ভয়াবহ নারীবিদ্বেষ

Send
তসলিমা নাসরিন
প্রকাশিত : ১৬:২০, ডিসেম্বর ১৮, ২০১৭ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৩৮, ফেব্রুয়ারি ০৭, ২০১৮

তসলিমা নাসরিনবাংলাদেশ থেকে দুঃখের খবর প্রচুর আসে। আজ এসেছে ভাস্কর্য ভাঙ্গার খবর। দুজন পুরুষ ও একজন নারী-মুক্তিযোদ্ধার ভাস্কর্য থেকে নারীটিকে ভেঙ্গে পুরুষ বানিয়ে দেওয়ার খবর। কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে ভাস্কর্যটি বানানোর জন্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা খরচ হচ্ছে। একইরকম ভাস্কর্য করিমগঞ্জে বানানো হয়েছে, কিন্তু সেখানে কেউ ঘেউ ঘেউ করেনি। করেছে তাড়াইলে। করেছে তাড়াইল-সাচাইল দারুল হুদা কাছিমুল উলুম নামের একটি মাদ্রাসা আর একটি মসজিদ। এরাই ভাস্কর্য নির্মাণ চায় না। এরা চায় না বলে ভাস্কর্যের শরীর থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে নারীকে।
তাড়াইল-সাচাইল দারুল হুদা কাছিমুল উলুম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা ফয়েজ উদ্দিন বলেছেন, ‘এখানে ভাস্কর্যের নামে যে মূর্তি বানানো হচ্ছে, তা আমাদের মাদ্রাসা থেকে স্পষ্ট দেখা যায়। বিশেষ করে নারী মূর্তিটি মাদ্রাসার দিকে ফেরানো। আমাদের দাবি ছিল ভাস্কর্যটিই যেন এখান থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। কিন্তু সেটি না করে প্রশাসন শুধু নারী মূর্তিটিকে পুরুষ বানানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এতে আমাদের দাবি কিছুটা হলেও পূরণ হয়েছে।’

নারীমুর্তিকে পুরুষ বানানোর জন্য জেলা পরিষদ থেকে কোনও লিখিত নির্দেশ আসেনি, নির্দেশ এসেছে তাড়াইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আর  উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছ থেকে। প্রশাসনের চাপে ভাস্কর্যের নারীকে পুরুষে রূপান্তরিত করা হয়েছে। ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে কোনও আন্দোলন হওয়ার আগেই প্রশাসন  ব্যবস্থা নিয়েছে। যারা অন্যায় করে, তাদের সঙ্গে আপস করাটাকেই প্রশাসনের লোকেরা শ্রেয় মনে করেছে।  তার চেয়ে কোনও একটা নোটিশ ঝুলিয়ে দেওয়া কি ভালো ছিল না, ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে কারও রংবাজি আর  ভায়োলেন্সবাজি অ্যালাও করা হবে না?

সেদিন শুনেছি শস্যক্ষেতে নারীর প্রবেশ নিষেধ করে দিয়েছে দেশের মোল্লা মুফতিরা। আজই  আবার  সিলেটের চৌহাট্টা এলাকায় আলিয়া মাদ্রাসার ছাত্ররা গিয়ে মেয়েদের একটি শৌচালয় ভেঙে দিয়েছে, মাদ্রাসার আশেপাশে  নাকি মেয়েদের শৌচালয় থাকতে নেই। ভাস্কর্য থেকে নারী-মুক্তিযোদ্ধাকে বাদ দেওয়া হয়েছে  মাদ্রাসা আর মসজিদ কমিটির আপত্তিতে। নারীর ভাস্কর্যে চোখ পড়ুক তারা তা চায় না। নারীর শরীরে বা ভাস্কর্যে, বা ফটোতে, ছবিতে চোখ পড়লে ওদের সমস্যা হয় কেন। ওরা বলে নারী শস্যক্ষেতে প্রবেশ করলে  শস্যের ক্ষতি হয়, নারীরা পুরুষের চোখের সামনে পড়লে পুরুষের সমস্যা হয়। তার মানে নারীর মতো বদ জিনিস আর কিছু নেই। সকল নষ্টের মূল নারী। সত্যি বলতে কী, নারীকে প্রচণ্ড ঘৃণা করলেই এমন কুৎসিত ভাবনা আসে। কেন ধর্মীয় মৌলবাদিরাই সবচেয়ে বেশী ঘৃণা করে নারীকে, কেউ কি ভেবে দেখেছে? তাহলে কি আমাদের ভেবে নিতে হবে ধর্ম বলেছে নারীকে ঘৃণা করতে? ধর্মীয় আইন থাকলে কেন আমরা বলি আইন বদলাতে, কেন সমানাধিকারের ভিত্তিতে তৈরি আধুনিক আইনের দাবি করি? তবে কি ধর্মীয় আইন নারীকে তার প্রাপ্য সম্মান দেয় না? ধর্ম যদি প্রাপ্য সম্মান দেয়, তাহলে ধর্মীয় আইন দেবে না কেন? ঈশ্বর বা ভগবান বা আল্লাহ কি তাহলে নারী আর পুরুষকে সমান চোখে দেখেন না? যে দেশগুলোয় ধর্মীয় আইন আছে, সে দেশগুলোয়, ধর্মীয় আইন নেই এমন দেশগুলোর তুলনায় মেয়েরা বেশি নির্যাতিত। যদি ধর্ম, ধর্মীয় আইন, ধার্মিক, ধর্মীয় মৌলবাদ সকলে মেয়েদের সমানাধিকারের বিরুদ্ধে  সরব হয়, তাহলে সেই ধর্ম নিয়ে যেমন বিতর্কের  প্রয়োজন আছে, ধর্মীয় বা শরিয়া আইনকে মানুষের মঙ্গলের জন্য বিদেয় করার প্রয়োজন আছে।  ধার্মিক বা ধর্মীয় মৌলবাদীদের তো বিদেয় করা যাবে না। তাদের পরিবর্তন করতে হবে, শিক্ষিত করতে হবে। যে করেই হোক ওদের নারীবিদ্বেষ দূর করতে হবে।

এ পর্যন্ত নারীর সমানাধিকারের জন্য যে পুরুষেরা কথা বলেছে, তারা সবাই বিজ্ঞানমনস্ক, মানবাধিকারে, গণতন্ত্রে, মুক্তচিন্তায় বিশ্বাসী মানুষ। মুফতি, মোল্লা, মৌলানারা এ পর্যন্ত নারীর অধিকারে বাগড়া দেওয়া ছাড়া নারীর ভালোর জন্য কিছু করেনি। ফতোয়া দিয়ে বেড়ায় মেয়েদের বিরুদ্ধে- মোবাইল ব্যবহার করা চলবে না, বেপর্দা বের হওয়া চলবে না, ইস্কুল কলেজে পড়া চলবে না, চাকরি বাকরি চলবে না, প্রেম করা চলবে না, সেক্স চলবে না, চুল দেখানো চলবে না, জিন্স পরা চলবে না, পরপুরুষের সঙ্গে মেলামেশা চলবে না, ঘর সংসারে অমনোযোগী হওয়া চলবে না। এই চলবে না’র অন্তঃ নেই। তার ওপর তো আছেই, এই মেয়েকে পুড়িয়ে মারো, ওই মেয়েকে দোররা মারো, সেই মেয়েকে পাথর ছুঁড়ে মারো।

মুফতি মোল্লারা বহাল তবিয়তে আছে। ঘৃণা ছড়াচ্ছে, ভয় ছিটোচ্ছে, কিন্তু ওপরতলা থেকে নিচতলা – সব তলা থেকেই সম্মান পাচ্ছে। আজকের এই আধুনিক সমাজে প্রচণ্ড নারীবিরোধী হয়েও কী দিব্যি ছড়ি ঘোরানো যায়! কিন্তু তা কি হতে দেওয়া উচিত। তারা কেন সরকারি সিদ্ধান্তে গড়ে ওঠা নারীর ভাস্কর্য আর নারীর শৌচালয় ভেঙ্গে ফেলতে পারে? নারীকে অপদস্থ করা, অপমান করা, অবদমন করা, অত্যাচার করার কেন কোনও বিচার নেই কোথাও? আসলে আমাদের যারা বিচারক, যারা আমাদের শাসক, যারা বসে আছেন মাথার ওপর,তারাই বিশ্বাস করে নারীর মান মর্যাদাকে পায়ে মাড়ানো অন্যায় কোনও কাজ নয়।

এখনও সমাজের মানুষ নারীকে আস্ত একটি যৌনাঙ্গ বলে মনে করে। তার আর কোনও পরিচয় স্বীকার করা হয় না। নারী আস্ত যৌনাঙ্গ, যৌনাঙ্গকে বোরখা বা হিজাব দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়, কারণ যৌনাঙ্গের মালিক-পুরুষটি একে ভোগ করবে একা একা। কারও নজর পড়েনি এমন যৌনাঙ্গই সে ভোগ করতে চায়। নারী আস্ত যৌনাঙ্গ বলেই মসজিদের সামনে থেকে নারীর ভাস্কর্য সরিয়ে ফেলা হয়, কারণ নামাজিরা যদি চোখের সামনে নারীর ভাস্কর্য দেখে, যেহেতু নারী মানেই যৌনাঙ্গ, তাদের পুরুষাঙ্গ উত্থিত হবে, পুরুষাঙ্গ উত্থিত হলে তাদের নামাজ কবুল হবে না। মাদ্রাসার সামনে নারীদের শৌচালয় দেখলেও ওই একই উত্থান ঘটবে পুরুষের শরীরে।  

নারীকে যৌনাঙ্গ মনে করলেই সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। নারীকে যৌনাঙ্গ মনে না করলেই নারীর স্বাধীনতার পথে কেউ বাধা হবে না, সমানাধিকার পেতে নারীর কোনও অসুবিধে হবে না, নারীর মান মর্যাদা নষ্ট হবে না। নারীকে যৌনাঙ্গ মনে করা হয় বলেই নারীকে মানুষ হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয় না, নারীকে ইতরশ্রেণীর জীব বলে গণ্য করা হয়। পুরুষেরা নারীকে যৌনাঙ্গ ভাবা বন্ধ না করলে নারীর সমানাধিকারের জন্য হাজার বছর চিৎকার করলেও কোনও লাভ নেই।

পুরুষের চোখে কোনও নারী ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার বা বিজ্ঞানী বা শিক্ষিকা বা শ্রমিক নয়, কোনও নারী ইস্কুল ছাত্রী বা কলেজ ছাত্রী নয়, পুরুষের চোখে সব নারীই আস্ত যৌনাঙ্গ। কিছু পুরুষ বলবে, ‘সব পুরুষ এক নয়, আমরা নারীকে যৌনাঙ্গ হিসেবে দেখি না’। আমার এখনও এমন পুরুষের সঙ্গে দেখা হওয়া বাকি আছে। এমন মহা-পুরুষ নিশ্চয়ই আছেন কোথাও।

লেখক: কলামিস্ট।

 

এফএএন

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ