‘ঘাড়ত্যাড়া’ সন্তান বনাম অসহায় মা-বাবা

Send
চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৬:২১, মে ২৭, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২৩, মে ২৭, ২০১৮

চিররঞ্জন সরকারগত কয়েক বছরে পরিচিত কারও ছেলেমেয়ে কোনও পাবলিক পরীক্ষায় ফেল করেছে-এমনটা শুনিনি। কিন্তু এবার ঘনিষ্ঠ এক পরিবারের একপুত্রধনের এসএসসিতে ফেল করার সংবাদে চমকে উঠি! এ যুগেও কেউ ফেল করে তাহলে! নানাজনের সঙ্গে এ ব্যাপারে কথা হয়েছে। তবে সবাই এ ব্যাপারে দায়ী করেছে ছেলেটির বাবা-মাকে। বাবা-মার কারণেই নাকি এমন ঘটনা ঘটেছে!
মাত্র কিছুদিন আগে অপর এক ঘনিষ্ঠজনের কন্যা জাত-ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে নিজের ভালোবাসার মানুষকে খুঁজে নিয়ে বিয়ে করেছে। সেখানেও শুনেছি নানা নিন্দা-মন্দ। সবই আসলে বাবা-মার দোষ। আবার মায়ের আশকারা না পেলে মেয়েটা এভাবে গোল্লায় যেত না।
যখনই ছেলেমেয়েরা কোথাও কিছু অঘটন ঘটায়, তখনই প্রথম আঙুল ওঠে বাবা-মায়েদের দিকে। এটাই স্বাভাবিক। আপনিও বলেন, আমিও বলি। বা কোনও ছেলে মেয়ে যদি রাস্তায় অশোভন আচরণ করে, নোংরামি করে, আমরা বলি—বাবা মা ঠিকমত শিক্ষা দেয়নি। এই ধারণাটা বহু পুরনো। ওল্ড ইজ গোল্ড। তাই এই তত্ত্বটাও ওল্ড, এবং গোল্ডের মতোই মর্যাদা পেয়ে আসছে। না হলে এখনও পর্যন্ত, বিয়ের পরে মেয়েরা শ্বশুরবাড়ি গিয়ে কোনও একটা কাজ না পারলেই প্রথম যে টিপ্পনিটা শুনতে হয় সেটা হলো—তোমার মা কি কিছুই শেখায়নি?

অর্থাৎ সবকিছু শিখিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব মায়ের বা বাবারই। তাদেরই সবকিছু শেখাতে হবে এটাই মা-বাবা হওয়ার প্রধান শর্ত। এই দায়িত্ব তারা পালন করেন। ধাপে ধাপে জীবন পাঠের দিকে তাদের সন্তানকে এগিয়ে নিয়ে যান। কেউ কেউ আবার এই শেখানোর ব্যাপারে একটু বেশিই পটু। তারা পড়ার সঙ্গে আঁকা শেখান, নাচ, গান, বাজনা শেখান, সাঁতার, ক্রিকেট, ক্যারাটে ক্লাসে ভর্তি করান। নানা কিছু ছেলেমেয়েকে শিখিয়ে দিতে চান। বলা যায় না, জীবনের চলার পথে কোনটা প্রয়োজন পড়ে। অথবা তাঁর সন্তানের মধ্যে যদি সুপ্ত কোনও প্রতিভা থাকে, তা বিকশিত হওয়ার শুরু তো করা গেলো। হ্যাঁ, এর জন্যে রুটিন করতে হয়। সেই রুটিন মেনে ছেলেমেয়েদের চালাতে হয়। এসব দেখেশুনে তখন আমরা হই হই করি, বলি—ছেলেমেয়েগুলোকে গিনিপিগ পেয়েছে! উঠতে বসতে বাবা-মাকে দোষ দিই। এমনকি আমরা বলি, আসলে নিজের শখ-সাধগুলো ওদের দিয়ে মেটাচ্ছে।

বারবার আমরা বাবা-মায়ের দিকে আঙুল তুলে সহজ সমাধানের দিকে এগিয়ে যাই। না শেখালে বাবা মায়ের দোষ, অনেক কিছুর মধ্যে দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও সেটা বাবা-মায়ের দোষ। স্কুলের প্রতিটা ক্লাসের জন্যে বই-খাতা চাই। তাই ওদের বইয়ের ব্যাগ বড় হয়। আর আমরা ওদের পিঠে মস্ত বইয়ের বোঝা দেখে বাঁকা কথা বলি। এক্ষেত্রেও বাবা-মাকে দোষ দিই। আবার রুটিন মিলিয়ে বই-খাতা না নিয়ে গেলো, স্কুলের শিক্ষকরাও বাবা-মাকেই দোষ দেন। পিতা-মাতাকে সর্বংসহা হতে হয়। জানি, মানিও।

এসব শিক্ষাদান পর্বের মাঝেই ছেলেমেয়েরা একটু একটু করে বড় হয়েছে, তাদের চোখ মুখ ফুটেছে। ওরা কেউ শিল্পী, বাদক, কেউ গায়ক, কেউ খেলোয়াড় হচ্ছে। এই গুণগুলোর জন্য কেউ কখনও বাবা-মাকে বাহবা দেন না। কিন্তু দোষারোপের জন্য বাবা-মাকে টেনে আনেন। অথচ তারা যা শেখান না, যা শেখাতে চান না, সেই অ-কথা কু-কথা, রূঢ় ব্যবহার, অশিষ্ট আচরণ তার জন্যেও অধম বাবা-মাকেই কাঠগড়ায় তোলা হয়। আর তারা তাও মাথানত করে মেনে নেন। কারণ আপনি বলছেন, আমি মানছি আপনার বলার হক আছে। কারণ, আপনি যে-শিক্ষা দিয়েছেন আপনার সন্তান সেটা গ্রহণ করেছে, আপনার সন্তানটি ভালো হয়েছে। আমারটি হয়নি। তার মানে আমি তাকে শিক্ষা দিইনি। এটা প্রমাণিত, তাই দোষী আমি।

কিন্তু এটা কি ঠিক? আপনি হয়তো জানেন না, আপনার মতো আমিও চেষ্টা করেছি। অনেক চেষ্টা করেছি। কিন্তু, পারিনি। আমরা এসব ব্যর্থ বাবা-মায়েদের যত দোষী করবো দিন দিন তাঁরা তত অসহায় হয়ে পড়বেন। আমার মনে হয়, আজকের দিনে বাবা-মায়েরা বড় একা, অসহায়। এই অসহায় বাবা-মায়ের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

তবে কি এই বাবা-মায়েদের অসহায় করে তুলছে এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা? এখন প্রশ্নটা গভীর, সত্যিই কি এই ছেলেমেয়েরা বাবা-মাকে অসহায় করে দিতে পারে? হয়তো এর উত্তর ‘না’ই হবে, না তারা পারে না। কিন্তু, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে উল্টো। একটু চোখ-কান খুলে দেখুন, অসহায় হয়ে অনেক বাবা-মা বোবা মেরে আছেন। অসহায় হয়ে তাদের অসুস্থ হয়ে পড়তেও দেখছি। কাকে বলবেন তাদের মনের কথাটি? বড় সংসার ছোট করে তো তারা বেরিয়ে এসেছেন। এখন দুঃখের কথা শোনার মানুষ নেই।

স্বীকার করে নেওয়া ভালো, বাবা-মায়েদের প্রচুর দোষ। তারা ঘরে ও বাইরে সন্তানের মুখে আলো ফেলার জন্য অনেক মিথ্যা কথা বলেছেন। বহু বাবা-মা আছেন যারা নিয়মিত সন্তানের রেজাল্ট নিয়ে মিথ্যা কথা বলেন। সন্তান পরীক্ষার পেল পঞ্চাশ, বাবা-মা গলা উঁচিয়ে বলে বেড়ালেন তার সন্তান লেটার পেয়েছে, স্টার পেয়েছে। এমনকি, সেই আনন্দে বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ন্ত্রণ করে খাইয়েও দিলেন। এই মিথ্যার বীজ তারা আস্তে আস্তে বুনে দিলেন সন্তানের ভেতর। একদিন এই মিথ্যাই তাদের সন্তান তাকে বলছে। আর এর থেকে প্রভাবিত হচ্ছে আরও অনেক ছেলেমেয়ে। তারা দেখছে, তাদেরই এক বন্ধুর বাবা-মা কী সুন্দর করে মেয়ের গুণপনা করছেন। তারা ভাবছে, তার বাবা-মায়েরও এমনটা করা উচিত। মাঝের যে সাদা ফারাকটা আছে তা কী সহজেই মুছে যাচ্ছে।

কিন্তু কিছু বাবা-মা আছেন যারা এই মিথ্যার বেসাতি করেন না। তারা সাদাকে সাদা বলেন, কালোকে কালো। তাদের হয়ে গেছে মুশকিল। অসহায় হয়ে পড়ছেন তারা। তারা সমাজের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছেন না। কেননা আপনার ছেলেটি দেখছে তার বন্ধুর বাবারা ছেলেমেয়েকে পার্টি করার জন্য টাকা দেন, সেও আশা করে তারা বাবাও টাকা দেবেন। বন্ধুরা দামি স্মার্ট ফোন নিয়ে ঘোরে, সাধারণ মোবাইলে আপনার ছেলেটি হীনম্মন্যতায় ভোগে।

নিজের সাধ্যের বাইরে গিয়ে অনেক বাবা-মা’ই ছেলেমেয়েকে ভালো স্কুল, বড় স্কুলে পড়তে পাঠান। বড় স্কুল, ভালো স্কুল মানে কী? বড় স্কুল, ভালো স্কুল মানে যেখানে পয়সাঅলা ঘরের ছেলেমেয়েরা পড়তে পারে। যেখানে বড়লোকি চাল শেখানো হয়। আমাদের সমাজ আমাদের তাই শিখিয়েছে। বড় স্কুল, ভালো স্কুল মানে এই নয়—যেখানে মেধাবী ছাত্ররা পড়ে। যেখানে ভালো রেজাল্ট হয়।

একজন সাধারণ বাবা মা কষ্ট করে, কৃচ্ছ্রসাধন করে ছেলেমেয়েকে ভালো স্কুলে পড়াতে যান।

এখন ব্র্যান্ডের যুগ। সবাই ব্র্যান্ড খোঁজেন। লোকে জামা কাপড় জুতো ব্র্যান্ডেড ছাড়া পরেন না। বাচ্চা হওয়ার জন্য ব্র্যান্ডেড হাসপাতাল খোঁজেন। তবে বাবা-মা কী দোষ করলো ছেলেমেয়ের জন্য ব্র্যান্ডেড স্কুল খুঁজে?

তারা ভাবেন, ব্র্যান্ডেড স্কুল থেকে ছেলেমেয়েরা বিদ্যা নিয়ে আসবে। স্কুল থেকে যেমন বিদ্যা আসবে, তেমন অবিদ্যাও আসবে। আসতে বাধ্য। কেউ কেউ খাসির মাংসের দোকানে গিয়ে তদবির করে হাড়ছাড়া মাংস দেওয়ার জন্য। কিন্তু সবাই যদি এই বায়না করে দোকানদার বেচারা কী করবেন। অবিদ্যাটা হচ্ছে সেই হাড়। আপনি না-চাইলেও বিদ্যার সঙ্গে অবিদ্যাটিও আসবে।

আবার উলটো দিকে দেখবেন, কেউ কেউ আছেন তারা হাড়সুদ্ধ মাংসই পছন্দ করেন। তারা মনে করেন হাড়ছাড়া মাংসের স্বাদ হয় না। এরা ছেলেমেয়েকে বিদ্যা আর অবিদ্যায় মিলিয়ে মিশিয়ে মানুষ করতে চান। নইলে দুদিন পরে তার ছেলেটি বা মেয়েটি জীবনযুদ্ধে লড়বে কী করে? অবিদ্যা দরকার, ছোবল না-মারলেও ফোঁস করার ভাষাও শিখতে হবে। অবশ্য কেউ কেউ আছেন যারা দোকানে গিয়ে চোখ বন্ধ করে থাকেন। দোকানদার ছাইপাঁশ যা দিল চোখ বন্ধ করে নিয়ে চলে এসে, হায় হায় করলেন।

এই তিন টাইপের বাবা মা-ই এখন আমাদের চারপাশে ঘুরছেন। বলতে পারেন, একটা অদৃশ্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। ব্র্যান্ডেড দোকান থেকে কী যে আসছে আপনি জানেন না। যদি ছেলে বা মেয়েটি ভালো হলো তো ভালো। আপনি জিতে গেছেন। আর যদি রূঢ়, বদমেজাজি, খামখেয়ালি, অবাধ্য হয়? তাহলে কী সব দোষারোপের আঙুল উঁচানো হবে বাবা-মায়ের দিকে?

আমরা তাই সবাই অসহায় হয়ে পড়ছি। আমরা অসহায় হয়ে পড়ছি কেন, কেননা এখনও পর্যন্ত আমাদের সমাজ এদের পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখে না। এদের আলাদা একটা জগৎ আছে, চিন্তা চেতনা আছে সেটা ভাবে না। আমাদের সময় আমরা বড়দের মুখের ওপর একটা কথা বললে আমাদের ‘পাকা’, ‘অশিষ্ট’ অ্যাখ্যা দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হতো। এখন আর অল্প বয়সীদের পাকা বলা হয় না। শুধু হাঁ করে তাকিয়ে দেখতে হয়। কী হু হু করে ওরা অল্পদিনে ‘বোদ্ধা’ হয়ে বেড়ে উঠছে। সেই বেড়ে ওঠার সময় সঠিক রোদ না পেলে ওরা এলইডি আলোর দিকেই দৌড়বে। আসলে ভেতর ভেতর তো নিউইয়র্ক থেকে কাউয়ারচর এক বঁড়শিতে গেঁথে গিয়েছে। আর আমরা ভাবছি বাবা-মায়েদের পুরনো ট্রাঙ্কের জগৎটাই ওদের জগৎ। এদের নিজেদের মতো বিচার বুদ্ধি আছে। খারাপ ব্যবহার, ভালো ব্যবহার যা করে—সেটা ওরাই করে। ওদের খামখেয়ালিপনাটুকু ওদের। ওদেরকে এর জন্যে আলাদা কোনও শিক্ষা দিতে হয় না। কিন্তু, ওদের জানিয়ে দিতে হয়—তুমি কোন দিকে যাচ্ছো।

আসলে আমরা সবাই বাবা মাকে দোষারোপ করে সহজ সমাধানের পথে যাচ্ছি। বুঝেও বুঝতে চাইছি না, আমাদের সমাজজীবনে ভয়ঙ্কর একটা প্রলয় কাণ্ড চলছে। আমরা এই প্রলয় কাণ্ড দেখব না বলে অন্ধ সেজে থাকছি। কিন্তু অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?    

লেখক: কলামিস্ট

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ