সনাতন মালো উল্লাসের নামে মামলা করেছে, আদালত সেই বিষয়ে তার সিদ্ধান্ত জানাবেন। কিন্তু আদালত প্রাঙ্গণে ছাত্রলীগের নেতারা যে চড়াও হলেন এবং বুক ফুলিয়ে সেটাকে বৈধতাও জাহির করলেন— এই চেহারা বোধ করি ছাত্রলীগের আদর্শ ধারণকারী প্রকৃত নেতা-কর্মীদের কাছেও মেনে নেওয়া কষ্টকর। সুতরাং প্রশ্ন জাগতেই পারে, এই ফিফথ কলামিস্টরা কারা, যারা আদালত প্রাঙ্গণে বিচারিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ওপর হামলা করছেন। এবং এর উত্তর পেতেও খুব বেশি দেরি করতে হবে না, কারণ যেভাবে খবরের কাগজে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জামাত ও ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা ছাত্রলীগে নাম লেখাচ্ছে— তা থেকেই এসব ধারণার স্পষ্ট জবাব পাওয়া যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগের অনেক বলিষ্ঠ সমর্থক ও আদর্শবান মানুষও তাদের স্ট্যাটাসে এই হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। কেননা, শুভবুদ্ধিসম্পন্ন সকলেই একটি বিষয় বুঝতে পারেন, আইনের মাধ্যমে যারা সমস্যার মোকাবিলা করতে যাচ্ছেন, তাদের ওপর হামলা করাটা একটি কাপুরুষোচিত কাজ।

১৬ জুলাই গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ও উদীচীর সদস্য সাংস্কৃতিক কর্মী সনাতন মালো উল্লাসের ওপর আদালত প্রাঙ্গণে হামলার পর ফিফথ কলামিস্টদের কথাটি আবারও মোনে পড়লো। এই অত্যুৎসাহী এবং চতুর ফিফথ কলামিস্টদের কারণেই বাংলাদেশকে পিছিয়ে যেতে হয়েছে বহু বছর। সুতরাং আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দেরও এ বিষয়টি নিয়ে ভাবতে হবে। রাষ্ট্রের আইন কাঠামোর যে নিয়মতান্ত্রিক ধারা, তা ব্যহত হওয়ার অর্থ হলো— রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ব্যর্থ করার ষড়যন্ত্র চলমান। এই ষড়যন্ত্র ১৯৭৫ সালের আগে খন্দকার মোশতাকরা করেছিলো। তাই রাজনীতি থেকে ফিফথ কলামিস্টদের এই দৌরাত্ম্য বন্ধ করতে হবে। ফিফথ কলামিস্টদের কণ্ঠে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগান শোভা পায় না।   

লেখক: ব্লগার ও অনলাইন অ্যাকটিভিস্ট 

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ