আগামী নির্বাচন ও রাজনৈতিক মেরুকরণ

Send
বিভুরঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৬:১৩, আগস্ট ০২, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৬:২০, আগস্ট ০২, ২০১৮

বিভুরঞ্জন সরকারজাতীয় সংসদ নির্বাচন এসে গেছে। আগামী ডিসেম্বর মাসেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি যেমন নির্বাচন কমিশন নিচ্ছে, তেমনি রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর মধ্যও চলছে বন্ধু বা মিত্র খোঁজার চেষ্টা। আমাদের দেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন ডজন। অনিবন্ধিত দলও হয়তো প্রায় সমসংখ্যক হতে পারে। তবে ভোটের রাজনীতিতে বিবেচনায় নেওয়ার মতো দল অর্ধডজনও নয়। ভোটের বাজারে হিসাব করা হয় প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপিকে। এর বাইরে এরশাদের জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতে ইসলামীর বেশ কিছু ভোট আছে । অবশ্য জামায়াত এখন নিবন্ধনহীন দল। দলের নামে ও দলীয় প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার সুযোগ তাদের এখন নেই। এছাড়া অন্য ছোট দলগুলো নির্বাচনে অংশ নিলেও জয়লাভ করতে পারে না। ছোট দুয়েকটি দল সংসদে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পায় বড় দুই দলের কোনও একটির অনুকম্পায়। বড় দলের সমর্থন ও প্রতীক নিয়ে নির্বাচন না করলে ছোট দলের প্রার্থীদের জিতে আসা সম্ভব হয় না। সেজন্য নির্বাচনের আগে ছোট দলগুলোরও তৎপরতা বাড়ে, বড় দলগুলোর কাছে ধরনা দেয়, যদি একটি দুটি আসন পাওয়া যায়!
দেশে এখন দলের রাজনীতির চেয়ে জোটের বা মহাজোটের রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনও দলই এখন এককভাবে নির্বাচনে জিতে সরকার গঠনের মতো অবস্থায় যাওয়ার ব্যাপারে শতভাগ নিশ্চিত নয় বলেই অন্য দলের সঙ্গে জোট গঠন করে নির্বাচন করতে চায়। ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর থেকেই অথবা বলা যায় এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই দেশে জোটের রাজনীতি শুরু হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে জোট, বিএনপির নেতৃত্বে জোট, বাম জোট, ইসলামপন্থিদের জোট ইত্যাদি নানা জোটের অস্তিত্ব ছিল এবং আছে। জোটগুলোতে দলের সংখ্যা বাড়ছে। সাবেক স্বৈরশাসক এরশাদের নেতৃত্বে গঠিত জোটেই সম্ভবত দলের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি! তবে এগুলো প্রায় সবই নামসর্বস্ব দল। এক নেতা এক দল। দল আছে, কর্মী নেই। কোনও দলের দু-চারজন কর্মী থাকলেও  তাদের কোনও সমর্থক নেই।

আগামী সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখেও প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ছোট দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছে। নিজ নিজ পক্ষে সমর্থক বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। বিএনপি চাইছে আওয়ামী লীগকে বন্ধুহীন প্রমাণ করতে, আবার আওয়ামী লীগ চাইছে বিএনপিকে নিঃসঙ্গ করতে।

বন্ধু খোঁজার প্রতিযোগিতায় স্বাভাবিকভাবেই সুবিধাজনক অবস্থায় আছে আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ টানা দুই মেয়াদে সরকারে আছে। বাংলাদেশে টানা দুই মেয়াদে সরকারে থাকার অতীত রেকর্ড নেই। শুধু দুই মেয়াদে থাকার রেকর্ড নয়, আওয়ামী লীগ এবার তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে নতুন রেকর্ড গড়ার আশা পোষণ করছে। অনেকের মধ্যে এই ধারণাটা বদ্ধমূল হচ্ছে, আাগামী নির্বাচনেও আওয়ামী লীগই জিতবে। সেজন্য আওয়ামী লীগের সঙ্গে ভিড়ে ক্ষমতার স্বাদ পাওয়ার বাসনা অনেকের মধ্যই জাগছে।

অন্যদিকে বিএনপি মনে করছে, দেশে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হলে তাদের বিজয় ঠেকানোর সাধ্য কারও নেই। অবশ্য তারা কোনোভাবেই বর্তমান সরকারের অধীনে নির্বাচন চায় না। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কয়েক দিন আগে দলীয় এক সমাবেশে বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে আওয়ামী লীগ নাকি ২০টির বেশি আসন পাবে না! মির্জা ফখরুলকে একজন দায়িত্ববান রাজনৈতিক নেতা হিসেবেই মনে করা হয়। তার বক্তব্য যদি কথার কথা না হয়ে থাকে, তাহলে প্রশ্ন আসে, বিএনপি তবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে টালবাহানা করছে কেন? তারা যদি নিশ্চিত হয়ে থাকে যে তারা অংশ নিলে আওয়ামী লীগ মাত্র ২০টি আসন পাবে, তাহলে কোনও দ্বিধাদ্বন্দ্ব না করেই তো তাদের নির্বাচনে যাওয়ার কথা সবাইকে সোৎসাহে জানানো প্রয়োজন। নাকি বিএনপি চাচ্ছে না আওয়ামী লীগকে লজ্জায় ফেলতে? বিএনপি যত বড়াই-ই করুক না কেন মাঠের খবর ভিন্ন। খুলনা ও গাজীপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জিতেছে। ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও দুই সিটিতে বড় ব্যবধানে জিতেছে আওয়ামী লীগ। সিলেটে বিএনপির প্রার্থী জিতলেও ভোটের ব্যবধান খুবই অল্প। বিএনপির বর্তমানে যে সাংগঠনিক অবস্থা তাতে আগামী নির্বাচনে তাদের জেতার সম্ভাবনা আছে বলে অনেকেই এখন আর মনে করছেন না। বিএনপি নির্বাচনে যাবে কিনা সেটা এখনও নিশ্চিত নয়। তবে বাইরে যাই বলুক বিএনপি আগামী নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি ভেতরে ভেতরে নিচ্ছে বলে মনে হয়। আওয়ামী লীগকে ধরাশায়ী করার জন্য সরকারবিরোধী সব রাজনৈতিক দল, সংগঠন এবং ব্যক্তির সমন্বয়ে একটি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার একটি চেষ্টা বিএনপির আছে। ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ড. কামাল হোসেন, আ স ম আব্দুর রব, কাদের সিদ্দিকী, মাহমুদুর রহমান মান্নাকে নিয়ে এই বৃহত্তর ঐক্য গড়তে বিএনপি আলাপ-আলোচনা শুরু করেছে। এর বাইরেও আরও কিছু আওয়ামী লীগবিরোধী বলে পরিচিত বাম দলের দিকেও বিএনপির নজর আছে। তবে বিএনপি জামায়াতের সঙ্গ না ছাড়লে এই বৃহত্তর ঐক্য হওয়ার সম্ভাবনা কম। প্রশ্ন হলো, বিএনপি কি জামায়াত ছাড়তে পারবে? অথবা উল্টো এটাও বলা যায়, জামায়াত কি বিএনপিকে ছাড়বে?

রাজনীতির অন্দর মহলের খবর যারা রাখেন, তাদের জানা আছে যে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির সম্পর্কে সাম্প্রতিক সময়ে কিছুটা টানাপড়েন দেখা দিয়েছে। সব সিটি করপোরেশনে বিএনপিকে সমর্থন দিয়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র পদ চেয়েছিল জামায়াত। বিএনপি তাতে সম্মত হয়নি। ফলে সিলেটে জামায়াত আলাদা প্রার্থী দিয়েছে। সিলেটের সংকট সিলেটেই শেষ হবে না বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। সিলেটের ধাক্কা যদি জাতীয় নির্বাচনেও লাগে তাহলে কি হবে? জামায়াত এবং আরও কিছু ইসলামপন্থি দল যদি স্বতন্ত্র নির্বাচন করে তাহলে সেটা কি বিএনপির জন্য খুব প্রীতিকর হবে? বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেছেন, ‘ভোটের হিসাব-নিকাশ একেক সময় একেক রকম হয়। একদিকে কমলে আরেকদিকে বাড়বে’। এ কথা বলে কি বোঝাতে চাইলেন প্রবীণ এই রাজনীতিক? জামায়াত যদি বিএনপি ছাড়ে অর্থাৎ জামায়াতের ভোট যদি বিএনপি না পায় তাহলেও তাদের ভোট বাড়বে! কীভাবে? বি চৌধুরী, কামাল হোসেনদের ভোট বিএনপিই পাবে? জামায়াতের ভোট কি কামাল, বি. চৌধুরীদের চেয়ে বেশি, না কম? ভোটের হিসাব-নিকাশ খুব সহজ নয়। আগামী নির্বাচনে যদি জামায়াত বিএনপির সঙ্গে না থাকে এবং বিএনপি যদি ২০-দলীয় জোটের পরিধি বাড়াতে পারে তাহলে যোগ-বিয়োগের ফল কি হবে তা কি বোঝা যাচ্ছে না?

ইসলামপন্থি দলগুলো ভোটের রাজনীতিতে বিএনপির এক বড় সহায়। এরা সাধারণত আওয়ামী লীগবিরোধী এবং এদের ভোট মোটাদাগে বিএনপি পেয়ে থাকে। কিন্তু আওয়ামী লীগ এবার এই দলগুলোকে বিএনপির কাছ থেকে দূরে রাখার কৌশল নিয়েছে। ইসলামপন্থি দু-একটি দল ২০ দল ভেঙে অথবা অন্য কোনও উপায়ে আলাদা নির্বাচন করবে। এই দলগুলো আলাদা প্রার্থী দিলে সেটা বিএনপির জন্য দুর্ভোগের কারণ হতে পারে। আওয়ামী লীগ এরকম দলগুলোকে বিএনপি থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করছে এবং করবে।

আওয়ামী লীগ নির্বাচনের আগে ১৪-দলীয় জোট বা নির্বাচনী মহাজেটের কলেবর বাড়ানোর চেষ্টা করছে। গত ২৪ জুলাই আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সিপিবি কার্যালয়ে গিয়ে সিপিবি নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন। সিপিবি সম্প্রতি ৮টি বাম দলের সমন্বয়ে একটি বাম গণতান্ত্রিক জোট গঠন করেছে। এই জোট আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট থেকে সমদূরত্বের নীতি ঘোষণা করেছে। তারপরও কেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সিপিবি অফিসে গিয়েছেন? তিনি বলেছেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে একটি ‘কর্ম সম্পর্ক' বা ওয়ার্কিং রিলেশন থাকা দরকার। এমন উদ্যোগের প্রতি সাধুবাদ জানাতেই হয়। এভাবেও যদি রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে কিছুটা পরিবর্তন আসে!

 সিপিবির পর ওবায়দুল কাদের সচিবালয়ে তার মন্ত্রীর দফতরে কথা বলেছেন সাবেক বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা এবং সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা কাদের সিদ্দিকীর সঙ্গে। নাজমুল হুদা এখন বিএনপির সমালোচক আর কাদের সিদ্দিকীর তীর আওয়ামী লীগের দিকে তাক করা। নাজমুল হুদা আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিশতে চান। কাদের সিদ্দিকীর টান বিএনপির দিকে। এই দুইজনের সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি কি বিশেষ কোনও বার্তা দিচ্ছে?

 ওবায়দুল কাদের  সাংবাদিকদের কাছে  বলেছেন, ‘নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে, ততই দৃশ্যপটে কিছু কিছু পরিবর্তন আসবে। নির্বাচন  এগিয়ে এলে নানা মেরুকরণ হওয়া স্বাভাবিক। এই মেরুকরণটা কীভাবে হবে, তা দেখার জন্য আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে’।

দেশের মানুষও সেটা দেখার অপেক্ষায় আছে। দেখা যাক, কে কাকে টেক্কা দিয়ে নিজেদের শক্ত অবস্থান মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে!

লেখক: কলামিস্ট

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ