বিএনপির ভবিষ্যৎ কোথায়?

Send
তপন মাহমুদ
প্রকাশিত : ১৯:১২, নভেম্বর ১০, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:১৪, নভেম্বর ১০, ২০১৭

তপন মাহমুদবার্ট্রান্ড রাসেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী স্নায়ুযুদ্ধের সময় পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে একটি বই লিখেছিলেন ‘ফিউচার অব ম্যানকাইন্ড’ নামে। অনেকে যার বাংলা অনুবাদ করেছেন ‘মানব জাতির ভবিষ্যৎ কোথায়?’ সে অনেক বড় বিষয়। পুরো দুনিয়ার মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা বা অনুমান করা সহজ নয়! তাই আমি বরং বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠের অন্যতম বৃহৎ দল বিএনপি’র ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই/চার কথা বলি।
এ বিষয়টি মাথায় এলো দিনকয়েক আগে। খোদ, বিএনপির মহাসচিব যখন দলটির ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কার কথা জানালেন। দলীয় এক সভায় তিনি বললেন, ‘সরকারের কৌশল তছনছ করতে সক্ষম না হলে, জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ধারা টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।’ তাই এখন প্রশ্ন হলো, নিকট ভবিষ্যতে বিএনপি কি সরকারের কৌশল ‘তছনছ’ করতে সক্ষম হবে?
সরকার বা সরকারি দল বা আওয়ামী নেতৃত্বাধীন জোট আসলে কী কৌশল করছেন সেটা নিয়ে নিশ্চয়ই বিএনপির এক ধরনের বোঝাপড়া আছে। যেমনটি তারা বেশ অনেক দিন ধরেই বলে আসছেন যে, মামলা হামলা দ্বারা বিরোধী শিবিরকে কোণঠাসা করে রাখছে সরকার। কিন্তু এখন দলটির নেতারা বলছেন, ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে সরকার নাকি আরও মরিয়া হয়ে উঠেছে। সব মামলাকে শেষ পর্যায়ে নিয়ে সাজা দিয়ে শীর্ষ নেতাদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখার কৌশল নিয়েছে।’ তাহলে উপায়? বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব কি সাজা এড়িয়ে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে?

এমন কৌশল যদি সরকার করেই থাকে, তাহলে তা মোকাবিলায় কী করছে বিএনপি? কয়েকদিন ধরে তাদের জ্যেষ্ঠ কয়েকজন নেতা দাবি করে আসছেন, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপির সঙ্গে আলোচনা করতে নাকি বাধ্য হবে সরকার। জানি না, বিএনপির হাতে কী এমন তুরুপের তাস আছে, যার ফলে আওয়ামী লীগ তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসবেই! বরং বেশ কিছুদিন ধরে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক থেকে জ্যেষ্ঠ অনেক নেতারাই বলতে শুরু করেছেন যে, বিএনপির সঙ্গে আলোচনার কোনও সুযোগ নেই। 

তবে, এই নাজুক অবস্থায়ও বিএনপি নেতা মওদুদ আহমেদকে যখন বলতে শুনি, ‘আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলে নির্বাচনই হবে না’ তখন কেবল মনে হয় ‘তর্জন-গর্জনই সার নয়’ তো! ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগেও বিএনপি নেতাদের বলতে শোনা গেছে, তারা অংশ না নিলে নির্বাচনই হবে না। সে যখন হয়েই গেলো, তখন তারা বললেন, সরকার গ্রহণযোগ্যতা পাবে না এবং শেষপর্যন্ত টিকতে পারবে না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগ শুধু টিকেই নেই, আগামী নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনেই করার কথা বলে আসছে। আর সে নির্বাচন যে শেখ হাসিনার অধীনেই হবে, সেটাও স্পষ্ট করেই বলছে আওয়ামী লীগ নেতারা। আর বিএনপি রাজপথে এমন কোনও শক্ত অবস্থান দেখাতে পারছে না যে, কেউ ধারণা করতে পারবে যে, তত্ত্বাবধায়ক বা সহায়ক কোনও সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকারকে তারা বাধ্য করতে পারবে।

তবে আশার কথা হলো, সম্প্রতি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমেদ বলেছেন, যেকোনও প্রতিকূল পরিবেশে তাদের দল নির্বাচনে যাবে। এটাই তাদের জন্য মঙ্গল। সত্যি বলতে কী, আগামী নির্বাচনে যাওয়ার ওপরই বিএনপির ভবিষ্যত নির্ভর করছে। অন্তত তার টিকে থাকা। তারপর সে নির্বাচন কেমন হবে, তার ফল কী হবে, সেটা পরের বিবেচ্য বিষয়।

তবে দীর্ঘমেয়াদে বিএনপির রাজনৈতিক ভাগ্য কী হবে, তা বলা এখন মুশকিলই বটে। কারণ যেসব কারণে বিএনপির এই ‘বেহাল’ অবস্থা, তা যে দলের নেতৃত্ব ঠিকঠাকভাবে বিবেচনায় নিতে পারছেন না, তা বুঝতে খুব জ্ঞানী হতে হয় না। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে অনেকগুলো ঐতিহাসিক ভুল করেছে বিএনপি। সেগুলোর ফয়সালা না করতে পারলে দলটির পক্ষে আওয়ামী লীগের ‘কৌশল তছনছ’ করা সম্ভব হবে না।

প্রথমত, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার ও  মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দল জামায়াতে ইসলামের প্রশ্নে এখনপর্যন্ত কোনও সঠিক অবস্থান নিতে পারেনি বিএনপি। বিএনপির উচিত ছিল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া। তাতে দলের কিছু নেতা ফেঁসে গেলেও আখেরে দলেরই লাভ হতো। আর মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত দলকে এখনও ছাড়তে না পারা বিএনপির নৈতিক অবস্থানকেই দুর্বল করে রেখেছে। বরং এতে নানাভাবেই লাভবান হয়েছে আওয়ামী লীগ। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের ইসলামিস্টদের বড় একটা অংশ, যারা মূলত জামায়াতবিরোধী, তাদেরও হারিয়েছে বিএনপি। 

দ্বিতীয়ত, ২০১৪ সালের নির্বাচনকে ‘বানচাল’ করতে অবরোধের নামে যে জ্বালাও পোড়াও এর রাজনীতি তারা করেছে, সে ভুলের মাশুল ‘মামলা, গ্রেফতার, বিচার ও সাজার ভয়ে তটস্থ থেকে’ এখনও গুনছে তারা। বলতে গেলে এর মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কোর্টে দীর্ঘমেয়াদে বল ঠেলে দিয়েছে তারা। 

এই ঐতিহাসিক ভুলগুলোর ফয়সালা না করে বিএনপির পক্ষে আওয়ামী লীগের কৌশল দূরে থাক, নিজের দল গোছানোই কঠিন হয়ে যাবে। বিএনপির ভাগ্য ভালো যে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগবিরোধী অনেক লোক আছে এবং যাদের চোখে কার্যত কোনও বিরোধী শক্তি না থাকায় তারা বিএনপির সমর্থক হয়ে ওঠে। কিন্তু গত প্রায় আট বছরে কিছু রাজনৈতিক বুলি আওড়ানো ছাড়া জনসম্পৃক্ত কোনও ইস্যুতে তারা কি কঠোর কোনও আন্দোলন করতে পেরেছে? জনগণের চাহিদাকে পাশ কাটিয়ে তারা রাজপথ পেরিয়ে কেবল ক্ষমতার যেতে চেয়েছে। কিন্তু জনশূন্য রাজপথ কি আর কাউকে ক্ষমতায় নিতে পারে?

আর একটা বিষয়, ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্রে উত্তরণের পর প্রতি পাঁচ বছর পর পর (মাঝে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাদ দিলে)  ক্ষমতার বদল ঘটায় আওয়ামী বা বিএনপি’র মতো দলগুলো মনে হয় ধরেই নেয় এটাই স্বাভাবিক। সে তাড়াহুড়োটা বিএনপিকে ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে ধ্বংস করে দিয়েছে। অথচ আমাদের পাশের দেশ ভারতে কংগ্রেসকে হারিয়ে ক্ষমতায় আসতে শেষবারেও কিন্তু বিজেপিকে দুমেয়াদে ১০ বছর পার করতে হয়েছে। একই ঘটনা পশ্চিমবঙ্গেও ঘটেছে। প্রায় ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় গেলো তৃণমূল কংগ্রেস। সেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি নয় বরং সিন্দুর বা নন্দীগ্রামের মতো ঘটনা বাম সরকারের ভীত নাড়িয়ে দিয়েছে। কারণ সেগুলো ছিল জনদাবি।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গত কয়েক বছর ধরে বিএনপি কার্যকর নেতৃত্ব শূন্যতায় ভুগছে। একইসঙ্গে তাদের বুদ্ধিজীবী শূন্যতাও চোখে পড়ার মতো। বরং দলটি জামায়াতপন্থীদের পরামর্শ দ্বারা বেশি আক্রান্ত বলেই মনে হয়। অথচ এই জামায়াত প্রশ্নেই দলের অনেক জ্যেষ্ঠ নেতারা পর্যন্ত নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। এমাজউদ্দিন আহমেদের মতো বুদ্ধিজীবীদের কথা কানে না তুলে তাদেরকেও হারিয়েছে।

এমন অবস্থায়, আওয়ামী লীগ বিএনপি এবং তাদের জোটকে কোণঠাসা করে রেখেছে, তাদের ওপর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে, এটাকে সত্য মেনে নিয়ে বার বার আওড়ালেও কার্যত কোনও লাভ হবে না। বরং বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবেই সরকারের কৌশল মোকাবিলা করতে হবে। সেজন্য শুধু কথার বুলি ফোটালে তাদের দৃশ্যমান অস্তিত্ব হয়তো থাকবে, কিন্তু যে রাজনৈতিক অন্তঃসারশূন্যতা তৈরি হবে তা খুব সহজে পূরণ হবে না। নিয়মতান্ত্রিক পথে রাজনীতির মাধ্যমেই বিএনপিকে টিকে থাকতে হবে।

 পুনশ্চ: বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের শঙ্কা অনুযায়ী জাতীয়তাবাদী ধরার রাজনীতি (আদতে বিএনপি) টিকিয়ে রাখা না গেলে কী হবে? এক্ষেত্রে বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘মানবজাতির ভবিষ্যৎ কোথায়’ একটা বিষয় স্মরণ করতে পারি, রোমের পতনের পর তাৎক্ষণিক ফলস্বরূপ ব্যাপক অরাজকতা, বর্বরতা, সর্বোপরি অন্ধকার যুগ এসেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তার ধারাবাহিকতায় ইউরোপে রেনেসাঁ যুগের সূচনা হয়েছিল।

 লেখক: জ্যেষ্ঠ প্রভাষক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ।

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ