জোটের জামায়াত, ভোটের জামায়াত

Send
মোস্তফা হোসেইন
প্রকাশিত : ১৪:৪২, জুলাই ১২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৪:৪৪, জুলাই ১২, ২০১৮

মোস্তফা হোসেইনবিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের জরুরি বৈঠকেও সুরাহা হয়নি সিটি নির্বাচনে জামায়াতের সঙ্গে দ্বন্দ্বের বিষয়টি। ৪ জুলাই গুলশানে অনুষ্ঠিত বৈঠকের আগে ২৭ তারিখও তারা বৈঠক করেছিল জোটে বিএনপির প্রাধান্য ধরে রাখার উদ্দেশ্যে। দুইবার বৈঠকের পরও সিলেট সিটি নির্বাচনে প্রার্থিতা প্রশ্নে জামায়াত অনড়। তাদের মনোনীত প্রার্থীকে যেন ২০ দলীয় জোট থেকে সমর্থন জানানো হয়, সেই লক্ষ্যে তারা সিলেটে এহসান মাহবুব জুবায়েরকে দাঁড় করিয়েছে। দুদিনই বিএনপিকে তারা বলেছে  মেয়র পদে  মাহবুব জুবায়েরকে সমর্থন করার জন্য। বিএনপি জামায়াতের আবদার না শুনে আরিফুল হককে দাঁড় করিয়েছে। তারাও জামায়াতকে বলছে বিএনপির প্রার্থীকে যেন তারা সমর্থন করে। জামায়াতের আবদার মেনে আরিফুল হককে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করতে বিএনপি বলে দেবে এমনটা মনে হয় না। আবার জোট রক্ষার কথা চিন্তা করে বিএনপি বিশাল ছাড় দিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
জামায়াতকে ছাড় দিয়ে হোক কিংবা জামায়াতকে বাদ দিয়েই হোক, সিলেটসহ তিন সিটি করপোরেশনের নির্বাচন যে বিএনপিকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমনিতেই সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং মামলা মোকদ্দমায় কাবু হয়ে আছে তারা। এর সঙ্গে জামায়াতের চাপ তাদের জন্য বিষফোঁড়ার মতোই মনে হতে পারে। কিন্তু জামায়াতের এই কৌশলও তাদের জন্য জরুরি ছিল। কারণ, তারাও নিজেদের অস্তিত্ব চিন্তায় অস্থির। সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটু নড়েচড়ে তাদের শক্তি দেখানোর সুযোগটা হাতছাড়া করবে কেন?

গণমাধ্যমে জামায়াতের এই কৌশলকে জাতীয় নির্বাচনে দরকষাকষির কৌশল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আসলে দরকষাকষির কৌশল নাকি নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে বিএনপির ছায়া থেকে মুক্তির পথ খুঁজছে তারা? বর্তমান সরকার আমলে অনুষ্ঠিত সবক’টি সিটি নির্বাচনে জামায়াত ছিল বিএনপিকে সমর্থনকারী দল। এছাড়া তাদের সামনে তেমন পথও খোলা ছিল না। কিন্তু নির্বাচনি বছরে সরকারি দলের অধিকতর ব্যস্ততার ফাঁকে নিজেদের অবস্থান তৈরির জন্য তাদের নির্বাচনে আসাটা জরুরিই মনে করছে তারা।

আবার পরিস্থিতির কারণে জামায়াত-বিএনপি পরস্পরকে ত্যাগের প্রাথমিক চেষ্টাও হতে পারে, এমনটাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। বিষফোঁড়া হিসেবে জামায়াতকে বিএনপি কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছে সামান্য কিছু ভোটের আশায়। বিএনপি যদি বিকল্প ভোট ব্যাংক পেয়ে যায়, তাহলে তারা জামায়াত গন্ধমুক্ত হওয়ার চেষ্টাও করতে পারে। আবার জামায়াতও বুঝতে পারে- বিএনপি যদি বিকল্প ভোট ব্যাংকের সন্ধান পায়, তাহলে জামায়াতকে ল্যাং মারতে দ্বিধা করবে না। এমতাবস্থায় নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য জামায়াতের জন্যও নির্বাচনে দাঁড়ানো প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে নতুন জোট গঠন করে সেখানে কোনও দলের মার্কা ব্যবহার করে ধীরে ধীরে ওই মার্কায় বিলীন হয়ে যাওয়ার চেষ্টাও তারা করতে পারে।

এদিকে বিএনপি যুক্তফ্রন্টকে জোটভুক্ত করার চেষ্টা করছে। সেটাও জামায়াতের জন্য সুখময় নয়। তারা ভাবতে পারে, জামায়াত ত্যাগের ক্ষেত্র তৈরিতেও এই যুক্তফ্রন্ট টোপ কাজে লাগাচ্ছে বিএনপি। যদিও যুক্তফ্রন্টের সব ভোট মিলিয়েও জামায়াতের সমান হবে না। তারপরও দুশ্চিন্তা তো থেকেই যায়।

এমন পরিস্থিতিতে বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টকে নিয়ে বিএনপির ভাবনা সঙ্গত কারণেই জামায়াতের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। যুক্তফ্রন্টকে সঙ্গে নেওয়ার জন্য বিএনপি বিলাত প্রবাসী নেতার নির্দেশনা ইতোমধ্যে স্পষ্ট হয়ে গেছে। অন্যদিকে ড. কামাল হোসেন স্পষ্ট বলেছেন, ঐক্য হতে পারে ৭২-এর সংবিধানকে সামনে রেখে। বলেছেন ৭২-এর সংবিধানকে মেনে নিলে জামায়াত এমনিতেই বাদ পড়ে যায়। তার মানে বিএনপি যদি যুক্তফ্রন্টকে অন্তর্ভুক্ত করে তাহলে জামায়াতকে ত্যাগ করতে হতে পারে। কিংবা জামায়াতই নিজে থেকে সরে যেতে পারে।

জামায়াতও মনে করে বিএনপির সঙ্গে তাদের জোট হয়েছে ঠিকই। তবে নির্বাচনের কারণে তারা আদর্শকে ত্যাগ করেনি, করবেও না। সেক্ষেত্রে জামায়াতের আদর্শের সঙ্গে বিপরীত অবস্থানে থাকা কেউ যদি জোটভুক্ত হয় তাহলে জোট ত্যাগের বিষয়টিও তো উন্মুক্তই আছে। সেক্ষেত্রেও বিএনপি-জামায়াতের স্বার্থ অক্ষুণ্ন থাকতে পারে। জামায়াতের নায়েবে আমির মিয়া গোলাম পরওয়ারের বক্তব্যে বেরিয়ে আসে বিষয়টি। তিনি বলেছেন, ‘তারাও আদর্শিক কারণে সবার সঙ্গে জোট করতে পারেন না। এমন দৃষ্টিভঙ্গি তো তাদেরও থাকতে পারে। তবে এই সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের যদি একটি দফার বিষয়ে ঐকমত্য থাকে, তাহলে জোটে জোটে লিয়াজোঁ হয়ে আন্দোলন হতে পারে’। (জামায়াত নিয়ে নতুন ভাবনায় বিএনপি- প্রথম আলো। ৫ জুলাই ২০১৮) সাপ মরলো লাঠিও ভাঙ্গলো না, অনেকটা এই নীতিকে অবলম্বন করার মতো।

 ভোটের হিসাবে জামায়াতের গুরুত্ব কিছুটা হ্রাস পেয়েছে এমনটা ভাবতেই পারে বিএনপি। ২০০৮ সালে ৪ দশমিক ৭ শতাংশ, তার আগে অষ্টম সংসদে ৪ দশমিক ২৩ শতাংশ, তারও আগে সপ্তম সংসদে জামায়াত পেয়েছিল ৮ দশমিক ৬১ শতাংশ ভোট। ভোটের ধারাবাহিকতা লক্ষ করলে বোঝা যায় জামায়াতের সমর্থন কমতির দিকে। সর্বশেষ বর্তমান সরকারের শাসনামলে একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের কয়েক নেতার ফাঁসি কার্যকর হওয়ায় তাদের সমর্থন যে আরও কমেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি যদি ৪ শতাংশ ভোটের আশা পেয়ে যায় তাহলেও জামায়াতকে আলাদা জোট গঠন করার সুযোগ করে দিতে দেরি করবে না। সেক্ষেত্রে মিয়া পরওয়ারের ফর্মুলা অনুযায়ী জোটে জোটে লিয়াজোঁ মাধ্যমে সরকারবিরোধী আন্দোলন করতে করতে ভোটের দিকে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হতে পারে।

 সেক্ষেত্রে বিএনপির জন্য বিকল্প ভোট পাওয়ার পথ হতে পারে যুক্তফ্রন্ট ও শফি হুজুরের হেফাজতে ইসলামী। সেক্ষেত্রে হেফাজতি আলোকবর্তিকা গাজীপুর সিটি নির্বাচনে দেখা গেছে। আওয়ামী লীগ হেফাজতকে তোয়াজ করে ৫ বছর ‘শাপলাচত্বরবিহীন’ দেশ শাসন করতে সক্ষম হলেও ভোটের হিসাব যে তাদের অনুকূলে নয় এটা প্রমাণ হয়ে গেছে। ভোটের আশায় আওয়ামী লীগ শিক্ষা কারিকুলামকে ‘হেফাজতিকরণে’র কাজটি সম্পন্ন করলেও গাজীপুরে হেফাজত নেতা প্রকাশ্যেই বলে দিলেন, যে সরকার আমাদের বুকে গুলি চালাতে পারে সেই সরকারকে আমরা সমর্থন করতে পারি না। শুধু তাই নয়, গাজীপুরে আওয়ামী লীগের প্রার্থী শফি হুজুরকে কদমবুছি করার পরও হেফাজত নেতা বিএনপি প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবেই সমর্থন করেছেন এমন নয়, হেফাজতের নেতা হিসেবে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে কাজ করেছেন এবং তারপরও হেফাজতের পক্ষ থেকে এর প্রতিবাদ করা হয়নি। সুতরাং গাজীপুর সিটি নির্বাচনে হেফাজতের অবস্থান বলে দেয় জাতীয় নির্বাচনে তারা কোন পথে হাঁটবে।

জামায়াতের ভোট কত তার পরিসংখ্যান গত নির্বাচনগুলোর হিসাব থেকে বের করা যায়। হেফাজতের ভোট সম্পর্কে তেমনটা সম্ভব নয়। কিন্তু তাদের শক্তি যে জামায়াতের চেয়ে কম নয় তা সহজেই অনুমেয়। আর সেই সুযোগটিকেই কি কাজে লাগাতে চাইছে বিএনপি? তারা কি মনে করছে, যুক্তফ্রন্ট প্লাস হেফাজত প্লাস ২০ দলীয় জোটের ক্ষুদ্র দলগুলোর ভোট তাদের সঙ্গে যুক্ত হলে ভোটের হিসাব বদলে যেতে পারে।

সেক্ষেত্রে ছাড় না দিয়ে জামায়াতকে জোটের সঙ্গী রাখতে পারলে তাদের লাভ হবে অনেক বেশি। আর যদি জামায়াত চলে যায় কিংবা তারা জামায়াতকে ছেড়ে দেয় তাহলেও খুব একটা লোকসান হবে না। হিসাব-নিকাশ যাই হোক- ২০ দলীয় জোটে যে পরিবর্তন আসন্ন তা বোঝা যায়। আখেরে তা যে ফলই বয়ে আনুক না কেন।

লেখক: সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক।

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ