ট্রাম্প তলিয়ে যাচ্ছেন

Send
তসলিমা নাসরিন
প্রকাশিত : ১৯:০০, আগস্ট ২০, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৪, আগস্ট ২২, ২০১৭

তসলিমা নাসরিনবর্ণ বিদ্বেষকে যেভাবে প্রশ্রয় দিয়েছেন ট্রাম্প, তারপর আর তার ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না আমেরিকার সভ্য শিক্ষিত মানুষ। মনে হচ্ছে ট্রাম্প পণ করেছেন আমেরিকার সমাজকে বিভেদে এবং বর্ণবিদ্বেষে তছনছ না করে তিনি যাবেন না। তিরিশের দশক থেকেই আমেরিকার নেতারা নাৎসি মতের বিপক্ষে তাদের মত জানাচ্ছেন। শুধু ট্রাম্পই আলাদা। যুদ্ধবাজ বুশও ট্রাম্পের নিন্দে করছেন। ট্রাম্পের বিবেকবুদ্ধিহীনতা, শ্বেতবর্ণের জাত্যাভিমান এতই চরমে উঠেছে যে তার উপদেষ্টাদের এমনকি পরিবারের শুভাকাঙ্ক্ষীদের পরামর্শকে উপেক্ষা করে বর্ণবিদ্বেষী, নাৎসি, অভিবাসিবিরোধী, শ্বেতাঙ্গদের মধ্যেও ভালো লোক আছে, দিব্যি বলে দিলেন।
ভার্জিনিয়ার শার্লটসভিলে গত সপ্তাহে কী কাণ্ড হয়েছে তা আমরা দেখেছি, কী করে এক পাল বর্ণবিদ্বেষী অন্ধকার যুগের স্লোগান নিয়ে পথে নেমেছিল। হাতে ছিল নাৎসি বাহিনীর সোয়াস্তিকা, ছিল কু ক্লক্স ক্যানের এবং শ্বেতাঙ্গগর্বের সব রকমের প্রতীক। সম্প্রতি আমেরিকায় এমন প্রকটভাবে আর কখনও শ্বেতাঙ্গজাত্যাভিমান প্রকাশিত হয়নি। ইহুদিদের কোনও জায়গা নেই সমাজে, এই দেশ সাদাদের, কালোরা বাড়ি যাও – এই ধরনের স্লোগান দিতে দিতে নেমেছিল ওরা রাস্তায়। ১৮৬১ থেকে ১৮৬৫ সাল অবধি যুক্তরাষ্ট্রের যে ১১টা রাষ্ট্র ক্রীতদাসপ্রথা মেনে চলতো, সেই কনফেডারেট রাষ্ট্রের বর্ণবিদ্বেষী নেতাদের মূর্তি সরিয়ে নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এসব মূর্তি শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীরা সরাতে দেবে না। সেই শুরু।
এক শ্বেতাঙ্গগর্বী আচমকা গাড়ি চালিয়ে দিয়েছে নব্য নাৎসিদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-মিছিলের ভেতর। ঠিক যেমন করে  সন্ত্রাসীরা মানুষজনের ভিড়ের ভেতর ভ্যান চালিয়ে দেয়। সেদিন অনেকে আহত হয়েছে, আর হিথার হেয়ার নামের এক প্রতিবাদী মেয়ে নিহত হয়েছে। শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসীদের মিছিলের আয়োজক জেসন কেসলার টুইট করেছে, ‘হিথার ছিল খুব মোটা, খুব কুৎসিত কমিউনিস্ট। এরা পৃথিবী ৯৪ কোটি লোককে হত্যা করেছে। এখন বদলা নেওয়ার সময়’। বদলা নিয়েছে বটে বর্ণবিদ্বেষীরা। কিন্তু ট্রাম্প কী করেছেন!  শার্লটসভিলের দাঙ্গার ঘটনার খবর পেয়েও তিনি চুপ করে ছিলেন। দুদিন পর মিনমিন করে প্রতিবাদ করেছেন। প্রতিদিন যদিও তিনি পৃথিবীর হেন কিছু নেই যে যা নিয়ে টুইট করেন না, কিন্তু নিজের দেশের এই অশুভশক্তির জাগরণ নিয়ে টুঁ শব্দ করেননি। দেখেও না দেখার ভান করেছেন। শেষ পর্যন্ত শিখিয়ে দেওয়া বক্তব্য টেলেপ্রিন্টার থেকে পড়ে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব সারলেন। বর্ণবিদ্বেষী সংগঠনের নাম উল্লেখ করে করে নিন্দে করলেন। কিন্তু পরদিনই অবশ্য তড়িঘড়ি স্বরূপ দেখিয়ে দিলেন। বললেন, বর্ণবিদ্বেষী এবং বর্ণবিদ্বেষের প্রতিবাদ যারা করেছে – দু পক্ষই নাকি দোষী। আবার বললেন, দু’পক্ষেই ভালো লোক আছে। আশ্চর্য! দু’পক্ষেই ভালো লোক আছে? নাৎসিরা কেউ ভালো, কু ক্লুক্স ক্যানে ভালো লোক, বর্ণবিদ্বেষীদের মধ্যে ভালো লোক?

আমেরিকায় বর্ণবিদ্বেষী নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু আমেরিকার প্রেসিডেন্টের মুখ থেকে বর্ণবিদ্বেষীদের ভালো বলাটা, এত দীর্ঘ দিন একটু একটু করে যে জাতপাতবর্ণবিদ্বেষ থেকে মুক্ত একটা ভিত বানানো হয়েছিল, তা কুড়োল মেরে ভেঙে দেওয়া একই কথা। বর্ণ বিদ্বেষী লোক সমাজে আছে, তাই বলে প্রেসিডেন্টকে তো বর্ণবিদ্বেষী, শ্বেতাঙ্গগর্বী হলে চলবে না, বা তাদের পক্ষ নিলেও চলবে না। যে দেশে নানা বর্ণের, নানা জাতের, নানা ধর্মের, নানা দেশের মানুষ বাস করে, সেখানে ‘দেশে শুধু শ্বেতাঙ্গ বাস করবে, বাকিরা হঠো’ বললে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যাবে। আর এই অসহিষ্ণুতাকে আর হিংসেকে বাড়তে দিলে আমেরিকা ধসে পড়বে একদিন না একদিন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এদের কিছুই শেখায়নি! অথচ নাৎসি বিরোধী মিত্র শক্তির একটি ছিল আমেরিকা।

আমেরিকার বন্ধু রাষ্ট্রগুলোও বর্ণবিদ্বেষ ঠেকাতে ট্রাম্প সরকারের ব্যর্থতার সমালোচনা করছেন। ট্রাম্পের সবচেয়ে বড় বন্ধু-শক্তি ব্যবসায়ী শক্তি, তারাও কড়া সমালোচনা করেছেন ট্রাম্পের। হোয়াইট হাউসের উপদেষ্টাপরিষদ থেকে একে একে উপদেষ্টা ইস্তফা দিয়েছেন। তবে বর্ণবিদ্বেষী স্টিভেন ব্যাননকে হোয়াইট হাউসের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেওয়া একটা কাজের কাজ হয়েছে। ট্রাম্পের বর্ণবিদ্বেষকে আরও উস্কে দিতে ব্যাননের ভূমিকাও ছিল বেশ। এখন হোয়াইট হাউসে নতুন যে কর্মকর্তারা যোগ দিয়েছেন স্টাফদের চিফ জন কেলি, এইচ আর ম্যাকমাস্টার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, জিম মাতিস প্রতিরক্ষা সেক্রেটারি—এরাই আশা করা হচ্ছে, ট্রাম্পকে উল্টোপাল্টা টুইট করা, হাবিজাবি কথা বলা, মাথা নেই মুণ্ডু নেই এমন আচরণ করা থেকে বিরত রাখবেন। একটা দুষ্ট শিশুকে মানুষ করার জন্য অনেকগুলো ন্যানি রাখা হয়, এ অনেকটা তেমন।

যা কিছু নিয়েই কথা বলেছেন ট্রাম্প, যে কাজেই হাত দিয়েছেন, জগাখিচুড়ি পাকিয়েছেন, দেশে বিদেশে নিন্দিত হয়েছেন। প্রায় সব কিছুতে ব্যর্থ হয়েছেন। অভিবাসী তাড়ানো, শরণার্থী বন্ধ করা, মুসলিম দেশগুলোকে নিষিদ্ধ করা, মেক্সিকোর সীমান্তে দেওয়াল তোলা—ইত্যাদি সব উদ্ভট কর্মসূচিতে হাত দিয়েছেন। সবাইকে স্বাস্থ্য পরিসেবা দিতে ব্যর্থ তিনি আর  পরিবেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মাথাই তো ঘামাতে চান না। মিডিয়াকে যাচ্ছেতাই ভাষায় গালাগালি করেন। আছেন প্রতিপক্ষকে কী করে কটাক্ষ করা যায়, এমন কী নিজের দলের লোক যারাই তার সমালোচনা করেন, তাদের ঘায়েল করা নিয়ে তিনি ব্যস্ত। সুস্থ সভ্য মানুষ রিপাবলিকান পার্টিটাকেই এখন দোষ দিচ্ছে, এই পার্টি কেন চেষ্টা করছে না ট্রাম্পের পাগলামি বন্ধ করতে?

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আব্রাহাম লিঙ্কনের আদর্শ গ্রহণ করছেন না, গ্রহণ করছেন আমেরিকার বর্ণবিদ্বেষী নেতা রবার্ট এডওয়ার্ড লী আর জেফারসন ডেভিসের আদর্শ। তাদের বর্বরতা এই নতুন আমেরিকায় নতুন প্রজন্মের কাছে, নতুন বিশ্বের কাছে নিতান্তই অচল। মানুষ এর মধ্যে মানবাধিকারের চর্চা করেছে, সমানাধিকারের জন্য আন্দোলন করেছে, মানবতা উদারতা মহত্বকে প্রণাম করেছে। তারা জানে বর্ণবিদ্বেষের ইতিহাস। তারা জানে বর্ণবিদ্বেষীরা কী ভীষণ রক্তপাত ঘটিয়েছিল। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ হিংসে নয়, যুদ্ধ নয়, শান্তি চায়। ট্রাম্পকে শান্তির কথা বলতে হবে, তা না হলে তার ভরাডুবি হতে আর দেরি নেই। বিপদ ঘণ্টি বেজে গেছে। 

লেখক: কলামিস্ট

এসএএস

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ