গুপ্তচর থেকে ডিজিটাল গুপ্তচর

Send
উদিসা ইসলাম
প্রকাশিত : ১৩:৪১, ফেব্রুয়ারি ০২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৫৭, ফেব্রুয়ারি ০৩, ২০১৮

উদিসা ইসলাম২০০৮ সালের নির্বাচনে যখন ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গড়ে তোলার কথা বলে প্রচারণা শুরু করে আওয়ামী লীগ তখন মানুষের কাছে ডিজিটাল শব্দটা ছিল অপরিচিত, কিছুটা হাস্যকরও। কিন্তু সময় গেছে আরও প্রায় ৮ বছর, এখন মানুষ বুঝতে শিখেছে এই ডিজিটাইজড হওয়া কতটা জরুরি ছিল। কিন্তু সেই জরুরি বিষয়টিতে যখন নাগরিক অভ্যস্ত হয়ে উঠছে তখন যদি সেই ডিজিটালের আঘাত আসে তখন হোঁচট খেতে হয় বৈকি। হ্যাঁ, বলছিলাম ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ নিয়ে।
নতুন খসড়ার যেসব বিধান শঙ্কা তৈরি করেছে সেগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে তথ্যপ্রযুক্তি আইন বা আইসিটি অ্যাক্টের ৫৭ ধারার নতুনভাবে আসা। ৫৭ ধারা নিয়ে সাংবাদিক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টরা যখন সমালোচনা আলোচনা শুরু করেছিলেন তখন বারবারই আইনমন্ত্রী বলার চেষ্টা করেছেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্ট আসলে ৫৭ ধারা থাকবে না। পরবর্তীতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আগের খসড়াটিতে ১৯ নম্বর ধারায় ৫৭ ধারার সব উপাদানই ধারণ করা হলেও তা নিয়ে আবার সমালোচনাও ওঠে।

গত সোমবার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮ প্রকাশের পর আইন নিয়ে যতটা না আলোচনা হচ্ছে তারচেয়ে বেশি আলোচনা একটি ধারাকে কেন্দ্র করে। যদিও গত কয়েক বছর ধরে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারাটি এই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তারপরও নতুন আইনের সব ধারা ছাপিয়ে ৩২-এর দিকেই সবার চোখ, বিশেষত সাংবাদিকদের। আইনটির ৩২তম ধারায় কী বলা হয়েছে? যদি কোনও ব্যক্তি বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে কোনও সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ কোনও সংস্থার কোন ধরনের অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য উপাত্ত কম্পিউটার ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, ডিজিটাল নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনও ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করিতে সহায়তা করেন তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কাজ হইবে কম্পিউটার বা ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ। আর এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ ১৪ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে। কেউ যদি এই অপরাধ দ্বিতীয়বার বা বারবার করেন, তাহলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবে। অর্থাৎ দেশে প্রচলিত থাকা গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধের দণ্ডবিধির ধারাটি এখন ডিজিটাল রূপ পেলো ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের হাত ধরে।  

পক্ষে বিপক্ষে আলাপ গড়িয়েছে। সাংবাদিকরা মনে করছেন তাদের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার পরিধি কমে আসছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের এই ধারাটি দিয়ে সাংবাদিকের নামে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনা যাবে। কেন সাংবাদিকরা এই ধারাটিকেই গুরুত্ব দিলেন

১. আমাদের সরকারি অফিসে দুর্নীতি অনেক কিন্তু স্বীকার করে উপযুক্ত সাজা দেওয়ার প্রবণতা কম

২. লিখিত কোন অনুমতি নিযে আমাদের সাংবাদিকরা কোন অফিসে প্রবেশ করেন না।

৩. কেউ স্বেচ্ছায় কাগজ দিয়ে পরে যদি অস্বীকার করে তখন বৈধতা প্রমাণের রাস্তা থাকবে না

৪. তথ্য অধিকার আইনের পর সরকারি তথ্য দিতে কর্মকর্তারা উৎসাহিত হলেও এই আইনের পর সেটি জটিল হয়ে উঠবে।

৫. ক্ষমতাসীনদের ভাষ্যের বাইরে অন্য কিছু আর প্রকাশ করা সম্ভব

পাল্টা আলাপও চলছে। সরকারি ভাষ্য আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সাংবাদিকদের সামনে হাজির করেন এই বলে, গুপ্তচরবৃত্তি তো আগেও আইনে অপরাধ ছিল। এ আইনের মধ্যে যেটা করা হয়েছে সেটা হলো, কম্পিউটার সিস্টেম বা ইনফরমেশন টেকনোলজির সিস্টেমের মাধ্যমে যদি কেউ গুপ্তচরবৃত্তি করে, সেটা অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে। এটার সঙ্গে সাংবাদিকতার কোনো সম্পর্ক আছে বলে তাঁর মনে হয় না। তিনি বলেন, এটা অহেতুক ভীতি। বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, আইনটি সঠিক ও স্বচ্ছতার সঙ্গেই করা হয়েছে। সত্য রিপোর্ট প্রকাশ করলে বোঝা যাবে। যদি প্রতিবেদন সত্য হয়, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি মনে করেন না।

সরকারের এই ভাষ্য স্বস্তি দেয় না তখনই, যখন কিনা প্রশ্নগুলোর উত্তর মেলে না। প্রশ্নগুলো কী?

  • ঘুষ লেনদেনের ছবি তোলার অনুমতি কে দিবে? সেক্ষেত্রে হিডেন ক্যামেরার ব্যবহার প্রতিবেদক করতে পারবেন কিনা
  • সাংবাদিক যদি তার কার্ড দেখিয়ে কোনও স্থাপনায় প্রবেশ করেন তারপর কতদূর পর্যন্ত তিনি বৈধতা পেলেন বলে বিবেচিত হবে
  • সাংবাদিক কোনও দুর্নীতির খবর পেলে সে কোনপথে সেটি উপস্থাপন করবে? ৩২-এর খড়গ তাকে বাধাগ্রস্ত করবে না সেই সুরক্ষা সে কোথা থেকে পাবে?
  • গুপ্তচরবৃত্তির সাথে এখানে রাষ্ট্রদ্রোহকে মেলানো হবে কিনা সেই বিষয়টি স্পষ্ট নয়
  • একাধিকবার এই অপরাধ করলে তার শাস্তি তিনগুণ হয়ে যাবে বলে জানানো হচ্ছে। এটি কখনো কোনও আইনে বলা হয় না। এবার নতুন করে এটি বলার কারণ ব্যাখ্যা করা হবে কিনা

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের খড়্গ যে শুধু সাংবাদিকতার ওপর নামছে তা নয়, এটি পুরো সমাজেরই স্বাধীন চিন্তা ও মতপ্রকাশের পথে বাধা সৃষ্টি করবে। তবে সমাজের অন্যান্য অংশের চেয়ে সংবাদমাধ্যমের জন্য চ্যালেঞ্জটা একটু বেশি বোধ করেই সাংবাদিকরাই প্রথম চ্যালেঞ্জটা নিয়ে সমালোচনায় মুখর হয়েছেন। মুক্তচিন্তকদের শঙ্কার কারণ হয়েছে এ জন্য যে এর আগের একাধিক জরুরি আইন অপপ্রয়োগের কারণে হয়রানিমূলক হয়ে দেখা দিয়েছে। তা না হলে, কেবল ফাইনান্সিয়াল ট্রানজিকশনের জন্য অনলাইনে মানুষদের যোগাযোগ সহজ করার জন্য যে আইসিটি অ্যাক্ট করার কথা হয়েছিল ২০০৬ সালে, পরে সেটি ব্যবহৃত হয়েছে পলিটিক্যাল কারণে, একদম ভিন্ন প্রাসঙ্গিকতায়। আসলে যে গুপ্তচরবৃত্তি সেটা ধরার জন্য একটি যুগোপযোগী আইন হয়তো জরুরি। কিন্তু তাই বলে, এটিও খেয়ালে রাখা প্রয়োজন যাতে এই সময়ে এসে এই আইন বুমেরাং না হয়ে যায়। পেনাল কোডে গুপ্তচরবৃত্তির যে ধারা আছে সেটিকেও যুগোপযোগীকরা যেতে পারতো কিংবা কেবল কম্পিউটার বার ডিজিটালি গুপ্তরবৃত্তি ‘মেনশন’ করতে হলে আইন পরিবর্তনেরও দরকার ছিল না বলে বলছেন আইনজীবীরা। চাইলে আদালত এগুলো আমলে নিয়ে পেনাল কোডের মাধ্যমেই বিচার সম্ভব ছিল। তা না করে নতুন আইনের এই ধারা যুক্ত করার মধ্য দিয়ে গুপ্ততচরবৃত্তির অপরাধ থেকে ডিজিটাল গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধের প্রক্রিয়ায় গেলে সেই পথ উদ্দেশ্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়। এই শঙ্কা একদিনের না। এখন এসে ৫৭ ধারা বাতিল করে সেটি একইভাবে কিছু সাজা কমিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বানানো হলেই গ্রহণযোগ্য হবে-এমন ভাবার কোনও কারণ নেই।

এ ধরনের সংবেদনশীল আইনের ক্ষেত্রে আইনের সাথে সম্পৃক্ত সকল পক্ষের সাথে মতবিনিময়ের কাজটি করা প্রয়োজন। এতে করে আইনটি একইসাথে গ্রহণযোগ্য হয়ে তৈরি হয় এবং আইনের ‘ইনটেনশন’ নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়ার সুযোগ কম থাকে।

 

লেখক : চিফ রিপোর্টার, বাংলা ট্রিবিউন

/এসএএস/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ