আশ্বাসে বিশ্বাস নেই!

Send
সালেক উদ্দিন
প্রকাশিত : ১৫:০৮, অক্টোবর ৩১, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:২০, অক্টোবর ৩১, ২০১৭

সালেক উদ্দিনমিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি’র সঙ্গে ২৫ অক্টোবরের বৈঠকের পর বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে কাজ করছে মিয়ানমার। তিনি বলেছেন অং সান সু চি নিজেই এই কথাটি বলেছেন। এটা নিঃসন্দেহে একটি ভালো খবর। শুধু তাই নয় এর পাশাপাশি জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বে গঠিত আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নে মিয়ানমার সম্মত হয়েছে বলেও গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছিল।
খবর দুটি সত্য হলে মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশের রোহিঙ্গাদের জীবনের অন্ধকারময় অধ্যায় শেষ হবে বলে আশা করা যায়। প্রশ্ন হলো যে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার সেনাবাহিনী দীর্ঘপরিকল্পনা করে মিয়ানমার থেকে তাড়িয়েছে তারা এত সহজেই রোহিঙ্গা প্রত্যাবর্তনে রাজি হয়ে গেলো এও কি সম্ভব? নাকি এর মধ্যে আরও কোনও চালাকি আছে?  
এমন প্রশ্ন মনে আসার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। রাখাইন থেকে রোহিঙ্গা তাড়ানো হঠাৎ করে ঘটে যাওয়া কোনও ঘটনা নয়। এটা মিয়ানমার সরকারের দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা এবং রোহিঙ্গা নিধন ও দেশান্তর করণ সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পরিকল্পিত অভিযান।

দীর্ঘদিনের সেনাশাসিত মিয়ানমারের সামরিক জান্তাদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছিল রাখাইন থেকে মুসলিম রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করা। সেইলক্ষে ১৯৮২ সালে তৎকালীন বার্মার সামরিক সরকার নাগরিকত্ব আইন করে মুসলিম রোহিঙ্গাদের অনাগরিক ও রাষ্ট্রহীন করে দেয়। সেই থেকে তাদের ওপর নিয়মিতভাবে চলছে জাতিগত নির্মূল অভিযান। বিভিন্ন উপলক্ষ ধরে বারবার রোহিঙ্গাদের ওপরে চালানো হচ্ছে গণহত্যা গণধর্ষণ এবং আবাসভূমি থেকে উচ্ছেদের মতো অমানবিক যত  নির্যাতন। এরমধ্যে সবচেয়ে নির্মম নির্যাতন হয় ১৯৭৮, ১৯৯০, ২০১২, ২০১৬ ও ২০১৭ বছরগুলোতে। এই নির্যাতনের ফলেই শত শত বছর ধরে বসবাসকারী ২০ লক্ষ রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৭ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশ, সৌদি আরব, ভারত, পাকিস্তান মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। অবশিষ্ট যে ১৩ লক্ষ ছিল তারমধ্যে এ বছরের নজিরবিহীন নির্যাতনের প্রায় ৬ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে চলে আসতে বাধ্য হয়েছে। এখনও নির্যাতন চলছেই। প্রতিদিনই রোহিঙ্গাদের কাফেলা আসছেই।
আর যৎসামান্য যে কয় লাখ রোহিঙ্গা সেখানে রয়ে গেছে তাদের বাংলাদেশ ঢুকাতে পারলেই মিয়ানমারের পরিকল্পনা একশতে একশ সফল হবে।  সেনাবাহিনীর ইচ্ছানুযায়ী পরিচালিত মিয়ানমারের সরকার যখন প্রায় লক্ষে পৌঁছে গেছেন সেখান থেকে তারা এত সহজে ফিরে আসবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন না। তারপরও বিশেষজ্ঞদের ধারণা ভুল প্রমাণিত করে অং সান সুচি’র আশ্বাস যদি সত্য প্রমাণিত হয় তবে সারা বিশ্বের বিবেকবান মানুষ তাঁকে স্বাগত  জানাবেন।

রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়াই সব কথা নয় তাদের জীবনের নিরাপত্তা বিধানসহ জাতিগত অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এখানে মুখ্য। যা সম্ভব কফি আনান পরিষদের সুপারিশ বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে। শুনলাম সেটাও নাকি বাস্তবায়নের আবারও আশ্বাস দিয়েছেন সু চি। কফি আনান পরিষদের সুপারিশে রয়েছে, রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া, রাখাইন অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, আন্তসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সব জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণের অধিকার। সুপারিশে আরও রয়েছে, নির্বাসন থেকে ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবিরে না রেখে নিজ গ্রামে পুনর্বাসন করা। মোটকথায়  রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব বিষয়ে মিয়ানমার সরকারের ১৯৮২ সালে প্রণীত নাগরিকত্ব আইন আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংশোধন করে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে নিজ ভূমিতে প্রত্যাবর্তন এবং মানবিক সহায়তা ও মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোই সন্নিবেশিত হয়েছে এই সুপারিশমালায়।
কফি আনান পরিষদের সুপারিশমালাকে সামনে রেখে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মিয়ানমার পরিস্থিতি সমাধানে যে পাঁচটি পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন তা হলো, সহিংসতা ও একটি জাতিকে নির্মূলের প্রক্রিয়া বন্ধ, মিয়ানমারে জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন প্রেরণ, মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সেফ জোন তৈরি, জোরপূর্বক উচ্ছেদকৃত মানুষদের নিজ‍ভূমিতে স্থায়ীভাবে প্রত্যাবর্তন।

কফি আনান পরিষদের সুপারিশমালার ভিত্তিতে বাংলাদেশে অবস্থানরত প্রায় দশ লক্ষ রোহিঙ্গা শরণার্থী (পূর্বের ৪ লক্ষ ও এবছরের ৬ লক্ষ) এত সহজে ফিরিয়ে নেওয়ার ইচ্ছা মিয়ানমারের আছে বলে মনে হয় না। এটা লোক দেখানো ভেল্কিবাজি হলেও হতে পারে। লোকভোলানো কথা সু চি আগেও কম বলেননি। এর আগে রাখাইন যখন রোহিঙ্গাদের রক্তে ভাসছে, নারীদের চিৎকারে প্রকম্পিত, আগুনের লেলিহান শিখায় জ্বলছে তখনও সু চি বলেছেন, মিয়ানমার সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী ভুল তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। এরপর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের চাপের মুখে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার উপায় বের করার জন্য সু চি যখন বাংলাদেশে তার মন্ত্রী পাঠান তখনও রাখাইনে রোহিঙ্গা নির্যাতন চলছিল। তখনও শতশত রোহিঙ্গা প্রতিদিন বাংলাদেশে ঢুকছিল। অর্থাৎ মন্ত্রী পাঠানোর বিষয়টি ছিল সু চি'র আইওয়াশের একটি কৌশল। এবারের আশ্বাসটিও সেই ধরনের আরও একটি কৌশল হলেও হতে পারে। কারণ এরপরও রোহিঙ্গা শরণার্থীদের কাফেলা বাংলাদেশে আসছেই।
অতএব বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে মিয়ানমারের স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চি’র দেওয়া আশ্বাসে উদ্বেলিত হওয়ার কোনোই কারণ নেই। বরং এই আশ্বাসকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা অত্যাবশ্যক এবং একইসঙ্গে মিয়ানমারের ওপর বিশ্বব্যাপী যে চাপ সৃষ্টি করতে বাংলাদেশ সক্ষম হয়েছে তা আরও বেগবান করার কৌশল অবলম্বন করতে হবে। কারণ রোহিঙ্গাদের বিষয়ে মিয়ানমার এখন পর্যন্ত যতটুকু নরম হয়েছে তা বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর চাপের কারণেই।
কিন্তু ২৭ অক্টোবর রাতেই বাংলা ট্রিবিউনেই মিয়ানমারের ছলচাতুরীর খবর প্রকাশিত হলো। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মিয়ানমার সফর উপলক্ষে বাংলাদেশের অনুমোদন ছাড়াই সেদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পেজে ‘যৌথ সংবাদ বিজ্ঞপ্তি’ প্রকাশ করে। এতে ১০টি বিষয়ে উভয় দেশের একমত পোষণ করার তথ্য বিকৃত করে প্রকাশ করা হয়। এমনকি এতে কফি আনান কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের বিষয়টিও বাদ দেওয়া হয়।

এসবে হতাশ হয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেশের একটি দৈনিক পত্রিকার প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক চাপ সরলে ওরা কিছুই করবে না’। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী  যথার্থই বলেছেন।
এটাই সত্য যে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে মিয়ানমার যে আশ্বাস দিচ্ছে তা বিশ্বাস করার কোনোই কারণ নেই। তাদের স্বদিচ্ছা থাকলে তারা ভেল্কিবাজির আশ্রয় নিত না। অতএব জীবনের নিরাপত্তাবিধান নিশ্চিতসহ রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন এবং জাতিগত অধিকার পুনরুদ্ধার শুধুমাত্র মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগেই সম্ভব। আলোচনার টেবিলে নয়। এর জন্যে প্রয়োজন মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক চাপ আরও বহুগুণ বৃদ্ধি। বাংলাদেশকেও হাঁটতে হবে সে রাস্তায়ই।
লেখক: কথাসাহিত্যিক

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ