মেয়েরাও পারে নাকি মেয়েরাই পারে?

Send
ফারজানা হুসাইন
প্রকাশিত : ১৪:৪৫, জুন ৩০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:২৫, জুন ৩০, ২০১৮

ফারজানা হুসাইনগত ক্রিসমাস আর নিউ ইয়ারের ছুটিতে হঠাৎ পাওয়া কিছু অবসরে সত্য কাহিনিনির্ভর হিন্দি চলচ্চিত্র–‘দঙ্গল’ (যার বাংলা অর্থ ‘কুস্তিলড়াই’) দেখতে বসলাম। গত বছর থেকেই খুব শোরগোল শোনা যাচ্ছিল এই ছবিটি নিয়ে। একে তো কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন বলিউড অভিনেতা আমির খান, তার ওপর এই চলচ্চিত্রের জন্য ইউটিউব আর ফেসবুকজুড়ে আমির খানের শরীর গঠনের বিভিন্ন ধাপের ছবি নিয়ে হচ্ছিল ব্যাপক আলোচনা। এই চলচ্চিত্রে আমির খান অভিনয় করেছেন মহাবির সিং ফোগাটের চরিত্রে, যিনি বাস্তবে একজন কুস্তিগির। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভারতের জন্য স্বর্ণপদক জয়ে ব্যর্থ হয়ে মহাবির সিং প্রতিজ্ঞা করেন, যা তিনি নিজে করতে পারেননি, তা তার ছেলে সন্তানকে দিয়ে করাবেন। কিন্তু একে একে চার কন্যাসন্তানের জন্ম হলে মহাবির সিং মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এই ভেবে যে, পুত্রসন্তান ছাড়া কুস্তিতে লড়াই করে পদক পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি তার মেয়েদের কুস্তি লড়তে প্রশিক্ষণ দেন এবং তার বড় মেয়ে গীতা পোগাত ২০১০ সালের কমনওয়েলথ গেমসে ভারতের প্রথম নারী কুস্তিগির হিসেবে স্বর্ণ জয় করেন।
'দঙ্গল' চলচ্চিত্রটি মূলত গীতা ফোগাটের গল্প, তার সাফল্যগাথা-অথচ পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাকে পূঁজি করে আমির খানের উপস্থিতি আর উদোম মাংসল শরীরকে কাজে লাগিয়ে শেষমেষ দারুণ ব্যবসা সফল হলো 'দঙ্গল'।

কারণ গীতা ফোগাটের গলায় কয়েকটা ফুলের মালা আর কিছু প্রগতিপন্থীর বাহবা জুটলেও, ঘরের বাইরে খেলার মাঠে নারীর সফলতাকে কেউ পয়সা খরচ করে সিনেমা হলে দেখতে যাবে না। একজন দক্ষিণ এশিয়ার নারী এই অভূতপূর্ব কাহিনির জন্ম দিলেও সেই কাহিনিকে শুধু পুরুষের মুখচ্ছবি করে দর্শকনন্দিত করা যাবে। যথার্থই আমির খানের শারীরিক বন্দনায় একবাক্যে সবাই বলেছে পয়সা উসুল ছবি!

নারী-পুরুষের মাঝে খ্যাতির বৈষম্য কেবল চলচ্চিত্রে সীমাবদ্ধ নয়, খেলার মাঠের অর্জনে আর উপার্জনেও রয়েছে বিশাল বৈষম্য।

ফোর্বস পত্রিকা খেলাধুলায় পৃথিবীব্যাপী সর্বাধিক ধনী ব্যক্তিদের ২০১৮ সালের বার্ষিক তালিকা প্রকাশ করেছে এবং গত নয় বছরের মতো এবছরও কোনও নারী ক্রীড়াবিদ প্রথম একশ’ জনের মাঝে উঠে আসতে পারেনি।

এত গেলো পে-গ্যাপের করুণ কাহিনি। রিও অলিম্পিক ২০১৬-তে ব্রিটিশ টেনিস প্লেয়ার অ্যান্ডি মারে দ্বিতীয়বারের মতো টেনিসে গোল্ড মেডাল জেতার পর বিবিসির এক সাংবাদিক তাকে শুভেচ্ছা জানান। বলেন, মারে একমাত্র টেনিস প্লেয়ার যে দুটো অলিম্পিকে গোল্ড মেডাল অর্জন করেছেন । মারে তৎক্ষণাৎ সেই সাংবাদিককে মনে করিয়ে দেন, তিনিই প্রথম কিংবা একমাত্র নন, বরং সেরেনা ও ভিনাস উইলিয়ামসের চারটি করে অলিম্পিক গোল্ড মেডেল আছে। এমন প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব আর নারীবাদী বক্তব্যের জন্য বেশ বাহবা কুড়ান মারে। কিন্তু সঙ্গে-সঙ্গে এই বিষয়টিও চাক্ষুষ হয়ে ওঠে যে, উইলিয়ামস বোনেরা বিশ্বক্রীড়া অঙ্গনের খুব পরিচিত মুখ হলেও কেবল নারী খেলোয়াড় হওয়ার কারণে  তাদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ের অর্জনও এমনভাবে সচরাচর উপেক্ষিত হয়।

এ ধরনের ঘটনা যে কেবল উইলিয়ামসদের সঙ্গে ঘটেছে কিংবা একবারই ঘটেছে, কিন্তু নয়। রিও অলিম্পিকের আরেকটি ঘটনা বলি। মেয়েদের ১০০ মিটার দৌড়ে জ্যামাইকার গোল্ড মেডেলিস্ট ইয়াইন থম্পসন ও ব্রোঞ্জ মেডেলিস্ট ফ্রেজার—উভয়কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, জ্যামাইকার তারকা পুরুষ স্প্রিন্টার উসাইন বোল্টের প্রতি মিডিয়ার বেশি বা প্রায় সবটুকু মনোযোগ থাকে বলে এই নারী স্প্রিনটারেরা নিজেদের কাঁধে কিছুটা কম চাপ অনুভব করেন কিনা এবং এই কম চাপ তাদের ভালো ফল করতে সহায়তা করে কিনা? জবাবে ফ্রেজার প্রাইস সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত সাংবাদিকদেরকে মনে করিয়ে দেন—‘এই প্রেস কনফারেন্স মহিলাদের ১০০ মিটার ফাইনালের জন্য, ইলাইন সোনা জিতেছে এবং আমি ব্রোঞ্জ পদক পেয়েছি, আমি মনে করি মিডিয়ার স্পটলাইট অন্তত আজ রাতে অন্য কেউ নয় কেবল আমাদের ওপর থাকা উচিত।’

এদিকে এই উপমহাদেশের ক্রীড়াতারকা দম্পতি সোনিয়া মির্জা ও শোয়েব মালিকের বিয়ের পর সাংবাদিকরা সোনিয়া মির্জাকে বারবার জিজ্ঞেস করতেন বিয়ের পর তিনি আর খেলবেন কিনা এবং কবে তিনি সন্তান নেবেন। বারবার একই প্রশ্নে বিরক্ত সোনিয়া সাংবাদিকদের দিকে উল্টো প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন, এই একই প্রশ্ন কেন তারা শোয়েব মালিককে করেন না। বিয়ে কেবল তিনি একা করেননি, শোয়েবও তাকে বিয়ে করেছেন। বিয়ে একজন পুরুষ খেলোয়াড়ের ক্যারিয়ারে কোনও বাধা না হলে, একজন নারী খেলোয়াড়ের জন্য

 বাধা হয়ে দাঁড়াবে?

২. ফেসবুকে কয়েকদিন ধরেই একটি ট্রল দেখা যাচ্ছে। যেখানে আছে–

এলাকার চাচা: কী রে মেসি, মাসখানেক তোমাকে দেখি না যে?

মেসি: চাচা, ওয়ার্ল্ডকাপ খেলতে রাশিয়া গিয়েছিলাম।

এলাকার চাচা দুঃখ প্রকাশের ভঙ্গিতে:  ফুটবল খেলে বেড়াও সারাদিন কেন, বিসিএসে চান্স পাওনি?

হয়তো এই উদাহরণটা কিছুটা অতিরঞ্জিত হয়ে গেলো। সময় অনেকটাই বদলেছে এখন। এইতো কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটি ছবি বেশ ভাইরাল হয়েছিল। ছবিতে দেখা গেলো, সন্ধ্যার আগে আগে এক কিশোর তার মায়ের সঙ্গে হেঁটে বাড়ি ফিরছে। কিশোরটির পরনে ছিল স্পোর্টস-ওয়্যার বা খেলার পোশাক। পাশে হেঁটে যাওয়া মায়ের কাঁধে কিশোরটির খেলার সরঞ্জামের ব্যাগ।

 

যেকোনও পেশার প্রতি, খেলাধূলাকে কেবল শখের বিষয় নয়, বরং পেশা হিসেবে নেওয়ার প্রতি আমাদের সমাজের, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজের মানসিকতায় যে বেশ বড়সড় পরিবর্তন এসেছে শেষ দশকে, এই ছবিটি তারই প্রমাণ।

সন তারিখ হিসাব করে বলতে গেলে ক্রিকেট সর্বসাধারণের ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে সাতানব্বইয়ে মালয়েশিয়ার কিলাতকিলাব মাঠে পাইলট-আকরাম খান-বুলবুলদের জয়ের দিন থেকে। দিনে দিনে ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের প্রাপ্তির খাতা যেমন গাণিতিক হারে বেড়েছে, জ্যামিতিকহারে পিছিয়ে পড়েছে ফুটবল। ক্রিকেটপ্রেমী আর দর্শকের মাঝে ছেলে-মেয়েদের আনুপাতিকহারে তফাৎটা তেমন নেই, অন্তত তেমনটা চোখে পড়ে না দর্শক সারিতে বা বাংলাদেশের যেকোনও বিজয়ে রাজপথে নেমে আসা আনন্দ মিছিলে। তবে তফাৎটা খুব বেশি চোখে লাগে খেলার মাঠে। তফাৎটা চোখে পড়ে ‘বড় হয়ে তুমি কী হতে চাও’– এই প্রশ্নে। বিশ্বকাপ ক্রিকেটে বাংলাদেশের অংশগ্রহণের পর থেকে পাড়ায়-মহল্লায়-স্কুলে যেভাবে ছেলেদের ক্রিকেটের ব্যাট-বল হাতে ছুটোছুটি করতে দেখা গেছে, মেয়েদেরকে কি সেভাবে দেখা গেছে? কোনও স্কুলে মেয়েরা কি স্কুল ছুটির পর কিংবা টিফিনে ছুটোছুটি করে ক্রিকেট খেলে? আন্তঃস্কুল পর্যায়ে মেয়েদের কোনও ক্রিকেট খেলার আয়োজন করা হয় কোথাও? কোনও মেয়ে শিশু কি হাতের খেলনা ব্যাট উঁচিয়ে ধরে বলেছে, সে বড় হয়ে ক্রিকেটার হতে চায়? সব উত্তরগুলো ‘না’। অথচ ক্রিকেটে আমাদের প্রথম ট্রফি ঘরে উঠেছে মেয়েদের হাত ধরেই।

নারী ও পুরুষ—উভয়ই মানুষ হলেও শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা সমাজ আর সংস্কার ঠিক করে দেয় প্রাত্যহিক জীবনে আর সমাজে নারী-পুরুষের স্থান আর ভূমিকা। তাই পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সচরাচর নারীর স্থান ঘরের কোণে আর পুরুষকে দেখা হয় দ্বিগ্বিজয়ী বীরপুরুষ রূপে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের সমাজে নারীরা আজ স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা সমাপ্ত করছে, কর্মস্থলে পুরুষ সহকর্মীর সঙ্গে-সঙ্গে সমানতালে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করছে বটে কিন্তু সে সংখ্যা আজও নিতান্তই নগণ্য। যে পরিবারগুলো কন্যা সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈতরণী পার হতে দিচ্ছে কিংবা চাকরি করতে অনুমতি দিচ্ছে (হ্যাঁ, অনুমতি শব্দটি এখানে ভেবে-চিন্তেই লিখেছি আমি), সেই পরিবার কি কন্যা সন্তানটিকে একটু ব্যতিক্রম কিছু করার অনুমতি দেবে? গতানুগতিক ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-শিক্ষক-বিসিএস অফিসার না হয়ে বরং এই ‘ব্যতিক্রম কিছুটা’ হতে পারে এমন, যেকোনও মেয়ে যদি ফুটবলার কিংবা ক্রিকেটার হতে চায়? সেক্ষেত্রে মেয়েকে তার ইচ্ছে পূরণে উৎসাহ দেওয়া তো দূরের কথা, অনুমতিটুকু দেওয়া হবে কিনা, সন্দেহ। আমি বড় হয়ে ক্রিকেটার হতে চাই—এই চাওয়াটা বাস্তবরূপ দিতে হলে ছেলেটাকে শুধু বাবা-মায়ের প্রথাসিদ্ধ ‘ছেলে আমার মস্তবড় অফিসার হবে’, এ স্বপ্নের বিপক্ষে নিজের স্বপ্নটাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হয়। অথচ মেয়ের ক্ষেত্রে তাকে বিরুদ্ধে আচরণ করতে হয় সমাজের প্রথাগত রীতি আর নিয়মকে। ক্রিকেটার ছেলের গর্বে আজ হয়তো সাকিব-তামিমের মায়ের বুক ভরে যায়, কিন্তু ক্রিকেটার মেয়ের ভবিষ্যতে বিয়ে না হওয়ার আশঙ্কায় আর পাঁচজনের কটূ কথায় বাবা-মায়ের কেবল মাথা হেঁট হয় আমাদের সমাজে।

পাকিস্তানি সুদর্শন ক্রিকেটারের জন্য গ্যালারিতে বসে বাঙালি তরুণী প্ল্যাকার্ডে আকুতি জানায়—‘মেরি মি, আফ্রিদি’। লাখ টাকা পুরস্কার আর ফ্ল্যাট উপহার পায় আমাদের ছেলেরা অথচ এশিয়াকাপ জয় করে আসা নারী ক্রিকেটাররা শঙ্কায় থাকে ন্যূনতম বেতন-ভাতা নিয়ে। পত্রিকায় শিরোনাম হয় জাহানারা কেবল ব্যাটেই ভালো নয়, তার রান্না বিরিয়ানিও ভালো! জাহানারার ট্রফি জয়, তার মাঠের সাফল্যগাথা, তার পরিশ্রম সবকিছুকে বাদ দিয়ে তার রন্ধনগুণই মূল পরিচয় হয়ে ওঠে, তা কেবল মেয়ে বলেই।

 

৩. ২০০২-এ আমেরিকান সাইকোলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের করা ‘গ্লোবাল সেল্ফ এস্টিম এক্রোস দ্য লাইফ স্প্যান’ নামক গবেষণায় যে তথ্য আর উপাত্ত ওঠে আসে, তা থেকে দেখা যায়, বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের সেল্ফ এস্টিম বা নিজের যোগ্যতার ওপর বিশ্বাস ছেলেদের তুলনায় দ্বিগুণ হারে হ্রাস পায়। উপরন্তু এই হারানো সেল্ফ এস্টিম নারী তার জীবনে আর কখনও ফিরে পায় না। ‘অলওয়েজ’ নামক স্যানিটারি ন্যাপকিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানটি বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের এই হঠাৎ হ্রাস পাওয়া আত্মবিশ্বাসের কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে উপলব্ধি করে যে, জেন্ডার স্টেরিওটাইপ বা লিঙ্গ ধ্যানধারকগুলো বয়ঃসন্ধিকালে মেয়েদের ওপর একটি বড় প্রভাব ফেলে, কারণ এই সময়ে তারা শিখে যে সমাজের চোখে নারী বলতে কী বোঝায়,  সমাজে নারীত্বকে সৌন্দর্য ও সাবমেসিবনেস অর্থাৎ অবনতশীলতার মতো কিছু নির্দিষ্ট বিশ্লেষণ দিয়ে কেবল সংজ্ঞায়িত করা হয়। সমাজে ক্রমাগত চলমান এই লৈঙ্গিক-বিভেদ আমাদের এই বার্তা দেয় যে, নেতৃত্ব, শক্তিমত্তা ও ক্ষমতা কেবল পুরুষের জন্য, নারীর জন্য নয়। এ সমাজে একটি ছেলেকে মানুষ হিসেবে নয় বরং অ-নারী হিসেবে গড়ে তোলা হয়, যা পক্ষান্তরে নারী-পুরুষ উভয়কে শেখায় যেন নারী হওয়াটা যথেষ্ট ভালো কিছু নয়। ইটস সিম্পলি নট গুড এনাফ। এই গৎবাঁধা সামাজিক ধারণা অনিবার্যভাবে বয়ঃসন্ধিকালে নারীর আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরায় এবং পরবর্তী জীবনে তাদের আচরণকে খুব বিরূপ প্রভাব ফেলে।

এই গবেষণার ভয়াবহ দিক উপলব্ধি করে সর্বোচ্চ পর্যায়ের জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ‘অলওয়েজ’ একটি নতুন ক্যাম্পেইন শুরু করে, যার নাম দেওয়া হয় হ্যাসট্যাগ লাইক আ গার্ল (#LikeAGirl)। ২.৫৯ মিনিটের এই ক্যাম্পেইন ভিডিওতে দেখা যায়, একদল তরুণ-তরুণীকে যখন বলা হয় Run like a girl বা fight like a girl বা throw like a girl তখন সেই তরুণ-তরুণীরা শ্লথগতিতে দৌড়ায় বা দুর্বলভাবে বল থ্রো করে বা আঘাত করে। অর্থাৎ ‘লাইক আ গার্ল’ তাদের কাছে দুর্বলতা আর শক্তিহীনতার অন্য নাম। অথচ বয়ঃসন্ধিপূর্ব একদল মেয়েকে যখন একই নির্দেশনা দেওয়া হয় তখন তারা সর্বোচ্চ শক্তি, ক্ষীপ্রতা আর দ্রুততার সঙ্গে দৌড়ায়, আঘাত করে বা বল ছুড়ে দেয়। ওই তরুণ-তরুণীর মতো তাদেরও জিজ্ঞেস করা হয় একই প্রশ্ন—লাইক আ গার্ল বলতে তারা কী বোঝে? সেই বয়ঃসন্ধিপূর্ব মেয়ে শিশুদের সবারই সহজাত উত্তর, মেয়েদের মতো দৌড়ে দেখাও বললে তারা মনে করে নিজের মতো দৌড়ানো, যতটা দ্রুতগতিতে দৌড়াতে সে পারে ততটাই গতিময় মেয়েদের মতো দৌড়। মেয়েদের মতো আঘাত করতে বলা মানে তাদের কাছে শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আঘাত করা।

অলওয়েজের করা এই ভিডিওচিত্র থেকে আত্মবিশ্বাসী আর দৃঢ় কন্যাশিশু থেকে নারীর দৃঢ়তাহীন আর অবলা হয়ে ওঠার গল্প স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই শঙ্কাপূর্ণ গল্পের একমাত্র ভিলেন সমাজ আর শতাব্দী ধরে চলে আসা একপেশে সামাজিক রীতি। যে মেয়েটি ছিল প্রজাপতির প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর, কেবল লোকে কী বলবে—এই দ্বিধা আর সংশয়ে সে মুখ থুবড়ে পড়ে নারীত্বে পৌঁছে। অথচ এই নারীত্ব হতে পারতো তার স্বপ্ন পূরণের সময়, নিজেকে চেনার, জানার আর প্রকাশের কাল।

নারীত্ব নামক হতাশার গল্পের এই পর্যায়ে এসে কিছুটা আশার বাণী শোনাতে চাই। গত বৃহস্পতিবার আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে মেয়েদের ক্রিকেট ম্যাচে আমাদের জাহানারা আলম প্রথম বাংলাদেশি নারী ক্রিকেটার হিসাবে পাঁচটি উইকেট নিয়ে দলকে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে দিয়েছে। ম্যাচটির ভাগ্য গড়িয়েছিল শেষ বলে, বাংলাদেশের জয়ের জন্য দরকার ছিল এক বলে এক রান। এরকম শেষ বলে এসে হারের ইতিহাস বাংলাদেশ পুরুষ দলে বারবার আছে, তবে সালমা আর জাহানারারা নারী এশিয়া কাপের ফাইনালের মতো আবারও এই ম্যাচে ইস্পাত কঠিন নার্ভের পরিচয় দিয়ে শেষ বলে জয় সুনিশ্চিত করেছে। শুক্রবার শেষ ওভারের রোমাঞ্চেই আরও একটি ম্যাচ জিতছে সালমা-রুমানারা। এই জয়ে তিন ম্যাচের সিরিজ ২-০ ব্যবধানে জিতে নিয়েছে বাংলাদেশের মেয়েরা। এই শুভ সংবাদে উচ্ছ্বসিত সবাই, ফেসবুকে কথা হচ্ছিল আশিক সরোয়ার হৃদ নামে আমার এক বন্ধুর সঙ্গে।

শেষ কথায় আশার বাণীতে হৃদের কমেন্টাই হুবহু তুলে দিচ্ছি—‘‘যাক! এইবার অন্তত এই পোড়া দেশে, ‘মেয়েদের মতো খেলো’ কথাটা তুচ্ছার্থে না বরং শুভকামনা জানাতে ব্যবহৃত হবে। এই যেমন আমি বলছি, এবার ওয়েস্ট ইন্ডিজে আমাদের ছেলেরা মেয়েদের মতো ক্রিকেট খেলুক!’’

 লেখক: আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ