বাতিল, সংস্কার ও সংবিধান

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৪:৫৭, এপ্রিল ১৬, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৫:০৫, এপ্রিল ১৬, ২০১৮

আমীন আল রশীদ‘মেঘ না চাইতে বৃষ্টি’–সব সময় শুভ নাও হতে পারে। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করছেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী সেটি অভিমানে হোক আর বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই হোক, এই কোটা পদ্ধতি বাতিল বলেই ঘোষণা দিয়েছেন। যদিও গেজেট বা প্রজ্ঞাপন হওয়ার আগ পর্যন্ত এ বিষয়ে শেষ কথা বলার সুযোগ নেই। নেই বলেই আন্দোলনকারীরাও গেজেট না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন স্থগিত করেছেন। সেই সাথে তারা প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন এবং তাঁকে ‘মাদার অব এডুকেশন’ বা ‘শিক্ষার জননী’ বলে উপাধি দিয়েছেন। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পেলেই প্রজ্ঞাপন জারি হবে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কিছু প্রশ্ন এবং সংশয়ও তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সংবিধানে রাষ্ট্রের সকল নাগরিক সরকারি কর্ম লাভে সমান সুযোগ পাবেন বলে উল্লেখ থাকলেও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের যে নির্দেশনা রয়েছে, কোটা পদ্ধতি পুরোপুরি বাতিল করলে সেটি সংবিধানের এই নির্দেশনার খেলাপ হবে কিনা, তা নিয়েও কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন। কেউ কেউ এমন সংশয়ের কথাও বলছেন যে যদি শেষাবধি কোটা ব্যবস্থা বাতিল করে প্রজ্ঞাপন জারি হয়, তখন সংক্ষুব্ধ কেউ এর বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে রিট করতে পারেন এবং তখন যদি উচ্চ আদালত কোটা ব্যবস্থা বাতিলকে অবৈধ বলে রায় দেন, সেটি নতুন সংকটের জন্ম দেবে। যদিও কোটা বাতিলের দাবিতে একটি রিটের শুনানি না করে হাইকোর্ট বলেছিলেন, এটি নির্বাহী বিভাগের বিষয়। এখানে আমরা এ বিষয়ে একটি নির্মোহ বিশ্লেষণ দেওয়ার চেষ্টা করছি।

সংবিধানের ১৯(১) অনুচ্ছেদ বলছে,‘সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন।’ (২) মানুষে মানুষে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অসাম্য বিলোপ করিবার জন্য, নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করিবার জন্য এবং প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের উদ্দেশ্যে সুষম সুযোগ-সুবিধাদান নিশ্চিত করিবার জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন। (৩) জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।

সংবিধানের এই ‘সুষম সুযোগ-সুবিধাদান’ শব্দটি বস্তুত ‘সাম্য’ শব্দের বর্ধিতরূপ; অর্থাৎ যা ছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আমাদের সংবিধানের ৪ মূলনীতিকে (গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা) মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে অনেকে মনে  করেন। বস্তুত এই মূলনীতি এসেছে মুক্তিযুদ্ধের পরে রাষ্ট্র গঠনের প্রাক্কালে, অর্থাৎ সংবিধান প্রণয়নের সময়। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের চেতনা কী, কী কারণে ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পরে নিরস্ত্র বাঙালি সশস্ত্র হয়ে গেল এবং আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত পশ্চিম পাকিস্তানি আর্মির বিরুদ্ধে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধের ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়লো, তার কারণ এই অসাম্য। একই রাষ্ট্রের নাগরিক হওয়ার পরও পাকিস্তানের পূর্ব অংশ অর্থাৎ পূর্ব পাকিস্তানের নাগরিকরা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন বলেই, অর্থাৎ অসাম্য ও অন্যায্যতার শিকার হচ্ছিলেন বলেই স্বাধিকার ও স্বাধীনতার প্রসঙ্গটি সামনে আসে।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর সশস্ত্র আক্রমণের পর বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার যে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করে, সেখানে বলা হয়, ‘বাংলাদেশের জনগণের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করণার্থে, সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্ররূপে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা ঘোষণা করা হলো।’ অর্থাৎ এই যে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের জন্য দীর্ঘ নয় মাস মুক্তিসংগ্রাম হলো, সেটিই মুক্তিযুদ্ধের চেতনা।

আমাদের পূর্বজরা জানতেন, যদি একটি সমাজে সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা যায়, সেখানে গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতার মতো বিষয়গুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর হবে।

সংবিধানের ২৯(১) অনুচ্ছেদ আরও পরিষ্কার করে বলেছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে।’ (২) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী-পুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিক প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের অযোগ্য হইবেন না কিংবা সেই ক্ষেত্রে তাঁহার প্রতি বৈষম্য প্রদর্শন করা যাইবে না।’

এটুকু পড়ার পরে আমাদের মনে হবে সংবিধান প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ পাওয়ার ক্ষেত্রে সবার জন্য সমান অধিকারের কথাই বলেছে। কিন্তু পরক্ষণেই সংবিধান এও বলছে যে ‘এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই- (ক) নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশ যাহাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করিতে পারেন, সেই উদ্দেশ্যে তাঁহাদের অনুকূলে বিশেষ বিধান-প্রণয়ন করা হইতে,

(খ) কোন ধর্মীয় বা উপ-সম্প্রদায়গত প্রতিষ্ঠানে উক্ত ধর্মাবলম্বী বা উপ-সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তিদের জন্য নিয়োগ সংরক্ষণের বিধান-সংবলিত যে কোন আইন কার্যকর করা হইতে,

(গ) যে শ্রেণীর কর্মের বিশেষ প্রকৃতির জন্য তাহা নারী বা পুরুষের পক্ষে অনুপযোগী বিবেচিত হয়, সেইরূপ যে কোন শ্রেণীর নিয়োগ বা পদ যথাক্রমে পুরুষ বা নারীর জন্য সংরক্ষণ করা হইতে,রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।

তার মানে যারা সমাজের অনগ্রসর এবং পিছিয়ে পড়া অংশ, তাদের জন্য কোটা অথবা বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা সংবিধানেই রয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, যেহেতু কোটা ব্যবস্থা পুরোপুরি বাতিল বলে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন এবং যদি সেই ঘোষণার আলোকে প্রজ্ঞাপন জারি হয়, সেটি কি সংবিধানের এই নির্দেশনার অবমাননা হবে? এর পরিষ্কার ব্যাখ্যা হচ্ছে, যেহেতু সংবিধানে এটি বলা নেই যে, রাষ্ট্রকে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, বরং বলা হয়েছে রাষ্ট্র যদি কোনো অনগ্রসর অংশের নিয়োগ সংরক্ষণের বিধান করে, তাতে কোনও অসুবিধা নেই। মানে বিষয়টা ম্যানডেটরি নয়; এই রাষ্ট্রের সদিচ্ছার ব্যাপার। রাষ্ট্র সেই সদিচ্ছা থেকেই মুক্তিযোদ্ধার পরিবারের জন্য ৩০, নারীদের জন্য ১০, জেলার জন্য ১০, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫ এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ১ শতাংশসহ মোট ৫৬ শতাংশ কোটা সরকারি চাকরিতে সংরক্ষিত রেখেছে।

বিতর্কটা এখানেই যে ৫০ ভাগেরও বেশি যদি কোটার জন্য সংরক্ষিত থাকে, তাহলে সেখানে প্রকৃত মেধাবীদের বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং বছরের পর বছর ধরে এই পদ্ধতি চালু থাকায় অনেক মেধাহীন বা অযোগ্য লোক কোটার জোরে চাকরি পেয়েছেন এবং বহু মেধাবী সরকারি চাকরি পাননি–এমন অভিযোগ রয়েছে। বস্তুত এই পদ্ধতিকে বৈষম্যমূলক দাবি করেই এর বিরুদ্ধে আন্দোলন দানা বাঁধে। কিন্তু সেই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে যখন পুরো কোটা ব্যবস্থাই বাতিল বলে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিলেন, তখন এ প্রশ্নও উঠছে যে গ্রামের বা মফস্বলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা রাজধানী এবং বড় শহরের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে চাকরির প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন কিনা?

কোটা নয়, মেধার ভিত্তিতে চাকরি––এই ধারণার মধ্যে কিছু সমস্যাও আছে। কারণ, আমাদের যে শিক্ষাব্যবস্থা তাতে বড় শহরের অভিজাত (ইংলিশ মিডিয়াম) শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেবল বিত্তশালীদের সন্তানরাই পড়তে পারে। সাধারণ স্কুল কলেজ মাদ্রাসায় যারা পড়েন, তারা কি ওইসব অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীদের চেয়ে কম মেধাবী? মেধার মানদণ্ড কি শুধুই জিপিএ? মেধার মানদণ্ড কি ভালো ইংরেজি জানা? মেধার মানদণ্ড কি ইন্টারভিউ বোর্ডে স্মার্টলি কথা বলতে পারা? যখন উলিপুর কলেজ থেকে পাস করে কেউ একজন সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করবেন এবং তিনি যদি পরীক্ষা পদ্ধতির কারণে বড় প্রতিষ্ঠান থেকে পাস করা একজনের কাছে হেরে যান, সেখানে সামাজিক ন্যায় বিচার বা সাম্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পথটি রুদ্ধ হবে কিনা?

প্রত্যেকের ভোট সমান–এটি গণতন্ত্রের জন্য ঠিক আছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রপতির একটি ভোটের যে মূল্য, একজন রিকশাচালকের ভোটের মূল্যও তাই। কিন্তু আমরা যখন সামাজিক ন্যায়বিচারের কথা বলি, সেটি গণতন্ত্রের চেয়ে আরও বেশি কিছু। অর্থাৎ যারা পিছিয়ে আছে, বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্র তাদের এগিয়ে নেবে, এটিই সামাজিক ন্যায়বিচার।

তাই সরকারি চাকরিতে ৫৬ শতাংশ কোটা যেমন একটি বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা, তেমনি কোটা একেবারে বিলুপ্ত করে দেয়াও যুক্তিসঙ্গত নয়। কারণ, কোটা একেবারে বিলুপ্ত করে দিলে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং প্রতিবন্ধী মানুষকে উন্নয়নের মূল স্রোতধারায় সম্পৃক্ত করা কঠিন হবে। ফলে আমরা সাম্য ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে যদি আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলে মানি, তাহলে সমাজের অনগ্রসর, পিছিয়ে পড়া অংশকে উন্নয়নের ধারায় ‍যুক্ত করতে তাদের জন্য হয় নির্দিষ্ট সংখ্যায় কোটা রাখতে হবে অথবা বিকল্প উপায় বের করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী যদিও বলেছেন, প্রতিবন্ধী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিয়োগে আলাদা ব্যবস্থা করা হবে।  

সবাই নিশ্চয়ই এটি স্বীকার করবেন, কোটা পুরোপুরি বাতিল না করে বরং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে এটি ন্যূনতম পর্যায়ে নামিয়ে আনাই ন্যায়সঙ্গত। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, যদি কোটা লাগে তাহলে কেবিনেট সচিবের নেতৃত্বে যে তিন সদস্যের কমিটি আছে, তারা তা পর্যালোচনা করবে। আমার মনে হয়, আমলাদের দিয়ে পর্যালোচনা না করে বিভিন্ন ক্ষেত্রের (শিক্ষক, সাংবাদিক, লেখক, সাবেক সচিব, আইনজ্ঞ, মানবাধিকারকর্মী ইত্যাদি) বিশিষ্ট এবং শ্রদ্ধেয়জনদের নিয়ে একটি কোটা সংস্কার কমিশন গঠন করা যেতে পারে। কারণ, মেধার ভিত্তিতে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ হবে– এটি যেমন গণতান্ত্রিক এবং নাগরিকদের জীবন-জীবিকার দাবি, তেমনি সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য সমাজের অনগ্রসর মানুষের জন্য বিশেষ বিধান ও ব্যবস্থাও লাগবে। মুক্তিযোদ্ধারা যেহেতু জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, অতএব, তাঁদের পরিবারের দুঃখ-দুর্দশা লাঘব করা রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব। তাঁরা অসম্মানিত হলে পুরো জাতি অসম্মানিত হবে। ফলে এসব বিবেচনায় সরকারি চাকরি এবং রাষ্ট্রীয় অন্যান্য ক্ষেত্রে কোটা কিংবা বিশেষ ব্যবস্থা থাকতে হবে। তবে অবশ্যই সেটি ৫৬ শতাংশ নয়।

লেখক: সাংবাদিক

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ