ঋতু ছুটি

Send
তসলিমা নাসরিন
প্রকাশিত : ১৪:৫৩, জুলাই ২৪, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৫৬, জুলাই ২৪, ২০১৭

তসলিমা নাসরিনমুম্বাইয়ের একটি কোম্পানি ঘোষণা করেছে, তাদের নারী-কর্মীরা স্রাবের প্রথম দিন ছুটি পাবে। বাহ, বেজায় আনন্দের সংবাদ। কী ভালোই না হতো যদি সব কোম্পানি এমন ‘উইমেন ফ্রেন্ডলি অথবা নারীর প্রতি সহানুভূতিশীল হতো! কিন্তু এই একটি দিনের ছুটি মেয়েদের বিপক্ষেই চলে যাবে এমন আশঙ্কা করছি। মেয়েদের চাকরিতে নিতে এমনিতেই অনেক কোম্পানির আপত্তি। মেয়েরা নাকি চাকরি করার যোগ্য নয়। কেন, মেয়েরা গর্ভবতী হয়ে পড়ে,  সন্তান প্রসবের জন্য দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকতে হয়। গর্ভবতী হওয়ার ঝামেলা যেহেতু পুরুষের নেই, তাই পুরুষদের কর্মী হিসেবে কোম্পানির লোকেরা পছন্দ করে। কর্মীদের অনুপস্থিতির কারণে উৎপাদন হোক, মুনাফা কম হোক, কেউ চায় না। এখন যদি ঋতুস্রাবের ছুটি চালু হয়ে যায়, তাহলে তো ‘উইমেন ফ্রেন্ডলি’ হওয়ার বদলে এমনই নারীবিরোধী হয়ে উঠবে কোম্পানিগুলো, মেয়েদের আর চাকরিই দেবে না। মেয়েদের স্কুলে যাওয়ায়, পড়াশুনো করায়, চাকরি করায়, বাণিজ্য করায়, উপার্জন করায়, নিজের পায়ে দাঁড়ানোয় শতাব্দির পর শতাব্দি বাধা দিয়ে এসেছে পুরুষেরা। এখন যেইনা লড়াই করে নিজের অধিকার সামান্য ছিনিয়ে নিয়েছে মেয়েরা, অপ্রয়োজনীয় ছুটির জন্য আবার  সবকিছু ওলোটপালোট করে দেবে। নারীবিরোধী ষড়যন্ত্রে পুরুষ কতটা পারদর্শী, তা তো আমাদের অজানা নয়। 
ঋতু ছুটির প্রয়োজন নেই। কারণ ঋতু চলাকালীন সব মেয়ের তলপেটে যন্ত্রণা হয় না। যার হয় সে বেদনা নিরোধক খেয়ে নেয়। আর কারও যদি বেদনা নিরোধকে কাজ না হয়, অসুস্থতাজনিত কারণে সে ছুটি নেয়। মুম্বাইয়ের ‘কালচারাল মেশিন’ই প্রথম ঋতুছুটির ব্যবস্থা করছে না, ১৯৯২ সাল থেকে বিহারের সরকারি চাকরি করা মেয়েরা রজোনিবৃত্তি হওয়া অবধি মাসে দু’দিন ঋতুছুটি পায়। ওরাই এই ছুটির দাবি করেছিল। তখন বিহারের মূখ্যমন্ত্রী ছিলেন লালু যাদব, তিনিই মাসে একদিনের এই ঋতুছুটি মঞ্জুর করেছিলেন। এখনও দিব্যি চলছে এই ঋতুছুটি। ঋতুছুটি নেওয়ার কারণে পুরুষেরা নিশ্চিত কোন মেয়ের কখন ঋতু চলছে। এই প্রাইভেসিটা চলে গেলো, এর ফলে পুরুষেরা কি নারীদের ঋতু নিয়ে রসরসিকতা করে? নারীকে হেয় করে কোনও পুরুষ-সুলভ মন্তব্য, করে কি? একটি মেয়ে খুব ভালো জবাব দিয়েছে, বলেছে, ‘ আমরা সুন্দর শাড়ি পরলেও তো পুরুষেরা সেক্সিস্ট কমেন্ট করে, তাহলে কি আমরা সুন্দর শাড়ি পরবো না? নিশ্চয়ই পরবো’।

পৃথিবীতে শতকরা ৮০ ভাগ  শ্রমিক মেয়ে। ঋতুস্রাবের সময় বড় কোনও অসুবিধে ছাড়াই তারা  শ্রমিকের কাজ করছে। ঋতুস্রাব, আর কতবার পুরুষদের বোঝাতে হবে যে, কোনও অসুখ নয় বা পঙ্গুত্ব নয়। বিখ্যাত  টেনিস খেলোয়াড় সেরেনা উইলিয়ামস গর্ভবতী অবস্থায় টেনিস খেলে গ্র্যান্ড স্লামস জিতেছেন। গর্ভবতী অবস্থায় যদি খেলতে পারেন  সেরেনা, তবে ঋতু চলাকালীন কাজ কেন করতে পারবে না মেয়েরা! অনেকে বলে ঋতুস্রাবের ঠিক আগে আগে মেয়েদের মেজাজে পরিবর্তন আসে। তাদের রাগটা বেশি প্রকাশিত হয়, কাজে মনোযোগ আসে না। কাজে মনোযোগ আসে না, এ কথা ভুল প্রমাণিত হয়েছে। নারী শিক্ষাবিদদের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে দেখা গেছে, ঋতুস্রাব হবে এমন সময় তারা যে কাজ করেন, সেই কাজ অন্যান্য সময়ে কাজ করার চেয়ে ভালো। আর রাগের কথা বলি, মেয়েদের রাগকে পুরুষেরা মোটেও পছন্দ করে না। যে পুরুষ-কর্তা অফিসে অধীনস্ত কর্মীদের হুমকি ধামকি করে, তাদের তো বেশ যোগ্য এবং ডাকসাইটে কর্তা বলে বিচার করা হয়। মেয়েদের বেলায় হতে হবে উলটো। মেয়েদের রাগটাকে অনেকটা রোগ বলে বিবেচনা করা হয়। রাগ করলে আজকাল তো চলই হয়েছে ‘পিএমসিং’ বলা। মেয়েদের জন্য  ছোটখাটো ছুটি ছাটার আয়োজন করে কাজের পরিবেশকে সত্যিকার ‘উইমেন ফ্রেন্ডলি’ করা  যায় না। ‘উইমেন ফ্রেন্ডলি’ করতে হবে সমাজটাকে। নারী পুরুষের মধ্যে যে বৈষম্য আছে, সেটিকে নির্মূল করতে হবে।  

বাংলাদেশের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে মেয়েদের টয়লেট ব্যবহার করার স্বাধীনতা বা অধিকার খুবই  সীমিত। পুরুষের চেয়ে মেয়েদের বেশি টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে। এবং যদি প্রয়োজনেও টয়লেটে না যেতে পারে মেয়েরা, তাদের কিডনিতে অসুখ বাঁধাসহ নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হয়। এ কথা কে বুঝতে চায়? আসলে ফ্যাক্টরিগুলো এবং ওসবে কাজের পরিবেশ পুরুষের সুবিধের জন্য তৈরি, মেয়েদের সুবিধের জন্য নয়। মেয়েরা যেন আত্মসম্মান নিয়ে, শারীরিক- মানসিক সুস্থতা এবং প্রসন্নতা নিয়ে কাজ করতে পারে – সেই উদ্যোগ কেউ নেয় না।

যদি পুরুষের ঋতুস্রাব হতো, তাহলে কিন্তু তাদের ঋতুস্রাব নিয়ে জাঁকালো উৎসব হতো প্রতি মাসে। শাসকের পদে বসানো হতো পুরুষদের, বলা হতো ঋতুস্রাবের সময় যে রাগ হয়, সেই রাগই দরকার দেশ চালানোর জন্য।  আর যদি পুরুষেরা শিশু জন্ম দিতে পারতো, তাহলে তো তাদের রকমারী ছুটির ব্যবস্থা থাকতো। মানবজাতিকে বাঁচিয়ে রাখতে কী মহান কাজ তারা করছে—তা-ই বছরভর প্রচার হতো। কৃতজ্ঞতায় মাথা নত হয়ে থাকতো সবার।  

এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ঋতুস্রাবের জন্য মেয়েরা কোনও সম্মান পাবে না, কারণ এই সমাজে মেয়েদের কোনও সম্মান নেই। আমি মনে করি ঋতুস্রাবের জন্য সব মেয়ের  ছুটির প্রয়োজন নেই। ঋতুস্রাব চলাকালীনই মেয়েরা ঘরে বাইরে সব কাজ করে, করে এসেছে আবহমান কাল ধরে। গর্ভাবস্থায় তারা যেমন পরিশ্রম করতে পারে, ঋতু চলাকালীনও তেমন পারে। মেয়েদের ক্ষমতা, আমি অবাক হই, এত বেশি যে পুরুষেরা তার ধারে কাছে দাঁড়াতে পারে না। অথচ এই পুরুষেরই অধীনতা স্বীকার করে নিতে বাধ্য হচ্ছে মেয়েরা। 

লেখক: কলামিস্ট

 

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ