আমাদের শিক্ষা ও সিন্ডিকেটমুক্ত জার্নালের স্বপ্ন!

Send
তপন মাহমুদ
প্রকাশিত : ১৮:৩৮, অক্টোবর ০৯, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৪৭, অক্টোবর ০৯, ২০১৭

তপন মাহমুদশিল্প-সাহিত্যের জগতে আইডিয়া ও লেখা ‘চুরি’র ইতিহাস বেশ পুরনো। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও এর থেকে মুক্ত ছিলেন না বলেও কেউ কেউ লিখেছেন। প্রমথনাথ সেনগুপ্ত নামের এক লেখক তার ‘আনন্দরূপম’ বইয়ে দাবি করেছেন, বিশ্বপরিচয় নামে রবীন্দ্রনাথের যে বইটা আমরা পাই, তার মূল লেখাটা তারই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই লেখার ভাষাগত বিষয়টা সম্পাদনা করতে করতে শেষে নাকি দাবিই করেই বসলেন তার নামে বইটা ছাপানো উচিত। শেষ পর্যন্ত তাই হয়েছিল। প্রমথসেন লিখেছেন, ‘গ্রীষ্মের ছুটির পর গুরুদেব আলমোডা থেকে ফিরে এসে একদিন সন্ধ্যার সময় ডেকে পাঠালেন। উত্তরায়নে গিয়ে দেখি ক্ষিতিমোহন বাবু ও শাস্ত্রীমশায়ের সঙ্গে তিনি কথা বলছেন। আমাকে পাশে বসালেন, কুশল প্রশ্ন করলেন। তারপর বললেন, দেখো বিশ্বপরিচয় লিখতে লিখতে দেখলুম এর ভাষাটা আমারই হয়ে গেছে, তাই এর মধ্যে তোমাকে কোথাও স্থান দিতে পারলুম না। একটু থেমে বললেন, অবশ্য তুমি শুরু না করলে আমি সমাধা করতে পারতুম না। তাছাড়া বিজ্ঞানের অনভ্যস্ত পথে চলতে চলতে শেষপর্যন্ত এই অধ্যাবসায়ীর সাহসে কুলাতো না। তুমি ক্ষুণ্ন হয়ো না।’ (সূত্র: ফরিদ আহমেদ  ও অভিজিৎ রায়: ২০১১, রবিঠাকুর, রাহাজানি এবং রবীন্দ্র পূজারীবৃন্দ)
সাহিত্যজগতে রবীন্দ্রনাথ অনেক বড় বৃক্ষ বলে ঝাপটাটা তার ওপর দিয়ে একটু বেশিই যায়। তাকে নিয়ে অনেক ধরনের গবেষণা হয়। তাই বলে ছোট ছোট তৃণ-গুল্মরাও যে বুদ্ধিবৃত্তিক চুরি থেকে মুক্ত তা নয় মোটেও। নকলের বা অন্যের কাজ নিজের বলে চালিয়ে দেওয়া শিল্প-সংস্কৃতি-সাহিত্য দুনিয়ায় নতুন কিছু নয়। আমরা স্বীকৃতি না দিয়ে কোনও লেখকের গল্প বা উপন্যাস থেকে নাটক বা সিনেমা বানিয়ে ফেলি। গানের কথা থেকে সুর হবহু নকল করতে আমাদের হাত-পা কাঁপে না মোটেও। শিল্প চর্চার নামে আমরা আসলে শিল্পের ‘চচ্চরি’ করে ফেলি। বলা যায় আসলের চেয়ে নকলেই আমরা বেশি সৃজনশীল।
তো, একাডেমিক গবেণণায় যে এর প্রভাব থাকবে না তা কি করে হয়? ‘যষ্মিন দেশে যদাচার’ বলে কথা। তবু আমরা আশা করি, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যারা পড়ান এবং পড়েন, তাদের নৈতিক অবস্থানটাও একটু উঁচু হতে হয় বৈকি! কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ গবেষণা হয়, শুধুমাত্র পদন্নতি বা উচ্চ পদে যাওয়ার একটি উপায় হিসেবে। তাই কী নিয়ে গবেষণা হলো, তা কতটুকু গবেষণা হয়ে উঠলো, তার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়ায় গবেষণাটা কোথায় না কোথাও ছাপা হলো কিনা। এজন্য কত ধরনের তদবির  হয় তা ভুক্তভুগী মাত্রই জানেন। তবে হ্যাঁ, তদবির ছাড়াও অনেক লেখা ছাপানো হয়। অনেক ভালো ভালো মানের মৌলিক গবেষণাও বাংলাদেশে হয়।
যেকোনও গবেষণার প্রধান উদ্দেশ্য হলো নতুন জ্ঞান তৈরি করা এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে এর প্রয়োগ। এটা আমাদের সমাজ বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের জ্ঞান চর্চায় ভূমিকা রাখে। কিন্তু যখন আমরা গবেষণাকে এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গিতে না দেখে কেবল ‘পদন্নতির পয়েন্ট’ হিসেবে বিবেচনা করি তখনই আসলে বিপদটা শুরু হয়। তখন আমরা স্রেফ একটা ছাঁচে ফেলে ( মানে গবেষণার নিয়মটা মেনে) কোনোমতে গবেষণাটা শেষ করেই বাঁচি। ফলে কখনও কখনও তাড়াহুড়োতে আবার কখনও তথ্য বা জ্ঞানের ঘাটতি মেটাতে কোনোমতে অন্যের বক্তব্য, তথ্য বা মন্তব্য নিজের নামেই চালিয়ে দেওয়া হয়।
গবেষণা নিয়ে কিছু সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গি আছে আমাদের দেশে। যেমন অনেককেই বলতে শুনেছি, বিশেষত যারা কখনও একাডেমিক গবেষণামুখী হননি, বিভিন্ন লেখা বা গবেষণা থেকে বক্তব্য বা মতামত নিয়ে নিজের একটা মতামত দিলেই গবেষণা হয়ে গেলো।
কিন্তু গবেষণায় এটা যথেচ্ছ করার কোনও সুযোগ নেই। একটা নির্দিষ্ট পরিমাণেই (কারও কারও মতে এটা ২০-৩০ শতাংশের মধ্যে থাকাই ভালো, তবে সুনির্দিষ্ট কোনও গাইডলাইন নেই) অন্য গবেষণা বা গবেষকদের উদ্বৃত করা যায়। বড় অংশেই গবেষক বা গবেষকদের বক্তব্য, মতামত, তথ্য বিশ্লেষণ ও ফলাফল থাকতে হয়।
তবে এটা সত্যি যে, একটা গবেষণায় সবচেয়ে বিরক্তিকর কাজ হলো রেফারেন্সিং বা সাইটেশন করা, অন্তত আমার কাছে। কারণ অনেক নিয়ম পদ্ধতি মেনে এটি করতে হয়। এই কারণে অনেকেই একাডেমিক গবেষণা করতে পছন্দ করেন না। তবে তার মানে এই না যে, যেসব গবেষণা করেছি (বা ভবিষ্যতে করবো) তাতে রেফারেন্সিং ঠিকভাবে করিনি (বা করবো না)। আমি বরং অন্যের চেয়ে নিজের তথ্য বা বিশ্লেষণটাই বেশি হাজির করতে পছন্দ করি। আমার মনে আছে, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে একটি কোর্সের অ্যাসাইনমেন্ট হিসেবে করপোরেট হেজিমনি নিয়ে গবেষণা করে সর্বোচ্চ মার্কস পেয়েছিলাম (৩ জন সমান মার্কস পেয়েছিলাম) যার মূল কারণ হিসেবে স্যার বলেছিলেন, ‘এই গবেষণাধর্মী লেখাটায় তোমার নিজস্ব বিশ্লেষণ ও মতামত ছিল বেশি, শুধুমাত্র অন্যের কথা কোট করা হয়েছে এমন হয়নি’।
শুনেছি (সত্যতা জানি না, কিন্তু কথ্য ইতিহাসেরও তো গুরুত্ব আছে) খোদ আব্দুর রাজ্জাক স্যার, যিনি বিশ্ববিখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড লাস্কির অধীনে পিএইচডি ডিগ্রি প্রায় শেষ করে ফেলেছিলেন, কিছু রেফারেন্সিং/ফুটনোট দেওয়া নিয়ে বিরক্ত হয়ে শেষ পর্যন্ত ফাইনাল কপিই জমা দেননি। অবশ্য অন্য কারণ ছিল, এর আগে স্বয়ং লাস্কি সাহেব দুনিয়া ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। এরপরও তিনি শেষ করতে পারতেন। কিন্তু করেননি। রাজ্জাক স্যারের নাকি ধারণা ছিল তার এই গবেষণা লাস্কি ছাড়া অন্য কেউ মূল্যায়ন করতে পারবেন না। অথবা তার কাছে মনে হয়ছে, পিএইচডির চেয়ে লাস্কির সঙ্গে কাজ করাটাই বড় ছিল। আর তিনিই সেই বিরল শিক্ষক যিনি কখনও পদন্নতির জন্য আবেদন করেননি। এজন্যই স্যার কোনও একাডেমিক গবেষণা ও ডিগ্রি ছাড়াই চলতে পেরেছেন। কিন্তু একজন জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান শিক্ষক হিসেবে তাকে সবাই মানত ও শ্রদ্ধা করতো। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক জাতীয় অধ্যাপক পদে সম্মানিত হন এবং ভারতের দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক পিএইচডি ডিগ্রি পান। (সূত্র: আহমদ ছফার ‘যদ্যপি আমার গুরু’, বাংলাপিডিয়া এবং বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের আড্ডা)
রাজ্জাক স্যারের গল্পটা এভাবে করার আরেকটা কারণ হলো, এটা বলা যে, একাডেমিক গবেষণা ছাড়াও জ্ঞানী ও প্রজ্ঞাবান শিক্ষক হওয়া যায়। পাশ্চাত্যের জ্ঞান কাঠামোর বাইরেও যে জ্ঞান চর্চা হতে পারে, জ্ঞান উৎপাদন হতে পারে, তারও উদাহরণ তিনি। কিন্তু ‘পরের জ্ঞানে পোদ্দারি’ মূলক গবেষণা করে কেবল বিতর্কিত ও নিন্দিতই হওয়া যায়।
একাডেমিক গবেষণা নিয়ে হঠাৎ এসব আলোচনার বড় কারণ ‘প্লেজারিজম’ এর দায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষকের বিরুদ্ধে খোদ বিশ্ববিদ্যালয়ই তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় বেশ ঝড়ও চলছে। যারা কোনোদিন গবেষণা নিয়ে ভাবেননি পর্যন্ত, তারাও দু’চার কথা বলতে ছাড়ছেন না।
তবে সত্যিটা এই যে, অপরের জ্ঞান নিজের/নিজেদের বলে চালিয়ে দেওয়া (যেটাকে একাডেমিক ভাষায় বলে প্লেজারিজম) খুব অনৈতিক কাজ। কখনও কখনও ‘অ্যাকসিডেন্টাল প্লেজারিজম’ হয়ে যেতেই পারে। তার জন্য সহজে ক্ষমাও পাওয়া যায়। কিন্তু পাতার পর পাতা লেখা কোনও ধরনের সোর্স ছাড়া ব্যবহার করা একদম দণ্ডনীয়। এ ধরনের কাজ একজন শিক্ষকের ‘অ্যাকাডেমিক ইন্টিগ্রিটি’ নষ্ট করে দেয়। তবে, এ প্রসঙ্গে আমি ভিন্ন দুটি প্রসঙ্গ তুলতে চাই।
এক. আমাদের দেশে যে কেবল গবেষকরাই ভুল করেন তা নয়। তারাই কেবল দায়ি নয়। যেসব জার্নালে এসব ছাপা হয় তাদেরও অভিযোগের আওতায় আনা উচিত। কারণ এসব জার্নাল গবেষণা প্রবন্ধ ছাপার আগে ঠিকমতো রিভিউ করে না বলেই এমনটি ঘটে। তার দায় কে নেবে? প্লেজারিজমের কারণে যে শুধু গবেষকদেরই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে তা নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নাল ও সর্বোপরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামও নষ্ট হয়েছে। এ বিষয়টিকেও আগামী দিনের গবেষক ও জার্নাল কমিটির বা সম্পাদনা পর্ষদেরও স্মরণে রাখতে হবে।
দুই. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও ছাত্র বিবেচনায় জার্নালের সংখ্যা হাতে গোনা কয়েকটি। অনেক পুরনো বিভাগ আছে, দীর্ঘদিনেও যাদের কোনও একাডেমিক জার্নাল নেই। অথচ ঢাকার বাইরে অবস্থিত অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বিভিন্ন বিভাগ থেকে ভালো মানের কিছু জার্নাল বের হয়। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞানের জন্য যে অল্প কয়েকটি জার্নাল বের হয়, তাও আসলে একটি সিন্ডেকেট। এখানে লেখা ছাপানো রীতিমতো যুদ্ধ। আর সেই যুদ্ধে নবীন কোনও গবেষককে প্রভাবশালী কোনও সিনিয়র শিক্ষককে খুঁজতে হয়। অল্প-সল্প ব্যতিক্রম বাদ দিলে বড়রা ছোটদের লেখায় নাম বসিয়ে দেন। সেক্ষেত্রে তারা ঠিকমতো দেখেন কিনা সন্দেহ। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সম্প্রতি এমন ঘটনায় জুনিয়র ( কো-অথর) গবেষকের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে আবার খালাস পাওয়ার চেষ্টা করছেন প্রভাবশালী সিনিয়র গবেষক। তাই আমার কাছে মনে হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জার্নালগুলোতে যে সিন্ডিকেট আছে তা ভাঙাটা সবার আগে জরুরি। একই সঙ্গে, পেশাদারিত্বটা ফিরিয়ে নিয়ে আসা খুব দরকার। অর্থাৎ ভালো প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ভালো গবেষণা খুঁজে ছাপানোর চেষ্টা করতে হবে। তাতে যেমন জার্নালের মান বাড়বে, তেমনি সুনাম বাড়বে বিশ্ববিদ্যালয়ের। লাভ হবে যারা প্রকৃতই গবেষণা করতে চায় তাদের। আর আম-গবেষকরাও গবেষণায় একটু উৎসাহ পাবে।
অতএব, সম্প্রতি জার্নালে ‘কপি-পেস্ট’ ঘটনাটি সবার জন্যই একটা বড় শিক্ষা। অবশ্যই এর জন্য একাডেমিক জায়গায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশকে মূল্য দিতে হচ্ছে। কিন্তু ভালো এটাই হবে, যদি আমরা এর থেকে শিক্ষা নিতে পারি। কারণ এটা যে খুব গুরুতর অপরাধ এবং এটা করে যে আদতে পার পাওয়া যায় না, সেটাও জানা হতো না অনেকের। আমাদের আরও মনে রাখতে হবে,  আমাদের দেশে গবেষণাকে যথেষ্ট গুরুত্ব না দিলেও পশ্চিমা বিশ্বে একাডেমিক জায়গায় গবেষণাকে বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই নেওয়া হয়। তাই সেখানকার কোনও আর্টিকেল থেকে মন্তব্য বা তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে তার সোর্স উল্লেখ না করলে ‘ধরা খাবার’ প্রবল সম্ভাবনা আছে কিন্তু। আর সর্বোপরি সততার ব্যাপারে একজন শিক্ষকের ন্যূনতম ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। না হলে যে, আমাদের মুখ লুকানোর জায়গা থাকবে না।

লেখক: জ্যেষ্ঠ প্রভাষক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ

এসএএস

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ