‘বেড়ায় গুঁতায়’

Send
ফারজানা হুসাইন
প্রকাশিত : ১২:০৫, আগস্ট ২৮, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১২:১৮, আগস্ট ২৮, ২০১৭

ফারজানা হুসাইনসেদিন ফেসবুকে এক ভদ্রমহিলার শেয়ার করা একটা ছোট্ট ঘটনা পড়ছিলাম। ভদ্রমহিলার বাসায় কাজ করে মধ্য বিশের এক মেয়ে, প্রচলিত শব্দে আমরা যাকে বলে ‘বাসার বুয়া’। প্রথম স্বামী ছেড়ে যাওয়ার পর মেয়েটি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেছে। এই বর্তমান স্বামীটি বেকার, ভবঘুরে আবার নেশাও করে। এক সকালে মেয়েটি ওই ভদ্রমহিলার বাড়িতে কাজে এসেছে কালশিটে পড়া চেহারা নিয়ে- সহজে অনুমেয় গত রাতে মাতাল স্বামী আবারও মেরেছে। ভদ্রমহিলা কিছুটা বিরক্ত হয়ে মেয়েটিকে প্রশ্ন করলো, এই যে রোজ রোজ মার খাও ওই লোকটার হাতে, তোমার রোজগারের সব টাকা-পয়সা নিয়ে যায় সে, সংসারে যার বিন্দুমাত্র কোনও অংশগ্রহণ নেই, কেন তাহলে আবারও বিয়ে করা?
একটু হেসে মেয়েটা বলে- ‘কী করবো আপা, বিয়া না কইরা একদিনও থাকন যায় না, রাইতে বস্তির ঘরের বেড়ায় গুঁতায়’!
কে গুঁতায়? সহজেই অনুমেয়- সমাজ গুঁতায়, কিছু সামাজিক জীবেরা গুঁতায়।
আমার পরিচিত এক মেয়ে, দারুণ মেধাবী, ভালো রেজাল্ট, পড়াচ্ছে দেশের একটি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে। ত্রিশের কোঠায় পা দিয়েছে, তবে বিয়ে করেনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার উপস্থিতি জানিয়ে দেয় বিয়ে নিয়ে মাথাব্যাথাও নাই। বেশ সাবলীল, স্বচ্ছন্দ্য আর সাজগোজ করতে পছন্দ করে সে। কোনও এক অনুষ্ঠানে তোলা তার শাড়ি পরা ছবিতে পরিচিত অপরিচিত কিছু মানুষের বেশ রসালো কমেন্ট পড়ে সে যারপর নাই বিস্মিত। ছবিতে শাড়ি সরে গিয়ে মেয়েটির কোমরের কিছু অংশ দেখা যাচ্ছিল। সেই সুযোগে কিছু সামাজিক প্রাণী মেয়েটির ফেসবুকের ভার্চুয়াল ওয়ালে, ছবির তলায় চটুল মন্তব্য ছুড়তে দ্বিধা করেনি একবারও। এই জীবেরা অধিকাংশই মধ্যবয়সী শান্ত শিষ্ট লেজ গৃহপালিত প্রাণী বটে। তাদের বউ-সংসার আছে, চাকরি-বাকরি আছে, জ্ঞান-গরিমাও আছে। নেই কেবল কাণ্ডজ্ঞান আর নারীকে মানুষ বিবেচনা করার মানসিকতা।

এই শিক্ষিত-কর্মজীবী মেয়েটির ফেসবুকের ওয়ালে বা ভার্চুয়াল বেড়ায় গুঁতায় সেই একই সমাজ, সমাজের এই জীবেরা। বেড়ায় গুঁতায় পুরুষতন্ত্র!

পুরুষতন্ত্র মানতে পারে না কোনও অবিবাহিত, ডিভোর্সি, বিধবা নারী একা একা নিজের পরিচয়ে পরিচিত হতে পারে, নিজের উপার্জনে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চাইতে পারে, বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারে। পুরুষতন্ত্র তখন সমাজ-সংসার, শতাব্দি ধরে চলে আসা সামাজিক রীতির নামে নারীকে চুপ করিয়ে দেয়। পায়ে শেকল হিসাবে পুরুষের দাসী বানায়। নারীর নিজের নাম

যথেষ্ট নয়, বাবার বা স্বামীর নাম লাগবেই। নারী হয় কোনও এক পুরুষের স্ত্রী কিংবা সে নগর-স্ত্রী বা পতিতা। মেয়েরা মায়ের জাত- তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করো, স্ত্রী হলো পুরুষের সম্পত্তি- তার সঙ্গে প্রেমের সুরে কথা বলো, মেয়ে হলো পিতার কাছে আমানত স্বরূপ, ক’দিন বাদেই পরের ঘরে চলে যাবে, কে জানে কেমন স্বামী-শ্বশুর বাড়ি আছে মেয়ের কপালে? তাই মেয়েকে স্নেহ করো। রাস্তায় কিশোরী মেয়েটির সম্ভ্রম রক্ষায় বডিগার্ড হয় পাঁচ বছরের ভাই! আশ্চর্যের বিষয় এই যে, নারীকে নারী হিসাবে সম্মান করতে বলে না কোনও সমাজ বা ধর্ম। নারীর যা কিছু সম্মান তা কেবল তখন যখন সে কোনও পুরুষের মা, স্ত্রী কিংবা কন্যা। পুরুষের সম্পত্তি সে, তাই যা অল্প বিস্তর ভালো ব্যবহার সে পায় সমাজ আর ধর্মীয় বিধানে। নতুবা নারীর নিজের না আছে পরিচয়, না আছে সম্মান।

সিঙ্গেল বা একাকী মেয়েকে বাড়ি ভাড়া দেয় না কোনও বাড়িওয়ালা, যদিও মেয়েটি হয়ত নিজের উপার্জনে বেশ ভালো বড়সড় বাড়ির ভাড়া দিতে সক্ষম। বাড়িওয়ালার প্রয়োজন গ্যারান্টি, মেয়েটির চরিত্রের সনদ- সেই গ্যারান্টি, সেই ক্যারেক্টার সার্টিফিকেট কেবল দিতে পারে একজন পুরুষ অভিভাবক। হয়ত মেয়েটির উপার্জনে সংসারের সিংহভাগ খরচ চলে, হয়ত মেয়েটি পৃথিবীর নামী দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে সার্টিফিকেট নিয়ে ফিরেছে, হয়ত কর্মস্থলে মেয়েটি আছে খুব গুরুত্বপূর্ণ পদে, হয়ত মেয়েটির অধীনেই কাজ করে কয়েকজন পুরুষ সহকর্মী, হয়ত কাজের জন্য তাকে আজ এদেশ তো কাল ওদেশে যেতে হয়, তবু একা সিঙ্গেল একটা মেয়ে একা একা বাড়ি ভাড়া করে থাকতে পারে না এদেশে। তার মাথায় এক অদৃশ্য ছাতা লাগে, এই ছাতা হতে পারে কেবল একজন পুরুষ। পুরুষের অধীনে, পুরুষের পরিচয়েই একজন নারী সম্পূর্ণতা পায় এই সমাজে।

এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে ঊনমানুষ বা মেয়ে মানুষ হয়ে জন্ম নেয় নারী, বেড়ে ওঠে, বড় হয়, বুড়ো হয়। কিন্তু নিজের পরিচয়ে পরিচিত হওয়ার মতো যোগ্যতা তার হয় না কখনও। মৃত্যুতেও দরকার পড়ে পুরুষ অভিভাবক বা আত্মীয়ের। শিক্ষিত বা অশিক্ষিত, কর্মজীবী বা গৃহিনী, নিম্নবিত্ত, মধ্যবিত্ত কিংবা উচ্চবিত্ত- নারী সে যে শ্রণিরই হোক, শিক্ষা-যোগ্যতা-শ্রেণি ভেদে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বেড়ায় গুঁতানো এই সমাজ নারীকে শুধু নারী বানিয়ে রাখে, অবলা মেয়েমানুষ হিসাবে দেখে, মানুষ হতে দেয় না।

লেখক: আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

এসএএস

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ