কেন এত ভারত বিরোধিতা!

Send
গোলাম মোর্তোজা
প্রকাশিত : ১৪:৪৬, নভেম্বর ২০, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:১০, নভেম্বর ২০, ২০১৭

গোলাম মোর্তোজারোহিঙ্গা ইস্যুকে কেন্দ্র করে আরও একবার ভারত বিরোধিতা দৃশ্যমান হচ্ছে বাংলাদেশে। রোহিঙ্গারা এখনই বাংলাদেশের জন্য বড় সমস্যা। সামনের দিনগুলোয় আরও বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দেবে। এ বিষয়ে প্রায় কোনও বিতর্ক নেই। প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রায় সবাই এক্ষেত্রে একমত। রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা চলছে। সেই আলোচনার কেন্দ্রে জাতিসংঘ। বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতা নিয়ে নানা প্রশ্ন-সন্দেহ বার বার সামনে আসছে। চীন- রাশিয়া-ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের কতটা সহায়তা করছে, তা নিয়ে মাঝেমধ্যেই বিতর্ক তৈরি হচ্ছে। আর এই বিতর্কের মাঝে সবচেয়ে বেশি আসছে ভারত প্রসঙ্গ। ভারত যদি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বন্ধুই হয়, তবে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের কতটা করণীয়, কতটা করছে, বাংলাদেশ সরকার কতটা প্রত্যাশা করে, বাংলাদেশের জনগণের প্রত্যাশা কতটা, কেন ভারত বিষয়ে বাংলাদেশের মানুষের মনে এত সন্দেহ, কেন মানুষ এত বিক্ষুব্ধ? ভারত বিষয়ে যত তীব্র প্রতিক্রিয়া, চীন বা রাশিয়া বিষয়ে তেমন প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না কেন?
সংক্ষিপ্ত পরিসরে একটু ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে দেখি।
১. রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের প্রস্তাবে চীন-রাশিয়া ভোট দিয়েছে মিয়ানমারের পক্ষে, বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে। ভারত সরাসরি মিয়ানমারের পক্ষে ভোট দেয়নি, নীরব থেকেছে। দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা নীরবতা পালন করেছে। অর্থাৎ তারাও বাংলাদেশের পাশে থাকেনি। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিয়েছে পাকিস্তান। প্রশ্ন উঠেছে বৈরি সম্পর্কের পাকিস্তান পক্ষে ভোট দিলো, সার্কভুক্ত এই দেশগুলো কেন বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দিলো না? চীন-রাশিয়া সরাসরি বাংলাদেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে ভোট দিলো, সেটা নিয়ে যত সমালোচনা, তার চেয়ে অনেক বেশি সমালোচনা ভারতের নীরব থাকা নিয়ে। নীরব থাকার চেয়ে বিরুদ্ধে ভোট দেওয়া নিয়ে তো বেশি বিক্ষুব্ধ হওয়ার কথা। কিন্তু তা হচ্ছে না। প্রায় সব সমালোচনা-বিক্ষুব্ধতা ভারতের বিরুদ্ধে। বলার চেষ্টা হচ্ছে, পাকিস্তানই বাংলাদেশের বন্ধু, ভারত নয়। শুধু রোহিঙ্গা ইস্যুতে অবস্থানের কারণেই এতটা ভারত বিরোধিতা? নিশ্চয়ই না।

যেসব কারণে বাংলাদেশের মানুষের ভেতরে ভারত বিরোধিতার জন্ম হয়েছে- 

ক. কেউ স্বীকার করুক বা না করুক, ধর্ম এক্ষেত্রে একটা বড় কারণ। পাকিস্তানকে এখনও বাংলাদেশের যত মানুষ বন্ধু ভাবে, তার মূল কারণ ধর্ম। ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের ঘটানো গণহত্যা, নিপীড়ন তাদের কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গা ইস্যুতে পাকিস্তান বাংলাদেশের পক্ষে ভোট দিয়েছে ভারতবিরোধী রাজনীতির বিশেষ কৌশলের কারণে, বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরূপ নয়।

খ. বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সমর্থন এবং শেষপর্যায়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ, যার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের দ্রুত স্বাধীনতা অর্জন। এ কারণে বাংলাদেশের মানুষ যেমন ভারতের প্রতি কৃতজ্ঞ, ঠিক একই কারণে কিছু মানুষ ভারতের বিরুদ্ধেও। ১৯৭১ সালে বিরুদ্ধে থাকা মানুষের সংখ্যা কম ছিল। এরপর যত সময় গেছে, তত বেড়েছে।

গ. ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর এদেশে ভারত বিরোধী রাজনীতি তীব্র হয়েছে। দৃশ্যমানভাবে সেটাই মনে হয়। বাস্তবে বঙ্গবন্ধু জীবিত থাকা অবস্থাতেই বাংলাদেশের মানুষের মনে ভারতবিরোধী অবস্থান জোরালো হতে থাকে। মুক্তিযুদ্ধের পরে মানুষের প্রত্যাশা এবং পাওয়ার সঙ্গে মিল না থাকার কারণে, বিক্ষুব্ধতা তৈরি হয়েছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত সম্পদহীন স্বাধীন ভূ-খণ্ডে মানুষের চাহিদা পূরণ অসম্ভব ছিল। মানুষ তা বোঝেনি। বোঝানোর কোনও মেকানিজমও কাজ করেনি। ভারতীয় সৈন্যরা যাওয়ার সময় সব কিছু নিয়ে গেছে, এই প্রচারণা এতটা তীব্র ছিল যে, তা মানুষের মনে স্থায়ী আসন করে নেয়। যদিও পরাজিত পাকিস্তানি বাহিনীর কিছু অস্ত্র ছাড়া ভারত অন্য কোনও সম্পদ বাংলাদেশ থেকে নিয়ে গেছে, কিছু অভিযোগ থাকলেও তার প্রমাণ পাওয়া যায় না। ভারত যে এত দ্রুত নিজেদের সৈন্য স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে সরিয়ে নিলো, তা খুব একটা আলোচনায় আসে না।

ঘ. স্বাধীন দেশের মানুষের ক্ষুধা নিবারণের সংগ্রামের সঙ্গে যোগ হয় জীবনের নিরাপত্তাহীনতা। সেই সময় জাসদ নামক ভয়ঙ্কর রাজনৈতিক দলটির জন্ম হয়। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের নামে দানবীয় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে শুরু করে জাসদ। জাসদের গণবাহিনী দমনের জন্যে বঙ্গবন্ধু সরকারের রক্ষীবাহিনীর তাণ্ডবও মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলে। বঙ্গবন্ধু সরকার ভারতের পরামর্শে সবকিছু করছিল, জাসদও তৈরি করেছে ভারতই–সত্য-মিথ্যা যাইহোক, এই গুঞ্জনও বাংলাদেশের মানুষের বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে। পাশে ছোট একটি দেশে বঙ্গবন্ধুর মতো এত বড় নেতার আরও বিশালত্বের দিকে এগিয়ে যাওয়া মেনে নিতে চায়নি ভারত, এই ধারণাও বাংলাদেশের অনেক মানুষের মনে আছে। বিএনপি মনোভাবাপন্ন প্রায় সব মানুষ বিশ্বাস করেন, জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডেও ভারতের সায় ছিল। এসবই অনুমাননির্ভর অভিযোগ, কোনোটিরই সত্যতা নিশ্চিত নয়। নিশ্চয় ইতিহাস একদিন সত্যতা নিশ্চিত করবে। কিন্তু মানুষের মনে স্থান করে নেওয়া এসব অভিযোগ দূর করার কোনও উদ্যোগ ভারত বা বাংলাদেশের সরকারকে নিতে দেখা যায় না। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনীতি প্রাতিষ্ঠানিকরণের জন্যে ভারতবিরোধিতা পরিকল্পিতভাবে সামনে আনা হয়েছিল। বাংলাদেশ বিষয়ে ভারতের ভুল নীতি এবং সেই কঠিন সময়ের আওয়ামী লীগের দুর্বল রাজনীতির সুযোগ নিয়ে তারা সফলও হয়। বঙ্গবন্ধু-আওয়ামী লীগের প্যারালাল জিয়াউর রহমান-বিএনপি দাঁড়িয়ে যায়।

বর্তমান শেখ হাসিনা সরকারের প্রথম মেয়াদের প্রথম দিকে ভারত বিরোধিতা কিছুটা কমেছিল। ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়া, তার বিনিময়ে বাংলাদেশের লাভবান হওয়ার আলোচনার বিষয়টি এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছিল। ট্রানজিটের বিনিময়ে ভারতের শুল্ক দিতে গড়িমসি আচরণ, শুরুতে ট্রানজিটের যে গুরুত্বের কথা বলা হয়েছিল পরবর্তী সময়ে তা না থাকা ও নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারতকে সর্বাত্মক সহায়তা করার পরও তিস্তা চুক্তি না হওয়া এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচনে ভারতের ভূমিকার কারণে, বিরোধিতা বাড়তে থাকে। অন্য যেকোনও সময়ের চেয়ে বাংলাদেশে এখন ভারতবিরোধিতা বেশি।

ঙ. যেসব কারণে বাংলাদেশের মানুষের ভেতরে ভারত বিরোধিতা তীব্র, তার মধ্যে অন্যতম সীমান্তে গুলি করে মানুষ হত্যা। ভারত এই বিষয়টি গুরুত্বের মধ্যেই আনতে চায় না। সীমান্তে গুলি করে বাংলাদেশের মানুষ হত্যা, ভারত ইচ্ছে করলেই বন্ধ করতে পারে।

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে চোরাচালান আছে। বিশেষ করে গরু চোরাচালান। চোরাচালানি দুই দেশেই আছে। ভারতীয় চোরাচালানিরা গরু পাঠায়, বাংলাদেশের চোরাচালানিরা গরু আনে। অভিযোগ আছে বিএসএফ-বিজিবি প্রাপ্তির বিনিময়ে সহায়তা করে। বিএসএফ চাইলে ৯৫ শতাংশ চোরাচালান বন্ধ করে দিতে পারে। গুলি করে মানুষ হত্যা না করে। প্রতিটি গরু হিসেবে বিএসএফ-বিজিবি হিস্যা পায়। হিসেবের বাইরে বাড়তি বা নজর এড়িয়ে গরু আনার চেষ্টা করলে বিএসএফ গুলি করে বাংলাদেশের চোরাচালানিদের হত্যা করে। চোরাচালন বন্ধ করার জন্যে গুলি করে বা গুলি করলে আর গরু আসে না; বিষয়টি মোটেই তেমন নয়। ভারতীয় গোয়েন্দাদের থেকে সীমান্তের সঠিক তথ্য নেতা-মন্ত্রীরা নিশ্চয়ই পেয়ে থাকেন। হত্যাকাণ্ড আর ঘটবে না, শূন্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছে, রাবার বুলেট নিক্ষেপ করা হবে, হত্যাকাণ্ড আগের চেয়ে কমেছে—এসব বক্তব্য বাংলাদেশের মানুষের বিক্ষুব্ধতা শুধু বৃদ্ধিই করছে।

বাংলাদেশ ছোট এবং দুর্বল দেশ। সেই দেশের মানুষ ভারত বিরোধী হয়ে উঠল কী উঠল না, তা হয়ত ভারতের কাছে আসলে কোনও গুরুত্বই বহন করে না।

চ. মূলত ধর্মীয় কারণে ভারতবিরোধী এবং পাকিস্তানপ্রেমী মানুষের সংখ্যাও বাংলাদেশে কম নয়। একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখার কারণেও তারা ভারতকে অপছন্দ করে। চীন মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষে থাকলেও এ বিষয়ে তাদের কোনও ক্ষোভ দেখা যায় না। তাদের যুক্তি, এখন তো চীন বাংলাদেশের কোনও ক্ষতি করছে না। চীন সরাসরি মিয়ানমারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে জাতিসংঘের প্রস্তাবে একবার ভেটো দিয়েছে। এবার মিয়ানমারের পক্ষে ভোট দিলো, তা নিয়ে প্রায় কোনও সমালোচনা নেই। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরে আসলো মূলত মিয়ানমারের পক্ষে লবিং করার জন্যে। মিয়ানমার চায় রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক আলোচনা থেকে সরে আসুক। চীন জাতিসংঘে মিয়ানমারের পক্ষে ভোট দিয়ে বাংলাদেশে এসে মিয়ানমারের পক্ষে লবিং করছে। অথচ তা নিয়ে বাংলাদেশে কোনও সমালোচনা নেই। এমন কাজ যদি ভারত করতো, সমালোচনার ঝড় বয়ে যেতো।

ছ. ‘মস্কোতে বৃষ্টি হলে ঢাকায় ছাতা ধরে’—কমিউনিস্টদের সম্পর্কে একসময় এমন মন্তব্য করা হতো। এখন বাংলাদেশে একদল মানুষ তৈরি হয়েছে, যারা ভারতের ভাষায় কথা বলে। এর মধ্যে রাজনৈতিক নেতা-মন্ত্রী, নাগরিক সমাজের অনেকে আছেন। সীমান্ত হত্যা, ট্রানজিট শুল্ক, রোহিঙ্গা ইস্যুতে তারা যে কথা বলেন, বাংলাদেশের মানুষের কাছে তা যৌক্তি কথা মনে হয় না। রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মিয়ানমারে গিয়ে সমর্থন জানিয়ে এসেছেন। ভারতের সাবেক কূটনীতিক-থিঙ্ক ট্যাংক পরিষ্কার করে বলেছে রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত কতটা কী করতে পারবে, খুব বেশি কিছু তারা করতে পারবে না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশে এসে নিজে সরাসরি কিছু বলেননি। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ‘সুষমা স্বরাজ বলেছেন, বাংলাদেশের পাশে  ভারত থাকবে।’

আর বাংলাদেশের সেই একদল মানুষ অনবরত বলে চলেছে, রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে আছে। যখন ভারতের নিরবতা দৃশ্যমান হলো, সমালোচনার মাঠ গরম করে ফেলল ভারতবিরোধীরা। সমালেচনায় যোগ দিলো, সাধারণভাবে ভারতবিরোধী নয় এমন অনেকে। ভারতের পক্ষ হয়ে দেশে যারা প্রচারণা চালাচ্ছেন, তারা আসলে ভারতের ক্ষতিই করছেন। তাদের অসত্য প্রচারণার পরিণতিতে ভারতবিরোধীরাই উপকৃত হচ্ছেন। একই রকম অসত্য প্রচারণা চালিয়ে দায়ী বাংলাদেশ সরকারও। ভারত তার নিজের স্বার্থগত কারণে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পক্ষে খুব বড়ভাবে থাকতে পারবে না, এই সত্য না বলে ‘পাশে আছে’ বলাটা বোকামিপূর্ণ রাজনীতি-কূটনীতি। বাংলাদেশের মানুষকে এটাও বোঝানো দরকার ছিল যে, ভেটো ক্ষমতাহীন ভারত যদি সরাসরি বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ায়ও, তাতেও মিয়ানমারের অবস্থানের পরিবর্তন হবে না। উল্টো মিয়ানমার আরও বেশি চীনের দিকে চলে যাবে। এতে বাংলাদেশ-ভারত কারও লাভ হবে না।

দায় আছে ভারতেরও। মিয়ানমারের পক্ষে সমর্থন অব্যাহত রেখে, বাংলাদেশের মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করছে ‘পাশে আছি’। এতেও মানুষের ক্ষোভ বাড়ছে। চীন ও ভারতের নীতিতে এখানেই বড় পার্থক্য। চীন রোহিঙ্গা ইস্যুতে পরিষ্কারভাবে মিয়ানমারের পক্ষে থাকার কথা দৃশ্যমান করেছে। তাদের আচরণে দ্বিচারিতা দেখা যায়নি। চীন ভোট যে মিয়ানমারের পক্ষে দেবে, এটা নিয়ে তেমন কোনও সন্দেহ ছিল না। বাংলাদেশের পক্ষে ভারত ভোট দেবে না, সেটাও অজানা ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার ও তাদের কিছু অনুসারী ‘পাশে থাকা’র প্রপাগান্ডা চালিয়েছে বিরতিহীনভাবে। ভারতবিরোধীরা সাধারণ মানুষের ভেতরে এখন সেই প্রচারণাটাই চালাচ্ছে।

রাশিয়াকে বাংলাদেশ এত বাণিজ্যিক সুবিধা দেওয়ার পরও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের স্বার্থ বিবেচনায়ই আনেনি রাশিয়া। এক্ষেত্রেও ‘পাশে থাকা’র অসত্য তথ্য বাংলাদেশের মানুষকে জানানো হয়েছে বার বার।

বাংলাদেশে পাকিস্তানপ্রেমীরা সরব, সরব ভারতপ্রেমীরাও। নিঃস্বার্থ বাংলাদেশপ্রেমীদের আওয়াজ তুলনামূলকভাবে কম। অথচ তারাই সংখ্যায় সবচেয়ে বেশি।

২. ভোটারবিহীন নির্বাচন ও তার পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ভারত ও চীন। ভারতের আচরণ ছিল দৃশ্যমান। চীনের আচরণ ছিল অদৃশ্য। পুরো প্রক্রিয়ায় ভারতের চেয়ে চীনের ভূমিকা কম ছিল না। ক্ষেত্র বিশেষে বেশি ছিল। বাংলাদেশের মানুষ বিক্ষুব্ধ হয়েছে ভারতের ওপর। চীনের প্রতি ক্ষোভ তৈরি হয়নি। কৌশলে ভারতের চেয়ে চীন বহুগুণ এগিয়ে থেকেছে। ভারতের নীতি বাংলাদেশের সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রাখা। চীনের কৌশলী নীতিতে সরকার জনগণ উভয়েই গুরুত্ব পেয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় আসার ক্ষেত্রে যে ভারতের ভূমিকা ছিল, তা সম্প্রতি জানা গেলো সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জীর বই থেকে। সেই সময়ের ভারতের কার্যক্রম যতটা পরিপক্ক ছিল, ২০১৪ সালে ঠিক ততটাই অপরিপক্ক।

৩. ভারতের মতো এত বৃহৎ কাছের প্রতিবেশীর সঙ্গে বাংলাদেশের জনগণের এতটা বৈরি সম্পর্ক থাকা উচিত নয়। ভারত যদি বাংলাদেশের মানুষের প্রতি আচরণে সংবেদনশীল না হয়, তবে বৈরিতার অবসান বা হ্রাস পাবে না। সরকারের চেয়ে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্ব না দিলে, ভারতবিরোধী মনোভার কমার সম্ভাবনা নেই। কয়েক’শ কোটি ডলার ঋণ দিলেই বাংলাদেশের মানুষ খুশি হবে না, বিষয়টি ভারতীয় নীতি-নির্ধারকদের উপলব্ধিতে আসা দরকার। কারণ এমন ঋণ বাংলাদেশ বহু আগে থেকে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপের কিছু দেশের থেকে পেয়ে আসছে। ফলে ভারতের ঋণ আলাদা কোনও তাৎপর্য বহন করছে না। উল্টো শর্ত ও অর্থছাড়ে অবিশ্বাস্য ধীর গতি নিয়ে সমালোচনা হচ্ছে।

বাংলাদেশের জনগণ একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ চায়, ভোট দেওয়ার অধিকার চায়। নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরা নিতে চায়। ভারতের মতো একটি গণতান্ত্রিক দেশের ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের মানুষ ভোটের অধিকার বঞ্চিত হবে, তা মানতে পারে না।

৪. বাংলাদেশ থেকে ভারত বিরোধিতা দূর করার ক্ষেত্রে ভারতকে খুব বেশি কিছু করতে হবে না। যা করতে হবে-

ক. কোনও কৌশলের আশ্রয় না নিয়ে ভারত প্রয়োজনীয় পানি বাংলাদেশকে দেবে।

খ. বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে আন্তরিকভাবে কিছু সুবিধা দেবে বাংলাদেশকে। এ ক্ষেত্রে কোনও কৌশল নেবে না। 

গ. ট্রানজিট সুবিধা নিয়ে মোটামুটি সম্মানজনক একটা শুল্ক বাংলাদেশকে দেবে। যা দেওয়া ভারতের জন্যে কোনও ব্যাপারই না।

ঘ. বাংলাদেশের মানুষের ভোটের অধিকার ভারত প্রতিষ্ঠা করে দেবে, বিষয়টি তেমন নয়। বিষয়টি এমন, ভোটারবিহীন নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে ভারত ভূমিকা রাখবে না। শক্তিশালী গণতন্ত্র ও প্রতিষ্ঠানের দেশ ভারত, বাংলাদেশের গণতন্ত্রে উত্তরণ ও প্রতিষ্ঠান তৈরিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র থাকলে, জঙ্গি-সন্ত্রাসী কোনও কিছু নিয়ে ভয়ে থাকতে হবে না ভারতকে। সম্পর্ক শুধু সরকারের সঙ্গে নয়, জনগণও গুরুত্বপূর্ণ—বিষয়টি দৃশ্যমান করতে হবে।

ঙ. কৌশলী কথা না বলে সীমান্তে গুলি করে বাংলাদেশের মানুষ হত্যা বন্ধ করতে হবে। আর বাংলাদেশের যেসব মানুষ ভারতের পক্ষ নিয়ে অসত্য তথ্য দিয়ে প্রচারণা চালায়, তা দেশের মানুষ প্রপাগান্ডা মনে করে, এতে লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি হয়। বিষয়েটি ভারতকে ভেবে দেখতে হবে।

লেখক: সম্পাদক, সাপ্তাহিক

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ