আমি, মেয়র ও মিডিয়া

Send
নাদীম কাদির
প্রকাশিত : ১৩:০৯, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:১০, ডিসেম্বর ০৮, ২০১৭

 

নাদীম কাদিরআনিসুল হক সম্ভবত ঢাকার সবচেয়ে সফল ও জনপ্রিয় মেয়র। সম্প্রতি তিনি সবার কাছ থেকে চিরবিদায় নিয়েছেন। সত্যি! চলে গেছেন সবাইকে ছেড়ে!
চলতি বছর আগস্টেই আমি তার স্ত্রী রুবানা হকের কাছ থেকে ফোন পাই। তিনি লন্ডনে একটি বগি গাড়ির ব্যবস্থা করার জন্য আমাকে অনুরোধ করেন। তিনি জানান, মেয়রের শরীর খুব খারাপ। আনিসুল হক নিজেই আমাকে জানান যে, তার হুইলচেয়ার পছন্দ না। তাই বগি গাড়িই দরকার।
এই দম্পতির সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব অনেক দিনের। তাই লন্ডন আসলেই আমার সঙ্গে দেখা করেন। কোনও অফিস কিংবা ব্যবসার কাজে নয় বরং লাঞ্চ বা ডিনারেই বসতাম আমরা। আনিসুল হক লন্ডনে বাংলাদেশি দূতাবাস থেকে কোনও রকম প্রটোকল নিতেন না।
সেদিন যখন তিনি আমার কাছে সাহায্য চাইলেন আমি তখন বাইরে ছিলাম। আমার সহকর্মীকে সব ব্যবস্থা করতে বললাম। তারাই তাকে বিমানবন্দরে স্বাগত জানালো। আবেদিন আমাকে জানালো আনিসুল হক খুবই অসুস্থ।
মেডিক্যাল চেকআপ ও বড় মেয়ের প্রথম সন্তানের জন্ম উপলক্ষেই লন্ডনে আসেন আনিসুল হক। এর আগে ঢাকায় একটি ডায়াগনসিস করিয়েছিলেন তিনি।
মেয়ের সন্তান হওয়ার কিছুদিন পরই আনিসুল হককে বিশ্বের অন্যতম সেরা নিউরো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার ভর্তি হওয়ার খবর বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সবাই তার স্বাস্থ্যের খোঁজ নিতে শুরু করেন। তার স্ত্রী প্রতিদিন বিবৃতি দিতে চাননি। আর এমন পরিস্থিতিতে এটা খুবই স্বাভাবিক।

আমি সবসময় রুবানা হককে অনুরোধ করতাম ‘ক্ষুধার্ত’ সংবাদমাধ্যমকে তথ্য দিতে। কারণ আনিসুল হককে সবাই ভালোবাসে। আমরা বেশ কয়েকদিন এই চেষ্টা করি। কিন্তু একটা সময় কোনও অজ্ঞাত কারণে আমাকে এই বিষয়ে কথা না বলার নির্দেশ দেওয়া হয় হাইকমিশন থেকে। আমিও মেনে নেই। কারণ আমি আমার অবস্থান ঠিক ভাবলেও অভিযোগ আসতেই পারে।

দুঃখজনকভাবে তখনও অনেক সাংবাদিক বন্ধু আমাকে জিজ্ঞাসা করতে থাকেন যে, ‘তিনি কি মারা গেছেন?’  তারা আনিসুল হককে এতো ভালোবাসে, তারপরও কেন জিজ্ঞাসা করলো না যে ‘তিনি কি সুস্থ হচ্ছেন?’। তার পরিবার খুব কষ্ট পেয়েছিল। তারপরও চুপ থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন রুবানা।

এরপর যখন তিনি ঘুমানো শুরু করলেন এবং জীবনের আশা প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল তখন তার ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র’ নিয়ে গুঞ্জন ওঠে।

এরপর ‘আসলেই’ মারা গেলেন আনিসুল হক। মিডিয়া অনেকদিন ধরে যেমন খুঁজছিলো সেই সংবাদ পেয়ে গেলো। কিন্তু একদিন পর আমি একটি কথা শুনে বিস্মিত হয়ে যাই। একজন সাংবাদিক আমাকে বলেন যে, আনিসুল হক আগেই মারা গিয়েছিলেন। প্রকাশ করা হয়েছে দেরিতে।

যখন এই গুজব তুঙ্গে, তখন আমি তার বড় ছেলেকে বার্তা পাঠাই। তিনি আমাকে বলেন, ‘আঙ্কেল সালাম, এখন শুধু প্রার্থনা ছাড়া কিছু করার নেই। আব্বু যে কোনও সময় আমাদের ছেড়ে চলে যাবেন।’ বাংলাদেশ সময় তখন বাজে রাত ৯টা ৫৪। চিকিৎসকরাও তখন হাল ছেড়ে দেন।

আমরা আনিসুল হকের পরিবারের ব্যক্তিগত বিষয় ও দুঃখ বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি। আমি খুব লজ্জিত।

আনিসুল হক ছিলেন একজন অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি। সে তুলনায় আমি নগণ্য।

যাইহোক একজন সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে সঠিক তথ্য দেওয়ার বা বলার বিষয়ে আমার সীমাবদ্ধতার প্রতি আমার মিডিয়ার বন্ধুরা নিষ্ঠুর ছিলেন। এসব প্রতিবেদন আমাকে খুবই ব্যথিত করেছে। তারা কতটা অপেশাদারিত্ব দেখিয়েছে দেখিয়েছে আশা করি ভবিষ্যতে এই বিষয়ে আলাদা করে লিখবো।

লন্ডনে বাংলা মিডিয়াতে (একটি ছাড়া যেটির সম্পাদক আমাকে ঘৃণা করেন) আমার সহকর্মীরা এটি উপেক্ষা করেছেন। শুধু আমার সঙ্গে তাদের বন্ধুত্বের কারণেই নয়; বরং তারা বুঝতে পেরেছিল যে, এটা কিভাবে ঘটছে এবং মন্তব্য করা থেকে বিরত থেকেছে। ধন্যবাদ তাদের।

এখানে আমার বন্ধুদের ডেডলাইন ও প্রতিযোগিতা থাকবে। কিন্তু একইসঙ্গে প্রতিবেদন তৈরির আগে আমাদের দায়বদ্ধতা থাকতে হবে এবং প্রতিটি পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে হবে।

আমার খুব প্রিয় ‘আনিস ভাই’– একজন মহৎ বড় ভাই এবং মহৎ উচ্চতার একজন বন্ধু। স্বর্গে শাশ্বত শান্তিতে বিশ্রাম নিন। তার পরিবার যেন এই অসহনীয় ক্ষতি মোকাবিলা করতে পারে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ