‘মেরেছিস কলসির কানা, তাই বলে কি প্রেম দেবো না’!

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৩:৪৯, জুন ০৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:০০, জুন ০৩, ২০১৮

বিভুরঞ্জন সরকারপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদেশ সফরে গেলে দেশে ফিরে সংবাদ সম্মেলন করে সফর সম্পর্কে বিস্তারিত অবহিত করেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেন। তখন আর বিষয়টি বিদেশ সফরের নির্দিষ্ট ইস্যুর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। নানা প্রসঙ্গ চলে আসে। রাজনীতি তো অবশ্যই। রাজনীতির চেয়ে আমাদের প্রিয় সাবজেক্ট আর কিছু নেই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে যেকোনও বিষয়ে প্রশ্ন করা যায়। তিনি তার জবাব দেন। প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি থাকেন প্রাণবন্ত, হাসিখুশি এবং দৃঢ়চিত্ত। শেখ হাসিনাকে 'সাংবাদিকবান্ধব' প্রধানমন্ত্রী বলা হয়। অন্যদিকে, আমাদের আরেক নেত্রী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপির মতো একটি বড় দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলন ডাকলেও খোলামেলা কথা বলতে চান না। লিখিত ফরমাল বক্তৃতার বাইরে কিছু বলতে তাকে রাজি করানো যায় না। সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে চান না। প্রশ্নের জবাব দিতে তিনি পছন্দ করেন না। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়েছেন খুব কমই। বিরোধী দলে থাকলেও তিনি সাংবাদিকদের মুখোমুখি হতে চান না।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেওয়া এক ধরনের জবাবদিহি। যেকোনও কাজের স্বচ্ছতার জন্য জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকা ভালো। খালেদা জিয়া কখনও সাধারণ নিয়ম মানেন না। এই যে খালেদা জিয়া সংবাদ সম্মেলন ডেকে প্রশ্নের জবাব দেন না বা দিতে পছন্দ করেন না, তাতে কি তার জনপ্রিয়তার কোনও হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে? এককথায় উত্তর হলো– না। সাংবাদিকরাও এতে মন খারাপ করেন না। কিন্তু শেখ হাসিনা যদি সেরকম করতেন তাহলে চারদিকে নিন্দা-সমালোচনার ঝড় বয়ে যেতো।

গত ৩০ মে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর একটি সংবাদ সম্মেলন ছিল। তিনি ২৫ ও ২৬ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সফরে গিয়েছিলেন। ওই সফর সম্পর্কে জানানোর জন্যই সংবাদ সম্মেলন। এটি রাষ্ট্রীয় সফর ছিল না। এই সফরকে অনেকটা সাংস্কৃতিক ও ব্যক্তিগত বলা যায়। মূলত দুটি কারণে প্রধানমন্ত্রীর কলকাতা যাওয়া। এক. শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ সরকারের অর্থায়নে নির্মিত ‘বাংলাদেশ ভবন’ উদ্বোধন এবং দুই. আসানসোলে কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত সম্মানসূচক ডি-লিট উপাধি গ্রহণ। কিন্তু শান্তিনিকেতনের অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির উপস্থিতি, শেখ হাসিনাকে স্বাগত জানানো, বিশ্বভারতীর সমাবর্তন অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনাকে সম্মানিত অতিথির মর্যাদা দেওয়া এবং সর্বশেষ কিছু সময়ের জন্য দুই প্রধানমন্ত্রীর একান্ত বৈঠক শেখ হাসিনার সফরকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে, ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। এছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে শেখ হাসিনার অনির্ধারিত একটি বৈঠকের কারণে এই সফরটি অনেকের কাছে ছিল আগ্রহের বিষয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার লিখিত বক্তব্যে সফরের উদ্দেশ্য এবং দুদিনে তিনি কী কী করেছেন তার বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। প্রশ্নোত্তর পর্বে আসে তিস্তা, রোহিঙ্গা, আগামী নির্বাচনসহ আরও কিছু প্রসঙ্গ। তিস্তা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করেই বলেন, এবার তিস্তা নিয়ে আলোচনার জন্য যাইনি। যৌথ নদী কমিশন এ নিয়ে কাজ করছে। অনেক সমস্যার আমরা সমাধান করেছি। তিস্তা সমস্যারও সমাধান হবে।

শান্তিনিকেতনে বাংলাদেশ ভবনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রদত্ত বক্তৃতায় শেখ হাসিনা তিস্তা শব্দটি উচ্চারণ না করলেও কৌশলে তিনি যা বলেছেন সেটা মঞ্চে উপবিষ্ট নরেন্দ্র মোদি এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বুঝতে কষ্ট হয়েছে বলে মনে হয় না। আর নরেন্দ্র মোদি ও মমতার সঙ্গে একান্ত বৈঠকে যে তিস্তা প্রসঙ্গে আলোচনা হয়েছে – এতে কোনও সন্দেহ নেই।

ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার তিস্তা চুক্তিতে আগ্রহী। নরেন্দ্র মোদি এ ব্যাপারে তার আগ্রহের কথা একাধিক সময় বলেছেন। দুই দেশের বর্তমান সরকারের মেয়াদকালেই তিস্তাচুক্তি সম্পাদনের আশাবাদও ব্যক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বাগড়া দেওয়ায় তিস্তার বিষয়টি ঝুলে আছে। মমতার সঙ্গে একটি সমঝোতায় আসার চেষ্টা মোদি সরকার করছে বলে শোনা যায়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ রাজনীতির নানা হিসাব-নিকাশের জন্য জট খুলছে না। মমতা চান কেন্দ্রীয় সরকার বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি করুক। তারপর তিনি এটাকে ইস্যু করে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের রাজনীতি করবেন। মোদির বিজিপি নির্বাচনে জিতে একের পর এক রাজ্যে সরকার গঠন করছে, কোথাও এককভাবে, কোথাও সমমনাদের সহযোগিতায়। পশ্চিমবঙ্গেও মমতার কানের কাছে নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে বিজিপি। আগামী নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ দখলের পরিকল্পনা বিজিপির। নির্বাচন সামনে রেখে কোনও রকম ঝুঁকি নিতে চান না মমতা। তিস্তা ইস্যুতে সস্তা  রাজনীতি করে বাজিমাৎ করতে চান তিনি। মোদি যদি তাকে অগ্রাহ্য করে তিস্তার পানি বাংলাদেশকে দিয়ে দেন তাহলে মমতা কেন্দ্রীয় বিজিপি সরকার এবং ব্যক্তিগতভাবে মোদিকে পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থবিরোধী বলে প্রচারের মওকা পাবেন। পানির আবেগে নির্বাচনি দরিয়া পাড়ি দিতে চান। মোদি এটা বোঝেন বলেই তিস্তা নিয়ে তড়িঘড়ি কিছু করছেন না। তবে ভারত সরকার এটাও বোঝে যে তিস্তা ইস্যু ঝুলিয়ে রেখে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক উষ্ণ রাখা যাবে না। বাংলাদেশকে অভিন্ন সব নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা না দিয়ে ‘সৌহার্দপূর্ণ’ সম্পর্কের গল্প বাজারে বিকোবে না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের কিছু করণীয় নেই, যা করার করতে হবে ভারতকেই।

কলকাতার ‘আনন্দ বাজার’ পত্রিকায় খবর ছাপা হয়েছে যে, বাংলাদেশ এখন ভারতের কাছে প্রতিদান চায়। এ সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি কোনও প্রতিদান চাই না। প্রতিদানের কী আছে এখানে? কারও কাছে চাওয়ার অভ্যাস আমার একটু কম, দেওয়ার অভ্যাস একটু বেশি। আমরা ভারতকে যা দিয়েছি, সেটা ভারত সারা জীবন মনে রাখবে। অতীতের বোমাবাজি-গুলির জায়গায় আমরা তাদের শান্তি ফিরিয়ে দিয়েছি। এটা তাদের মনে রাখতে হবে। আমি কোনো প্রতিদান চাই না। তবে হ্যাঁ, আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তারা যে সহায়তা দিয়েছে, আমরা তা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি’।

প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট এবং বলিষ্ঠ। এটা যাদের বুঝতে সমস্যা হচ্ছে তারা আসলে বুঝতে চান না।  আওয়ামী লীগ বিরোধিতা এবং ভারত বিরোধিতা যাদের রাজনীতির হাতিয়ার তারা এমন কথা বলে যে ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য শেখ হাসিনা বারবার ভারত সফর করেন। প্রধানমন্ত্রীর এবারের ভারত সফর ব্যর্থ, কারণ তিস্তার পানি আনতে পারেননি।

এবারের সফরটা যে পানি আনার ছিল না– সেটা জেনেও যারা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য উদ্দেশ্যমূলক প্রচারণা চালান তারা মতলববাজ, তাদের উদ্দেশ্য অসৎ। আর ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ভারত সফর– এই বক্তব্য যাদের তাদের উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনার জবাব: ‘জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখলের দুই বছরের মধ্যে ভারত গিয়েছিলেন। কেন? প্রধানমন্ত্রী হয়ে খালেদা জিয়াও ভারত গিয়েছিলেন। এসব তারা ভুলে গেছেন? আজকে তারা তিস্তার পানি পানি করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল গঙ্গার পানি। খালেদা জিয়া দিল্লি থেকে ফিরে কী বলছিলেন? গঙ্গার পানির কথা তিনি ভুলে গিয়েছিলেন’।

বিকল্প ধারার সভাপতি ডা.  বদরুদ্দোজা সম্প্রতি নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার স্বার্থে জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাব করেছেন। সংবাদ সম্মেলনে একজন সাংবাদিক এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর মতামত জানতে চাইলে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বদরুদ্দোজা সাহেব ইলেকশন নিয়ে প্রশ্ন করেন। উনাকে প্রশ্ন করি, জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করে যখন ‘হ্যাঁ’, ‘না’ ভোট নিয়েছিল, তখন বদু কাকা কোথায় ছিলেন? ভোট নিয়ে যত রকমের অনিয়ম, এটা তো তাদের আমলেই হয়েছে। মাগুরা উপনির্বাচন, ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন খালেদা জিয়া করেছেন। বদরুদ্দোজা তখন তার সঙ্গেই ছিলেন। এগুলো তার মনে রাখা উচিত। এখন তিনি খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি করেন। যার জন্য তাকে রেললাইন ধরে দৌঁড়াতে হলো তিনি তার মুক্তি দাবি করেন। যেন, মেরেছিস কলসির কানা, তাই বলে কি প্রেম দেবো না?

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মুক্তি চাচ্ছেন। তিনি জেলে কেন? এতিমের টাকা নিয়ে দুর্নীতির দায়ে তিনি জেলে গেছেন। জেল দিয়েছে কোর্ট, আমি তো দেইনি। তো মুক্তিটা কার কাছে চাইছে? রাষ্ট্রপতির কাছে উনি ক্ষমা চাক’।

সংবাদ সম্মেলনে চলমান মাদকবিরোধী অভিযান এবং এই ব্যবসায় জড়িত  গডফাদার প্রসঙ্গ ওঠে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা কাকে গডফাদার বলছেন আমি সেসব জানি না, আমি শুধু এটুকু বলতে পারি, কে গডফাদার, কে ডন, তা কিন্তু আমরা বিচার করছি না। এই অভিযান হঠাৎ করে শুরু হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা সংস্থা এ নিয়ে কাজ করেছে। কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, পুলিশ থেকে শুরু করে প্রত্যেকে এই ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্ক। যে-ই গডফাদার থাকুক, সে যে বাহিনীতেই থাকুক, কাউকে ছাড়া হচ্ছে না, হবে না’।

প্রধানমন্ত্রী সবাইকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, ‘আমি যখন ধরি, ভালো করেই ধরি’। দশ হাজারের মতো মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতারের তথ্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, একটি অভিযান চালাতে গেলে কিছু ঘটনা ঘটতেই পারে। মাদকবিরোধী অভিযানকে বড় করে না দেখে অন্য বিষয় বড় করে না তোলার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

লেখক: কলামিস্ট

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ