ঈদ: ফিরুক মানুষের আনন্দ

Send
শুভ কিবরিয়া
প্রকাশিত : ১২:০৩, সেপ্টেম্বর ০২, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫০, সেপ্টেম্বর ০৪, ২০১৭

শুভ কিবরিয়াআমাদের চারপাশে সব দুঃখজাগানিয়া খবর। হাওর এলাকার অকাল বন্যার কষ্ট কাটতে না কাটতেই এক বড় বন্যা এসে দেশের বিশাল এলাকা ভাসিয়ে দিয়ে গেল। এই বানের জলে ভেসে গেল ক্ষেত-ফসল ও দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক সুখ। এই অযাচিত বন্যা এবার দেশের এমন সব এলাকা আর জনপদকে প্লাবিত করেছে যেখানকার মানুষ গত দুই তিন দশকে এরকম দুর্দশার মুখোমুখি হননি। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর এলাকা পড়েছে এক বড় বিপাকে। সেখানে মানুষের বন্যার অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে। এ এলাকার মাটির বাড়িঘর এ বছরের বন্যায় বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাঠের ফসল হারিয়েছে কৃষক। ফসলহানি আর সম্পদহানির ফলে এইসব বন্যাদুর্গত এলাকার মানুষ লড়ছে এক ভয়াবহ দুঃখের বিরুদ্ধে।
প্রাকৃতিক এই বিপর্যয়ের মধ্যেই প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে চলমান হিংসার আগুনের আঁচ গায়ে লাগতে শুরু করেছে বাংলাদেশের। মিয়ানমারের সেনাবাহিনী দেশটির রাখাইন রাজ্যে চালাচ্ছে এক জাতিগত নিধনযজ্ঞ। মিয়ানমারের হাজার হাজার মানুষ প্রাণভয়ে রিক্তহস্তে পালিয়ে আসছে বাংলাদেশের দিকে। এই অবস্থা বাংলাদেশের জন্য যেকে নিয়ে আসছে এক বিপদ, এক সংকট। বাংলাদেশ পড়েছে এক উভয়সংকটে। বাংলাদেশ কি এই হাজার হাজার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের খোলামনে আশ্রয় দিয়ে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করবে? নাকি এই বিপন্ন মানুষদের তাড়িয়ে দেবে, পুশব্যাক করবে মিয়ানমার সীমান্তে?
লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বছরের পর বছর ধরে আশ্রিত আছে বাংলাদেশে। তাদের নিয়েই হাঁপিয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। অন্যদিকে মিয়ানমারের রাজনৈতিক ও সামরিক পদক্ষেপের কারণে জাতিগত সংঘাত আরও হিংসাত্মক হয়ে উঠছে। রাখাইন রাজ্যের রোহিঙ্গাদের একাংশ সশস্ত্র সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে এক জাতীয়তাবাদী লড়াইয়ের সূচনা করেছে। ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ, ক্ষতিগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের কেউ কেউ জঙ্গিবাদী চরমপন্থার সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েছে। ফলে বাংলাদেশের জন্য এখন এই সংকট এক বড় পরিসরে বিস্তৃতি লাভ করেছে। বাংলাদেশের সরকার এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কূটনৈতিকভাবে বড় কোনও ইস্যু তৈরি করতে পারেনি। ফলে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপে এই সংকটের নিকটতর সমাধানও দুরুহ। এরূপ বিপর্যয়, সংকট আর দুরবস্থা এই পরিস্থিতিকে করে তুলছে আরও নারকীয়।
দেশের ভেতরে বন্যা, যানজট, সড়কের বেহাল দশা, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে উত্তাল রাজনৈতিক উত্তেজনার সঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থীজনিত এই সংকট এবার ঈদের মৌসুমকে করে তুলেছে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।
তবুও মানুষ ঘরমুখে ছুটেছে ঈদ পালনের অভিপ্রায়ে। কোরবানির ধর্মীয় দর্শন আর সামাজিক রিচ্যুয়াল পালনের ইচ্ছে নিয়ে পথের সব কষ্টকে হাসিমুখে মেনে নিয়েই প্রিয়জনের সঙ্গে মিলেছে মানুষ।
মানুষের এই ঈদমিলন আনন্দমগ্ন হোক সেই প্রয়াসে লেখাটা শেষ করছি কতগুলো কৌতুক দিয়ে। নানাসূত্র থেকে সংগৃহীত এইসব কৌতুক আমাদের সামাজিক-রাজনৈতিক অনেক দৈন্যকে যেমন বাঁকা চোখে দেখায়, তেমনি আমাদের ঈদের আনন্দকেও কিছুটা বাড়িয়ে তোলে বইকি!
দুই.
জোকস-১
একবার একটা ইঁদুর ভুল করে দামি হীরার একটা টুকরো গিলে ফেলে। হীরার মালিকের তো ঘুম হারাম। যেকোনও মূল্যে এই হীরা তার ফেরত চাই। ইঁদুর মারার জন্যে সে এক ইঁদুরশিকারীর খোঁজ করে। তাকে পেয়েও যায়। শিকারির সাথে চুক্তি হয়, নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে সে ইঁদুর মেরে হীরা উদ্ধার করে দেবে।
শিকারি ইঁদুর মারতে ইঁদুরদের বাসস্থানে পৌঁছালে দেখে, হাজারের ওপর ইঁদুর একে অন্যের সঙ্গে গুঁতোগুঁতি করে শুয়ে বসে আছে। আর একটা ইঁদুর সবার থেকে আলাদা হয়ে এক জায়গায় চিৎপটাং হয়ে শুয়ে আছে।
শিকারি তাক করে ওই ইঁদুরটাকেই ধরে। আর তার পেট কেটে হীরা বার করে মালিকের হাতে সেটা তুলে দেয়। হীরার মালিকের কাছ থেকে নিজের পাওনা হিসাব বুঝে নিয়ে শিকারি যখন সেখান থেকে চলে আসছে, মালিক তখন যারপরনাই আশ্চর্য। শিকারির কেরামতি দেখে বিস্মিত মালিকের জিজ্ঞাসা—
- হাজারো ইঁদুরের মধ্যে তুমি ভাই কিভাবে বুঝলে যে ওই ইঁদুরটাই হীরা গিলেছে?
শিকারি সহাস্য জবাব—
- খুব সহজ স্যার। মূর্খ যখন হঠাৎ বিত্তবান হয়ে যায়, সে নিজের লোকেদের সংসর্গ ও তাদের সঙ্গে মেলামেশা বন্ধ করে দেয়।
জোকস-২
তৃতীয় বিশ্বের এক দেশের নামজাদা এক মন্ত্রী মৃত্যুর পর পরজগতে গেল। সে যখন স্বর্গে ঢুকবে (ধরে নেই, সে কোনও না কোনোভাবে স্বর্গে ঢুকবে) তখন দেবতা তাকে বলল, ‘স্বর্গে কিছু সংস্কার চলছে। তুমি দুইদিন শুধু নরকে ঘুরে আসো। এরপর স্বর্গে ঢুকো।’
মন্ত্রী রাজি হলো।
নরকে শয়তান তাকে সাদর আমন্ত্রণ জানালো। এরপর সে তাকে নরক ঘুরে দেখাতে লাগলো। মন্ত্রী অবাক হয়ে দেখতে লাগলো যে নরক অনেক সুন্দর। খুবই আরামের ব্যবস্থা, থাকার জন্য সুন্দর সুন্দর প্রাসাদ। খেলাধুলার জন্য বড় বড় মাঠ। আছে বিশালাকৃতির সুইমিং পুল। আছে সুসজ্জিত গলফ কোর্টসহ সব ব্যবস্থা। আছে অনেক সুস্বাদু পানীয়, খাবার-দাবার, অসংখ্য সুন্দরী রমণী। মানুষ অনেক আরামে আছে ওখানে।
দুইদিন পর দেবতার কাছে এসে মন্ত্রী বলল, আমি নরকেই থাকতে চাই।
দেবতা অবাক। জিজ্ঞেস করলো, তুমি সত্যি ওখানে থাকতে চাও?
মন্ত্রির জবাব, হ্যাঁ।
দেবতাও রাজি হলো।
অতএব মন্ত্রী গেলেন নরকে। কিন্তু একি! এই নরক তো একেবারেই অন্যরকম। কোনও সুন্দর জায়গা নেই, চারপাশে শুধু আগুন আর কয়লা। মানুষজনকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে পৈশাচিক কায়দায়। দৈত্যরা মানুষজনকে অবিরাম শাস্তি দিচ্ছে। অসংখ্য সাপ আর হিংস্র প্রাণী ঘুরে বেড়াচ্ছে; খুবই কুৎসিত আর জঘন্য জায়গা এখন নরক।
মন্ত্রী অবাক হয়ে শয়তানকে জিজ্ঞাসা করলেন, নরকের এই হাল কেন? আগে আমি কী দেখলাম, আর এখন কী দেখছি!!
শয়তান হেসে বলল, আরে ওইটা তো ছিল একটা ক্যাম্পেইন। তোমরা যেমন ভোটের আগে মানুষকে স্বর্গ বানিয়ে দেবে বলে স্বপ্ন দেখিয়ে পরে কুশাসনের নরক উপহার দাও; আমরাও তাই করেছি। তোমার তো এটা না বোঝার কথা নয়।
জোকস-৩
এক লোক বৃষ্টির পানির মধ্যে ড্রেনে পড়ে মারা গেলেন। তিনি স্বর্গে গিয়ে দেখলেন বিশাল এক দেয়াল। সেই দেয়াল ঘড়িতে পরিপূর্ণ। তা দেখে মৃত লোকটি স্বর্গের দূতকে জিজ্ঞাসা করলেন, এখানে এত ঘড়ি কেন?
স্বর্গের দূত জানালেন, এগুলো হলো মিথ্যা ঘড়ি। প্রত্যেক মানুষের জন্য একটি করে রাখা আছে। দুনিয়াতে থাকা অবস্থায় কেউ যদি একবার মিথ্যা কথা বলে, তাহলে ঘড়ির কাঁটা একবার ঘুরবে; দু’টি মিথ্যা কথা বললে ঘুরবে দু’বার। এভাবে যে যতবার মিথ্যা কথা বলবে, তার ঘড়ির কাঁটা ততবার ঘুরবে।
দূরে একটি ঘড়ি দেখিয়ে মৃত ব্যক্তি জানতে চাইলেন, আচ্ছা, ওই ঘড়িটি কার?
স্বর্গের দূত বললেন, এটা মাদার তেরেসার ঘড়ি। এটার কাঁটা একবারও ঘুরেনি। তার মানে তিনি জীবনে একটি মিথ্যাও বলেননি।
মৃত ব্যক্তি এবার জিজ্ঞাসা করলেন, আচ্ছা, আমাদের দেশের যেসব দল বিভিন্ন সময় রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিল, তাদের বড় বড় রাজনীতিবিদদের ঘড়িগুলো কই?
স্বর্গের দূত বললেন, দেখুন, সাধারণত বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের ঘড়িগুলো আমাদের অফিসরুমে থাকে। ওগুলো আমরা টেবিল ফ্যান হিসেবে ব্যবহার করি।
পুনশ্চ: এত কিছুর পরও আমরা চাই আমাদের রাষ্ট্র, রাজনীতি সকল দুর্দশা কাটিয়ে ন্যায্য রাষ্ট্র হয়ে উঠুক। কমে যাক মানুষে মানুষে অর্থনীতির বৈষম্য। মর্যাদা আর মৌলিক অধিকারের নিরিখে সুশাসন ভর করুক সমাজ, রাষ্ট্রের সর্বত্র। কোরবানির ঈদ আনন্দে এই প্রত্যয় জাগুক মানুষের মনে। আমাদের আনন্দ ভাগ করে নেই সকল দুঃখী মানুষের সঙ্গে। প্রত্যেকে আমরা হয়ে উঠি সকলের তরে।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, সাপ্তাহিক

/এসআএস/টিআর/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ