বঙ্গবন্ধুর ফিরে আসা এবং অজানা ১৬ ডিসেম্বর-৭ জানুয়ারি

Send
গোলাম মোর্তোজা
প্রকাশিত : ১৬:১৪, জানুয়ারি ১১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:১৬, জানুয়ারি ১১, ২০১৮

গোলাম মোর্তোজাবাংলাদেশের ইতিহাসের স্মরণীয় বা আবেগী তারিখগুলোর মধ্যে ১০ জানুয়ারি অন্যতম। কারোরই অজানা নয় যে, এদিন বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে এসেছিলেন। সেই সময়টাতে কতটা আবেগঘন পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, আমার ধারণা তা লিখে বোঝানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। যদিও প্রতিবছর ১০ জানুয়ারি উপলক্ষে যত লেখা প্রকাশিত হয়, তার প্রায় সবাই আবেগঘন স্মৃতিচারণ। স্মৃতিচারণমূলক এই লেখাগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই লেখাগুলো একটু মনোযোগ দিয়ে পড়লে, আলোচনা শুনলে বোঝা যায়, বেশ কিছু বিষয় নিয়ে এখনও বিভ্রান্তি আছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ৭ জানুয়ারি পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কী ঘটেছিল? জানা যায় কিছু কিছু। তবে সব তথ্য একরকম নয়, এটা একটা দিক। আরেকটি দিক আলোচনা করার সময় এই ২০ বা ২১ দিন ইতিহাস থেকে প্রায় ডিলিট করে দেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর ফেরার দিন ১০ জানুয়ারির অনুষ্ঠান পালনের পরের দিন খুঁজে দেখার চেষ্টা করব সেই সময়টাকে।
১. ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধুকে ৩২ নম্বর থেকে গ্রেফতার করে পাকিস্তানিরা। ড. কামাল হোসেন গ্রেফতার হন ৪ এপ্রিল লালমাটিয়াতে, তার এক আত্মীয়ের বাসা থেকে। ৫ এপ্রিল ড. কামাল হোসেনকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সদস্যরা ড. কামালকে বলে, তোমাদের লিডারকে পশ্চিম পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ঠিক কবে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তারিখ নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। তারিখটা ২৮ মার্চ থেকে ১ এপ্রিলের মধ্যে হবে।
১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। বঙ্গবন্ধু এবং ড. কামাল হোসেন পাকিস্তানের কারাগারে। ড. কামাল হোসেনের শ্বশুরবাড়ি করাচি এবং তার স্ত্রী তখন করাচিতে। সেই কারণে ড. কামালের পরিবার জানতেন যে, তিনি জেলে আছেন। বঙ্গবন্ধুর স্ত্রী-সন্তানদের কয়েকজন ঢাকায় গৃহবন্দি, শেখ কামাল ভারতে অবস্থান করে জেনারেল ওসমানির এডিসি হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা রাখছেন। তাজউদ্দীন আহমদের নেতৃত্বাধীন প্রথম বাংলাদেশ সরকার, আওয়ামী লীগের অন্যান্য নেতা, ভারত সরকার, কেউই জানেন না যে বঙ্গবন্ধুর ভাগ্যে কী ঘটেছে। তিনি পাকিস্তানের কারাগারে আছেন, নাকি ইতিমধ্যে হত্যা করা হয়েছে- কোনও তথ্য নেই কারও কাছে। অথচ বঙ্গবন্ধুর নামে তাজউদ্দীন আহমদের মতো বিচক্ষণ নেতার নেতৃত্বে যুদ্ধ করে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে। বাংলাদেশ, ভারতের মতো সারা পৃথিবী তখন জানার জন্যে অপেক্ষা করছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কোথায় আছেন, কেমন আছেন।
২. এতক্ষণ যা লিখলাম, এখন যা লিখব- তা ড. কামাল হোসেনের দীর্ঘ সাক্ষাৎকারের ভাষ্য। নিউজ ম্যাগাজিন ‘সাপ্তাহিক’কে কয়েক পর্বে দেওয়া তার দীর্ঘ একটি সাক্ষাৎকারে এই ইতিহাসের বিস্তারিত বলেছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান থেকেও অনেক বই প্রকাশিত হয়েছে। সেসবের ছায়াও নিশ্চয় এই লেখায় স্থান পেয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর থেকে ৭ জানুয়ারির ইতিহাস আওয়ামী লীগের দু’একজন নেতা কিছু লিখেছেন, সেই সময়ে লন্ডনে থাকা কূটনীতিকদের কেউ কেউ লিখেছেন। বর্তমান বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদও আংশিক লিখেছেন। আওয়ামী লীগের প্রবীণ দু’একজন নেতা যা লিখেছেন, তা অন্যদের থেকে শুনে লিখেছেন। তরুণ নেতা হিসেবে ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুর কাছে অত্যধিক গুরুত্ব পাওয়ায়, সিনিয়র নেতাদের অনেকে খুশি ছিলেন না কামাল হোসেনের ওপর। তাদের ‘শুনে লেখা ইতিহাসে’ তার প্রমাণ রয়ে গেছে। তাদের কেউ কেউ লিখেছেন, ড. কামাল গ্রেফতার হননি, স্বেচ্ছায় করাচি গিয়ে তার শ্বশুরবাড়িতে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, এই তথ্য পুরোপুরি অসত্য। ড. কামাল গ্রেফতার হয়েছিলেন, পাকিস্তানের কারাগারে ছিলেন, সেটাই সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
লন্ডনে থাকা কূটনীতিকরা ইতিহাসের এই অংশটা জানেন, ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ও ড. কামাল হোসেন লন্ডনে পৌঁছানোর পরে। হয়তো তারা বঙ্গবন্ধুর থেকে তখন কিছু শুনেছিলেন। লন্ডনে বঙ্গবন্ধুর এত অল্প কিন্তু ব্যস্ত সময়ে কতটা বলেছিলেন বা বলার মতো পরিবেশ ছিল, সেটা এক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাদের যারা লিখেছেন, বঙ্গবন্ধু লন্ডনে এসে প্রথম জানলেন বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে গেছে, এই তথ্য বিশ্বাস করার সামান্যতম কোনও যৌক্তিক কারণও নেই।
আওয়ামী লীগ নেতা, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ এই ইতিহাস যতটা লিখেছেন, তার থেকে মুখে যতটা শুনেছি- তা বিশ্বাসযোগ্য বলেই মনে হয়। তার বর্ণনার সঙ্গে ড. কামালের বর্ণনার মিল আছে। তোফায়েল আহমেদ বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ইসলামী সম্মেলনে গেছেন। বঙ্গবন্ধুর থেকে জেনেছেন, পাকিস্তানের অনেকের থেকে জেনেছেন। ড. কামাল কিছু ঘটনার কেন্দ্রে ছিলেন। কিছু বঙ্গবন্ধুর থেকে শুনেছেন এবং সেই সময় পাকিস্তানে বঙ্গবন্ধু ও ড. কামাল ছাড়া আর কেউ সেখানে ছিলেন না। সুতরাং অন্য যে কারও চেয়ে ড. কামাল হোসেন দেখা এবং জানা ১৬ ডিসেম্বর থেকে ৭ জানুয়ারির ইতিহাস বিশ্বাসযোগ্য, গ্রহণযোগ্য।

৩. বঙ্গবন্ধুকে রাখা হয়েছিল পশ্চিম পাকিস্তানের ফ্রন্টিয়ার প্রদেশের মিয়ানওয়ালি জেলে। কিভাবে নেওয়া হয়েছিল, বিশেষ কিছু জানা যায় না।

ড. কামালকে প্লেনে ঢাকা থেকে করাচি, করাচি থেকে আরেকটা প্লেনে রাওয়ালপিন্ডি। সেখান থেকে মাইক্রোবাসে ঘণ্টা তিনেকের দূরত্ব হরিপুর সেন্ট্রাল জেলে। পাকিস্তানের সেই সময়ের বার কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আবরার সিকান্দার খান কারাগারে ড. কামাল হোসেনকে বিস্কুটের টিন পাঠিয়েছিলেন। কারা কর্তৃপক্ষ তা ড. কামালকে দিয়েছে ১৬ ডিসেম্বরের পরে। গ্রেফতার হওয়ার সময় ড. কামালের কাছে পাঁচ ছয়’শ টাকা ছিল। জেল থেকে বের হওয়ার সময় স্বাক্ষর করে তিনি সেই টাকা ফেরত নেন। তার স্ত্রী কয়েকটি বই পাঠিয়েছিলেন, সেই বইও মুক্তির সময়ে তাকে দেওয়া হয়। ড. কামাল হোসেন যে হরিপুরের এই জেলে ছিলেন, এসব তথ্যও তার প্রমাণ।
১৬ ডিসেম্বর থেকে হরিপুর কারা কর্তৃপক্ষের আচরণে পরিবর্তন আসে। জেল সুপারিনটেন্ডেন্ট ড. কামাল হোসেনকে জেলের বিভিন্ন অংশ ঘুরিয়ে দেখান। খাবারের মান উন্নত হলো। আগে কোনও কথা বলতেন না, এখন প্রায়ই কথা বলতে শুরু করলেন। ১৬ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত এমন চলল। কিন্তু বাইরের কোনও খবর তখনও তাকে জানানো হলো না। পত্রিকা পড়ার সুযোগ তখনও দেওয়া হয়নি।
২৮ ডিসেম্বর সকালে ড. কামাল হোসেনকে মুক্তির বিষয়টি জানানো হয়। মুক্তি মানে তাকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়া হবে। সেদিনই সন্ধ্যার দিকে দু’জন এসে ড. কামালকে নিয়ে ভক্সওয়াগন গাড়িতে করে রওনা দিলেন। পেছনে মিলিটারি ট্রাক। কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, জানেন না ড. কামাল। আমরা কোথায় যাচ্ছি- ড. কামালের এই প্রশ্নের উত্তরে তারা শুধু বললেন, ‘ইউ উইল লাইক ইট’।
গাড়ি রাওয়ালপিন্ডিতে ঢুকলো। পেশোয়ার টু রাওয়ালপিন্ডি রোড, যা ড. কামালের চেনা ছিল। ধারণা করছিলেন রাওয়ালপিন্ডি বা ইসলামাবাদ নিয়ে যাবে হয়তো। না, রাওয়ালপিন্ডি থেকে গাড়ি বেরিয়ে গেলো। ৪০ মিনিট মতো চলার পর বামদিকে মোড় নিল। কাঁচা রাস্তা, গাছপালা। অন্ধকার হয়ে গেছে। মেশিনগ্যান নিয়ে সামরিক বাহিনীর সদস্যরা গাড়ির কাছে এগিয়ে এলো। তারপর সিগন্যাল দিল, গাড়ি সামনে এগিয়ে ডাকবাংলোর সামনে থামলো। একজন অফিসার এসে ড. কামালকে বললেন, ‘আই এম কর্নেল আবদুল্লাহ, প্লিজ কাম ইনসাইড।’
নাটকীয় পরিবেশ। বসার ঘর, একটা ছোট প্যাসেজ। দুই পাশে রুম। রুমগুলোতে নাম্বার দেওয়া। কর্নেল আবদুল্লাহ বললেন, ‘হোয়াই ডোন্ট ইউ গো ইন রুম নম্বর ওয়ান?’
ড. কামাল ১ নম্বর রুম খুলেই দেখেন বঙ্গবন্ধু দাঁড়িয়ে আছেন। ড্রেসিং গাউন পরিহিত বঙ্গবন্ধু ড. কামাল হোসেনকে জড়িয়ে ধরলেন। সে এক আবেগঘন পরিবেশ!
৪. ড. কামাল হোসেনকে এই ডাকবাংলোতে আনা হলো ২৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায়। বঙ্গবন্ধু ড. কামালকে বললেন, তাকে আনা হয়েছে ৩ দিন আগে। তার মানে ২৬ ডিসেম্বর।
বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, বঙ্গবন্ধু তা জেনেছেন মিয়ানওয়ালি জেলেই। পাঞ্জাবের অধিবাসী ডিআইজি আবদুর রহমানের তত্ত্বাবধানে মিয়ানওয়ালি জেলে ছিলেন বঙ্গবন্ধু। মিয়ানওয়ালি ছিল জেনারেল নিয়াজির জন্মস্থান। ডিআইজি আবদুর রহমান ১৬ ডিসেম্বরের পরে বঙ্গবন্ধুকে বলেন, দেখেন কারাগারের ভেতরের অবস্থা খুব খারাপ। জেনারেল নিয়াজি ঢাকায় আত্মসমর্পণ করেছে। এটা মিয়ানওয়ালিবাসীর জন্যে খুব অপমানজনক, অসম্মানজনক। তারা প্রতিশোধের কথা ভাবছে।
ডিআইজি আবদুর রহমান মিয়ানওয়ালি জেল থেকে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গেলেন ‘চশমাব্যারাজ’-এ। সেই সময়ের পাকিস্তান সরকার ডিআইজি আবদুর রহমানকে দিয়ে কাজটি করিয়েছিলেন। ড. কামাল হোসেন বলেছেন, সেখানে একটি ডাকবাংলোতে রাখা হয় বঙ্গবন্ধুকে। তোফায়েল আহমদ লিখেছেন, মিয়ানওয়ালি জেল সুপার হাবীব আলীর চশমাব্যারাজ বাসভবনে রাখা হয় বঙ্গবন্ধুকে। ডাকবাংলো বা হাবীব আলীর বাসভবন, যেখানেই হোক বঙ্গবন্ধুকে যে চশমাব্যারাজে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, এই তথ্য মিলে যায় দু’জনের কথা থেকেই। ডিসেম্বরের কয় তারিখে বঙ্গবন্ধুকে জেল থেকে বের করা হলো, চশমাব্যারাজে কয়দিন তাকে রাখা হলো? তারিখের উল্লেখ কোথাও পাওয়া যায় না। ড. কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, দুই-চার দিন সেখানে রাখা হয়েছিল।
বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের যে ডাকবাংলোতে দেখা হয়েছে, সেখানে কামাল হোসেনকে আনা হয়েছিল ২৮ ডিসেম্বর, বঙ্গবন্ধুকে আনা হয়েছিল তার তিন দিন আগে ২৬ ডিসেম্বর। যদি চশমাব্যারাজে বঙ্গবন্ধু ২ দিন থাকেন, তাহলে তাকে জেল থেকে বের করা হয়েছিল ২৪ ডিসেম্বর, ৪ দিন থাকলে ২২ ডিসেম্বর।
পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগার, চশমাব্যারাজের ডাকবাংলো বা হাবীব আলীর বাড়ির নথি যদি এখনও থেকে থাকে, কেউ যদি সত্যিকারের গবেষণা করেন, হয়তো নিশ্চিত তথ্য জানা সম্ভব।
৫. চশমাব্যারাজ থেকে হেলিকপ্টারে করে বঙ্গবন্ধুকে এই ডাকবাংলোতে আনা হয়। এখানে ভুট্টো দেখা করতে এসেছিলেন। ডাকবাংলোতে বঙ্গবন্ধুকে পত্রিকা দেওয়া শুরু হয়। বঙ্গবন্ধু ড. কামাল হোসেনকে বলেন, ভুট্টো দেখা করতে এসেছিল। তাকে আমি বললাম, ‘তুমি কি বন্দি অবস্থায় এসেছ?’ ভুট্টো বলল, ‘না না আমি তো এখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট।’
বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, তুমি প্রেসিডেন্ট হলে কী করে? নির্বাচনে আমি তো তোমার চেয়ে দ্বিগুণের বেশি আসন পেয়েছিলাম।
বঙ্গবন্ধুর উদ্ধৃতি দিয়ে ড. কামাল বলছেন, এতে ভুট্টো একটু লজ্জা পেয়ে যায়। তারপর বঙ্গবন্ধু পরিস্থিতি সামলে নিয়ে বলেন, যাই হোক এখন আমি কত দ্রুত বাংলাদেশে ফিরে যেতে পারব, সেটা বলো। উত্তরে ভুট্টো বলেছিলেন, একটু সময় লাগবে। ভারতের ওপর দিয়ে আমাদের প্লেন যাতায়াত বন্ধ। বঙ্গবন্ধু ইউএন প্লেনের প্রসঙ্গ এনেছিলেন। এই পর্যায়ে ভুট্টোকে বঙ্গবন্ধু বলেন, ড. কামাল হোসেনও এখানে আছে, তোমাদের কোনো একটা জেলে। ভুট্টো প্রশ্ন করে, কিভাবে জানলেন? বঙ্গবন্ধু বলেন, আমার ট্রায়াল চলার সময় পাকিস্তানের প্রখ্যাত আইনজীবী এসএ ব্রোহী বলেছিলেন, এই ট্রায়াল শেষ করে আমি ড. কামালের ট্রায়ালে যাব। কথাটা আমার কানে এসেছিল।
বঙ্গবন্ধুর কথা অনুযায়ী ড. কামালকে এখানে আনার ব্যবস্থা করেন ভুট্টো।
ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, তিনি যখন ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করেন, ইয়াহিয়া খান তখন ভুট্টোকে বলেছিল, আমি তোমর হাতে দায়িত্ব দিচ্ছি, তবে আমার একটা অনুরোধ তুমি শেখ মুজিবের ফাঁসি কার্যকর করে দিও। ভুট্টো ইয়াহিয়াকে বলেছিলেন, তুমি ইতিমধ্যে অনেক ক্ষতি করেছ, আর ক্ষতি করার দরকার নেই। বঙ্গবন্ধুর ধারণা ছিল, ভুট্টো তাকে খুশি করার জন্যেই এ কথা বলেছিল।
৬. ভুট্টো সরকারের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে ফেরার আলোচনা চলতে থাকল। কামাল হোসেনকে বঙ্গবন্ধু আলোচনা চালিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দিলেন। ডাকবাংলোতে একদিন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আজিজ আহম্মদ এলেন। সাবেক এই আইসিএস অফিসারের নির্দেশে ভাষা আন্দোলনের সময় গুলি চালানো হয়েছিল। তিনি বললেন, সরাসরি ফ্লাই করা যাবে না। অন্য রুটে যেতে হবে। ইরান হয়ে যাওয়া যেতে পারে। তুরস্ক হয়েও যাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনা করে ড. কামাল জানালেন, আমাদের বিপক্ষে ছিল এমন কোনও দেশ হয়ে যাওয়া যাবে না। সে কারণে ইরান বা তুরস্ক হয়ে যাওয়া যাবে না। লন্ডন হয়ে যাওয়ার বিষয়টি ঠিক হলো। দর্জি পাঠালো, গরম কাপড় দিল। লন্ডনে তখন শীত। লন্ডনে যেতে হলে পাসপোর্ট প্রয়োজন। ইউএনের ট্রাভেল ডকুমেন্ট বা বাংলাদেশি পাসপোর্ট কোনোটাই সেই মুহূর্তে পাওয়া সম্ভব ছিল না। তার চেয়ে বড় বিষয় ছিল, কত দ্রুত পাকিস্তান ত্যাগ করে বাংলাদেশে আসা যাবে।
বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে আসাটা একটু দেরি করাতে সর্বশেষ ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলেন, ইরানের রেজা শাহ পাহলি পাকিস্তানে আসছেন। তার খুব ইচ্ছে আপনার সঙ্গে দেখা করা। আপনি আরও দু’একটা দিন থেকে যান। বঙ্গবন্ধু তখন ড. কামাল হোসেনকে বলেন, এটা ভুট্টোর চালাকি। রেজা শাহ পাহলিকে দিয়ে আমার কাছে তদবির করাতে চায়। পাকিস্তানের ৯৩ হাজার সৈন্য বাংলাদেশে আটক। তাদের বিষয়ে পাহলি যদি কোনও অনুরোধ করে, আমি তো কিছু বলতে পারব না। বঙ্গবন্ধু ড. কামালকে বলেন, ভুট্টোর কথায় রাজি হওয়া যাবে না। যত দ্রুত সম্ভব আমাদের যাওয়ার ব্যবস্থা করতে বলো। নিরূপায় হয়েই ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর লন্ডনে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে বলেন। পিআইএ’র যে প্লেনে বঙ্গবন্ধু লন্ডনে যাবেন, সেটা আসবে করাচি থেকে। কামাল হোসেন বঙ্গবন্ধুকে বলেন, বঙ্গবন্ধু ভুট্টোকে বলেন, কামাল হোসেনের পরিবারকে করাচি থেকে প্লেনে তুলে নিতে।
পাকিস্তান থেকে রওনা দেওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু বলেন, লন্ডনে ল্যান্ড করার আগে বলা যাবে না যে, এই প্লেনে বঙ্গবন্ধু যাচ্ছেন। আইডেনটিফিকেশনের জন্যে ‘পিআইএ স্ট্রাটেজি কার্গো’ বলে দিলেই হবে। আর এই প্লেন পথে অন্য কোনও দেশে থামতে পারবে না। পাকিস্তান সরকার কথানুযায়ী ল্যান্ড করার ১ ঘণ্টা আগে লন্ডনকে জানায় যে, এই ফ্লাইটে বঙ্গবন্ধু যাচ্ছেন।
৭. ৭ জানুয়ারি পাকিস্তান থেকে রওনা দিয়ে ৮ জানুয়ারি লন্ডন পৌঁছালেন বঙ্গবন্ধু। ড. কামাল হোসেনের যতদূর মনে আছে, লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে পাসপোর্ট দেখেনি বা সিলও মারেনি। ভিআইপি গেটের সামনে ৬ ফুট লম্বা একজন ব্রিটিশ পুলিশ বঙ্গবন্ধুকে স্যালুট করে বললেন, ‘উই হ্যাভ বিন প্রেয়িং ফর ইউ স্যার’। ভেতরে ঢুকলেন বঙ্গবন্ধু, ড. কামাল। তখন মাইকে ঘোষণা দেওয়া হলো ‘ফোন কল ফর শেখ মুজিবুর রহমান’। বঙ্গবন্ধু ফোনে কথা বলতে বললেন ড. কামাল হোসেনকে। ফোন করেছেন ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ও কমনওয়েলথ বিভাগের কূটনীতিক ইয়ান সাদারল্যান্ড। যার সঙ্গে ১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ড. কামালের দেখা হয়েছিল। তিনি চিনতে পারলেন। জানতে চাইলেন, শেখ মুজিবুর রহমান সত্যি লন্ডনে এসেছেন কিনা? আমরা এক ঘণ্টা আগে জেনেছি যে, শেখ মুজিব আসছেন। সে অনুযায়ী আমরা সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। কামাল হোসেন নিশ্চিত করলেন বঙ্গবন্ধু এসেছেন।
বঙ্গবন্ধু কামাল হোসেনকে বললেন, জিজ্ঞেস করো আমাদের আবু সাঈদ চৌধুরীর সঙ্গে কী করে যোগাযোগ করা যায়। সাদারম্যাল্ড জানালেন, আবু সাঈদ চৌধুরী ইতিমধ্যে ঢাকার উদ্দেশে লন্ডন ত্যাগ করেছেন। তবে মি. রেজাউল করিম আছেন। তারপর রেজাউল করিমের সঙ্গে কথা হলো ড. কামালের। সাদারল্যান্ড তাকে খবর দিয়েছিলেন।
এর মধ্যে পাকিস্তানের হাইকমিশনার নাদিম আহম্মদ বিমানবন্দরে এসে বঙ্গবন্ধুকে বললেন, ‘স্যার হোয়াট ক্যান আই ডু ফর ইউর হেলপ’। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘ইউ হ্যাভ ডান এনাফ। থ্যাংক ইউ ভেরি মাচ। আই ডোন্ট থিংক উই উইল নিড অ্যানি মোর হেলপ। থ্যাংক ইউ। আওয়ার পিপল আর হেয়ার। দে আর কামিং।’ দশ পনেরো মিনিটের মধ্যে সাদারল্যান্ড আসলেন। রেজাউল করিমও আসলেন।
৮. লন্ডনে ২০ ঘণ্টার মতো বঙ্গবন্ধুর অবস্থান, সংবাদ সম্মেলন থেকে সারা পৃথিবী জেনে গেলো। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী অ্যাডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দেখা হলো। আলোচনা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু দ্রুত দিল্লি যাওয়ার জন্যে প্লেনের প্রসঙ্গ তুললেন। অ্যাডওয়ার্ড হিথ দ্রুত একটি প্লেন প্রস্তুত করে বঙ্গবন্ধুকে দিল্লি পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। তার আগে কথা হচ্ছিল, দিল্লি থেকে প্লেন পাঠানো হবে।  ১৯৭২ সালের ৯ জানুয়ারি ভোরবেলা ব্রিটিশ প্লেনে বঙ্গবন্ধু দিল্লির উদ্দেশে লন্ডন ছাড়লেন। দিল্লির জনসভায় বক্তৃতা, ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে আলোচনা। ১০ জানুয়ারি স্বাধীন দেশের মাটিতে ফিরে এলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
পরের ইতিহাস সবারই জানা।
৯. ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারির এই সময়কাল শুধু বঙ্গবন্ধুর জন্যে বা আওয়ামী লীগের জন্যে নয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের জন্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই ইতিহাসের সাক্ষী দুইজন, বঙ্গবন্ধু স্বয়ং এবং ড. কামাল হোসেন। বঙ্গবন্ধু নেই, লিখেও যাননি। কামাল হোসেন আছেন। নিজে লেখেননি, মোটামুটি বিস্তারিত বলেছেন। তোফায়েল আহমদ কিছু জেনেছেন, লিখেছেন। আরও হয়তো লিখবেন।
১০. কামাল হোসেন এখন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করেন না। তাকে অপছন্দ করার স্বাধীনতা নিশ্চয় আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দের আছে। কামাল হোসেন যে ইতিহাসের অংশ, সেই ইতিহাস বাংলাদেশের জন্ম প্রক্রিয়ার ইতিহাস। দু’জন ভারতীয় কূটনীতিক লন্ডন থেকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দিল্লি এসেছিলেন, তাদের যে অভিজ্ঞতা সেই ইতিহাসও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে এদের সবার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ড. কামাল হোসেনের দেখা এবং জানা ইতিহাস। ভারতীয় দুই কূটনীতিক বঙ্গবন্ধুর দেখা-কথাবলার সুযোগ পেয়েছিলেন লন্ডন-দিল্লি ফ্লাইটে ১৩ ঘণ্টা। ড. কামাল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ছিলেন ২৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যা থেকে ৭ জানুয়ারি। যে সময় অন্য কেউ ছিলেন না। তারপরেও বঙ্গবন্ধুর জীবনকালের পুরো সময়টা ড. কামাল বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিশ্বস্ত সঙ্গী হিসেবেই ছিলেন। এখনও সময় আছে, বিভ্রান্তি তৈরির সুযোগ না তৈরি করে, ১৬ ডিসেম্বর থেকে ৭ জানুয়ারির সময়কালের ইতিহাসকে স্বচ্ছ এবং নির্মোহভাবে উপস্থাপন করার।

 

 

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ