‘গাভী বিত্তান্ত’

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৫:০৮, নভেম্বর ০৮, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:১৯, নভেম্বর ০৮, ২০১৭

আমীন আল রশীদঅন্যের লেখা ‘কপি-পেস্ট’ নিয়ে বিতর্কের রেশ না কাটতেই এবার নিজেদের মধ্যে মারামারি করে ফের আলোচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। সম্প্রতি নীল দলের শিক্ষকদের সভায় দু’জন শিক্ষকের মারামারি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তো বটেই, মূলধারার গণমাধ্যমও সরব। এর ফলে বস্তুত বিতর্কিত হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রাচ্যের অক্সফোর্ডখ্যাত এই বিদ্যাপিঠ। আরও বিস্তৃতভাবে বললে, নিয়মিত বিরতিতে এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে কালিমালিপ্ত হচ্ছে দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা।
গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে,বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার দিকে শুরু হওয়া এই সভায় প্রথম থেকেই সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকপন্থী এবং বর্তমান উপাচার্য আখতারুজ্জামানপন্থী শিক্ষকরা একপক্ষ আরেকপক্ষকে কটাক্ষ করে বক্তব্য দিতে থাকেন। এর জেরে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ খ ম জামাল উদ্দিনের ওপর চড়াও হন প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানী। ঘুষিতে তার নাক দিয়ে রক্ত ঝরা শুরু হয় বলে সাংবাদিকদের জানান জামাল উদ্দিন। যদিও প্রক্টর গোলাম রব্বানির দাবি, তিনিই আক্রমণের শিকার হয়েছেন।
এর আগে গত জুলাই মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্যানেল নির্বাচনের জন্য ডাকা সিনেটের বিশেষ অধিবেশনকে কেন্দ্র করে সিনেট ভবনের পূর্ব দিকের গেটে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগও নতুন কিছু নয়। এই অভিযোগে অনেক শিক্ষকের চাকরি চলে গেছে। অনেকে নানাভাবে শাস্তি পেয়েছেন। ফলে সেই পুরনো প্রশ্নটিই বারবার ঘুরেফিরে আসছে যে, কারা আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হচ্ছেন?

এটা ধরেই নেওয়া হয় যে, মেধাবীরাই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারেন। তাদের অ্যাকাডেমিক ক্যারিয়ার হতে হয় উজ্জ্বল। অনার্স-মাস্টার্সে ফার্স্টক্লাস। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, তাদের অনেকেই নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ নন।

সবশেষ বৃহস্পতিবার রাতের ওই ঘটনার পরদিন এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রবীণ অধ্যাপকের সঙ্গে আমার কথা হয়। নিয়মিত টেলিভিশনের আলোচনা অনুষ্ঠানে আসেন বলে ব্যক্তিগত সম্পর্কের সুবাদে তিনি বলেন,‘এই ঘটনাটি অত্যন্ত ন্যাক্কারজনক এবং নোংরামি। এতে আমিই বরং লজ্জিতবোধ করছি।’ তিনি বলেন,‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এখন আসলে রাজনীতিতে ঢাকা পড়ে গেছে। এখানে এখন শিক্ষক খুঁজে পাওয়া কঠিন।’ ওই অধ্যাপক আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেন যে, ‘আচরণ, বিচরণ ও বচন––এই তিন ঠিক না হলে তাকে আমরা শিক্ষক বলতে পারি না।’

কিন্তু বাস্তবতা হলো এখন শিক্ষকদের একটা বড় অংশের বিচরণই রাজনীতির মাঠে। অনেক শিক্ষকের আচরণ দলীয় ক্যাডারের মতো। অনেকের বচন পাড়ার মাস্তানের মতো। মেধা ও মনন, গবেষণা কিংবা অধ্যয়ন এখন আর গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে অবশিষ্ট নেই। বরং এসব থাকলে জীবন কেরানির মতো পানসে। তারচেয়ে বরং বিভিন্ন রঙে বিভক্ত হয়ে গেলে, রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি করলে নিয়মিত বেতনভাতার বাইরেও বিবিধ বৃত্তি এবং সামাজিক ক্ষমতা নিশ্চিত করা যায়। কারণ তারা জানেন, রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি না করলে সারা জীবন প্রাইমারি ইস্কুলের মাস্টারের মতো ‘ওই দেখা তালগাছ’ পড়িয়ে যেতে হবে। কোনোদিন তালগাছের মাথায় ওঠা হবে না। অর্থাৎ ভিসি, প্রক্টর বা রেজিস্ট্রার হওয়া কপালে জুটবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের এই সংকটের ব্যাপারে সবচেয়ে শক্তিশালী কথাগুলো লিখে গেছেন আহমদ ছফা তাঁর ‘গাভী বিত্তান্ত’ উপন্যাসে। এখানে তিনি লিখেছেন,‘এখন শিক্ষক সমাজ বলতে কিছু নেই। আছে হলুদ, ডোরাকাটা, বেগুনি এসব দল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষমতা কব্জা করার জন্য দলগুলো সম্ভব হলে সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হত। মাঠ এবং রাস্তা ছাত্ররা দখল করে রেখেছে বলে শিক্ষকদের লড়াইটা স্নায়ুতে আশ্রয় করে নিয়েছে।’

এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র আবু জুনায়েদ নামে এক অথর্ব লোকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হয়ে ওঠার ট্রাজেডি বর্ণনা করতে গিয়ে ছফা লিখছেন, ‘সকলের দৃষ্টির অজান্তে এখানে একের অধিক হনন কারখানা বসেছে, কারা এন্তেজাম করে বসিয়েছেন সকলে বিশদ জানে। কিন্তু কেউ প্রকাশ করে না। ফুটন্তে গোলাপের মতো তাজা টগবগে তরুণরা শিক্ষক হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার পর হনন কারখানার কারিগরদের ইয়ারে দোস্তে পরিণত হয়েছেন। তাই জাতির বিবেক বলে মহান শিক্ষকদের কারো কারো মুখমণ্ডলের জলছবিতে খুনি খুনি ভাটা যদি জেগে থাকে তাতে আঁতকে ওঠার কোনো কারণ নেই।’

একসময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলী রীয়াজ এ বিষয়ে আমাকে একবার বলেছিলেন,‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপককে আমরা একটি বিশাল বটবৃক্ষের সাথে তুলনা করতে পারি; যার ছায়াতলে অনেকে আশ্রয় নিতে পারে। একটি বিশাল গাছ দূর থেকে দেখলেই চেনা যায়। একজন অধ্যাপকও সেরকম। বিশাল মহীরুহ। কিন্তু আমরা অধ্যাপক হিসেবে এরকম মহীরুহ কতজনকে এখন চিনি?’

বৃহস্পতিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ওই মারামারির খবরের পর ফেসবুকে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও গবেষক আফসান চৌধুরী একটি স্ট্যাটাস দেন। যেখানে তিনি লিখেছেন, 5 years back I wrote a piece that DU did more politics than academics. I got 300 hate mails. Wonder what people think now? অর্থাৎ ৫ বছর আগে তিনি লিখেছিলেন যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অ্যাকাডেমিক কাজের চেয়ে রাজনীতিটা বেশি হয়। তখন তিনি তিনশোটি মেইল পেয়েছিলেন যেখানে তার এই বক্তব্যের সমলোচনা করা হয়েছিল। মি. চৌধুরীর প্রশ্ন, যারা ওই সমালোচনা করেছিলেন, তারা এখন কী বলবেন?

এটা ঠিক যে, আমরা শিক্ষক বলতে যে ধরনের সৎ, নীতিবান ও আদর্শবান মানুষের কথা কল্পনা করি বা একসময় ছিলেন কিংবা এখনও অনেক আছেন বলে বিশ্বাস করি, এই সমাজ তাদের আদৌ চায় কিনা বা এরকম শিক্ষকের সামাজিক অবস্থান আসলে কত তলানিতে, তা আমরা আমাদের চারিপাশে তাকালেই দেখি। তাঁদের ব্যাপারে হুমায়ুন আজাদ বলে গেছেন, ‘শিক্ষকের জীবনের থেকে চোর, চোরাচালানি, দারোগার জীবন অনেক আকর্ষণীয়। এ সমাজ শিক্ষক চায় না। চোর-চোরাচালানি-দারোগা চায়।’ ফলে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা হয়তো বুঝে গেছেন যে, শিক্ষক হয়ে বেঁচে থেকে খুব বেশি লাভ নেই। তাই তারা অন্যের লেখা চুরি করে হোক আর সহকর্মীর নাক ফাটিয়েই হোক কিংবা রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি–এমন একটি জীবন তারা নিশ্চিত করতে চান, যেখানে অর্থ, সম্মান এবং ক্ষমতা সবই আছে।

লেখক: সাংবাদিক

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ