প্রসঙ্গ ‘ডুব’

Send
বিথী হক
প্রকাশিত : ১৭:১৩, নভেম্বর ১৫, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৮, নভেম্বর ১৫, ২০১৭

বিথী হক‘ডুব’ মুক্তির আগেই বিভিন্ন মহল থেকে পাল্টাপাল্টি মন্তব্য, একের পর এক পটপরিবর্তনসহ বিভিন্ন গুঞ্জন ছিল সাধারণ দর্শক থেকে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির অলিগলিতে। কেউ বলেন- এই সিনেমা হুমায়ূন আহমেদের বায়োপিক, তো কেউ বলেন- এটি কারও জীবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টই নয়। অনাকাঙ্ক্ষিত মিলকে মিল না বলাই ভালো ইত্যাদি এবং ইত্যাদি। পাশের দেশের একটি জনপ্রিয় পত্রিকায় প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে নির্মাতা স্বয়ং স্বীকার করেছিলেন, এটি হুমায়ূন আহমেদের বায়োপিক। তারপর বহু লুকোচুরি, সেন্সরবোর্ড-গল্প হয়ে কিছুদিন পরেই বিভিন্ন খবরের শিরোনাম হয়- সিনেমাটি কারও বায়োপিক নয়।
শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত যা কিছু মনে ছিল সব ঝেড়ে ফেলে ‘ডুব’ দেখতে গিয়েছিলাম এই ভেবে যে, কারও জীবনের সঙ্গে সিনেমা মিলিয়ে দেখার চেষ্টাও করবো না। রি-ইউনিয়নের দৃশ্য, ছোট্ট সাবেরী আর নিতুর সংলাপেও ভাবলাম গল্প ঠিকই আছে। এটা কারও বায়োপিক নয়, নিতুর বাবা নিজের টাকা দিয়ে নিতুকে নিয়ে সিনেমা বানিয়ে দেবেন। তারপরের ঘটনাপ্রবাহ, অফুরন্ত ফ্ল্যাশব্যাক, একের পর এক দৃশ্য ও সংলাপ থেকে আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কে এই জাভেদ হাসান? কী করেন তিনি? তার পরিচয় কী? তার ছেলেমেয়ে কী করেন? উত্তরগুলো সিনেমায় না পেয়ে অবচেতন মন কোনও একজনের সঙ্গে তুলনায় জড়িয়ে পড়ছিল। এই অপরাধবোধ একজন দর্শক হিসেবে আমার কাঁধে না চাপিয়ে, নির্মাতা সিনেমা দেখার আগে প্রি-রিকুজিট হিসেবে কোনও লেখকের জীবনী পড়ে নিতে বলতে পারতেন! এই দেশের পুকুর চুরি, প্রকল্পের টাকা চুরি, আটা-ময়দা চুরির মতো সিনেমা থেকে নির্মাতা চুরি করেছেন দৃশ্য। সহজবোধ্য গল্পকে জটিল করে চরিত্রের অপ্রকাশিত ঘটনা ও চরিত্র নির্মাণে করেছেন কারচুপি। অদ্ভূত সত্য যে, যে কোনও চরিত্র এস্টাবলিশ করার জন্য বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সিনেমায় অন্তত দু’টি প্রাসঙ্গিক দৃশ্য রাখা হয়, যাতে দর্শক বুঝতে পারেন সমাজে চরিত্রটির অবস্থান ও স্বরূপ কী। সেখানে আমরা মাত্র একটি দৃশ্যে দেখতে পাই শ্যুটিং শেষে গাড়িতে শ্যুটিংয়ের অনুষঙ্গ তোলার সময় দু’টি টিফিন ক্যারিয়ার আসে। কিন্তু পুরো সিনেমার কোথাও জাভেদ হাসানকে তার নিজের কাজ করতে দেখা যায়নি। পুরো সিনেমাজুড়ে তিনি ছেলে-মেয়ের পেছনে সময় দিয়েছেন। প্রথম স্ত্রীকে অবহেলা করে কষ্ট পেয়েছেন বা দোটানায় ভুগেছেন, নিতুকে ঝাড়ি মেরেছেন আর সিগারেট খেয়েছেন। যেন একজন শিল্পীর নিজের কোনও পরিচয় এখানে মুখ্য নয়।

এখানে তাহলে কী মুখ্য? এই সিনেমায় তাহলে দেখানোর কী ছিল? নারীরা প্রেমিকা হিসেবে কেমন, স্ত্রী হিসেবে কেমন আর কন্যা হিসেবে কেমন তা? প্রথম স্ত্রী মায়ার সঙ্গে প্রেমের বিয়ে হলেও, অনন্ত ফ্ল্যাশব্যাকে সবকিছু দেখানো হলেও তাদের সম্পর্কটা কত মধুর ছিল, সে বিষয়েও নির্মাতা দর্শককে কিছু দেখাতে চাননি। শুধু দেখিয়েছেন একজন জাভেদ হাসান প্রথম স্ত্রীর কাছে সর্বদা চেঁচামেচি শুনে শুনে গরম তেলের কড়াই থেকে সরাসরি আগুনে ঝাঁপ দিয়ে নিতুর চুলোয় পড়েছেন। নারী/স্ত্রী মানেই এই সিনেমায় চেঁচামেঁচি। পুরো সিনেমাজুড়ে জাভেদ হাসান নিতুকে ধমকাধমকিই করেছেন কেবল। ‘কেন তুমি এখানে আসো?’, ‘গো, গো, গো’ ইত্যাদি। প্রেমটা যেন নিতুই গায়ে পড়ে করেছিল, ধরে-বেঁধে বিয়েটাও একাই করেছে। কিন্তু বিয়ের পরে যে বাড়িতে তারা থাকত সে বাড়ির দেয়ালে জাভেদের সঙ্গে তার বেশকিছু প্রাণোচ্ছল ছবি দেখা যায়, যার বিন্দুমাত্র ছায়াও সিনেমার কোথাও পড়েনি। যেন নিষিদ্ধ গল্প কাউকে বলা যাবে না! দর্শকও বুঝেছে জাভেদ জীবনে কোনোদিন নিতুকে ভালবাসেনি? শুধু তাড়িয়েই দিয়েছে।

অনেকেই বলছেন আগের সিনেমাগুলোর সঙ্গে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর এই সিনেমার কোনও মিলই নেই। আমি এমন মন্তব্যের প্রেক্ষিতে মনে করিয়ে দিতে চাই- সিগারেট শেয়ার করে টানতে থাকা আর চা খাওয়ার দৃশ্যে বিরক্ত দর্শকের পিঁপড়াবিদ্যায় অসীম ধৈর্য নিয়ে কান দেখার কথা কেন মনে নেই? একটা আলোচনার দৃশ্যে লম্বা সময় ধরে ক্যামেরায় একটা কান দেখাটা অত্যন্ত বিরক্তের। আমি যখন অভিনয় দেখতে চাই, অভিব্যক্তি দেখতে চাই, তখন নির্মাতা এসব না দেখিয়ে ‘গড়পড়তা’ দর্শকদের কান দেখিয়ে, সিগারেট টানা দেখিয়ে আর চায়ে চুমুক দেওয়ার দৃশ্য দেখিয়ে আমাকে নিবৃত্ত করতে চাইছেন, বিষয়টা দুঃখজনক।

আমার মতো অনেকেই আমরা সময়টা ধরতে পারিনি। ১৯৯০ সাল থেকে কখন ২০১৭ সালে এসেছে, কখন ১৯৯৬ সাল এসেছে সেটাই বুঝিনি। রিপন নাথ একজন চৌকস শব্দশিল্পী, বরাবরের মতোই অসাধারণ ছিল তার কাজ। কিন্তু অনেক জায়গায় এত সুনসান নীরবতা ছিল, এতই বেশি নৈঃশব্দ ছিল যে, ঘুমিয়ে পড়ার একটি আবহ তৈরি হয়ে গিয়েছিল। তাকে আরেকটু ছেড়ে দিয়ে কাজটা করতে দিলে বোধ হয় দৃশ্যগুলো শব্দের সঙ্গে চমৎকার একটি সম্পর্ক তৈরি করতে পারতো। ক্যামেরায় এরিয়েল শটগুলো এরিয়েল না হলে বোধ হয় মানাতো না। চোখ জুড়ানো বন্দরবানের দৃশ্য, সিনেমার শুরু আর শেষের জাহাজ-ঝড়ের দৃশ্য বিদেশি পর্যটকদের চোখে বাংলাদেশকে চেনার যথেষ্ট উপকরণ দেবে। অনেক দৃশ্যকে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়েছে, তার একটি লং শটে গাছপালা দেখানো। কাশবনে মা আর মেয়ের ফোনে কথোপকথনের দৃশ্যটা অসাধারণ ছিল। পুরো সিনেমায় এই একটি জায়গায় এসে মনে হয়েছে ‘অ্যামেইজিং’। মেক-আপ নিয়ে আরও কাজ করার ছিল। রোকেয়া প্রাচীকে মায়া করে তোলার জন্য যে মেক-আপ ওনাকে দেওয়া হয়েছে, সেটা বোধহয় তার গায়ের রঙ ঢাকবার জন্যই। একই দৃশ্যে মুখের রঙের সঙ্গে হাতের রঙের অসামঞ্জস্যতা খুব দৃষ্টিকটু লেগেছে। রোকেয়া প্রাচী গুণী শিল্পী নিঃসন্দেহে, তার অভিনয় নিয়ে কিছু বলার নেই। ইরফান খান যে কারণেই হোক চরিত্রের এপাশ-ওপাশ দিয়ে চলে গেছেন। আমাদের লেখকের মতো হয়ে উঠতে পারেননি। পার্নোর কাছে প্রত্যাশা অনেক বেশি ছিল। আমি তার অভিনয়ের ভক্ত কিন্তু ‘ডুব’এ তাকে যথেষ্ট সাবলীল মনে হয়নি। তিশার দু’তিনটে দৃশ্য হৃদয়ছোঁয়া ছিল। এমনিতে তিশার সব অভিনয় আমার কাছে একরকম লাগে, চরিত্রের সঙ্গে মানানসই হোক বা না হোক তার অভিনয় একইরকম। একেবারে শেষ দৃশ্যে জাভেদ হাসানের ছোট ছেলের হাত তুলে ক্ষমা করে দেওয়া কিসের মেটাফোর ছিল বুঝতে পারিনি।

পরিশিষ্ট: মেয়ের বান্ধবীকে বিয়ে করা, প্রথম স্ত্রীকে মানসিক যন্ত্রণায় ফেলে দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করা, দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে সমাজের চক্ষুশূল বনে যাওয়া, মৃত্যু সংক্রান্ত মিথ ও দাফন সংক্রান্ত জটিলতা ইত্যাদি বিচার করলে হুমায়ূন আহমেদের ব্যক্তিজীবনকেই দেখতে পান দর্শক। এই দিকটিকে নিজের মতো চিত্রনাট্যে রূপ দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের দ্বিতীয় স্ত্রীকে ‘বিষে ভরা নাগিন’রূপে ইতিহাসের কাছে প্রতিষ্ঠার উদ্দেশে তৈরি হয়েছে ‘ডুব’। বাংলা ট্রিবিউনেই একটি কলামে শাওনকে নিয়ে লেখা ‘তিনি পাবলিক ইন্টারেস্ট হতে পারেন, পাবলিক প্রোপার্টি নন’ বাক্যে অনেকেই আপত্তি তুলে আগে সিনেমাটি দেখার পরামর্শ দেন। সিনেমাটি দেখে এই মর্মে আমি আবার লিখলাম যে, এটি একজন লেখকের ব্যক্তিগত জীবনকে নোংরাভাবে উপস্থাপন করে নির্মাতা তার ব্যক্তিগত কোনও প্রতিশোধ নিয়েছেন। বস্তুত মানুষকে অশান্তি জিইয়ে রেখে এক সংসারেই জীবন যৌবন লগ্নি করে, নিজের সব সত্ত্বাকে বিসর্জন দিয়ে, দ্বিতীয় বিয়ে খারাপ সংশ্লিষ্ট মেসেজ দিয়ে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীকে আরও একবার অন্যের সংসার ভাঙার কারণ ও অন্যের সঙ্গে তুলনা করে নারীদের প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে ওঠার গল্প ‘ডুব’ তৈরি হয়; তা আর কাম্য নয়, হতেও পারে না। 

লেখক: সাংবাদিক

 

/এসএএস/এপিএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ