বিলেতে হালিমারা কেমন আছে?

Send
জেসমিন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৮:০৭, ফেব্রুয়ারি ০২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১০:৫২, ফেব্রুয়ারি ০৩, ২০১৮

জেসমিন চৌধুরীপ্রায় বিশ বছর আগে ইস্ট লন্ডনের একটা বালিকা বিদ্যালয়ে হোম-স্কুল লিয়াজোঁ অফিসার হিসেবে কাজ করতাম। স্কুলে অনিয়মিত ছাত্রীদের অভিভাবকদের সাথে যোগাযোগ করে অনুপস্থিতির কারণ অনুসন্ধান করা এবং সমস্যা সমাধানে সাহায্য করার মাধ্যমে উপস্থিতিরমাত্রা বাড়ানোইছিল আমার কাজ।বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ফোনে হুমকি দিলেই কাজ হতো, ছাত্রীর উপস্থিতির মাত্রা বাড়ত। কিছু কিছু ক্ষেত্রে বাসায় গিয়ে অনুসন্ধান চালাতে হতো।
সমস্যার মাত্রা এবং পরিধি ছিল বিভিন্ন পর্যায়ের। কারো বাসায় ওয়াশিং মেশিন নেই বলে স্কুলের পোশাক নিয়মিত পরিষ্কার করার সুবিধা নেই, কারো ভাইবোন বেশি বলে ছাত্রীকে বাসায় থেকে মা’কে সাহায্য করতে হয় কারো মা-বাবা স্কুলে নিয়মিত উপস্থিতির প্রয়োজন সম্পর্কেই অনবহিত। স্কুলের পক্ষ থেকে এসব সমস্যা সমাধানের সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হতো। তারপরও যার সমস্যা সে নিজে না চাইলে সমাধানের পথ কঠিন। এই কঠিন পথে হাঁটতে গিয়ে অভিবাসী জীবনের অনেক করুণ পরিস্থিতি নিজ চোখে দেখেছি।

একবার খবর পাওয়া গেল ক্লাস টেনের একটা মেয়েকে জোর করে বাংলাদেশে নিয়ে যাওয়া হয়েছেবিয়ে দেয়ার জন্য। সিলেটে কর্মরত ব্রিটিশ কাউন্সিলের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে ফ্যাক্সে তখনো ইন্টারনেট যোগাযোগ শুরু হয়নি) যোগাযোগ করে তার সাহায্যে কাহিনীর সত্যতা নিরূপণ করে সোশ্যাল সার্ভিসকে জানালাম। তারা মেয়েটাকে উদ্ধার করে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করল।  

তার কিছুদিন পর ক্লাস টেনের আরও একটা মেয়ে দুই সপ্তাহ ধরে স্কুলে অনুপস্থিত। কয়েকবার ফোন করলাম। তারা আমার কণ্ঠ শুনেই ফোন রেখে দেয়। বাসায় গেলাম ভিজিট করতে। বেল বাজিয়ে অপেক্ষা করছি, ভেতরে পায়ের শব্দশুনতে পাচ্ছি। দরজা পর্যন্ত হেঁটে এসে কেউ উঁকিও মেরে গেল কিন্তু দরজা খুলল না। এদিকে শিক্ষকরা প্রতিদিনই আমাকে জিজ্ঞেস করছেন- ‘হালিমার কোনো খবর পেলে?’

এভাবে দুদিন ব্যর্থ মনোরথ হয়ে ফিরে আসার পর ঠিক করলাম অ্যাপ্রোচ পাল্টাব। তার পরদিন স্কার্ফ দিয়ে ভালোমত মাথা ঢেকে নিয়ে হাজির হলাম। একটা চুলও দেখা যাচ্ছে না। এবারদরজা খুলল, কিন্তু ভেতরে ঢুকে আমার আসবার কারণ বলতেই হালিমার বাবা রেগেমেগে আমাকে বেরিয়ে যেতে বললেন,

'কিতার লাগি ইস্কুলো পাঠাইতাম? তুমরা আমার পুড়িরে বদমাইশি শিখাইতায় করিনি?'

‘চাচা দেখেন আমিও তো আপনার মতোই বাংলাদেশ থেকে এসেছি। আমার চিন্তাভাবনাও অনেকটা আপনার মতই। অন্তত আমার সাথে কথা বলুন। সমস্যার কথাটা বলুন, দেখি কী করতে পারি'।

এবার তিনি আমাকে বসতে দিলেন। আমি তাকে বুঝিয়ে বললাম, মেয়ের ‘ও’ লেভেল পরীক্ষা সামনে, এখন স্কুল মিস করা ঠিক নয়। তাছাড়া মেয়ে স্কুলে না গেলে স্কুল বাবা-মা’কে কোর্টে নেবে, বিশাল অংকের জরিমানাও হতে পারে। কিন্তু কিছুতেই তাকে বাগে আনা গেলনা। তিনি বদ্ধপরিকর, মেয়েকে আর কিছুতেই স্কুলে পাঠাবেন না।  

'আমি কি হালিমার সাথে একটু কথা বলতে পারি?'

'হালিমা বাসাত নাই,আমরা তাইর বিয়ার ব্যবস্থা করিয়ার।'

সোশ্যাল সার্ভিসের হস্তক্ষেপে এ ধরনের বাল্যবিবাহের বহু প্রচেষ্টা কীভাবে অতীতে ভেস্তে গেছে তা উনাকে খুলে বললাম। ষোল বছরের মেয়েকে তার বিনা অনুমতিতে বিয়ে দেয়া যে আইনের চোখে অপরাধ সেটাও বললাম।

এবার হাউমাউ করে কেঁদে ফেললেন বৃদ্ধ, ‘মাই গো, আমি কিতা করতাম? বড় বিপদো আছি পুড়িরে লইয়া। আমার মান-ইজ্জত বাঁচাইবার আর কোনো উপায় নাই গো মাই।'

ঘটনা কী না জেনেই হালিমার বাবার বুকফাটা কান্না দেখে আমার চোখ ভিজে উঠল। তারপর উনি ঘটনাটা খুলে বললেন।

এক বাংলাদেশি যুবকের সাথে প্রেমের সম্পর্কে গড়ে উঠেছে হালিমার। অনেক দিন ধরে সে স্কুল ছুটির পর দেরি করে বাড়ি ফিরছে। তাদের আদেশ উপদেশে কোনো কাজ হয়নি। বহুবার সে স্কুলে যাওয়ার পর স্কুল থেকে ফোন এসেছে- 'হালিমা আজ স্কুলে আসেনি কেন?'পরে খোঁজ নিয়ে জেনেছেন স্কুলের ব্যাগের ভেতর লুকিয়ে বাইরে পরার পোশাক নিয়ে গেছে সে। স্কুল পালিয়ে দিন কাটিয়েছে প্রেমিকের সাথে। একবার নাকিদুদিন সে রাতে বাড়ি ফেরেনি, লজ্জায় কাউকে বলতে পারেননি, স্কুলেও জানাননি। 

যখন টের পেলেন মেয়ে ঐ ছেলের সাথে রাত কাটিয়েছে, তখন সিদ্ধান্ত নিলেন সে যেমন ছেলেই হোক তার সাথেই মেয়ের বিয়ে দিয়ে দেবেন। মেয়ের কাছ থেকে ছেলের ফোন নাম্বার নিয়ে তাকেকল দিলেন। বললেন, 'বাবা, তুমি বাসাত আও, আলাপ করি। তুমরার বিয়ার ব্যবস্থা করি।'

শুনে নাকি ছেলে হেসেই কূল পায় না, 'বিয়া ছাড়াউ তুমার ফুড়ির লগে ঘুমাইয়ার, তে বিয়া করতাম কিতার লাগি?'

এই ঘটনার পর তিনি ভীষণ অসহায় বোধ করে মেয়েকে ঘরে বন্দি করে রাখতে শুরু করেন। স্কুলথেকে ফোনের পর ফোন, চিঠির পর চিঠি আসতে শুরু করলে ভয় পেয়ে অন্য এক শহরে চাচার বাসায় পাঠিয়ে দিয়েছেন মেয়েকে। এখন দেশে পাত্র খোঁজা হচ্ছে। উপযুক্ত পাত্র পাওয়া গেলেই মেয়েকে দেশে নিয়ে গিয়ে বিয়ে দিয়ে দেবেন।

অসহায় এই বাবার করুণ গল্প শুনে আমি পাথরের মতো বসে রইলাম। একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হালিমার মা জিজ্ঞেস করলেন,‘চা খাইতায়নি গো মাই?’

বাবা ধমকে উঠলেন, ‘জিগাও কিতার লাগি? চা দেও বেটিরে,লগে বিস্কুট দেও। কত কষ্ট দিছে তানরে আমরার পুড়িয়ে'।

পৃথিবীর সমস্ত অসহায়ত্ব নিয়ে নিরূপায় এই মা। বাবার সামনে বসে চায়ে চুমুক দেই আমি, আকাশ-পাতাল হাতড়াই একটা জুতসই মন্তব্যের জন্য। কিন্তু কোনো কথাকেই যেন উপযুক্ত মনে হয় না। 

আমার ছেলের তখন বয়স সাড়ে চার বছর, মেয়ের বয়স ছয় মাস। এদেশে এসেছি কয়েক বছর হলো। তবু এখনো কালচার শক কাটিয়ে উঠতে পারিনি। না পারি ব্রিটিশ কালচারকে পুরোপুরি গায়ে মাখিয়ে নিতে, না পারি নিজের সংস্কৃতিকে পরিপূর্ণভাবে চর্চা করতে। বাংলাদেশ থেকে জীবিকার সন্ধানে এদেশে আসা এই প্রায় অশিক্ষিত মা-বাবার কষ্ট আমি বুঝতে পারি। এরা মুসলিম সংস্কৃতিতে সন্তানদের বড় করবার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু বুঝতে পারছেন না পানিতে নেমে গা শুকনো রাখা যাবে না। এদেশের সংস্কৃতির সবটুকুই যে খারাপ নয় তা-ও বুঝতে পারছেন না। সন্তানদের বেশি বেশি আগলে রাখতে গিয়ে গোপনীয়তার আশ্রয় নিতে বাধ্য করছেন, ফলে এরা কালচার গ্যাপের ভিকটিমে পরিণত হচ্ছেন।

আমার বয়স তখনো অনেক কম, মাত্র পঁচিশ। জীবন সম্পর্কে নিজের চিন্তাভাবনা এবং দৃষ্টিভঙ্গি তখনো পরিপক্বতা লাভ করেনি। এদের অবস্থা দেখে আমি খুব ভয় পেলাম। আমার সন্তানদের কি আমি ভারসাম্যপূর্ণভাবে বড় করতে পারব, নাকি তাদের সাথে এ ধরনের দূরত্ব হয়ে যাবে আমারও। অনেকদিন ধরেই আরো কিছু কারণে দেশে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছিলাম। এই ঘটনার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিলাম দেশে ফিরে যাব। তখনো দেশে চাকরি করে খাওয়ার মতো শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জন করিনি, জমানো টাকাও নেই,তবু নিজের ভয় এবং শঙ্কাকে পুঁজি করে ছয় মাসের মধ্যে চাকরি ছেড়ে দেশে চলে গেলাম। বাচ্চাদের বড় করে নিয়ে তারপর আবার ইউকে ফিরে আসি বারো বছর পর।  

আমার ছেলে প্রায়ই বলে, দেশে চলে যাওয়ায় এদেশের হালচালের সাথে মানিয়ে নিতে তার অনেক অসুবিধা হয়।তবু আমি আক্ষেপ করি না। এখন দোভাষী হিসেবে কাজ করতে গিয়ে হালিমার প্রজন্মকে দেখি, মাঝবয়সে উপনীত হয়েও নানান সমস্যায় আজও হাবুডুবু খাচ্ছেন তারা। সমস্যাগুলো আরো গভীর এবং জটিল রূপ ধারণ করেছে।

এক-দুই প্রজন্মের অভিবাসীদের কালচার গ্যাপ নামক এই অগ্নিপরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতেই হয়। যদিও পরিপূর্ণ সোশ্যাল ইন্টিগ্রেশনই সবচেয়ে শান্তিময় পন্থা, তবু ধর্মানুভূতি এবং শেকড়ের স্মৃতি তাতে বাদ সাধে। নষ্ট হয়ে যায় অনেক হালিমার জীবন। হালিমাদের মেয়েদের জীবনও খুব ভালো যায় না,নাতনিদের কী হবে তা দেখার জন্য আমাকে আরো অনেক দিন বাঁচতে হবে।
(হালিমা একটি কাল্পনিক নাম) 

 

লেখক: অভিবাসী শিক্ষক ও অনুবাদক

.

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ