শেখ হাসিনাই পেতে পারেন নোবেল পুরস্কার

Send
ফজলুল বারী
প্রকাশিত : ১৫:২৩, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৬, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৭

ফজলুল বারীরোহিঙ্গা সমস্যাটি বাংলাদেশের জন্যে বাঁশের ওপর আঁটির বোঝা। বাংলাদেশে এর আগে যত রোহিঙ্গা শরণার্থী এসেছেন এর প্রায় পাঁচ লাখ এখনও এখানে রয়ে গেছেন। নতুন এসেছেন আরও প্রায় তিন লাখ। বাংলাদেশের মতো দেশের পক্ষে এত শরণার্থীর চাপ সওয়া কঠিন। এরপরও মানবিক দৃষ্টিতে বাংলাদেশকে বিষয়টি দেখতে হবে। দেখতে হবে প্রকৃত শরণার্থীর আন্তর্জাতিক দৃষ্টিতে। এই মুহূর্তে বিশ্বে রোহিঙ্গারাই প্রকৃত শরণার্থী। কারণ তাদের কোনও দেশ নেই। যে ভূমিতে তাদের জন্ম সেই মিয়ানমারই তাদের স্বীকার করে না। সেদেশে তাদের নাগরিকত্ব পর্যন্ত নেই। ফিলিস্তিনিদেরও ছোটখাটো একটি টেরিটোরি-সরকার আছে। রোহিঙ্গাদের সেটিও নেই।
মিয়ানমার নামের বর্তমান পৃথিবীর অন্যতম ‘শয়তান’ রাষ্ট্রটি পরিকল্পিতভাবে রোহিঙ্গা সমস্যাটি বাংলাদেশের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। গত কয়েক দশক ধরে নানা উছিলায় তারা আরাকান রাজ্যকে রোহিঙ্গা শূন্য করার কাজ করছে। তাদের বরাবরের দোসর দেশটির নাম চীন। এরসঙ্গে আবার নতুন যুক্ত হয়েছে নরেন্দ্র মোদির ভারত। এই পরিস্থিতির ভেতর মিয়ানমার গিয়ে তাদের কার্যক্রমকে সমর্থন জানিয়েছে দিল্লির হিন্দুত্ববাদী সরকার! এখন যদি কেউ বলে রোহিঙ্গারা মূলত ইসলাম ধর্মাবলম্বী এরজন্যে মোদির এমন আগ বাড়িয়ে চুলকানি, এর জবাব কী হবে? ভারত অবশ্য ইসরায়েলেরও বন্ধু রাষ্ট্র। এটি ইন্দিরা গান্ধীর ভারত নয়। রোহিঙ্গা সমস্যা ইস্যুতে বর্তমান ভারত সরকারের অবস্থানটি বাংলাদেশের জন্যেও বিব্রতকর। কারণ আপনি মানেন আর না মানেন সত্য হচ্ছে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক-কূটনৈতিক নানাক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটি ভারত নির্ভর দেশ। দিল্লি সঙ্গে আছে বলে শেখ হাসিনার সরকার নিয়ে কথা বলতে আমেরিকার মতো দেশ সাতবার চিন্তা করে অথবা ভয় পায়। কারণ তাদের দরকার দিল্লিকে ঢাকাকে নয়। বাংলাদেশ তাদের কাছে অনেকটা কেয়ার অব নিউ দিল্লি। চলমান রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে দিল্লির হঠাৎ ভূমিকাটি বাংলাদেশের জন্যে অপ্রত্যাশিত। চীনা বিরোধিতার কারণে জাতিসংঘ এখনও রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কোনও পূর্নাঙ্গ বৈঠক করতে পারেনি সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। বাংলাদেশের চীনপন্থীরাও এর নিন্দা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। বিবেকের কী দাসত্ব!

এবার রোহিঙ্গা শরণার্থী ইস্যুটি এভাবে মানুষের বিবেককে এতোটা নাড়া দেওয়ার কারণ স্বাধীন বিশ্ব মিডিয়া আর সোশ্যাল মিডিয়ার শক্তিমত্তা! বিবিসি-রয়টার্স-এপি-এএফপি সহ আন্তর্জাতিক মিডিয়া স্বদেশ ভূমি থেকে বিতাড়িত একটি জনগোষ্ঠীর দুঃখ দুর্দশার চিত্র বিশ্বস্তভাবে তুলে ধরেছে। বরাবরের মতো বাংলাদেশ এবারেও শুরুর দিকে নতুন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ঢুকতে দিতে চায়নি। কিন্তু জীবন বাঁচাতে দূর্গম দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে বিপন্ন মানুষজনের স্রোত আটকায় সে সাধ্য কার? মানুষ আসছে প্রাণ বাঁচাতে। এ মানুষেরা মনে করছে এ বাংলাদেশ তাদের নিরাপদ আশ্রয়। কারণ দেশটির মানুষজন বাংলাভাষী। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষজন ইসলাম ধর্মাবলম্বী। বিপন্ন মানুষকে সাময়িক আশ্রয় দিতে মানবিক হৃদয়ের শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তের প্রশংসা করছে বিশ্ব। সিরিয়ান শিশু শরণার্থী আয়লানের মতো এক রোহিঙ্গা মেয়ে শিশুর ভাসমান লাশের মুখটি বিশ্ব মানবতাকে কাঁদিয়েছে। বিশ্ব মানবতার এই সমর্থনকে কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা সংকট সামাল দিতে হবে। কারণ রোহিঙ্গারা দেশে ফিরতে পারছে না ঠিক, কিন্তু বাংলাদেশেও পড়ে থাকতে আসেনি। এত যাবৎকাল যত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছেন তাদের সিংহভাগ এখন আর বাংলাদেশে নেই। ছড়িয়ে পড়েছেন সারা বিশ্বে। কারণ জাতিসংঘ শরণার্থী সনদে যে সব দেশ স্বাক্ষর করেছে সে সব দেশে পৌঁছতে পারলে রোহিঙ্গাদের প্রটেকশন হয়ে যায়। কারণ রোহিঙ্গারা প্রকৃত শরণার্থী। তাদের কোনও দেশ নেই। এরমাঝে মালয়েশিয়া ঘোষণা দিয়েছে রোহিঙ্গারা তাদের উপকূলে পৌঁছলে তারা তাদের সাময়িক আশ্রয়ের ব্যবস্থা করবে। মালয়েশিয়ার এ ঘোষণাকে কাজে লাগাতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরালো করা দরকার।

সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকে এই মানবিক পরিস্থিতিকে কটাক্ষ করে লিখছেন! ফেসবুকে আমার বন্ধুদের অনেকে হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তাদের কারও কারও লেখা পড়ে চমকে যেতে হয়! এক সংখ্যালঘু যদি আরেক সংখ্যালঘুর যন্ত্রণা না বোঝে তাহলে কে বুঝবে? পর্যটক জীবনে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে প্রনব রিচেল নামের এক গারো শিক্ষকের বলা কথাগুলো এখনও কানে বাজে। আমাকে তিনি বলেছিলেন ফজলুল বারী, সংখ্যালঘুর যে কী যন্ত্রণা তা আপনি বুঝবেন না। কারণ বাংলাদেশে আপনি সংখ্যাগুরুর দলে। আমি প্রনব রিচেল এদেশে সংখ্যালঘু বলে আরেক সংখ্যালঘুর যন্ত্রণা বুঝি। পৃথিবীর যে কোনও প্রান্তে সংখ্যালঘু নির্যাতনের কাহিনি পেলে সেটি পড়ি। তা আমাকে স্পর্শ করে। কারণ আমি একজন সংখ্যালঘু’। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু নির্যাতনের ঘটনা জানলেই আমরা এর বিরুদ্ধে লিখি। বাংলাদেশ থেকে সারা বছরই নীরবে হিন্দুদের ভারতে চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ থেকে ভারতে গেলেই হিন্দুরা শরণার্থী হিসাবে আশ্রয় প্রটেকশন পায়। কিন্তু যে হিন্দু এখানে নিত্য নির্যাতিত তাদের কেউ কেউ রোহিঙ্গাদের নিয়ে এত ক্ষিপ্ত হওয়ার কারণ কী। কেউ যদি বলে রোহিঙ্গারা মুসলিম সে কারণে? এর জবাব কী হবে? আমি বিষয়টি এখানে কাউকে আঘাত করে বলছি না। দুঃখিত।

চট্টগ্রাম অঞ্চলের অনেকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে প্রতিদিন ফাটায়ে দিচ্ছেন! রোহিঙ্গা সংকটের ইতিহাস জানেন? কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় কৃষ্ণদাস নামের একজন বাঙালি রোহিঙ্গা রোহিঙ্গাদের ইতিহাসটি এভাবে তুলে এনেছেন। কৃষ্ণদাস লিখেছেন, ‘রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের রাখাইন (অতীতে আরাকান) প্রদেশের মানুষ। সুপ্রাচীন কালে বাংলার পূর্বাংশ থেকে আগত লাখ লাখ মানুষ এখানে এসে পুরুষানুক্রমে স্থায়ী ভাবে বসবাস করেছে। সেখানে গড়ে তুলেছে সভ্যতা ও সংস্কৃতি। কিন্তু মিয়ানমারের রাষ্ট্রশক্তির পুনর্বিন্যাসের ফলে রোহিঙ্গাদের স্বদেশ আরাকান মিয়ানমারের অংশ হয়ে গেলো। রোহিঙ্গারা স্বদেশে পরদেশি হয়ে গেলো। ষোড়শ শতাব্দী থেকেই আরাকান প্রদেশে বাঙালি মুসলমানেরা বাস করত। ১৬৬৬ সালেও আরাকান বাংলার চিটাগঙ্গের অংশ ছিল। ১৭৮৫’তে বর্মিরা যুদ্ধে আরাকান দখল করলে ৩৫০০০ আরাকানবাসী চিটাগঙ্গে আশ্রয় নেয়। ১৮২৬ সালে প্রথম অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধের পরে আরাকান প্রদেশকে ব্রিটিশরা ভারতের সঙ্গে যুক্ত করে নেয়। ব্রিটিশদের উৎসাহে এবং প্রলোভনে বাংলার বহু মানুষ সেখানে গিয়ে খামার-শ্রমিক হিসাবে কাজ শুরু করে। কৃষিকাজে দক্ষতা আর কর্মকুশলতার ফলে আরাকান প্রদেশে বাঙালি রোহিঙ্গাদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছিল। কোনও নির্দিষ্ট সীমানা না থাকায় চিটাগঙ্গের বাঙালি হাজারে হাজারে আরাকানে চলে যায়। ধান চাষে সস্তায় মজুর পাওয়ার তাগিদে আরাকান-সহ বর্মার আদি বাসিন্দারাও বাঙালিদের উৎসাহিত করত। ১৯২৭ সাল নাগাদ অনেক জায়গাতেই ভারতীয়রা ছিল সংখ্যাগুরু।
পাকিস্তান আন্দোলনের সময় (১৯৪০ সাল) পশ্চিম বর্মার রোহিঙ্গারা পূর্ব-পাকিস্তানভুক্তির জন্য পৃথগীকরণের আন্দোলন শুরু করে। ১৯৪৮ সালের জানুয়ারিতে বার্মার স্বাধীনতার পরেও তাদের সে প্রয়াস অব্যাহত ছিল। কিন্তু মোহাম্মদ আলি জিন্নাহ বার্মার লোকেদের বিরুদ্ধে কোনও কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে না বলে ঘোষণা করলে রোহিঙ্গারা বিদ্রোহী হয়ে উঠল। বার্মার মিলিটারি তাদের দমন করার জন্য সক্রিয় হলো।
১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীন হওয়ার সময়ে আরাকান সে দেশের অন্তর্ভুক্ত হয়। বাঙালি রোহিঙ্গারা পূর্ব বাংলার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য আন্দোলন করেছিল, সেই থেকে বর্মিরা রোহিঙ্গা-বিরোধী। ১৯৭৮ সালে বর্মিদের ‘কিং ড্রাগন অপারেশন ইন আরাকান’-এর অত্যাচারে রোহিঙ্গারা ঘরবাড়ি ছেড়ে হাজারে হাজারে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশে চলে এলো। ১৯৮২ সালে নাগরিক আইন কার্যকর করে সে দেশের সরকার। সেখানে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়। ৭,৩৫,০০০ রোহিঙ্গা বার্মায় বাস করত। এরা মূলত রাখাইন প্রদেশের শহরকে কেন্দ্র করে থাকত। ব্রহ্মদেশের পুলিশ বাড়ি-ঘর পুড়িয়ে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করতে লাগল।
১৯৮২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাদের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে ঘোষণা করে যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের নাগরিক নয়। সঙ্গে সঙ্গে মিয়ানমার সরকারও তাদের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে ঘোষণা করে যে বাঙালিরা সবাই বিদেশি। ১৯৮৩ সাল থেকে মিয়ানমার সরকার সীমানা সুরক্ষিত করে নেয়। ১৯৯০ সাল থেকে শুরু হয় রোহিঙ্গাদের টিকে থাকার আন্দোলন। তারা রোহিঙ্গা জাতীয়তাবাদের পতাকা তুলে ধরলো। তাদের বক্তব্য, ‘আরাকান আমাদের, হাজার বছর ধরে আরাকান ভারতভূমি ছিল’।

আজ নব প্রজন্মের অনেক বাঙালিই মনে করেন রোহিঙ্গারা বাঙালি নয়। তারা রোহিঙ্গা ভাষায় কথা বলে। রোহিঙ্গা ভাষার সঙ্গে আধুনিক প্রামাণ্য বাংলার কোনও মিল নেই। এখনও সিলেট- নোয়াখালি-চট্টগ্রাম’ র গ্রামীণ মানুষদের ভাষা একটু লক্ষ করলেই বোঝা যায় বাংলা ভাষা কত বৈচিত্রময়। আরাকানবাসী বাঙালি মুসলমান মানুষরা আজ গৃহহীন দেশহীন হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একবিংশ শতকের এই পৃথিবীতে রোহিঙ্গাদের বেঁচে থাকার অধিকার আছে। সেই অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারকে একসঙ্গে সক্রিয় হতে হবে’।

ভাস্কর দেবনাথ নামের আরেকজন লিখেছেন, ‘সংখ্যালঘুর কোনও জাত নেই, রাষ্ট্র নেই, ধর্ম নেই! এক কথায় নেই রাজ্যের বাসিন্দা। সে নির্যাতিত, নির্যাতনই তার জীবনের একমাত্র পাওয়া। আমরা এমন এক সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে মানুষ গৌণ, রাষ্ট্র সমস্ত কিছুর নিয়ামক। ওরা বিশ্বাস করে, নির্যাতিত মানুষগুলোকে মারা যায়, পোড়ানো যায়! ’৪৭-এর দেশভাগের পর রাতারাতি নিজভূমে পরবাসী মানুষের যে ঢল নেমেছিল অন্য দেশে আশ্রয় নেওয়ার, তা আজও অব্যাহত। সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন সত্যিই অলীক বলে ঠেকে আজকাল! ইতিহাসে আরাকান রাজসভা কিন্তু অসাম্প্রদায়িকতার ছবিই তুলে ধরে! দৌলত কাজি, শ্রীচন্দ্র সুধর্মা, আলাওল, মাগন ঠাকুর— মিথ্যা হয়ে যাবে? রোহিঙ্গাদের এই সংকটে উপমহাদেশের বৃহৎ শক্তি হিসাবে ভারত সরকারের দায়িত্ব অনেক বেশি। কিন্তু এটা ভেবে কষ্ট হচ্ছে যে, ভারতে আশ্রিত চল্লিশ হাজার রোহিঙ্গাকে নাকি জোর করে ফেরত পাঠানো হবে! জেনেবুঝে ওদের যদি আমরা আগুনের মুখে ঠেলে দিই, তা হলে ‘অতিথি দেবতা’-র আদর্শ থেকে বিচ্যুত হব না?’

এখন রোহিঙ্গারাতো বিপদে পড়ে এসে কাউকে বলছে না যে আমাদের সাবেক দেশে আমাদের আবার আশ্রয় দাও। তাহলে এই বিপন্ন মানুষগুলোকে নিয়ে এত আদাজল খেয়ে বিরোধিতা কেন? তারা ইয়াবা ব্যবসায়ী? আপনাদের একজন এমপির নাম ‘ইয়াবা বদি’! তার গায়ে হাত দেওয়ার মুরোদ নেই বিপন্ন রোহিঙ্গাদের নিয়ে এত জোর দেখানো কি অক্ষমের আর্তনাদ? রোহিঙ্গারা নাকি জঙ্গি! এত জঙ্গি ধরা পড়ছে, হলি আর্টিজানের ঘটনায় আওয়ামী লীগ নেতার ছেলেও পাওয়া গেছে, রোহিঙ্গা জঙ্গি পাওয়া গেলো কোন ঘটনায়? এসব কথাবার্তার সঙ্গে মিয়ানমার নির্যাতক সরকারের পার্থক্য কোথায়? প্লিজ, রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশ অনেক মানবিক দায়িত্ব পালন করেছে এবং করছে। এসব শ্রদ্ধার কাজগুলোকে বেফাঁস মন্তব্যে পণ্ড করবেন না। আমার এক বন্ধু লিখেছেন রোহিঙ্গারা পাহাড় ধ্বংস করছে। বিপন্ন আশ্রয়হীন মানুষেরা আশ্রয়ের জন্যে এসেছে। তাদের প্রাথমিক মাথাগোঁজার ঠাই করা গেলে কি তারা অন্য কিছু করতো? বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীদের প্রথমে স্কুল কলেজে থাকার ব্যবস্থা করা হয়। পরে তাদেরকে স্থানান্তর করা হয় শরণার্থী ক্যাম্পে। পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে পাহাড়ি শরণার্থীরা যখন ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন তখন তাদেরও বছরের পর নানা ব্যবস্থায় রাখা হয়েছে। আমরা একটা শরণার্থী জাতি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর শেখ হাসিনা-রেহানাও জার্মানিতে-ভারতে শরণার্থীর মর্যাদায় ছিলেন। এসব যেন আমরা ভুলে না যাই। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে বলে আমরা দেশে ফিরে আসতে পেরেছি। ভারত অস্ত্র-ট্রেনিং দিয়েছে বলে আমরা পেরেছি। রোহিঙ্গাদের ভাগ্য বাংলাদেশিদের মতো প্রসন্ন না। তাদের সংগঠনগুলোকে কেউ সহায়তা দিচ্ছে না। উল্টো মিয়ানমার সরকারের সঙ্গে গলা মিলিয়ে সন্ত্রাসী বদনাম দেওয়া হচ্ছে! অথচ রোহিঙ্গাদের পেশা মূলত কৃষি। কৃষি শ্রমিক হিসাবেই তারা ওই অঞ্চলে গিয়েছিল। একদল বলছেন রোহিঙ্গারা পাকিস্তানের পক্ষে ছিল। সেটিতো ১৯৪৭-৪৮ এর কথা। গণভোটে সিলেটের অংশ পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়াতেইতো আজকের সিলেট বাংলাদেশে। একই গণভোটের কারণে সিলেটের আরেক অংশ আজ ভারতে। আমার এক বন্ধু রোহিঙ্গাদের কী করতে হবে না হবে সে রকম একটি ফর্মুলা দিয়েছেন। শরণার্থীদের আচরণবিধি জাতিসংঘ সনদেই বলা হচ্ছে। জীবন বাঁচাতে আমাদের যে সব ব্লগার ইউরোপের দেশগুলোতে গেছেন তাদের প্রথমে ক্যাম্পে রাখা হয়। প্রটেকশন হয়ে যাওয়ার পর স্বাধীনভাবে ক্যাম্পের বাইরে থাকতে পারছেন। ইউরোপে যারা গেছেন তারা দেশে ফেরার চিন্তা নিয়ে যাননি। দেশে ফেরাও তাদের জন্যে কঠিন। জার্মানিতে প্রটেকশন প্রাপ্তরা ১২ বছরের আগে দেশে ফিরতে পারবেন না। প্রটেকশন পাওয়ার পর অনেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে ভারত পর্যন্ত যাচ্ছেন।

রোহিঙ্গা যারা অস্ট্রেলিয়া এসেছেন তাদের অনেককে জাতিসংঘ উদ্ধাস্তু হাইকমিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ক্যাম্প থেকে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। মালয়েশিয়া-ইন্দোনেশিয়া থেকে যারা নৌকায় এসেছেন তারা অস্ট্রেলিয়ায় জলসীমায় ঢোকার পর তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর নিয়ে রাখা হয় ক্রিসমাস আইল্যান্ডের জেলখানায়। এদেশে যেহেতু কাউকে জেলখানায় রাখা অনেক ব্যয়বহুল তাই রোহিঙ্গাদের কমিউনিটি রিলিজে মুক্তি দিয়ে তিন-চার বছরের ভিসা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া দিয়ে বলা হয়েছে কাজ করে খাও। কাজ করে টাকাপয়সা জমিয়ে দেশে ফেরত যাও। কিন্তু প্রকৃত বাস্তবতা হচ্ছে অস্ট্রেলিয়া এই রোহিঙ্গাদের কোনোদিন বের করে দিতে পারবে না। কারণ তারা প্রকৃত শরণার্থী। তাদের কোনও দেশ নেই।

আমার আওয়ামী সমর্থক অনেক বন্ধু হয়তো মনে করছেন রোহিঙ্গা সমস্যা সরকারের চাপ বাড়াবে। সে কারণে তারা এখানে রোহিঙ্গাদের আশ্রয়ের চরম বিরোধী। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে জড়িত আটকে পড়া পাকিস্তানিদের একজনকেও কি পাকিস্তানে ফেরত পাঠাতে পেরেছেন? এখনতো কেউ আর তাদের নিয়েও বলেনওনা। রোহিঙ্গারা বাঙালি হওয়া ছাড়া বাংলাদেশের বিরুদ্ধে তাদের কোনও অপরাধ নেই। তাদের প্রতি মানবিক আচরণ দেখালে তাদের সমস্যাটি মানবিকভাবে হ্যান্ডেল করা গেলে এর একটি আন্তর্জাতিক ইতিবাচক ফলাফল আসতে পারে। নোবেল শান্তি পুরস্কারও আসতে পারে শেখ হাসিনার জন্যে।

আমার বিশ্বাস রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আন্তর্জাতিকভাবে নাড়া দেওয়ার ঘটনাটি মানবিক-বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে হ্যান্ডেল করা গেলে তা শেখ হাসিনার জন্যে বয়ে আনতে পারে নোবেল পুরস্কারের সম্মান। প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শকদের বিষয়টি ভেবে দেখার অনুরোধ করছি।

লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক

 

এসএএস

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ