উল্টোপথে চলছে গাড়ি!

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৫:০৪, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৪, সেপ্টেম্বর ২৭, ২০১৭

সালেক উদ্দিন২৪ সেপ্টেম্বর রাতে বাংলা ট্রিবিউন পড়ছিলাম। একটি খবরের শিরোনাম ছিল এমন, ‘উল্টোপথে চালিয়ে ধরা খেলেন মন্ত্রী-সচিবের গাড়িচালকরা’। এই খবরটিই আরও একটি পত্রিকার শিরোনাম হয়েছে। সেখানে লেখা– ‘উল্টো পথে গাড়ি, রাস্তায় নেমে আটকালেন দুদক চেয়ারম্যান’।
যে দেশে জায়গায় জায়গায় দুর্নীতি অবাধ বিচরণ সে দেশের দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যানের নিদ্রাহীন কাজ থাকে। এত কাজের মধ্যে কেনই বা দু’দকের চেয়ারম্যান ট্রাফিক ডিউটিতে নেমে গেলেন এই ভেবেই খবরটি ভেতরে চোখ রাখলাম। পড়লাম এবং দেখলাম এতে লেখা আছে, রাজধানীতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন সুগন্ধা সামনে হঠাৎ করেই দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ দাঁড়িয়ে গেলেন। তার উদ্যোগে পুলিশ সেখানে উল্টো পথে চলা গাড়ি ও মোটরসাইকেল আটকানো শুরু করলো। দুই ঘণ্টা ধরে চলল সেই অভিযান। এই দুই ঘণ্টায় উল্টো পথে চলার দায়ে যে ৫৭ টি যানবাহনকে মামলা ও জরিমানা করা হলো তার ৪০টিই সরকারি গাড়ি। এর মধ্যে রয়েছে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ এর গাড়ি। রয়েছে অনেক সচিবের গাড়ি, বিচারকের গাড়ি, সরকারি দলের নেতাদের গাড়ি, পুলিশের গাড়ি ও সাংবাদিকের গাড়ি।
শুধু তাই নয়, অভিযান চলাকালে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ ও নরসিংদী-২ আসনের কামরুল আশরাফ খানের গাড়িও আটকায় ট্রাফিক পুলিশ। মন্ত্রী ও সচিব তখন গাড়িতেই ছিলেন। এছাড়া অভিযুক্তদের মধ্যে ৭০ ভাগই ছিল সচিব ও যুগ্ম সচিবের গাড়ি। ছিল মোটরসাইকেল।

উল্টোপথে গাড়ি চলার দৃশ্য রাজধানীর মহল্লার রাস্তা থেকে ভিআইপি রাস্তা পর্যন্ত সব সময়ই দেখা যায়। জ্যামের কারণেই হোক আর অন্য কোনও কারণেই হোক মোটরসাইকেল আরোহীরা কখনোই কোনও সিগনাল মানে না। তারা জ্যামে পড়লে ফুটপাত দখল নেয়, ট্রাফিক পুলিশের নাকের ডগা দিয়ে সিগনাল বাতি অমান্য করে উল্টো রাস্তা ধরে ভোঁ ভোঁ করে চলে যায়। ট্রাফিক পুলিশকেও বলতে দেখা যায় না কিছুই। অবস্থা দৃষ্টে মনে হয় এটাই নিয়ম। উদাহরণ স্বরুপ বলতে পারি ওইদিনই

আমি এক পরিচিতের মোটরসাইকেলের পেছনে বসে ছিলাম। বড়সড় ধরনের ট্রাফিক জ্যামের মধ্যেও খুব দ্রুতই গন্তব্যে পৌঁছে যেতে পেরেছিলাম আমরা। আর অবাক হয়ে দেখছিলাম বন্ধু মোটরসাইকেল চালকের নিয়ম  ভাঙার দৃশ্য,  ট্রাফিক পুলিশেরও সেই নিয়ম ভাঙাকে নিয়ম বলে মেনে নেওয়ার দৃশ্য। তিনি জ্যামে উল্টোপথে চালিয়েছেন, লাল বাতিতেও ঝড়ের গতিতে সিগনাল পার হয়েছেন, সময়ে সময়ে ফুটপাতের ওপর দিয়ে রেসিংকারের গতিতে চলার পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। বন্ধুটির মোটরসাইকেল চালানোর অনিয়মের নিয়ম দেখে এতই ভয় পেয়েছিলাম যে, তখনি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আর কখনোই মোটরসাইকেলের পেছনের আরোহী হবো না। অবশ্য তখন একবার এটাও ভেবেছিলাম যে, তাহলে তো রিকসা-সিএনজিতেও ওঠা যাবে না। এরাও তো একই কাজ করে। পার্থক্য এটুকুই যে, ওদেরকে ট্রাফিক পুলিশ থামায়। রিকসা চালককে চড় থাপড় মারে, সিএনজি ড্রাইভারকে মামলা দেয় আর  মোটরসাইকেল চালককে কিছুই বলে না। এসময় একবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে যেতে মন্ত্রী মহোদয়দের গাড়ি পুলিশ প্রহরায় উল্টো রাস্তায় চলার দৃশ্যও মনে পড়েছিল। এমন দৃশ্য ট্রাফিক পুলিশের মতো অত না হলেও আমি বহুবার দেখেছি। তবে একটুও অবাক  হইনি। কেন অবাক হইনি সে কথা বলতে হলে বলতে হয়, ওই ট্রাফিক পুলিশের মতো আমিও ধরে নিয়েছি যে, গাড়ির মধ্যে যারা আছেন তারা জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং আইনের প্রবর্তক। আইন ভাঙার সাহসতো তাদের থাকতেই পারে!  

আজ যে সব গাড়ি চালক রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন সুগন্ধার সামনে উল্টোপথে গাড়ি চালিয়ে দু’দুকের চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সাহেবের হাতে ধড়া পড়েছেন, তারাতো আর শুধু আজকেই নিয়ম ভাঙেনি তারা বহুকাল ধরেই মন্ত্রী মহোদয়দের নিয়ে পুলিশ প্রহরায় উল্টোপথে গাড়ি চালিয়ে অভ্যস্ত। অনিয়মই তাদের কাছে নিয়ম। আজ তারা বিরক্ত হচ্ছে এই ভেবে যে, দু’দক চেয়ারম্যান এসে যত না ঝামেলা বাঁধালেন!

শুধু আজকের দিনেই নয় প্রতিদিন ঢাকা শহরে এরকম হাজার হাজার গাড়ি উল্টোপথে চলে। তাদেরকে কেন উল্টো পথে চলতে হয়? কেন নিয়ম ভাঙতে হয়? এই প্রশ্নের একটিই জবাব তা হলো- ঢাকায় তীব্র যানজট। এই যানজট আজকের নয় দীর্ঘদিনের। এ নিয়ে অনেক জন অনেক কথাই বলেছেন। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। গত ১৯ জুলাই রাজধানীর একটি হোটেলে দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছিল বিশ্ব ব্যাংক। সেই সম্মেলনে যেসব তথ্য উপস্থাপিত হয় তা এইরকম– ‘যানজটে ঢাকায় দিনে ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। এতে দেশের আর্থিক ক্ষতি হয় প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। ঢাকায় ঘণ্টায় গড়ে মাত্র ৭ কিলোমিটার গতিতে যানবাহন চলে। এভাবে চলতে থাকলে আর কিছুদিন পর হেঁটেই গাড়ির আগে গন্তব্যে পৌঁছবে মানুষ’। বিশ্ব ব্যাংকের আশঙ্কা, পরিস্থিতি দিন দিন যে ভাবে খারাপ হচ্ছে তাতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরো বাড়বে। এভাবে একসময় ঢাকা শহর অচল হয়ে পড়বে।  
এক জরিপে দেখা গেছে ঢাকার মোট আয়তনের ৬ ভাগ মাত্র রাস্তা। অথচ আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী একটি শহরের রাস্তা ২৫ থেকে ৩০ ভাগ থাকার কথা।
অনেকের মতে দেশের সকল সরকারি বেসরকারি সংস্থার প্রধান কার্যালয়সহ মানুষের অত্যাবশ্যকীয় সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দু এই মহানগরী হওয়ায় ঢাকা যানজটের মহানগরীতে পরিণত হয়েছে। তারা মনে করেন এইসব অফিসের অধিকাংশই বিভিন্ন বিভাগীয় শহরের স্থানান্তরের মাধ্যমে ঢাকার যানজট অনেকাংশে কমানো যেতে পারে।

কেউ বলছেন ঢাকা থেকে রিকসা সিএনজি অটোরিক্সা ও লক্কর ঝক্কর বাস উচ্ছেদ অপরিহার্য। যান চলাচলের জন্য এখানে শুধু প্রাইভেট কার এবং উন্নত মানের আধুনিক এসি বাস রাস্তায় থাকবে। নির্ধারিত বাসস্ট্যান্ড থাকবে, কারপার্কিং থাকবে, নোপার্কিং- ইয়েস পার্কিং ব্যবস্থা থাকবে। আর এসব হলেই ঢাকার যানজট অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

কেউ বলছেন রাস্তায় অধিক গাড়ি চলাচল বন্ধ করতে গাড়ি ক্রয় নীতিমালা নির্ধারণ করতে হবে। যানজট সহনীয় মাত্রায় আনতে স্বল্প গতির যানবাহন ও প্রাইভেট কারের সংখ্যাধিক্যের দিকে নজর দেওয়া দরকার। কারও মতে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘিত হয় বলেই রাজধানীতে এমন অসহনীয় যানজট। তারা মনে করেন ট্রাফিক আইন যাতে সব ক্ষেত্রেই কড়াকড়িভাবে মানা হয় সে ব্যাপারে যত্নবান হতে হবে।

কারো কারো মতে, নগরীর ব্যস্ততম এলাকায় প্রাইভেট কার চলাচলের ক্ষেত্রে কনজেশন চার্জ আরোপ করতে হবে। প্রাইভেট কারের পরিবর্তে পাবলিক পরিবহনের ব্যবস্থা করতে হবে। কেউ বলেন, জোর নম্বরের এবং বেজোড় নম্বরের গাড়িগুলো রাজধানীতে ভিন্ন ভিন্ন দিনে রাস্তায় নামার ব্যবস্থা করলে যানজট কমতে পারে।

গুণীজনদের উপরোক্ত কথাগুলো পালন করলে হয়তো ঢাকা শহরের যানজটের সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু এর কোনোটিই রাতারাতি করা সম্ভব নয়। এর সবই দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা।

তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায় ঢাকা শহরের যানজট এই মুহূর্তে সহনীয় পর্যায়ে আনা যায় কিভাবে? এর একটিই উত্তর হতে পারে তা হলো, চালকদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে বাধ্য করা। দু’দকের চেয়ারম্যান মহোদয়ের প্রতিশ্রদ্ধা রেখেই বলছি, ২৪ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন সুগন্ধার সামনে উলটো পথে গাড়ি চালকদের বিরুদ্ধে তিনি দাঁড়িয়ে থেকে ট্রাফিক পুলিশ দিয়ে যে অভিযান চালিয়েছেন সেটা কোনও সমাধান নয়। শুধু তিনি একা নন সব মন্ত্রী যদি মাঝেমধ্যেই রাজধানীর একেকটি রাস্তায় দাঁড়িয়ে এমন অতিরিক্ত দায়ীত্ব পালন করেন তবুও উল্লেখযোগ্য কোনও লাভ হবে বলে মনে হয় না। এটা সম্ভব হবে তখনি যখন ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের জন্য কঠিন আইন প্রণয়ন করা যাবে এবং তার প্রয়োগের বিষয়টি এক’শ ভাগ নিশ্চিত করা যাবে।    

প্রসঙ্গক্রমে এশিয়ার একটি দেশ মালয়েশিয়ার একটি ঘটনা বলছি। রাতে কুয়ালালামপুর থেকে ট্যাক্সি যোগে সানওয়েতে ফিরছি। রাত গভীর। একটি ট্রাফিক রেড সিগনাল এসে দাঁড়ালো আমার ট্যাক্সি। চারিদিকে একটি গাড়িও নেই তবুও গ্রিন সিগনাল আসার আগে ড্রাইভার ট্যাক্সিকে একচুল মুভ করালেন না। পরে জানলাম এদেশে কোনও গাড়ি চালক ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করে না। কারণ একটিই তা হলো, এখানে ট্রাফিক সিগনালসহ রাস্তার বাঁকে বাঁকে ক্যামেরা স্থাপিত আছে এবং সিগনাল ব্রেকসহ যেকোনও ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করার সঙ্গে সঙ্গে গাড়ির  ছবিসহ  মামলা হয়ে যায়। আর সেই মামলার দণ্ডের পরিমাণ অনেক বেশি। কমপক্ষে ১০০০ রিঙ্গিত যা আমাদের হিসেবে ২০,০০০ টাকা। সেখানে শহর এলাকার প্রায় সবারই গাড়ি আছে এবং কেউই এই দণ্ডের ভয়ে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন করে না। ভুলে লঙ্ঘিত হয়ে গেলে মাথা চাপড়ায়।

আমাদের দেশেও এমনই ট্রাফিক ব্যবস্থার এখনই প্রবর্তন দরকার।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

এসএএস

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ