মুক্তমনা বন্ধুদের কাছে প্রত্যাশা

Send
বাকী বিল্লাহ
প্রকাশিত : ১১:১৬, সেপ্টেম্বর ০৩, ২০১৫ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:০৪, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৮

বাকী বিল্লাহঅস্ট্রিয়ায় একটি ট্রাক থেকে ৬১জন নারী-পুরুষ-শিশুর হিমায়িত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। তারা সবাই সিরিয়ান নাগরিক। লিবিয়ার উপকূলে ৫০০ মানুষসহ নৌকা ডুবে অনেকেরই সলিল সমাধি হয়েছে। তাদের অধিকাংশই সিরিয়ান নাগরিক। সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন প্রায় আড়াই লাখ বেসামরিক মানুষ।
এবার একটু অন্য প্রসঙ্গে বলি। গত ৫ জানুয়ারি আমাদের এখানে যে নির্বাচনটি হয়েছে, আমি তার কট্টর সমালোচক।  ওই নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আরোহণকারী আওয়ামী লীগ সরকারকে গণতান্ত্রিক সরকার মনে করি না। এখন প্রশ্ন হচ্ছে,  গণতন্ত্রে উত্তরণের জন্য আমাদের করণীয় কী?
আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজে বিরাজমান কিছু শর্তের কারণে এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। তাই এর সমাধানটাও হতে হবে ভেতর থেকে। কোনও দৈব বা বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপে এটার সমাধান হবে না। গত পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোও ওই নির্বাচনের সমালোচনা করেছে। যে যার জায়গা থেকে কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছে। কিন্তু তারচেয়ে বেশি আগে বাড়েনি বা বাড়ার সুযোগ পায়নি। বাস্তব পরিস্থিতি হলো, ভারতের সমর্থন ছাড়া এরচেয়ে বেশি কিছু করার সুযোগ তাদের ছিল না। মার্কিন রাষ্ট্রদূত সরাসরি হস্তক্ষেপ করার জন্যে দিল্লি গিয়ে মিটিং করেছিলেন। আমাদের সৌভাগ্য, সেই মিটিং ফলপ্রসূ হয়নি।

এখন আমরা একটু কল্পনা করে দেখি, যদি বিদেশি শক্তিগুলো আমাদের রাজনীতিতে শক্তি প্রয়োগ করত, তাহলে কী কী ঘটত। তারা ছত্রভঙ্গ জামায়াত-শিবিরের ক্যাডারদের পুনর্গঠিত করে হাতে অস্ত্র এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে দিত। সেই অর্থ খরচ করে হাজার-হাজার নতুন ক্যাডার নিয়োগ করা হতো। বঞ্চিত বিএনপির নেতাকর্মীরাও ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের আশায় এই বাহিনীতে যোগ দিত। শুরু হয়ে যেত প্রবল যুদ্ধ ও রক্তপাত। ছোট্ট এই ভুখণ্ডে কয়েকদিনের যুদ্ধেই লাখ-লাখ বেসামরিক মানুষ মারা পড়ত। এর মধ্যে সুযোগ বুঝে হরকাতুল জেহাদ বা আনসারুল্লাহর মতো ছোট-ছোট গোষ্ঠীও বিদ্রোহী বাহিনীতে যোগ দিত। অর্থ ছড়াছড়ির মধ্যে তারাও বিপুল পরিমাণ নতুন রিক্রুট করত। রাজনৈতিক আদর্শ নয় ভৌগলিক ও আঞ্চলিক সুবিধা বিচেনায় নিয়ে বিভিন্ন গ্রুপ গড়ে উঠত। অনিবার্যভাবে নিজেদের বলয়ভুক্ত কিছু এলাকায় আনসারুল্লাহ বা জেএমবির মতো গোষ্ঠী শরিয়া আইন চালাত। এর মধ্যে একদিন আমরা শুনতে পেতাম, শেখ হাসিনার পতন হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২ ঘণ্টার ট্রাইব্যুনালের বিচারে শেখ হাসিনাকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ তখনও শেষ হতো না। এবার শুরু হতো, বিদ্রোহী বাহিনীর মধ্যে রাজনৈতিক বিবাদ। সবার হাতে অস্ত্র- বিএনপির সঙ্গে  জামায়াতের, জামাতের সঙ্গে আনসারুল্লাহর, জেএমবির সঙ্গে ফ্রিডম পার্টির আধিপত্য প্রতিষ্ঠা নিয়ে তুমুল লড়াই বাঁধত। দেশের প্রগতিশীল অংশও অস্ত্র হাতে টিকে থাকার চেষ্টা করত। দেশের মধ্যে প্রতিদিন বোমা ফাটত- প্রাণ যেত হাজার হাজার মানুষের। লাখো মানুষ প্রাণ হাতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে নিরাপদ আশ্রয় খুঁজত সন্তান-সন্ততির জন্য। আর বিবিসি-সিএনএন প্রমাণ করে দিত, ইসলামি মৌলবাদীদের হাতে ধ্বংস হচ্ছে বাংলাদেশ। আর আমরাও সেটাই দেখতাম কারণ একমাত্র ওইটাই হচ্ছে দৃশ্যমান বাস্তবতা। প্রকৃত সত্যটা চলে যেত দৃশ্যমান সত্যের আড়ালে।

সিরিয়ানদের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। দারুণ এক আধুনিক সমাজে সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে বেড়ে ওঠা সিরিয়ান নাগরিকরা আজ বেঁচে থাকার জন্যে হন্যে হয়ে আশ্রয় খুঁজছে। সেদিন পত্রিকায় একটি ছবি এসেছে- হাঙ্গেরীয় বর্ডারে এক সিরিয়ানকে পিছমোড়া করে বাঁধছে পুলিশ, পাশে তার শিশু কন্যা। লোকটা চিৎকার করে কিছু একটা বলতে চাইছে। আর কিছু না, বলতে চাইছে- ওহে পশ্চিমা পশুরা, তোমাদের লোভের কারণে বলি হয়েছি আমরা। সব হারিয়ে শুধু সন্তানদের বাঁচাতে তোমাদের এখানে ভিখেরির জীবন-যাপন করতে এসেছি।

ইরাক ও লিবিয়াতে একই ঘটনা ঘটেছে। ইরাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং লিবিয়া ও সিরিয়ায় ফ্রান্স জার্মানির মতো ইউরোপীয় রাষ্ট্রগুলোর লোভ-লালসার বলি হয়েছে লাখ-লাখ  সাধারণ মানুষ। তিনটা দেশেই উদার আধুনিক সমাজব্যবস্থা ছিল। রাষ্ট্রচরিত্র স্বৈরতান্ত্রিক হলেও জাতীয় সম্পদে জনগণের অধিকার ছিল। তিনটা দেশই আজ জ্বলন্ত নরক।

লিবিয়া ও সিরিয়া সংকট তৈরি হয়েছে প্রত্যক্ষভাবে ফ্রান্সের হাতে। এক সময়কার আগ্রাসী  ফ্রান্স কিছুকাল বিরতি দিয়ে ভয়ঙ্কর এক কদর্য চেহারা নিয়ে বিশ্ব রাজনীতিতে হাজির হয়েছে। কিন্তু তার কদর্যতাও ঢাকা পড়ে থাকে আল কায়েদা বা আইএস নামক দৃশ্যমান কদর্যতার আড়ালে।

নিজেকে একজন মুক্তমনা মানুষ ভাবি। ধর্মীয় ও জাতিগত সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে নিজের বিবেক বুদ্ধিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করি। একই সঙ্গে  শাসকের প্রোপাগান্ডা বা পুঁজিবাদী যুদ্ধ অর্থনীতির ক্যাম্পেইন থেকে মাথাটাকে মুক্ত রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু সত্যি কথা হচ্ছে, আমার অন্য মুক্তমনা বন্ধুদের অতি সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে মুক্তমনা শব্দটি বহন করা মাঝেমধ্যেই গ্লানিকর বলে মনে হয়। আমরা জানি, আমাদের সময়টাও ভীষণ খারাপ। গত কয়েক মাসে চারজন মুক্তমনা লেখককে হারিয়েছি আমরা। অন্যরা ভয়ঙ্কর অনিরাপদ এক পরিস্থিতিতে বাস করছেন। অনেকেই দেশ ছেড়ে চলে গেছেন- অন্যরা চলে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। সারাক্ষণই অদৃশ্য এক চাপাতির ছায়াতলে বাস করা সম্ভব নয়। তাই যারা দেশ ছাড়ছেন বা ছেড়ে যেতে চাচ্ছেন, তাদের নিয়ে আমার কোনও অভিযোগ নেই। কেবল প্রত্যাশা এই যে, দেশ ছাড়ার সঙ্গে-সঙ্গে কেউ যেন দেশের আপামর মানুষের প্রতি ভালোবাসাটুকু না ছাড়ি বা দেশটাকে পাল্টে দেওয়ার বিশ্বাসটুকু না ছাড়ি। আমাদের বিশ্বাস মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখবে। আর বিশ্বাস ত্যাগ করা মাত্রই ইরাক, লিবিয়া বা সিরিয়ার ভবিতব্য ঘনিয়ে আসবে আমাদের দিকেও।

ওপরের প্যারাটা লিখতে-লিখতে এক ধরনের  আত্মশ্লাঘায় ভুগছিলাম- কেন আমার বন্ধুদের সঙ্গে  চিন্তার দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। আমরা লেখক-ব্লগাররা আজ মৌলবাদীদের চাপাতির লক্ষ্যবস্তু, মতভিন্নতার সময়তো এটা নয়। কিন্তু একইসঙ্গে  একজন মুক্তমনা এ কারণেই মুক্তমনা যে সকল পরিস্থিতিতে তিনি চিন্তাকে মুক্ত ও নির্মোহ রাখতে পারেন। চিন্তা ও বিশ্লেষণে পক্ষপাত থাকলে তিনি আর মুক্তমনা থাকেন না- তাই কথাগুলো বলাও জরুরি। যে কারণে সিরিয়ার শরণার্থীদের দিয়ে আলোচনা শুরু করে এরপর বাংলাদেশের ভাগ্যে কী ঘটতে পারত, সেটা দেখে নিয়ে লেখাটি এই উপসংহারের কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে।

ইসলামি মৌলবাদ ও জঙ্গি  গোষ্ঠীর তৎপরতা আজকের দুনিয়ার সবচেয়ে গুরুতর সংকটগুলোর একটি। কিন্তু সেই সংকটের বৈশ্বিক রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় না এনে একরৈখিক পর্যালোচনা করা কোনওভাবেই একজন মুক্তমনা মানুষের কাজ নয়। কিন্তু ইউরোপে থাকা বাংলা ভাষাভাষী মুক্তচিন্তকদের একাংশ এবং সদ্য দেশ ছাড়া আরও কয়েকজন ট্যাগধারী মুক্তমনা সে কাজটি অহরহ করছেন। মাঝেমধ্যে সেটি দৃষ্টিকটুভাবে চোখে লাগছে। আজকের সিরিয়ার মানুষের যে দুর্ভোগ তার জন্যে আইএস নামক জঙ্গি  গোষ্ঠীর যেমন দায় আছে, তেমনি ফ্রান্স জার্মানিসহ অন্য রাষ্ট্রগুলোর দায় আছে, যারা নিজেদের স্বার্থে বাশারকে উৎখাতের জন্য জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর হাতে অর্থ ও অস্ত্র তুলে দিয়েছে।এখানে ইসলামি জঙ্গিবাদী গোষ্ঠী এবং ফ্রান্স জার্মানির লালসা একইসঙ্গে  বিরাজ করা দুটি পরিপূরক সত্য- যার যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে মরছে সিরিয়ার মানুষ, ধ্বংস হচ্ছে ঐতিহাসিক প্রত্ন সম্পদ। এ দুই সত্যকে একইসঙ্গে  দেখার চোখ এবং সাহস যিনি রাখেন না, তিনি আর যাই হোক, মুক্তমনা হতে পারেন না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে ইউরোপ-প্রবাসী মুক্তমনারা মোটা দাগে এই কাজটি দীর্ঘদিন ধরে করে আসছেন। সেটা  আশ্রয়দাতার প্রতি কৃতজ্ঞতা, না কি এক বিরাট প্রোপাগান্ডা যন্ত্রের কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে সত্য দেখার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা- তা নিশ্চিত নই।

আমরা যারা বাংলা ভাষায় গণপরিসরে লিখে বিভিন্ন মতামত দেই- আমরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যত চিত্রনাট্য লিখি। দেশে এখনও অনেক মানুষ নিরক্ষর, অনেকে খণ্ডিত শিক্ষা পেয়েছে। জনগোষ্ঠীর মধ্যে নানারকম অজ্ঞতা-কুসংস্কার আছে। কিন্তু দিন শেষে এরাই আমার দেশের মানুষ- সবাই মিলে একসঙ্গে  এগোতে হবে আমাদের। সম্প্রতি  বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা থেকে আমরা শিখেছি যে, অন্যের পা তা যত সবলই হোক না কেন- তার চেয়ে জোরে হাঁটা যায় না। তাই যদি সত্যি হতো, তাহলে সাদ্দাম উৎখাতের পরে ইরাক হতো বিশ্বের অন্যতম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লাখো মানুষের রক্তের বিনিময়েও ইরাকে গণতন্ত্র আনতে পারেনি। শুধু তাদের দেশের তেল কোম্পানির মুনাফা বাড়াতে পেরেছে।

যারা নিজেদের মুক্তমনা দাবি করেন, তাদের আমি নিজের লোক বলে মনে করি- তাই প্রত্যাশাও সীমাহীন। সকল মুক্তমনা মানুষ প্রোপাগান্ডার জঞ্জাল সরিয়ে সত্য দর্শন করুক- দেশের মানুষ তাদের পাশে থাকবে। শেষ বিচারে মানুষ মৌলবাদ বা পুঁজিবাদের নয়- সত্যের পক্ষে।

লেখক: ব্লগার অ্যান্ড অ্যাকটিভিস্ট

.

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ