১৭ এপ্রিল ও রাষ্ট্রনৈতিক সাফল্য

Send
শুভ কিবরিয়া
প্রকাশিত : ১৬:৫৭, এপ্রিল ১৭, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:৫৮, এপ্রিল ১৭, ২০১৮

শুভ কিবরিয়াইতিহাসের নানামুখিন বাঁক রাজনীতিতে একেক সময় একেক রকম প্রভাব ফেলে। কিন্তু ইতিহাসের কিছু মোড় ফেরানো ঘটনা থাকে সমকালীন ইতিহাস তার মূল্য ততটা না বুঝলেও চিরকালীন ইতিহাসে তার মূল্য অপরিসীম। বাংলাদেশ রাষ্ট্র হয়ে উঠবার আঁতুড়ঘরের এমন সব ঘটনা অছে, যার প্রচারণা নেই নানান কারণে, কিন্তু সেসব ঘটনা আর ঘটনার নেপথ্যের মানুষরা আমাদের রাষ্ট্রনৈতিক ইতিহাসের নথিতে, পুথিতে, প্রতিটি মুহূর্তের দলিলে অমর হয়ে আছেন। সমকালীন সময়ের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ তার মূল্য হয়তো সব সময় বুঝতে সক্ষম হয় না। তবে আগামী দিনের রাষ্ট্র তার পথ বেয়ে বড় হয়ে উঠতে চাইলে এই সাফল্যের কথা গর্বের সঙ্গেই খুঁজতে চেষ্টা করবে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রনৈতিক ইতিহাসে তেমনই একটা গৌরবময় দিন ১৭ এপ্রিল, ১৯৭১। এই দিনেই বাংলাদেশের প্রথম সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেন যুদ্ধরত অবস্থায়। বাংলাদেশের প্রথম সরকারের গঠন প্রবাসে হলেও এবং সেই সরকার বিদেশের মাটিতে কাজ শুরু করলেও, এই সরকার শপথ নেন বাংলাদেশের মাটিতেই। বলা বাহুল্য, শপথ অনুষ্ঠানের এক সপ্তাহ আগে ১১ এপ্রিল ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বেতার ভাষণেই প্রকাশ্য হয় এই সরকারের অবয়ব। ২৫ মার্চের ভয়াল অভিজ্ঞতার পর এই বেতার ভাষণই প্রথমবারের মতো মুক্তিযুদ্ধের চেহারায় আনে নতুনতর উদ্দীপনা।

‘তাজউদ্দীনের বেতার ভাষণের পরদিন থেকে অবরুদ্ধ ঢাকাবাসীর মুখে মুখে প্রচার পেতে শুরু করে, সত্যিই ঢাকার বাইরে অধিকাংশ জায়গায় পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। বিদ্রোহী বাঙালি সেনাবাহিনী, রাইফেলস, পুলিশ ও আনসারের সমন্বয়ে গঠিত মুক্তিবাহিনী সে যুদ্ধের পুরোভাগে রয়েছে। রাজনৈতিক নেতা হিসাবে তাজউদ্দীনের নিজস্ব পরিচিতি সে সময় তত ব্যাপক ছিল না। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়া সত্ত্বেও ওই দলের সভাপতি শেখ মুজিবের নামই কেবল ছিল সর্বজনপরিচিত। দলের মধ্যেও তাজউদ্দীনের অনুসারীর সংখ্যা ছিল সীমিত। মানুষকে উত্তেজিত বা উদ্বেলিত করার মতো বক্তৃতাও তিনি দিতে পারতেন না। তবে তাজউদ্দীনকে যারা চিনতেন, তারা তাঁকে সৎ ও যুক্তিবাদী মানুষ হিসাবেই গণ্য করতেন। তাজউদ্দীনের পরিচিতির সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাঁর বেতার বক্তৃতার কথা প্রচার পেয়ে চলল বেশ দ্রুতগতিতেই।… পরপর দুদিন আকাশবাণী তাজউদ্দীনের বক্তৃতা সম্প্রচার করায় ঢাকার উদ্বেগাকুল সাধারণ মানুষের মধ্যে আসন্ন মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সাহায্য ও সহযোগিতা লাভের বিষয় নিয়ে দ্রুত আশার সঞ্চার ঘটতে থাকে।’[১]

দুই.

এই আশা রাষ্ট্রনৈতিক পরিণতি লাভ করে ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ বাংলাদেশ সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করে গঠিত সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এই দিনেই আনুষ্ঠানিক শপথ নেন।

‘সৈয়দ নজরুল ইসলামকে উপ-রাষ্ট্রপতি এবং বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করা হয়। তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী, ক্যাপ্টেন এম. মনসুর আলী, খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও এই.এইচ.এম কামারুজ্জামান-কে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য নিয়োগ করা হয়।… অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও মন্ত্রিপরিষদ ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর মহকুমার বৈদ্যনাথতলার আম্রকাননে শপথগ্রহণ করেন।’[২]

এই শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানের প্রত্যক্ষদর্শী ও অংশীজনদের একজন ছিলেন ব্যারিস্টার আমীরুল ইসলাম। তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা হচ্ছে, ‘আমি আর মান্নান সাহেব প্রেস ক্লাবে (কলকাতা) গেলাম। প্রেস ক্লাব থেকে সাংবাদিকদের নিয়ে রওনা দিলাম। প্রায় এক-দেড়শ ট্যাক্সি ভর্তি সাংবাদিক। সবাইকে নিয়ে আমরা চলেছি বৈদ্যনাথতলাতে। আমরা সকাল ১১টার দিকে পৌঁছলাম। তিন ঘণ্টা লাগলো পথে।

আমরা আগে থেকেই আম্রকাননে সবকিছু ঠিক করে রেখেছিলাম। স্টেজ তৈরি করা হয়েছিল। ওখানে আমি দ্রুত ইংরেজিতে লেখা স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি বাংলা করে দিয়েছিলাম। সমস্ত পার্লামেন্ট সদস্যদের পক্ষ থেকে চিফ হুইপ হিসেবে ইউসুফ আলী সাহেবকে প্লেনিপোটেনশিয়ারি নিযুক্ত করে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়। ইউসুফ আলী সাহেব ঘোষণাপত্রের বাংলা অনুবাদটি পাঠ করেন। সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেব, তাজউদ্দীন সাহেব তাঁদের লিখিত বক্তৃতা দিলেন। এবং এই বক্তৃতার কপি সাংবাদিকদের দেওয়া হলো। সে দিনের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথগ্রহণের মাধ্যমে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সাংবাদিকরা কাভার করলেন যে, এটা হলো আমাদের সরকারের আনুষ্ঠানিক সূচনা বা আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ। তৌফিক এলাহী, মাহবুব মেহেরপুরের আম্রকাননে গার্ড অফ অনার দিলেন। তাজউদ্দীন ভাই এক বিদেশি সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে এই জায়গার নামকরণ করেন ‘মুজিবনগর’। আর এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, যুদ্ধের সময় সরকার শুধু এক জায়গায় উপস্থিত থাকবে না, যেখানে সরকার থাকবে সেটাই মুজিবনগর।’ [৩]

তিন.

যে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পথ বেয়ে এই ভূখণ্ডের মানুষের স্বাধিকারের পথ খুঁজে পাওয়া তার রাষ্ট্রনৈতিক ভিত্তি ছিল এই ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের প্রথম সরকারের আনুষ্ঠানিক শপথ। ১০ এপ্রিল ১৯৭১ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গৃহীত হওয়া, ১১ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বেতার ভাষণ, ১৭ এপ্রিল বিদেশি সাংবাদিকদের হাতে তুলে দেওয়া প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার মুদ্রিত কপির মধ্য দিয়ে পৃথিবীর সামনে উদ্ভাসিত হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনৈতিক যৌক্তিকতা। কেন এই স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে বিশ্ববাসীর একাত্মতা প্রকাশ করে সর্বাত্মক সমর্থন দেওয়া উচিত তার দালিলিক যুক্তিও বিধৃত হয়েছে এই পরিসরে।

১৭ এপ্রিল ১৯৭১ বাংলাদেশ সরকারের শপথগ্রহণের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেন, ‘পাকিস্তান আজ   মৃত এবং অসংখ্য আদম সন্তানের লাশের তলায় তার কবর রচিত হয়েছে।...আমাদের এই জাতীয় সংগ্রামে, তাই আমরা রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি এবং বৈষয়িক ও নৈতিক সমর্থনের জন্য বিশ্বের জাতিসমূহের প্রতি আকুল আবেদন জানাচ্ছি।…বিশ্বের আর কোনও জাতি আমাদের চেয়ে স্বীকৃতির বেশি দাবিদার হতে পারে না। কেননা, আর কোনও জাতি আমাদের চেয়ে কঠোরতর সংগ্রাম করেনি, অধিকতর ত্যাগ স্বীকার করেনি। জয়বাংলা।’

চার.

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মাঝে মাঝে যে ধোঁয়াশা আর কূটতর্কের অবতারণা করা হয় নানান ক্ষুদ্রস্বার্থে তার প্রতিটির জবাব নিহিত আছে ১৯৭১ সালের ১১ তারিখের প্রধানমন্ত্রীর বেতার ভাষণ আর ১৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর লিখিত ভাষণের পরতে পরতে। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তাঁর নামে পরিচালিত বাংলাদেশ সরকারের নেতৃত্বে স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয় এবং এই গৌরবময় সাফল্যের ইতিকথার এক রাষ্ট্রনৈতিক মাইলফলক হচ্ছে ১৭ এপ্রিল। এই রাষ্ট্রনৈতিক সাফল্যের কথা না জানলে বাংলাদেশের মানুষের শক্তি আর সামর্থ্যের কথা অজানা থেকে যাবে। আঞ্চলিক-আন্তর্জাতিক রাজনীতির কূটকৌশল উতরে, অভ্যন্তরীণ সকল বিভেদকে উপেক্ষা করে যে বিশাল ক্যানভাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ পরিচালিত হয়েছে তার উৎসমুখ, শক্তিমুখ জানার জন্যেই এই দিনটির গুরুত্ব উপলব্ধি করা দরকার।

বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম যাদের হাতে উন্নত বাংলাদেশের সোপান নির্মিত হবে বলে আমরা নিত্য আশা পোষণ করি, তাদের জন্য এই গৌরবগাথার আদ্যোপান্ত জানা খুব জরুরি।

আগামী দিনে সকল ঝড়  উপেক্ষা করে, বিশ্বময় প্রতিযোগিতামূলক ‘রাজনীতি’তে সাফল্যের সাথে রাষ্ট্রনৈতিকভাবে টিকে থাকার জন্যও এই দিনের অন্তর্গত শক্তি প্রেরণা হতে পারে।  সেই প্রণোদনাতেও ১৭ এপ্রিলকে জানা দরকার। বোঝা দরকার।

তথ্যসূত্র:-

[১] উপধারা একাত্তর:মার্চ-এপ্রিল, মঈদুল হাসান,প্রথমা প্রকাশন, ডিসেম্বর ২০১৫, পৃষ্ঠা ৪৬-৪৭।

[২] বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১, এইচ.টি.ইমাম, আগামী প্রকাশনী, দ্বিতীয় মুদ্রণ, মার্চ২০০৪, পৃষ্ঠা ৬৩।

[৩] তাজউদ্দীন আহমদ-আলোকের অনন্তধারা,আমীরুল ইসলামের সাক্ষাৎকার, প্রতিভাস, জুলাই ২০০৬, পৃষ্ঠা ৭৯।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ