আমাদের শহরে এসেছে মেয়েটি

Send
শান্তনু চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৫:০৩, অক্টোবর ১২, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৭, অক্টোবর ১২, ২০১৭

শান্তনু চৌধুরীবড় শহরে প্রতিদিন মানুষ আসে। হাজার হাজার মানুষ। পুরো দেশ থেকে, দেশের বাইরে থেকে। কেউ আসে জীবিকার তাগিদে। কেউ আসে জীবন সাজাতে। কেউ আসে ঘরবাড়ি হারিয়ে। কেউবা বেঁচে থাকার অবলম্বন খুঁজে নিতে। ঢাকা শহর বিশাল শহর। মানুষ আসছে, মানুষ যাচ্ছে। কিন্তু স্বস্তি কোথায়। মানসিক চাপে পড়ে যেন আমরা ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছি। লোপ পাচ্ছে বিবেক-বুদ্ধি আর বিবেচনা। অবৈধ, বিকৃতি আর অপরের আনন্দ কেড়ে নিয়ে বিপদের মুখে ঠেলে দেওয়াই যেন আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য। অন্যের জীবনকে কঠিন করে দেওয়াই যেন একমাত্র কাজ। এর কারণে প্রতিদিন ঘটছে বিকৃত যৌন উল্লাস। সম্ভ্রম হারানোর ঘটনা। যেমনটি ঘটেছে টাঙ্গাইল থেকে আসা এক কিশোরীর বেলায়। সে এসেছিল এই শহরে। কিন্তু জানতে না শহরের হালচাল। বিশ্বাস করেছিল প্রেমিক নামধারী পুরুষকে। বিশ্বাস করেছিল কয়েকজন যুবককে।
রাজধানীর মিরপুর শাহ আলী কমপ্লেক্সের রাস্তার পাশ থেকে রক্তাক্ত ওই কিশোরীকে উদ্ধার করা হয়। মেয়েটি পুলিশকে জানিয়েছে, কয়েকজন যুবক একটি আবাসিক হোটেলে নিয়ে ধর্ষণ করার পর তাকে সেখানে ফেলে রেখে যায়। মেয়েটির অপরাধ ছিল সে তার প্রেমিকাকে বিশ্বাস করেছিল। তার কথায় ঘর ছেড়ে এসেছিল দেখা করতে। বিয়ে করার কথা ছিল। নিয়ে এসেছিল স্বর্ণালঙ্কারও। কিন্তু মেয়েটি হয়তো জানতো না এখন আর প্রেমিক নেই। সব পশু। তাই ছেলেটি কিশোরীর কাছ থেকে সবকিছু কেড়ে নিয়ে বাড্ডা এলাকায় একটা জায়গায় বসতে বলে চলে যায়। আর ফিরে আসেনি। এরপর এক যুবক এসে গাজীপুরে তার এক দূর সম্পর্কের দুলাভাইয়ের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে তাকে হোটেলে নিয়ে ধর্ষণ করে।

মেয়েটিকে যখন ওই ধর্ষকরা ফেলে যায় তখন হয়তো কেউ লক্ষ্য করেনি। কিন্তু এরপর শতশত জনতা তাকে ঘিরে রেখেছে। কেউ কেউ হয়তো আহ্-উহ্ করে সহানুভূতিও প্রকাশ করেছে। স্মার্ট ফোনে ছবি তুলেছে। ফেসবুকে আপলোড দিয়েছে। কিন্তু কারো এই আগ্রহটা জাগেনি তাকে হাসপাতালে নিয়ে সুস্থ করতে হবে। কিংবা থানায় খবর দিতে হবে। সেটি জেগেছিল এক নিরাপত্তারক্ষীর। তিনি আর দশজনের মতো তাকিয়ে না থেকে প্রথমে স্ত্রীকে ডেকে আনেন। পরে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসা না দিলে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানেও চিকিৎসা না দিলে পরে ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে ভর্তি করানো হয়।

এটি কোনও নতুন ঘটনা নয়। রাজধানীতে বা দেশের আনাচে কানাচে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে প্রতিদিন। অনেক ঘটনা নানা কারণে জানতে পারা যাচ্ছে না। গেলো এক সপ্তাহে রাজধানী, গাজীপুর, নোয়াখালী, ফরিদপুরে যে ধরনের ধর্ষণের খবর পত্রিকার পাতায় এসেছে তাতে বেশিরভাগই বিকৃত মস্তিস্কের ফল বলে মনে হয়েছে। কেউ দলবেঁধে, রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে, কেউবা স্বজনকে, পালিত কন্যাকে ধর্ষণের ঘটনা ঘটিয়েছে। কেন এসব ঘটছে? আমরা কি ক্রমে সামাজিক দায়বদ্ধতা বা শৃঙ্খল থেকে সরে যাচ্ছি। আমরা কেন অনুভব করতে পারছি না এসব ঘটনা ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সামাজিক বা রাষ্ট্রীয়ভাবেও প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে শিশু (ছেলে-মেয়ে উভয়ই) ধর্ষণের ঘটনা ক্রমাগত বাড়ছে। বেসরকারি আন্তর্জাতিক সংগঠন অ্যাকশন এইড বলছে, বাংলাদেশে শতকরা ৫০ ভাগ নারী মনে করেন, মার্কেটে বাজারে তারা অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ বা এ ধরনের ঘটনার শিকার হন। হাসপাতালে গিয়ে ৪২ শতাংশের বেশি নারী সেবা প্রদানকারীদের কাছ থেকে দুর্ব্যবহারের শিকার হন। ৩০ ভাগ নারী পুলিশ স্টেশনে উত্ত্যক্তের শিকার হন। শতকরা ৩৫ ভাগ নারী শারীরিক নির্যাতনের শিকার বলেও উল্লেখ করা হয়। নারী নির্যাতন সম্পর্কে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নতুন রিপোর্ট বলছে, বিশ্বের প্রায় এক তৃতীয়াংশ নারী যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন অহরহ। এছাড়া বিশ্বের মোট নারীর ৭ শতাংশ জীবনের যে কোনও সময় ধর্ষণের শিকার হয়েছেন।

মনে হতে পারে এ ধরনের ধর্ষণের ঘটনা শুধু বাংলাদেশে ঘটছে তা নয়। উন্নত বিশ্বেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। আমাদের দেশে যেটা সবচেয়ে বেশি ভয়ংকর তা হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এ পর্যন্ত ধর্ষক উপযুক্ত শাস্তি পেয়েছে এমন উদাহরণ হাতে গোনা। জামিন অযোগ্য অপরাধ করেও অনেকে জামিন পেয়ে যাচ্ছে। অনেক দেশে এসব অপরাধের বিচার দ্রুত বিচার আইনের সাহায্যে করা হয়। অপরাধ করে যদি জামিন পেয়ে যায় তবে অপরাধের মাত্রা বাড়বে সেটাই স্বাভাবিক। আবার ধর্ষিতা বা তার পরিবার চান না সামাজিকভাবে হেয় হতে। যেহেতু আমাদের সমাজে ধর্ষক মাথা উঁচু করে ঘুরে আর ধর্ষিতা ঘুরে দাঁড়াতে চাইলেও তার পাশে কেউ দাঁড়ায় না। পাশাপাশি অনেকে জানেন না কোথায় অভিযোগ করতে হয়। ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীও অনেক সময় মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বুঝতে পারেন না কী করবেন। নিজেকে হয়তো অসহায় লাগে। এ সময় পাশে কারও দাঁড়ানোটা জরুরি। ধর্ষণের পর একা না থেকে কারো সঙ্গে কথা বলা। গোসল, খাওয়া, ধূমপান, বাথরুমে যাওয়ার আগে, অর্থাৎ ধর্ষণের চিহ্ন মুছে না যাওয়ার আগে ডাক্তারি পরীক্ষা করানো প্রয়োজন।

আমাদের দেশে দেখা গেলো প্রথমত একেকটা ঘটনা ঘটে, তারপর গণমাধ্যমসহ সব জায়গায় তুমুল আলোচনা হয়। তারপর আরেকটি ঘটনা ঘটে আগেরটাকে ঢেকে ফেলে। এ সময়ের মধ্যে হয়তো অনেক ঘটনায় ধামাচাপা পড়ে যায়। ঘটনা যাতে ঘটতেই না পারে, সে জন্য প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন। তাছাড়া অনেকের মানসিকতায় এখনও মধ্যযুগীয় রয়ে গেছে। অনেকে এখনও মনে করেন ধর্ষণের জন্য নারীর পোশাকও দায়ি। এ ধরনের চেতনা পরিহার করতে হলে ছোটবেলা থেকেই সেভাবে গড়ে তুলতে হবে। পাঠ্যপুস্তকে বিষয়টি গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু মুশকিল হলো পাঠ্যপুস্তক প্রণেতা থেকে শুরু করে প্রশ্নকর্তারা এমন সব প্রশ্ন করেন যা মেয়েদের পোশাকের কারণেই ধর্ষণকে ইঙ্গিত করে। মূল্যবোধের অবক্ষয়, পর্নোগ্রাফির প্রতি আসক্তি, দরিদ্রতার সুযোগ নিয়েও ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। যেমনটি রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে ঘটছে বর্তমানে।

ফেসবুকে সামান্য পরিচয়ের সূত্র ধরে অনেকে সহজে মেলামেশা করেন। সে থেকেও অঘটন ঘটছে। বিভিন্ন টিভি চ্যানেল বিশেষ করে পাশের দেশের অনেক টিভি চ্যানেলের নাটক ও সামাজিকভাবে আমাদের ওপর প্রভাব ফেলছে। এসব প্রতিকারে এগিয়ে আসতে হবে। নজর দিতে হবে পরিবার থেকে। যাতে করে ছেলে-মেয়েরা সুস্থ স্বাভাবিক জীবন-যাপন করে বেড়ে উঠতে পারে। অসৎ সঙ্গে যেন সর্বনাশ না হয়। শহরের রেস্টুরেন্ট, হোটেল, মোটেল থেকে শুরু করে কোনও বাসাবাড়ির প্রতি সন্দেহ হলেও এ বিষয়ে নজর দিতে হবে স্থানীয় প্রশাসনকে। ধর্ষিতা নারীকে শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার শিকার হতে যাতে না হয় সে সম্পর্কেও সচেতন হতে হবে। ডাক্তারি বা মনস্তাত্বিক সাহায্য ছাড়াও প্রয়োজন পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও সমাজের বন্ধুবৎসল আচরণ। ধর্ষকের মাথা থেকে জন্ম হয় লালসার। মগজ থেকে সে চিন্তা দূর করার উপায় বের করতে হবে। সুস্থ স্বাভাবিক জীবন ও চিন্তামুক্ত মন যে প্রশান্তি এনে দিতে পারে এবং সমাজকে সুন্দর করতে পারে তা বোঝাতে হবে। সামাজিক সম্পর্কগুলোকে ঝালিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি নিজেকেও সমৃদ্ধ করতে হবে। তবে প্রাথামিকভাবে শিক্ষার পাশাপাশি প্রয়োজন শাস্তির দৃষ্টান্তও।

লেখক: সাংবাদিক ও সাহিত্যিক

shantanu.reporter@gmail.com

এসএএস

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ