‘বহিরাগত’ ফোবিয়া ও নিয়ন্ত্রক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

Send
তপন মাহমুদ
প্রকাশিত : ১৮:১৫, জুলাই ১১, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:২০, জুলাই ১১, ২০১৮

তপন মাহমুদঅনেকক্ষণ ভেবেও বুঝে উঠতে পারছিলাম না কী দিয়ে লেখাটা শুরু করি। হঠাৎ মনে হলো, আমার ছাত্র শিপংকরের মন খারাপ করা প্রশ্নটা একটা বেদনাময় সূচনা হতে পারে। দিনকয়েক আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সেমিনারে গিয়েছিলেন এই শিক্ষার্থী। জন-ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের সেই সেমিনারে মূল প্রবন্ধটা ছিল আবার আমার। প্রবন্ধ ও পরবর্তী আলোচনা শুনে বেশ ভালো লেগেছিল শিপংকরের। ফলে ওর আগ্রহ জন্মেছে ইতিহাস চর্চায়, বিশেষ করে জন ইতিহাস। সদস্য হওয়ার আগ্রহের কথাও জানালেন। এই সুবাদে ওকে একটা ভর্তি ফরমও দেওয়া হয়েছিল। ফর্মের সঙ্গে একটা ভালো লাগা নিয়ে সেদিন সেখান থেকে এসেছিলেন শিপংকর। ও হয়তো মুখিয়ে ছিল, আবার কবে যাবে, অংশ নেবে এমন আলোচনায়।
কিন্তু কাল হঠাৎ আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভাগের করিডোরে দেখা হলো শিপংকরের সঙ্গে। সেই মন খারাপ করা প্রশ্নটাই ছুড়ে এলেন আমার দিকে—‘স্যার, আমার কাছে তো জন-ইতিহাস চর্চা কেন্দ্রের ফর্ম আছে, জমা দিয়ে লাভ কী, এখন কি আর যেতে পারবো? আমি তো বহিরাগত!’ স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে তাকে আশ্বস্ত করলাম, ‘আপনি যেতে পারবেন, কোনও সমস্যা হবে না।’ কিন্তু আমার ভেতরে একটা বেদনার চোরা স্রোত বয়ে গেলো। সত্যি বলছি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র হিসেবে নিজেকে ছোট মনে হলো। যে উদারতার, খোলা মনের, বিশালত্বের দাবিদার মনে হয়েছিল এতদিন, একটা ছোট্ট প্রশ্ন তা খান-খান করে দিলো।

ভাবলাম, আমার জন্য হলেও শিপংকর হয়তো যাবেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু আগে যে ভালোবাসা নিয়ে যেতে চাইতেন, এখন কি আর সেটা হবে? কত প্রশ্ন নিয়ে এখন তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে পা বাড়াতে হবে। একটা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে, আমাদের জাতি মুক্তি লাড়াইয়ের সূতিকাগার হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে হয়তো তার আপনই মনে হতো। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান প্রশাসনের একটা ‘অপ্রয়োজনীয়’ সিদ্ধান্ত এক মুহূর্তে ওকে ‘আদার’ বা আলাদা করে দিলো। শিপংকরের মতো অন্য সবাই, বিশেষ করে যারা কোনোভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সরাসরি জড়িত নন, ‘বহিরাগত’ শব্দের দ্বারা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো। তাদের বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হলো। যে জনগণের টাকায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় চলে, সেই জনগণকেই তাদের নিয়োগপ্রাপ্ত চাকরিজীবীরা অস্বীকার করে বসলো! বের করে দিলো!

বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাটাই হলো ‘জ্ঞানের উন্মুক্ত স্থান’। আর জ্ঞান কি শুধু পাঠদানকক্ষে বা চেয়ার টেবিলে বসে হয়? আমি জোর গলায় বলতে পারি, আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে যতটুকু শিখেছি, তার বড় অংশই পেয়েছি আড্ডা থেকে। সে আড্ডা আমরা মধুর কেন্টিনে, লাইব্রেরির সামনে, ডাকসুর ছাদে, টিএসসির মোড়ে, এখানে সেখানে কত জায়গায় দিয়েছি। সেখানে অনেক ‘বহিরাগত’ থাকতো। তাদের কাছেও অনেক কিছু শিখেছি। বুঝেছি, ঘরের জানালাটা বন্ধ করে রাখাটা স্বাস্থ্যকর কিছু নয়, খোলা রাখতে হয়। 

কিন্তু এতদিন পরে এসে যখন দেখছি, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার দরজা জানালাগুলো বন্ধ করে দিচ্ছে, তখন বিস্ময়ে হতভম্ব হয়ে যাই। ছুটির দিনে, জাতীয় দিবসগুলোয়, উৎসবে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গমগম করতো, সত্যি বলছি, আমার খুব ভালো লাগতো। মনে হতো প্রাণের খোঁজে, ইতিহাসের খোঁজে, মুক্তির সন্ধানেই এখানে ছুটে আসে মানুষ। কখনও কখনও তারা বঞ্চনার কথা বলে, সোচ্চার হয়। এটাই তো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত সৌন্দর্য।

ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা দেখবো, একটা জাতির মুক্তির স্বপ্ন কীভাবে ডানা মেলেছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে স্বপ্ন পূরণেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কী অসাধারণ ভূমিকাই না রেখেছে! বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, উত্তাল দিনগুলোয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শুধু ছাত্ররাই অংশ নেননি, সঙ্গে ‘বহিরাগত’ মানে সাধারণ জনতাও যোগ দিয়েছিল। আর এ কারণেই দেশ স্বাধীন হয়েছে। আর আজ কিনা, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাধারণের প্রবেশকেই নিষিদ্ধ বা সংকুচিত করে দিলো! দেশ ও দেশের জনগণের প্রতি যে ঐতিহাসিক দায়, সেটা অস্বীকার করলো। আদতে, এর মধ্য দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের স্বাধীনতা ও স্বাধীনতার চেতনাকেই সংকুচিত করলো!

‘বহিরাগদত’দের নিষেধাজ্ঞা সম্পর্কিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তগুলো, যা প্রেস রিলিজ আকারে গণমাধ্যমে পাঠানো হয়েছে, তা আমি পড়ে দেখলাম। খুব অবাক হলাম, যেসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে, তার বেশিরভাগই আসলে প্রচলিত নিয়ম-কানুন বা আইনেই আছে। যেমন বলা হয়েছে, অ-ছাত্রদের হলে থাকতে দেওয়া হবে না। হলে ছাত্ররাই থাকবে। এটা তো পুরনো নিয়ম। এখন সেটা নতুন করে ঢাকঢোল পিটিয়ে বলার কী আছে? বাস্তবতা হলো, ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের ছত্র-ছায়ায় ‘অছাত্র বহিরাগতরা’ আগেও ছিল, এখনও আছে। সুতরাং এই বহিরাগতদের কারণে যদি বিশ্ববিদ্যালয় ‘অস্থিতিশীল’ হয়, সেটা দায়ভার ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নিতে হবে এবং সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়কেও। তাই বলে, বহিরাগতদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থান ও ঘোরাফেরার জন্য প্রক্টরের অনুমতি নিতে হবে, এটা কেমন কথা?

আমরা যদি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস দেখি, তাহলে কিন্তু এটাই মিলবে যে, এই প্রতিষ্ঠানে  মারামারি, খুনোখুনি বেশিরভাগই হয়েছে দলীয় কারণে। কখনও সরকারি ও বিরোধী দলের সংঘর্ষ, আবার কখনও দলীয় কোন্দল। বাস্তবে ‘বহিরাগতরা’ কখনোই এই বিশ্ববিদ্যালয়কে অস্থিতিশীল করতে চায়নি বা পারেনি। যদি কখনও করেও থাকে তার মূল সহযোগিতা ভেতর থেকেই হয়েছে এবং সেটা অবশ্যই ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের সহায়তায়। কারণ ইতিহাস এটাও বলে যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে বিরোধী ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা খুব কমই ক্যাম্পাসে বা হলে অবস্থান করতে পেরেছে। ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে এখানে কিছু করা অসম্ভব।

এখন যদি আসি, কোটা সংস্কার আন্দোলন প্রসঙ্গে, যেটার ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সেই গণ-আন্দোলন বা ছাত্র আন্দোলন শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছিল না। আর সবশেষ যে, হামলা আন্দোলনকারীদের ওপর হয়েছে, তা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দ্বারাই সংগঠিত হয়েছে। আর যারা মার খেয়েছে, তারাও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। কিন্তু কী দেখা গেলো, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, আক্রান্তদের পক্ষ না নিয়ে, পক্ষ নিল আক্রমণকারীদের। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেতনা এটাই হওয়া উচিত ছিল যে, তারা গণমানুষের পক্ষে কথা বলবে, নির্যাতিতদের পক্ষে থাকবে। কিন্তু উল্টো দেখা গেলো, অভ্যন্তরীণদের দোষ বহিরাগতদের ঘাড়ে চাপিয়ে নতুন ঢাক পিটিয়ে দিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এই ঢাকের আওয়াজ আরও দুই-একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বাজলেও হয়তো অবাক হবে না। কারণ এগুলো আর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র ধারণ করতে পারছে কি? নাকি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার আয়োজন করছে, যা পুরোটাই হবে নিয়ন্ত্রিত!

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়ন বিভাগ, স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়

 

/এসএএস/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ