ভুলের ব্যাখ্যা কে পাবে রক্ষা!

Send
রেজানুর রহমান
প্রকাশিত : ১৮:৫০, জুলাই ১৯, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৮:৫৭, জুলাই ১৯, ২০১৮

রেজানুর রহমানফেসবুকে ক্লাস সিক্সের একটি মেয়ে স্ট্যাটাস দিয়েছে– ‘অতীত ভুলে যেতে চাই’। তার এই স্ট্যাটাসের প্রেক্ষিতে শামীমা আকতার নামে একজন লিখেছেন– ‘কী ভুলে যেতে যাসরে তুই? বিছানায় মোতার দিনগুলোর কথা?’ মেয়েটির ওই স্ট্যাটাসকে ঘিরে আরও অনেকে মন্তব্য লিখেছেন। একজন লিখেছেন, মেয়েটি হয়তো তার জীবনের কোনও ঘটনা নিয়ে এতটাই শকড হয়েছে যে অতীত মনে রাখতে চায় না। তবে অনেকের ধারণা ক্লাস সিক্সের এই মেয়েটি হয়তো প্রেমে ‘ছ্যাকা’ খেয়ে এই ধরনের কথা লিখেছে। আর এখানেই সবার আপত্তি। ক্লাস সিক্সের একটি মেয়ের কতইবা বয়স। সে প্রেম সম্পর্কে কী বোঝে? আবার কারও কারও মন্তব্য পড়ে মনে হয়েছে প্রেম নয়, পারিবারিক জীবনে হয়তো সে বড় ধরনের কোনও আঘাত পেয়েছে। তাই এ ধরনের স্ট্যাটাস দিয়েছে। তবে প্রায় সবারই মন্তব্য পড়ে মনে হয়েছে, মেয়েটির বয়স নিয়েই সব আপত্তি। ক্লাস সিক্সের এই ছোট্ট মেয়েটি জীবনের এমন কঠিন কথা লিখতে পারে কিনা? কোথাও কি কোনও ধরনের ভুল হয়েছে? নাকি মেয়েটির সরল মনের কোমল কথাকেও ‘ভুল’ ভাবছি আমরা?
এই ‘ভুল’ শব্দটি নিয়ে সারাদেশে এখন বেশ তোলপাড় চলছে। ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে ভুতুড়ে কাণ্ড’ শিরোনামে পত্রিকায় একটি চমকপ্রদ খবর প্রকাশ হয়েছে। খবরে উল্লেখ করা হয়েছে ‘ছিল সোনার চাকতি, হয়ে গেছে মিশ্রধাতু, ২২ ক্যারেটের সোনা হয়ে গেছে ১৮ ক্যারেট। সোনার চাকতির ৪০ শতাংশ সোনা হয়ে গেছে ৮০ শতাংশ। যদিও এই খবরের প্রতিবাদ করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। তবে ৪০ আর ৮০ অংক সংখ্যার ক্ষেত্রে একটি মারাত্মক ভুলের কথা স্বীকার করে বাংলাদেশ ব্যাংকের কারেন্সি অফিসার আওলাদ হোসেন চৌধুরী বলেছেন, ‘শুল্ক ও গোয়েন্দা বিভাগের দেওয়া সোনা জমা রাখার সময় সোনা ৪০ শতাংশই ছিল। কিন্তু ইংরেজি বাংলার হেরফেরে সেটা ৮০ শতাংশ লিখে ভুলবশত নথিভুক্ত করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত স্বর্ণকার এই ভুলটা করেছিলেন।’ আওলাদ হোসেন চৌধুরীর বক্তব্য অনুযায়ী ৪০ কে ৮০ লেখার ভুলটা বাংলাদেশ ব্যাংকের তালিকাভুক্ত স্বর্ণকার করেছিলেন। কিন্তু ব্যাংকের তালিকাভুক্ত স্বর্ণকার গিয়াস উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এই ভুল তিনি করেননি। তার মন্তব্য–‘আমি তো লিখি না। আমি শুধু পরীক্ষা করে যেটা বলি, সেটা লিপিবদ্ধ করেন বা লেখেন বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা। বাংলা ট্রিবিউনের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, ‘সেটা ২০১৫ সালের কথা। বাংলাদেশ ব্যাংকে যখন শুল্ক গোয়েন্দারা সোনা রাখতে আসে তখন আমাকে বলা হয়েছিল কী পরিমাণ সোনা আছে তা পরিমাপ করে দিতে। তখন আমি কষ্টিপাথরে সোনার মান যাচাই করে ৪০ শতাংশই বলেছিলাম। কিন্তু তখন বাংলাদেশ ব্যাংকের রেকর্ড বুকে যিনি লিখেছিলেন তিনি ভুলে ইংরেজিতে ৪০-এর জায়গায় ৮০ লিখেছিলেন...।

ভুল তো মানুষেরই হয়। তাই বলে এমন ভুল? কষ্টদায়ক সত্য হলো, এই ভুলের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা কুরুচিপূর্ণ ভাষায় ব্যঙ্গ করা হচ্ছে। সরকারকে দোষারোপ করা হচ্ছে। কাজেই ৪০ কেমন করে ৮০ হয়ে গেলো সেই রহস্য উদঘাটন করা জরুরি। যদিও অর্থ প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান এ ঘটনাকে খুব একটা বড় করে দেখছেন না। তিনি বলেছেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা স্বর্ণ নিয়ে অনিয়মের খবর যেভাবে প্রকাশিত হয়েছে তা পুরোপুরি সত্য নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর-এর মধ্যে যোগাযোগ ঘাটতিতেই এই সংকট সৃষ্টি হয়েছে। তবে বিষয়টিকে ছোট করে দেখছি না। ঘটনার পর্যালোচনা করা হবে। কারও বিরুদ্ধে ভুল অথবা গাফিলাতির প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানি না এই ভুলের শেষ পর্যন্ত কী বিচার হবে। তবে বিব্রতকর আরও একটি মহা ভুলের খবর বেরিয়েছে পত্রিকায়। বাংলাদেশ বিমানের এক ভুলের কারণে নাকি রাষ্ট্রকে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি মোকাবিলা করতে হবে। পত্রিকার খবরে জানা গেছে, হজ ফ্লাইট পরিচালনা করবে এমন বিমানের প্রতিটির আসন সংখ্যা ৪১৯। কিন্তু হজ ফ্লাইটের জন্য সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে নিবন্ধন করার সময় আসন সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছে ৩১৯। এজন্যই হজযাত্রী পরিবহন করতে গিয়ে বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষকে বিপুল অংকের আর্থিক জরিমানা দিতে হবে। প্রতিটি ফ্লাইটে অতিরিক্ত ১০০ আসন খালি থাকবে। এজন্য নিয়ম অনুযায়ী বাংলাদেশ বিমান নাকি সৌদি কর্তৃপক্ষকে জারিমানা দিতে বাধ্য।

এমন তো নয় বাংলাদেশ বিমান এই প্রথম হজ ফ্লাইট পরিচালনা করছে। বছরের পর বছর ধরে হজ ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছে বাংলাদেশ বিমান। কাজেই এমন ভুল তো হওয়ার কথা নয়। যদি হয়েই থাকে তাহলে এর দায় কার? ভুলটা কে করেছে?

আসলে প্রতিদিন এভাবেই ছোট-বড় ভুল আমরা করেই যাচ্ছি। দিন কয়েক আগে ঢাকা থেকে নদীপথে বরিশাল গিয়েছিলাম। সদরঘাটে পৌঁছে মনটা খারাপ হয়ে গেল। বুড়িগঙ্গার পানি আবার দুর্গন্ধে ভরে গেছে। পানিতে ভাসছে ডাব, নারিকেল, পলিথিনের ব্যাগসহ ময়লা আবর্জনার স্তূপ। একটি বিলাসবহুল লঞ্চে বেশ আরামেই বরিশাল পৌঁছাই। সকালে লঞ্চটি থেকে নামার আগে পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা অন্য একটি লঞ্চের নিচতলার দিকে চোখে পড়লো। লঞ্চের নিচতলা ঝাড়ু দেওয়া হচ্ছে। পলিথিনসহ ময়লা আবর্জনার বিশাল স্তূপ প্রকাশ্যে নদীর পানির মধ্যে ফেলে দেওয়া হলো। চিৎকার করে জানতে চাইলাম–ভাই, এভাবে নদীর পানিতে ময়লা ফেলছেন কেন? এটা তো অন্যায়। আমার চিৎকার শুনে ঝাড়ুদার ভর্ৎসনা করার ভঙ্গিতে বললো, আপনার কাম আপনি করেন। আমারে আমার কাম করতে দেন...।

এই যে ঝাড়ুদার লোকটি অসৌজন্যমূলক আচরণ করলো এজন্য দায়ী কে? দায়ী আমাদের প্রশাসন ব্যবস্থা। নদীরও জীবন আছে। ময়লা আবর্জনা নদীর জীবনের জন্য হুমকিস্বরূপ এই কথাটি আমরা হয়তো অনেকেই জানি। কিন্তু মানি কয়জন? দেশে পলিথিনের ব্যবহার আইনত নিষিদ্ধ। কিন্তু বাজার করতে গেলেই দোকানদার প্রকাশ্যে পলিথিনের ব্যাগ ধরিয়ে দেয়। আমরা সেটা বাসাবাড়িতে নিয়ে আসি, তারপর ডাস্টবিনে ফেলে দেই। ডাস্টবিনের পলিথিন শেষমেশ ফেলা হয় শহরের ড্রেনে অথবা মাটি ভরাটের কাজে ফেলে দেওয়া হয়। একবারও কি ভেবেছি আমরা, এর ভবিষ্যৎ পরিণতি কী হবে? পলিথিন জমে জমে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। কোথাও কোথাও নদী তার গতিপথ হারাচ্ছে। পলিথিনসহ ময়লা আবর্জনার স্তূপ দিয়ে খাল ভরাট করে উঁচু ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এই যে ভুলগুলো হচ্ছে সেজন্য নিশ্চয়ই একদিন আমাদের খেসারত দিতে হবে।

লেখাটি শুরু করেছিলাম ক্লাস সিক্সের একটি মেয়ের ফেসবুক স্ট্যাটাস দিয়ে। সে লিখেছে ‘অতীত ভুলে যেতে চাই’। সে তার কোন অতীত ভুলতে চায় তা স্পষ্ট নয়। যদিও অনেকে মেয়েটির এই মন্তব্যের নানান ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আগেই লিখেছি, সংখ্যাগরিষ্ঠের ধারণা মেয়েটি প্রেমে ব্যর্থ হয়েছে। এই বয়সে প্রেম? কাজেই সে মারাত্মক একটি ভুল করেছে। কিন্তু তার মতো আমরা বড়রাও কি ভুল করছি না। বললাম ৪০, লিখে ফেললেন ৮০। ভাগ্য ভালো যে সংখ্যাটি ৪০ আর ৮০’র মধ্য দিয়ে গেছে। সংখ্যাটি যদি ইংরেজি ‘৬’ হতো আর ভুলে আপনি ‘৬’-কে ‘৯’ লিখে ফেলতেন তাহলে তো 'গিট্টু'টা আরও বড় করে লাগতো।

তার মানে সামান্য ভুলের কারণেও অনেক মাশুল দিতে হয়। কর্তৃপক্ষের দাবি, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা স্বর্ণের ক্ষেত্রে ভুলে ৪০’র বদলে ৮০ লেখা হয়েছে। সহজভাবে ভাবলে এটা তো কোনও ভুলই না। কিন্তু ভুলটা কোথায় হয়েছে? ভুলটা হয়েছে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে। কাজেই এটাকে সহজভাবে ভাবার কোনোই অবকাশ নেই।

শেষে একটি গল্প বলি। এক মহিলা পাশের বাড়ির এক মহিলার কাছ থেকে একটি কাঁসার পাতিল ধার নিতে এসেছেন। পাশের মহিলা সানন্দে তাকে কাঁসার পাতিল ধার দিলেন। দুদিন পর ওই মহিলা ওই কাঁসার পাতিলটির সঙ্গে ছোট্ট একটি কাঁসার পাতিল এনে পাশের বাড়ির মহিলাকে দিলেন। পাশের বাড়ির মহিলা জানতে চাইলেন–ঘটনা কী? আপনি তো একটা পাতিল ধার নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু ফেরত দিলেন দুইটা? মহিলা হাসতে হাসতে জবাব দিলেন– সুখবর আছে। আপনার পাতিলটি এই দুদিনে একটা বাচ্চা জন্ম দিয়েছে। কথা শুনে পাশের বাড়ির মহিলা বেজায় খুশি হলেন এবং বড় পাতিলের সাথে ছোট পাতিলটিও রেখে দিলেন।

আরেক দিন ওই মহিলা আবার এলেন কাঁসার পাতিল ধার নিতে। কিন্তু পাতিল নিয়ে যাওয়ার পর ওই মহিলার আর কোনও খোঁজ নেই। পাশের বাড়ির মহিলা অনেক খুঁজে তাকে বের করলেন।

‘ব্যাপার কী, আমার কাঁসার পাতিল যে ফেরত দিচ্ছেন না? পাশের বাড়ির মহিলাকে প্রশ্ন করতেই পাতিল ধার করে আনা মহিলা বললেন–একটা দুঃখজনক খবর আছে। আপনার কাঁসার পাতিলটি মারা গেছে। একথা শুনে পাশের বাড়ির মহিলা তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে বললেন, এই যে...  আপনি গাঁজাখুরি গল্প বলার আর জায়গা পেলেন না? কাঁসার পাতিল মারা যায় কী করে? তার কি জীবন ছিল যে মারা যাবে?

পাতিল ধার করে আনা মহিলা এবার বেশ শান্ত ভঙ্গিতে বললেন, আপা আপনি এসব কি বলতেছেন? কাঁসার পাতিল বাচ্চা দিতে পারে একথা আপনি বিশ্বাস করেন নাই?

পাশের বাড়ির মহিলা বললেন, হ্যাঁ বিশ্বাস করেছি। এবার পাতিল ধার করে আনা মহিলা বললেন, তার মানে যার জীবন আছে সেই তো বাচ্চা জন্ম দেওয়ার ক্ষমতা রাখে তাই নয় কি? যার জীবন আছে তার মৃত্যুও আছে একথা নিশ্চয়ই মানেন?

হ্যাঁ মানি। পাশের বাড়ির মহিলা সায় দিতেই পাতিল ধার করে আনা মহিলা বললেন, কাজেই বুঝতে পারছেন আপনার পাতিলটিরও মৃত্যু হয়েছে।

প্রিয় পাঠক, নাসির উদ্দিন হোজ্জার এই গল্পটির মাজেজা কী ধরতে পেরেছেন? সকল ধরনের অসঙ্গতি ও প্রতারণা থেকে মুক্ত থাকুন।

লেখক: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক- আনন্দ আলো। 

 

/এসএএস/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ