‘মালয়েশিয়া বোলে’ ও উত্তরাধিকার

Send
আহসান কবির
প্রকাশিত : ১৩:২০, জুন ১৩, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৩:২২, জুন ১৩, ২০১৮

আহসান কবিরগালগপ্পো শুনতে বাঙালি খুব ভালোবাসে। তারা বিশ্বাস করে বাঙালি দেশে ভালো না করলেও বিদেশে গিয়ে নাকি ঢের ভালো করে। সবচেয়ে বড় উদাহরণ মাহাথির মোহাম্মাদ। তার দাদার বাড়ি নাকি বাংলাদেশের চট্টগ্রামে।  জাহাজে চাকরি করতেন ভদ্রলোক। তারপর নাকি একদিন মালয়েশিয়ায় নেমে গিয়েছিলেন। সেখানকার মেয়ে বিয়ে করে থেকে যান। এই গল্পের লেজ হচ্ছে চট্টগ্রামের এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব উইমেনের সঙ্গে নাকি মাহাথিরের মেয়ে মেরিনা জড়িত আছেন। গল্প গল্পই।  তবে মাহাথির নিজে কখনও বলেননি যে তার পূর্বপুরুষের বাস ছিল বাংলায়।  আসলে মালয়েশিয়া আর মাহাথির দু’জনে দু’জনার, দু’জনই সমান বিখ্যাত।
‘টুইন টাওয়ারের’ জন্য শুধু আমেরিকা নয়, মালয়েশিয়াও বিখ্যাত। আমেরিকারটা ‘ওয়ান ইলেভেন’-এর কারণে বেশি আলোচিত হলেও মালয়েশিয়ারটা বিখ্যাত অন্য কারণে।  ‘পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার’ যখন নির্মাণের পরিকল্পনা হয় তখন ভয়াবহ সমালোচনা হয়েছিল।  পেট্রোনাসের বিশাল নির্মাণ ব্যয় এবং শেষমেশ এটা আদৌ শেষ করা যাবে কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।  মাহাথির মোহাম্মাদকে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বারবার একই উত্তর দিতেন- ‘মালয়েশিয়া বোলে’, যার মানে মালয়েশিয়াই পারে। টুইন টাওয়ার এখন মালয়েশিয়ার অন্যতম গর্বের বিষয়। পদ্মাসেতু হয়ে গেলে শেখ হাসিনাও হয়তো বলে ফেলতে পারেন- ‘বাংলাদেশ বোলে’।

যাই হোক, মালয়েশিয়া বোলের মতো মাহাথির নিজের সাথেও নিজে পেরেছিলেন একবার।  বুকে অসুখ ধরা পড়েছিল। খুব দ্রুত এনজিওপ্লাস্ট করার কথা বলেছিলেন মালয়েশিয়ার ডাক্তাররা। তাকে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হসপিটালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। তিনি যেতে রাজি হননি।  সেই অসুখ পরবর্তীকালে আরও বেড়েছিল, শেষমেশ বাইপাস সার্জারি করতে হয়েছিল। কিন্তু বিদেশে চিকিৎসা করার মানসিকতা বদলে দেশের চিকিৎসা খাতকে পরম মমতায় গড়ে তুলেছিলেন মাহাথির নিজেই। এদেশের নেতা মন্ত্রী বড় বড় ব্যবসায়ীরা নাকি সর্দি হলেও বিদেশে চিকিৎসা করান। মাহাথিরের কাছ থেকে আসলে অনেক কিছুই শেখার আছে।

শেখার আছে শত্রুকে কীভাবে বন্ধু বানাতে হয়। শেখার আছে মানুষকে কীভাবে স্বপ্ন দেখাতে হয়, কীভাবে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে কঠোর হতে হয়। একদা মাহাথির মোহাম্মাদ ছিলেন কঠোর এক কর্তৃত্বপরায়ণ শাসক। বিরোধী মতকে সহ্য করতে পারতেন না। এশিয়া ও আফ্রিকার ক্ষমতামাতাল একনায়কদের মতোই তিনি দেশ চালাতেন। বিরোধীদের ওপর মামলা ও দমনপীড়ন যেমন ছিল তার আমলে, তেমনি সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতাও তেমন ছিল না। বিদেশি গণমাধ্যমগুলোর কাছে তিনি ছিলেন গণতন্ত্রহীন অথচ উন্নয়নের রাজনীতির পুরোধা পুরুষ! মালয়েশিয়াকে তিনি নিয়ে গেছেন অন্য উচ্চতায়। তাই তাকে বলা হয় আধুনিক মালয়েশিয়ার জনক।

১৯৮১ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন মাহাথির। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তার ডেপুটি ছিলেন আনোয়ার ইব্রাহিম। আনোয়ার ইব্রাহিমকেই একদা শত্রু ভেবেছিলেন মাহাথির। তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন, সমকামিতার মামলায় তাকে জেলেও ঢুকিয়েছিলেন।  সেই ইব্রাহিমের কারণেই পনের বছর পর রাজনীতিতে ফিরে প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছেন মাহাথির। ২০১৮ সালের মে মাসের এই নির্বাচনে মাহাথির যতটা জিতেছেন, তার চেয়ে অনেক বেশি জিতেছেন আনোয়ার ইব্রাহিম। একদা আনোয়ার ছিলেন মাহাথিরের ডেপুটি, জেল থেকে না বের হওয়া পর্যন্ত আনোয়ারের স্ত্রীই হবেন মাহাথিরের ডেপুটি। মালয়েশিয়ার রাজার সঙ্গেও কথা বলে রেখেছিলেন মাহাথির। আনোয়ার ইব্রাহিম ইতোমধ্যে ছাড়া পেয়েছেন।  তার প্রধানমন্ত্রী হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র। মাহাথির স্বীকার করেন যে ইব্রাহিমকে জেলে ঢোকানো বড় ধরনের ভুল ছিল।  যাকে জেলে পুরেছিলেন, তার মহানুভবতায় মাহাথির আবারও প্রধানমন্ত্রী।  শত্রুকে বন্ধু বানিয়েছেন আসলে কে? মাহাথির না আনোয়ার ইব্রাহিম?

মাহাথির ফিরেছেন এটা পুরনো খবর।  তাকে নিয়ে অনেক বিজয়গাথাও লেখা হয়েছে।  তার অবসর জীবনে যারা তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন, ছবি তুলেছিলেন তারা সেসব প্রকাশ করছেন, দেখা হওয়ার ঘটনা লিখছেন।  কেউ কেউ অবশ্য তার বয়স নিয়ে গবেষণায় নেমে গেছেন। কীভাবে মাহাথির বয়স ধরে রাখলেন সেটাই তাদের গবেষণার ব্যাপার। জানি না কেউ কেউ মাহাথির নামে কোন বডি লোশন বের করবে কিনা। সেই বডি লোশনের গায়ে হয়তো লেখা থাকবে- এই বডি লোশন গায়ে মাখলে চামড়াতে ভাঁজ পড়বে না। মনে হবে না আপনার বয়স হচ্ছে! কেউ কেউ এনার্জি ড্রিংকও বের করতে পারেন মাহাথিরের নামে। হয়তো স্লোগান থাকবে এমন- সিক্রেট অব মাহাথিরস এনার্জি। কেউ কেউ অবশ্য মাহাথিরের নামে বলবর্ধক কিছুও বাজারে ছেড়ে দিতে পারে।

তবে উত্তরাধিকার মাহাথিরের পিছু ছাড়েনি। সারা পৃথিবীর রাজনীতিতেও আছে উত্তরাধিকারের দাপট।  গণতন্ত্রের যতই বড়াই করুক আমেরিকা কিংবা ভারত, সেখানেও আছে ‘গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র’ (রাজতন্ত্রে বাবার পরে ছেলে হতো রাজা। গণতন্ত্রে বাবার পরে ছেলে, মেয়ে কিংবা স্ত্রী হবে প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট!)। সিনিয়র বুশ আর জুনিয়র বুশকে নিয়ে আমেরিকার মানুষ কম রসিকতা করেনি।  যুদ্ধবাজ বাবা ও ছেলের ভেতর ছেলেকে নিয়েই বেশি উপহাস করা হয়েছিল।  জুনিয়র বুশের দিকে জুতা ছুড়ে মেরেছিলেন এক ইরাকি সাংবাদিক। আর ভারতের কংগ্রেসের রাজনীতি জুড়ে আছে নেহরু তথা গান্ধী পরিবার। হয়তো গান্ধী পরিবারের কেউ (রাহুল বা প্রিয়াংকা) ভবিষ্যতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীও হয়ে যেতে পারেন। বাংলাদেশ, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, বার্মার মতো মালয়েশিয়াতেও আছে উত্তরাধিকার। মাহাথির দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন এই উত্তরাধিকারকেই হটিয়ে। এই উত্তরাধিকারের নাম নজীব রাজ্জাক (রাজাক নামটাই বেশি প্রচারিত)।

মালয়েশিয়ার স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে ২০১৮-এর মে মাস পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল বারিসান ন্যাশনাল জোট। এই জোটের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তুন আব্দুর রাজ্জাক। মালয়েশিয়ার রাজনীতির প্রধানতম পুরুষদের একজন ছিলেন তিনি। আজও মালয়েশিয়ার মানুষ শ্রদ্ধার সাথে তাঁকে স্মরণ করেন। তার ছেলে নজীব রাজ্জাক। রাজনীতি থেকে অবসরে গিয়ে ১৫ বছর পরে মাহাথিরের ফেরার বড় কারণও নজীব। নজীবের দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও পাচারের ঘটনার প্রতিবাদ জানান মাহাথির। চীনসহ আরো কয়েকটি দেশ মালয়েশিয়ায় বিশাল বিনিয়োগ করে। কয়েকটি দেশের সাথে চুক্তিও করেন নজীব। কিন্তু মাহাথিরসহ অনেকেই মনে করেন যে নজীব তার ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করেছেন, দেশের স্বার্থ সেখানে রক্ষিত হয়নি।  বারিসান জোট থেকেই এর আগে মাহাথির প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি দল এবং জোট ছেড়ে নতুন দল ও জোট গঠন করেন। পাকাতন হারপান জোট। যার মানে আশার জোট। মালয়েশিয়ার মানুষ আশাবাদী হয়ে মাহাথিরকে নির্বাচিত করেছেন,পরাজিত হয়েছেন নজীব। একই সাথে নজীব তাঁর বাবার ইমেজ ও সুখ্যাতি নষ্ট করেছেন। হয়তো তার বিচার হবে এবং তার রাজনীতি শেষ হয়ে যাওয়াও বিচিত্র কিছু না! কারণ, ইতোমধ্যে পুলিশ নজীবের বাড়িতে হানা দিয়েছে, অনেক কাগজপত্র নিয়ে গেছে, তার স্ত্রীকেও জিজ্ঞাসাবাদ করেছে।

উত্তরাধিকার নিয়ে পথ হাঁটছেন মাহাথিরও। তিনি নতুন দল গঠন করেছেন তার ছেলে মুখরিককে নিয়ে। এর আগে অবশ্য মুখরিক বারিসান জোটে ছিলেন, ছিলেন কেডাহ প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী। আনোয়ার ইব্রাহিম প্রধানমন্ত্রী হলেও  মুখরিক কোনও না কোনভাবে ক্ষমতার কাছাকাছিই থাকবেন। মুখরিকের ভবিষ্যৎ যাই হোক, নজীবের কাছ থেকে মুখরিক শিক্ষা নিতে পারেন। ছেলের অপকর্মের কারণে বাবার ইমেজের যেন ক্ষতি না হয়। বাংলাদেশের প্রধান দুই দলও উত্তরাধিকারের রাজনীতিতে জড়িয়ে আছে। আশা করি এই ঘটনা তাদের চিন্তার খোরাক হবে।

মাহাথির মালয়, চীনা ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত মালয়েশিয়ানদের সমানভাবেই ভালোবাসেন।  ধরপাকড়, বিরোধী দল দমন ও মত প্রকাশে বাধা দেওয়ার মতো কর্তৃত্বপরায়ণ শাসন তিনি করবেন না বলে কথা দিয়েছেন। শেষ ভালো যার সব ভালো তার। মাহাথির হয়তো দার্শনিক ভলতেয়ারের পথ ধরেই হাঁটবেন। মৃত্যুর আগে ভলতেয়ারের কাছে এক ধর্মযাজক জানতে চেয়েছিলেন- জীবনের শেষপ্রান্তে এসে আপনি কী স্বীকার করবেন যে ঈশ্বর আছেন? ভলতেয়ার উত্তর দিয়েছিলেন- শেষ সময়ে কাউকে শত্রু বানিয়ে কী লাভ? আর মুখরিক কী করবেন সেটা তিনিই ভালো জানেন।

উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে একটা গল্প বলে বিদায় নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট তাঁর কন্যাকে খুব ভালোবাসতেন। তার ভাবনা ছিল এমন- প্রত্যেক সন্তানই তাঁর বাবার মতো হতে চায়। তবে আবেগ ও অন্ধ স্নেহ তাকে বিপদগামী করে। প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত রুজভেল্টকে রাজা লুইস ১৬-এর একটি পোট্রেট উপহার দিয়েছিলেন। এই পোট্রেটে ৪০২টি হীরক খণ্ড সংযুক্ত ছিল। তিনি পোট্রেটটাকে অক্ষত রাখতে চেয়েছিলেন। রুজভেল্ট তার কন্যার নামে এই পোট্রেট উইল করে দিয়ে যান। পোট্রেটের হীরা দিয়ে মেয়ে যেন গয়না না বানায় সেজন্য মেয়ের উদ্দেশে উপদেশ লিখে যান এভাবে- এখন থেকে তোমার গয়না কম পরা উচিত হবে!

লেখক: রম্যলেখক

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ