বিএনপির ভবিষ্যৎ কী?

Send
শুভ কিবরিয়া
প্রকাশিত : ১২:৫৯, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:৫৬, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৮

শুভ কিবরিয়াবিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতি মামলার রায়ে আদালতে দণ্ডিত হয়েছেন। এখন তিনি কারগারে আছেন। বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে তার পুত্র তারেক রহমানও দণ্ড পেয়েছেন। বড় রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপির সর্বোচ্চ নেতাদের এই জেলদণ্ড তাদের কর্মী, নেতা এবং সমর্থকদের জন্য এক বড় বিষাদের কারণ হয়েছে। অন্যপক্ষে বিএনপিকে যারা অপছন্দ করে, খালেদা জিয়া ও তার রাজনীতির যারা ঘোরতর বিরোধী তাদের বড় অংশ এই রায়ে দারুণতর খুশি। বিশেষ করে সরকারি দল, তাদের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা উল্লসিত। কেমন সেই বিষাদ ও উল্লাসের চেহারা!
প্রথমেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করার মতো। তিনি এই রায় শুনে বরিশালের জনসভায় প্রকাশ্যেই বলেছেন, ‘এতিমদের সম্পদ মেরে খেলে তাদের শাস্তি পেতে হয়, আজ সেই শাস্তি খালেদা জিয়াও পেয়েছেন। অন্যায় করলে যে শাস্তি পেতে হয়, আজ তা প্রমাণিত হয়েছে।’

তিনি খালেদা জিয়াকে উদ্দেশ করে বলেছেন, লজ্জা থাকলে জীবনে আর লুটপাট ও দুর্নীতি করবে না।

জাতীয় পার্টিও এই রায়ে ভীষণ খুশি। কেননা, তারা মনে করে একসময় বেগম জিয়া অন্যায় করে তাদের নেতা এইচ এম এরশাদকেও জেলে পুরেছিলেন। আজ তার শাস্তি হচ্ছে। সংসদে জাতীয় পার্টির এমপি ইয়াহইয়া চৌধুরী রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেই ফেলেছেন, ‘ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া একদিন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদকে বিনা অপরাধে কারাগারে পাঠিয়েছিলেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, সেই জেলখানায় এখন খালেদা জিয়া। আজ থেকে ২৮ বছর আগে কারাগারে থাকা অবস্থায় হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ একটি বরই গাছ লাগিয়েছিলেন। সেই গাছে এখন বরই ধরেছে। কারা বিধান অনুযায়ী এ বরই খাওয়া যাবে কী না জানি না। সুযোগ থাকলে খালেদা জিয়াকে সেই বরই খেতে দেওয়া হোক।’

স্বভাবতই বিএনপি নেতারা এই রায়ে বিষাদে ভুগছেন। একে তারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে উল্লেখ করেছেন। খালেদা জিয়া যাতে আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন এ জন্যই এই রায় দেওয়া হয়েছে বলে তাদের অভিমত।

দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘অবৈধ আওয়ামী লীগ সরকার রাজনীতি ও আসন্ন নির্বাচন থেকে দূরে রাখার জন্য ভুয়া ও মিথ্যা মামলা তৈরি করে খালেদা জিয়াকে হেয়প্রতিপন্ন করতে এই সাজা দিয়েছে।’

রায় ঘোষণার পর বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রিজভী আহমদ বলেছেন, ‘এ রায় প্রধানমন্ত্রীর প্রতিহিংসা পূরণের রায়, গণতন্ত্রকে ধুয়েমুছে একদলীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করার জন্য এ রায়।’

২.

এখন আমরা কতগুলো রাজনৈতিক প্রসঙ্গ নিয়ে এই ঘটনার বিশ্লেষণে যেতে পারি। এই রায় কি বাংলাদেশের কোনও রাজনীতিবিদের জন্য দুর্নীতির অপরাধে প্রথম সাজার ঘটনা?

নিশ্চয় নয়। অনেক দলের অনেক রাজনীতিবিদ দুর্নীতির অপরাধে অতীতে দণ্ডিত হয়েছেন। এবং তারা সবসময় তাদের সাজাকে রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রতিপক্ষকে দমনের চেষ্টা বলেই অভিহিত করেছেন। বছরের পর বছর ধরে এই ভূ-খণ্ডের রাজনীতি এমন নজির বহন করেছে। সেই বিবেচনায় বেগম খালেদা জিয়ার দণ্ড নতুন কোনও ঘটনা নয়।কিন্তু যেটা বিবেচ্য সেটা হলো এই ঘটনা আমাদের রাজনীতির গতিমুখে কী ধরনের পরিবর্তন আনবে? নাকি আদৌ কোনও পরিবর্তন আসবে না?

প্রথম বিবেচনাটা হচ্ছে, এই ঘটনার প্রভাব পড়বে আগামী নির্বাচনে। যদি বেগম জিয়া তার ওপর দায়ের করা অন্যসব মামলাতেও দণ্ডিত হোন, জেলে থাকেন, তবে আগামী দিনের নির্বাচনে মূল বিএনপির অংশগ্রহণ ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। তখন একটা দলছুট, খণ্ডিত বিএনপিকে নির্বাচনে পাঠানোর রাষ্ট্রিক চেষ্টা চলবে। সেই চেষ্টা রাজনীতিকে কতটা সুফল দেবে বলা মুশকিল। তবে সেটা আওয়ামী লীগকে বিশেষ সুবিধা দিতে পারে।

আর বেগম জিয়া যদি নির্বাচনে নিজে অংশ নিতে না পারেন তবু আগামী সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে কিনা বলা মুশকিল।

অন্যদিকে জেলদণ্ড মাথায় নিয়ে নির্বাচনের মাঠে যদি বেগম জিয়া নামতে পারেন তবে তা তাকে ভোটারদের কাছে নতুন আবেদন নিয়ে হাজির করতে পারে। অতীতে বহুবার বাংলাদেশে এরকম রাজনীতির প্রত্যাবর্তন দেখা গেছে।

৩.

বিএনপির জন্য রাজনীতি এখন আর সহজ নেই। একথা বলা যায় বিএনপির রাজনীতি কঠিন থেকে কঠিনতর হয়ে গেছে। বিএনপির এই রাজনৈতিক সংকট দল হিসেবে বিএনপিকে কি কোনও সম্ভাবনার সুযোগ তৈরি করে দেবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুব সহজ নয়। তবে, তাত্ত্বিকভাবে বলা যায় দেয়ালে যখন পিঠ ঠেকে যায়, তখন মানুষ তার সংকটকে সম্ভাবনার পথে ঠেলে নতুন পথ খুঁজে নেওয়ার চেষ্টা করে। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপিও সেই পথে পা রাখতে পারে। আবার ভুল সিদ্ধান্ত নিলে, ঐক্যবদ্ধ হওয়ার বদলে সাময়িক লোভে কোনও বিচ্যুতির পথে হাঁটলে বিএনপির জন্য বড় বিপদও তৈরি হতে পারে।

এখন দেখা যেতে পারে অতীত আমাদের কী শিক্ষা দিয়েছে? অতীতে আমরা দেখেছি, একটা রাজনৈতিক দলের জনভিত্তি গড়ে তুলে বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে গেলে অনেক কঠিন পথে চলতে হয়। অনেক বিপদ, অনেক সংকট, অনেক চড়াই-উৎরাই পার হতে হয়। তা যেমন রাজনৈতিক দলকে ভেতরে ভেতরে শক্ত করে তেমনি জনগণের হৃদয়েও জায়গা তৈরি করে দেয়। দলের নেতাকর্মীরাও এই কঠিন পথে হেঁটে একধরনের রাজনৈতিক নির্বাণ লাভ করে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তার রাজনৈতিক যাত্রাপথে এরকম পথপরিক্রমায় সিদ্ধি লাভ করেছে। বিপদের দিনে উঁচুতলার নেতারা পা পিছলে পড়লেও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা পথভ্রষ্ট হয়নি। এবং সেটাই আওয়ামী লীগকে আজকের এই শক্তিমত্ত অবস্থায় এনেছে। বিএনপির জন্যও এখন সেরকম পরীক্ষার দিন উপস্থিত হয়েছে। দেখার বিষয় বিএনপির তৃণমূলের শক্তি বিপদের দিনে উঁচুতলার নেতাদের পথ দেখাতে পারে কিনা!

৪.

বিএনপি চেয়ারপারসন ও তারেক রহমানের এই জেলদণ্ড তার মাঝারি নেতাদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হাজির করেছে। অতীতে অভিযোগ ছিল বেগম জিয়া ও তারেক রহমানের ভাবনার বাইরে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার সুযোগ তারা পেতেন না। এখন হয়তো সেই সুযোগ কিছুটা আসতে পারে। সেই সুযোগ বিএনপি নেতারা কতটা কাজে লাগাতে পারবেন সেটাও একটা বিবেচনার বিষয়।

অন্যদিকে জনগণ কী ভাবছে, বিএনপির রাজনীতিবিদরা সেটা ভাবছেন কিনা সেটাও একটা ভাবনার বিষয়। শুধু সিমপ্যাথির ওপর দাঁড়িয়ে আর আদালতে মামলা চালিয়ে জনহৃদয় জয় করা সহজ হবে না। বিএনপিকে তার রাজনৈতিক অবস্থান ক্রমশ পরিষ্কার করতে হবে। সরকারি বাধার মুখে মুক্ত গণতান্ত্রিক কর্মসূচি বিএনপির জন্য পালন করা এখন সহজ নয়, তবু তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মসূচি কী হবে, অতীতের ভুলগুলো সম্পর্কে তাদের মূল্যায়ন কী হবে সেসব সম্পর্কেও জনগণকে আস্তে আস্তে অবহিত করতে হবে। বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, বিপদের দিন হলেও তাদের জনগণের কাছেই ফিরতে হবে। আজ হোক কাল হোক জনশক্তিই দিয়েই তাদের রাজনীতিকে বেগবান করতে হবে। শুধু বিপক্ষের নেগেটিভ কাজকে শক্তি না ভেবে নিজেদের পজিটিভ কাজকে জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ