‘না’ একটি চমৎকার শব্দ

Send
জেসমিন চৌধুরী
প্রকাশিত : ১৩:৫৪, মে ১০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ০০:১৮, মে ১১, ২০১৮

জেসমিন চৌধুরীকেউ বলছেন, নারীর পোশাকের স্বল্পতাই ধর্ষণের কারণ, কেউ বলছেন, পোশাকের আধিক্য নারীকে দুর্বলতর লিঙ্গে পরিণত করার মাধ্যমে ধর্ষণকে উৎসাহিত করে। ধর্ষণের কারণ সম্পর্কে যখন গবেষকরাও নিশ্চিত হতে পারছেন না, তখন আমরা হুটহাট নিজের মতো করে ব্যাখ্যা দিয়ে যাচ্ছি। ওদিকে ধর্ষণের মাত্রা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। ঘরের নিরাপত্তায় বসে কথা বলার মানুষের অভাব নেই, অথচ ধর্ষণবিরোধী মানববন্ধন তিন হাতের বেশি লম্বা হয় না। মাত্র কয়েকজন মানুষ হাত ধরাধরি করে পথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকে, বাকিরা ব্যাঙ্গাত্মক হাসি হেসে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। 
ধর্ষণের কারণ নির্ধারণ অথবা এর প্রতিকার সাধন— কোনোটাই সহজ নয়। আসল কথা হলো নারীর গায়ে বাড়তি পোশাক চড়িয়েছে যে পুরুষতন্ত্র সেই পুরুষতন্ত্রই আবার নারীর পোশাক হরণে তৎপর। ধর্ষণ কিছুতেই পুরোপুরি থামানো যাবে না কারণ অনেক ক্ষেত্রে রক্ষকই ভক্ষক। তবু ধর্ষণ বা অন্যান্য ধরনের যৌন নির্যাতন থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করতে আমরা নারীরা কিছুটা সতর্কতা অবলম্বন করতে পারি। 

সমাজ ও পারিবারিক কাঠামোতে নারীর অধিকারের অভাব দেখে এসেছি ছোটবেলা থেকেই। তবু এর জন্য প্রতিটি পুরুষকে ব্যক্তিগতভাবে অপরাধী করে রাখিনি। কবিতা আর নাটকের চর্চা করতে গিয়ে কিছু সংস্কৃতিমনা, সংযত ও শ্রদ্ধাশীল পুরুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল বলেই হয়তো নিজ অধিকার ও নিরাপত্তা সম্পর্কে চিরদিন সচেতন থাকলেও পুরুষদের ঘৃণা করিনি কখনও। কিন্তু তাদের সম্পর্কে সতর্ক থাকার শিক্ষাও জীবনই আমাকে দিয়েছে।

খুব ছোটবেলা থেকে স্কুলশিক্ষক, বাসার কাজের ছেলে, বেড়াতে আসা আত্মীয়-স্বজন, ডাক্তার, বাসে/ট্যাম্পুতে সহযাত্রী, বাজারের ভিড়ে লুকিয়ে থাকা হিংস্র থাবা—সব মিলিয়ে যৌন নির্যাতক হিসেবে পুরুষের কুৎসিত রূপ দেখেছি অসংখ্যবার। তাই একসময় পুরুষের প্রতি অনাস্থা আর বিতৃষ্ণা জন্ম নিয়েছে অবধারিতভাবেই। কিছুটা বড় হওয়ার পর বুঝতে পেরেছি, পুরুষ মাত্রই যেমন নির্যাতক নয়, তেমনি যেকোনও পুরুষই নির্যাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ার ক্ষমতাও রাখে। পুরুষের কামনার ছোবল থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাকেই নিতে হবে। আমার সঙ্গে আমি ছাড়া আসলে আর কেউ নেই।

একটা মেয়ের এ ধরনের ভাবনা একটা সমাজের জন্য খুব একটা গৌরবের কথা নয় কিন্তু যে সমাজে পুরুষকে সংযত হতে শেখানো হয় না, সেই সমাজে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে একটা মেয়ে আর কী করতে পারে? প্রাইমারি স্কুলের জীবন থেকে আমার পুরুষ বন্ধুর সংখ্যাই বেশি ছিল কিন্তু সেই বন্ধুত্বে অবিচলিত বিশ্বাস স্থান পায়নি কখনও, এটা একজন নারী হিসেবে আমারই দুর্ভাগ্য হয়তো।

লন্ডনে মেয়েকে নিয়ে একা থাকতাম যখন, তখনও আমার বয়স খুব একটা বেশি নয়। মনে মনে দ্বিতীয়বার ঘর বাঁধার জন্য একজন সঙ্গী খুঁজতাম। ওই সময় পরিচয় হলো একজন সাহিত্যপ্রেমীর সঙ্গে। একদিন কাজের ফাঁকে তার সঙ্গে লাঞ্চ করার প্ল্যান হলো, কিন্তু লাঞ্চটাইমের ঘণ্টাখানেক আগে তিনি ফোন করে বললেন, তার শরীর খারাপ, আমি যেন তার বাসায় চলে যাই। আমি নির্দ্বিধায় তাকে বললাম, এত অল্প পরিচয়ে তার বাসায় চলে যাওয়ার প্রস্তাব আমার ভালো লাগেনি।

‘এই আপনার আধুনিকতা? এই সাহস নিয়ে চলাফেরা করেন? আপনার কি ধারণা আমি একা পেলেই আপনাকে রেপ করবো?’

তার এসব আক্রমণাত্মক কথা বিন্দুমাত্র বিচলিত করেনি আমাকে। হুটহাট কারও বাসায় চলে যাওয়ার মধ্যে তার আধুনিকতার ধারণা সীমাবদ্ধ থাকতে পারে, আমার আধুনিকতা নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে চলতে পারার মধ্যে ব্যপ্তি পেয়েছিল। আমার সাহসও একজন পুরুষকে ‘না’ বলার মধ্যে, তার আহ্বানে সাড়া দেওয়ার মধ্যে নয়।

এরপরও আরও কয়েকবার তিনি নানান ছুতায় আমাকে তার বাসায় যেতে বলেন, তার বইয়ের কালেকশন দেখার জন্য, মিউজিক শেয়ারিংয়ের জন্য। তার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলেই তিনি আমাকে পশ্চাৎপদ বাঙালি নারী বলে উসকানোর চেষ্টা করতেন। একপর্যায়ে তার সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগই বিচ্ছিন্ন করলাম। কারণ আমাদের আধুনিকতা ও মুক্তচিন্তার ধারণাকে কিছুতেই এক বিন্দুতে মেলানো যাচ্ছিল না। হয়তো তার কোনও অসৎ উদ্দেশ্য ছিল না, কিন্তু আমি সেই ঝুঁকি নেবো কেন?

পরবর্তী সময়ে যখন আরও একজন সাহিত্যপ্রেমীর সঙ্গে পরিচয় হলো, তিনি নিজেই দেখা করতে চাইলেন একটা আর্ট গ্যালারির সামনে—মুক্ত বাতাসে, মুক্ত আলোয়। শুরু থেকেই স্নিগ্ধ একটা অনুভূতিতে মন ভরে গিয়েছিল। কারণ কোনও জোর জবরদস্তি ছিল না, চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ছিল না, বাড়াবাড়ি আগ্রহের অস্বস্তি ছিল না। সেই ব্যক্তির সঙ্গেই ঘর করছি আজ  সাত বছর হলো। ঘর-সংসার করি, তবু মনে হয় সিঙ্গেলই আছি, নিজের ব্যক্তিসত্তা আর ইচ্ছা অনিচ্ছাকে কখনোই বিসর্জন দিতে হয় না বলে।

আমি প্রায়ই স্পিড অ্যান্ড ক্রাশ এয়োয়ারনেস কোর্সে দোভাষীর কাজ করি, যেখানে চালকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়, যাতে রাস্তার অন্য চালকদের ভুলের হাত থেকেও নিজেকে রক্ষা করা যায়।

আমি মেয়েদের বলতে চাই, এই পৃথিবীটা একটা গতিময় মোটরওয়ের মতোই। অন্য গাড়ির চালকদের মন মানসিকতা জানা নেই আমাদের, কাজেই তাদের ওপর আস্থা না রেখে নিজের গাড়িটার, নিজের জীবনটার নিরাপত্তার দায়িত্ব আমাদেরই নিতে হবে।

পুরুষের আগ্রহ দেখে উচ্ছ্বসিত হওয়ার কিছু নেই। পুরুষ আমাকে চায়, এতে আমি বিগলিত হবো কেন? আমি বিগলিত হবো যখন আমার মনে হবে, ‘আমি তাকে চাই’।

‘না’ বলতে শেখো মেয়েরা, এটি একটি চমৎকার  শব্দ।

লেখক: অভিবাসী শিক্ষক ও অনুবাদক

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ