বিচারপতি ‘বশীকরণ’

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৯:৩৭, নভেম্বর ১৩, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ২০:৪৪, নভেম্বর ১৩, ২০১৭

আহসান কবিরভারতের রাজস্থান হাইকোর্টের বিচারপতি মহেশচন্দ্র শর্মা স্বাভাবিক অবসরে গিয়েছেন ২০১৭ সালের জুন মাসে। অবসরে যাওয়ার আগে ‘ময়ূর বিষয়ক’ তার একটি উক্তি ভাইরাল হয়ে যায়। মহেশচন্দ্র বলেছিলেন– ভারতের জাতীয় পাখি হিসেবে ময়ূরকে বেছে নেওয়ার কারণ হচ্ছে ময়ূর ব্রহ্মচারী। ময়ূরীর সঙ্গে ময়ূর মেলামেশা না করলেও ময়ূরী সন্তানসম্ভবা হয়। ময়ূরের চোখের জলই ময়ূরীকে সন্তানসম্ভবা করে! অভিনেত্রী টুইংকেল খান্না এই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত হন একটা কৌতুকের মাধ্যমে। কৌতুকটা এমন–
ময়ূর: ওগো আমাদের সন্তানটার শরীর এমন কেন? ওর চামড়া দেখে মনে হচ্ছে ও একটা বাচ্চা কুমির, ময়ূর না।
ময়ূরি: ওর গায়ে পালক নেই! তাহলে তুমি সেদিন কুমিরের কান্নাই কেঁদেছিলে!
পাকিস্তানে বিচারপতিদের নিয়ে প্রচলিত একটা কৌতুক আছে। বিচারপতিদের কি মেরুদণ্ড আছে? উত্তর– না! সামরিক শাসন জারি হয়ে গেলে রাষ্ট্রপতি কিংবা প্রধান বিচারপতি হওয়ার জন্য বিচারপতিরা নাকি স্বতঃস্ফূর্তভাবে লাইনে এসে দাঁড়ান! ব্যতিক্রম কি নিয়মের মধ্যে পড়বে? উত্তর– মোটেই না। বিচারপতি হিসেবে যারা ব্যতিক্রমী, শুধুমাত্র তাদেরই মেরুদণ্ড গজায়। যেমন জাস্টিস কায়ানি। তিনি বলেছিলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী আর কিছু না পারুক নিজের দেশটাকেই কয়েকবার দখল করতে পেরেছে! তেমনি যে বিচারপতিদের মেরুদণ্ড গজায় তারা সামরিক শাসক পারভেজ মোশাররফ কিংবা সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের বিরুদ্ধে সঠিক রায় দিতে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হন না! বাংলাদেশ নিয়ে প্রথমে কিছু না বলাই বোধ করি ভালো। আপাতত গান বা সিনেমার দিকে নজর ফেরাই।

বাংলা ছবির জনপ্রিয় একটা গানের কথা এমন– খোদার কাছে নালিশ করতে দিলো না আমারে/পাপ-পূণ্যের বিচার এখন মানুষে করে! এই গান থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে বিচারতিদের গানটা নিয়ে যে কেউ এখন প্রশ্ন তুলতে পারে। বিচারপতিদের নিয়ে গানটার প্রথম দুই লাইন– বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা/আজ জেগেছে সেই জনতা! জনতা কী বিচারপতির বিচার করতে চেয়েছিল বা করতে পারলো, নাকি সরকার নিজেই বিচারের দায়ভার নিজের হাতে তুলে নিয়েছে? বিচার বা আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কি ঠিক? বেশকিছু বাংলা বা হিন্দি ফিল্মের শেষ দৃশ্যে পুলিশের আগমন ঘটে থাকে এবং ভিলেনদের গ্রেফতার করার আগে নায়কের উদ্দেশে পুলিশের চিরচেনা ডায়ালগ– আইন নিজের হাতে তুলে নেবেন না! এই ডায়ালগ কি নিছক দর্শকের জন্য নাকি সরকারের জন্য?

‘বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা...’ এই গানটা অবশ্য স্বাধীনতার অনেক আগেই রচিত ও গীত হয়েছিল। বাংলাদেশে এই পর্যন্ত ২১ জন মানুষ প্রধান বিচারপতি ছিলেন। স্বাধীনতার পর প্রথম প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন আবু সাদাত মো. সায়েম। বিচারপতি তালিকার ২১তম ব্যক্তিটি ছিলেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। সাত বছরের বেশি সময় ধরে প্রধান বিচারপতির পদে দায়িত্বরত ছিলেন বিচারপতি ফজলে কাদেরী মোহাম্মদ আবুল মুনিম। এত দীর্ঘ সময় আর কেউ প্রধান বিচারপতি থাকতে পারবেন বলে মনে হয় না। তবে সাবেক প্রধান বিচারপতি মুনিম সাহেবের ঠিক আগে যে প্রধান বিচারপতি ছিলেন তাকেও সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই ভদ্রলোকের নাম ছিল বিচারপতি কামালউদ্দীন হোসেন এবং সেই সময়কার ক্ষমতার দখলদার স্বৈরাচার এরশাদ তাকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। বিচারপতি বদরুল হায়দার চৌধুরী আলোচিত হয়েছিলেন রাষ্ট্রপতির মনোয়ন পেয়ে। আওয়ামী লীগ তখন জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের, বিশেষ করে গোলাম আজমের কাছে ছুটে গিয়েছিল সমর্থনের আশায় (১৯৯১ সালে)। সেবার বিএনপি নির্বাচনে জিতে রাষ্ট্রপতি বানিয়েছিল সদ্যপ্রয়াত রাজাকার আবদুর রহমান বিশ্বাসকে।

বিচারপতিরা এই দেশে আরও কয়েকটি কারণে আলোচনায় আসতেন, ভবিষ্যতেও হয়তো আসবেন। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার শুরুতে প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি মনোনীত করা হয়েছিল। চিরস্মরণীয় এই মানুষটির জন্য সংবিধানে পরিবর্তন এনে আবারও তাকে প্রধান বিচারপতি পদে ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। বিচারপতি হাবিবুর রহমান যখন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান, তখন সেনাপ্রধান জেনারেল নাসিমকে সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন রাজাকার রাষ্ট্রপতি আবদুর রহমান বিশ্বাস। সেই সময়ে (১৯৯৬ সালের ২০ মে) সেনাবাহিনীর ভেতরেও এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল। জাতির উদ্দেশে ভাষণে তখন বিচারপতি হাবিবুর রহমান বলেছিলেন, ‘ভাইয়ের রক্তে যেন আমাদের হাত রঞ্জিত না হয়।’ তবে গোলাম আজম নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন এই হাবিবুর রহমান প্রধান বিচারপতি থাকাকালেই!

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে বিচারপতি লতিফুর রহমান যতটা আলোচিত হয়েছিলেন, তার চেয়ে ঢের বেশি আলোচনায় এসেছিলেন বিচারপতি কে এম হাসান। কে এম হাসান সাহেবের বয়স বাড়ানো হয়েছিল যেন তিনি পরবর্তীকালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে পারেন এবং তার হাত ধরে যেন ক্ষমতায় আসতে পারে বিএনপি। বিএনপি সরকারের এই পরিকল্পনা পরে বাস্তবায়িত হয়নি। বরং দেশের চাকা উল্টোদিকে ঘুরতে শুরু করে। মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দিনের সরকার দুই বছর ধরে জেঁকে বসে দেশে (২০০৭-২০০৮)। বিএনপিকেই এ কারণে সবচেয়ে বেশি খেসারত দিতে হয়েছে, এখনও হচ্ছে। তবে এই দুই বিচারপতির একজনের পিতাও ছিলেন বিচারপতি। ওই বিচারপতির নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক হয়েছিল। শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হককে তখন জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, কেন এমন একজনকে বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে? শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক উত্তর দিয়েছিলেন, কারণ সে আমার আত্মীয়! বিচারপতিদের সঙ্গের এই আত্মীয়তার বন্ধন ক্ষমতার বন্ধনে উন্নীত করতে গিয়ে অতীতেও অনেকে ফেঁসে গেছেন। ভবিষ্যতে কী হবে তার জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আমাদের আর কোনও উপায় নেই।

সর্বশেষ বা ২১তম প্রধান বিচারপতি ছিলেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। আওয়ামী লীগ সরকারই তাকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে তাকে নিয়োগ দিয়েছিল। আবার সরকারের সঙ্গে টানাপড়েনের কারণেই তাকে পদত্যাগ করে চলে যেতে হয়েছে। অসদাচরণ ও অযোগ্যতার কারণে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকদের বরখাস্ত করার ক্ষমতা জাতীয় সংসদের হাতে দেওয়ার বিষয়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায় বহাল রেখে আপিল বিভাগ রায় দেয় ২০১৭ সালের জুলাই মাসে। এরপর থেকেই সরকারের সঙ্গে তার টানাপড়েনের শুরু। এছাড়া ২০১৬ সালে মানবতাবিরোধী বিচারাধীন মামলা নিয়ে মন্তব্য করার কারণে দুই মন্ত্রীকে জরিমানা করে সুপ্রিম কোর্ট। এই দুই মন্ত্রী হচ্ছেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক। সুরেন্দ্র কুমার সিনহা প্রধান বিচারপতি হিসেবে যতটা আলোচনার জন্ম  দিয়েছেন, অন্য কেউ তা করতে পারবেন বলে মনে হয় না।

তবে বাংলাদেশে ১৯৭৫-এর পটপরিবর্তনের পর বিচারপতিরা কেউ কেউ ক্ষমতার লোভে ক্ষমতাসীনদের কাছে গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে যেতেন– এই অভিযোগ বার বার উঠেছে। পাকিস্তানেও হয়েছে এমন।

সার্টিফিকেট জাল, ঘুষ গ্রহণ কিংবা অসদাচরণের অভিযোগ যেমন আছে বিচারকদের বিরুদ্ধে, তেমনি আছে শপথ না করানোর মতো ঘটনা। মানুষ বলেই হয়তো ভালো-মন্দ মিলিয়েই সমাজ। তবে শেরে বাংলা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত যেসব সরকার ক্ষমতায় এসেছে, তারা প্রধান বিচারপতি তথা বিচার বিভাগকে কোনও না কোনোভাবে হয়তো ‘বশে’ রাখতে চেয়েছে। ‘বশে’ না থাকলেই বিপত্তি ঘটবে– এটাই যেন দুনিয়ার নিয়ম। সুতরাং ‘বশে’ থাকা ও রাখার কৌতুক বলেই বিদায় নেই।

১২ বছর ঘর করার পর বিবাহ বিচ্ছেদ চাইতে এসেছে এক ভদ্র মহিলা। আদালতে তার সঙ্গে বিচারকের কথপোকথন–

স্ত্রী: মাননীয় বিচারক, ১২টা বছর আমার স্বামীরে আমি বশ করে রেখেছিলাম। কিন্তু...

বিচারক: কোনও কিন্তু নয়। সরাসরি বলুন কিভাবে তাকে বশ করে রেখেছিলেন?

স্ত্রী: না মানে মাননীয় বিচারক, এখন হয়েছে কী সে অন্য এক....মানে সে অন্য এক...

বিচারক: আমি কোনও মানে-টানে শুনতে চাই না। সরাসরি বলুন কেমন করে তাকে বশ করে রেখেছিলেন!

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/টিআর/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ