নিরাপদ সড়ক আন্দোলন: দ্রুত সিদ্ধান্ত নিন

Send
চিররঞ্জন সরকার
প্রকাশিত : ১৭:০২, আগস্ট ০৫, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৭:১০, আগস্ট ০৫, ২০১৮

চিররঞ্জন সরকারদেশ ক্রমেই সংকটের দিকে যাচ্ছে। একদিকে শিক্ষার্থীদের অনড় আন্দোলন, আরেকদিকে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের যান চলাচল বন্ধ। সাধারণ মানুষ রয়েছে সীমাহীন সংকটে। তারা চলাচল করতে পারছে না। পণ্য আনা-নেওয়া করা যাচ্ছে না। জরুরি প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে সীমাহীন ভোগান্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সারাদেশেই একটা ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
এদিকে, রাজধানীতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে নানা বিভ্রান্তি, উসকানি ও ষড়যন্ত্র চলছে। কোথাও কোথাও পরিবহন শ্রমিক, কোথাও কোথাও পুলিশ, আবার কোথাও ক্ষমতাসীন দলের নব্য লেঠেলদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ওপর আক্রমণ চালানোর অভিযোগ উঠেছে। এসব অপতৎপরতার দৃশ্য মুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে। সব দায় ও ক্ষোভ গিয়ে জমা হচ্ছে ক্ষমতাসীনদের ওপর। শিক্ষার্থীরাও এ ধরনের কাপুরুষোচিত হামলায় ক্ষুব্ধ হচ্ছে। তারা আরও বেশি জেদি হচ্ছে। এভাবে যদি আন্দোলনকারীদের ওপর শক্তি প্রয়োগ করা হয়, তাহলে আন্দোলন যে আর অহিংস থাকবে না, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

তাই সবার আগে আন্দোলনকারীদের ওপর বলপ্রয়োগ ও গুণ্ডামি বন্ধ করতে হবে। অপরিণামদর্শী কোনও মন্তব্য না করে সড়ক পথের নৈরাজ্য ও অরাজকতা দূর করতে ব্যাপক ও সক্রিয় উদ্যোগ নিতে হবে। এই উদ্যোগে শিক্ষার্থী ও অভিভাবক প্রতিনিধিদের শামিল করা যেতে পারে। আর শিক্ষার্থীরা যা করছে, তার প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি প্রদর্শন করা জরুরি। মনে রাখা দরকার যে, শিক্ষার্থীদের সংগ্রাম রাস্তায় গাড়ির লাইসেন্স পরীক্ষা করার নয়। সংগ্রামটা নিরাপদ সড়কের। শিক্ষার্থীরা চোখ খুলে দিয়েছে। কিন্তু নিরাপদ সড়কের জন্য যা প্রয়োজন, তা কিন্তু সরকারকেই করতে হবে। প্রথমেই ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের বাদ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট ঘোষণা দিতে হবে। পাশাপাশি তিন চারটি অথরিটির কাছে পরিবহন ব্যবস্থা অর্পণ করা, সরকারি আর বিরোধী দলের বাঘা বাঘা নেতাদের হাত থেকে পরিবহন খাতকে বের করে আনা জরুরি। চালকদের চাকরির ব্যবস্থা করা দরকার, যেন তারা দায়বদ্ধ হয়। ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে জরিমানা শোধ করা, যেন পুলিশ মামলার ভয় দেখিয়ে ঘুষ না নিতে পারে। ওভারটেক ও প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে। এ ব্যাপারে যদি পথচারী ও যাত্রীরা অভিযোগ করে, তবে মোটা অংকের টাকা জরিমানা এবং তিনমাস তার লাইসেন্স স্থগিত করার মতো কঠোর বিধান করলে রাজপথে দুই পরিবহনের অন্যায় প্রতিযোগিতা বন্ধ হবে। নিয়ম লঙ্ঘনকারী চালকদের জরিমানার টাকার একটা অংশ ট্রাফিক পুলিশ ও পরিদর্শকদের জন্য বরাদ্দ করা যেতে পারে।

আইনমন্ত্রীসহ অনেকেই বলছেন, সড়ক পরিবহনের নতুন আইন পাস হলে সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে। প্রশ্ন হলো, সমস্যাটা কি আইন না থাকার? বিদ্যমান যে আইন, সেটা কতটুকু মানা হয়? কতটুকু মানানো যায়? বিআরটিএ-র দুর্নীতি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্নীতির কারণে অবৈধ লাইসেন্স, ফিটন্সে ও লাইসেন্স বিহীন গাড়িও চলাচলের অনুমতি পায়। মাঝে মাঝে দুর্নীতির ঊর্ধ্বে উঠে প্রশাসন কোনও উদ্যোগী ভূমিকা পালন করলে শ্রমিক ও মালিক সমিতি হরতাল-ধর্মঘটের মাধ্যমে জিম্মি করে ফেলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তাদের অন্যায় আবদারের কাছে মাথা নত করতে হয়। এমন বহুমুখী সমস্যা ও জটিলতার কারণে পরিবহন সেক্টরে এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। কোনও রকম জবাবদিহিতা, দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা না থাকার কারণে তারা বেপরোয়া আচরণ করে। এর শিকার হয় নিরীহ মানুষ।

এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কী করেছে? কী করতে পেরেছে? সড়কের নৈরাজ্যের জন্য সড়ক পরিবহনমন্ত্রীকে জবাবদিহির আওতায় আনা দরকার। ওবায়দুল কাদের এ ব্যাপারে কী করেছেন? কী করতে পেরেছেন? আমরা তার দায় নিয়ে কথা বলছি না কেন?

আরেকটি কথা। পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের অঘোষিত ধর্মঘটও কিন্তু সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলছে। মালিক ও শ্রমিক উভয় সংগঠনের নেতারাই সরকারের মন্ত্রিপরিষদে রয়েছেন। সড়ক পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা হিসেবে নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাহাজান খান এবং পরিবহন মালিক সমিতির নেতা হিসেবে প্রতিমন্ত্রী মশিউর রহমান রাঙ্গা পুরো পরিবহন সেক্টরকে নিয়ন্ত্রণ করেন বলে অভিযোগ আছে। এখন সড়কের অরাজকতা দূর করার আন্দোলনের মুখে যদি যানচলাচল বন্ধ থাকে তবে তার দায় ওই দুই ব্যক্তির ওপর পড়তে বাধ্য। সরকারের উচিত এই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে ওই দুই ব্যক্তিকে চাপ প্রয়োগ করা। এ মুহূর্তে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবহন ধর্মঘট শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিতে পারে।

তবে, সীমাহীন ক্ষোভ ও ‘বাস্তবতা’ বিবেচনায় নিয়ে শাজাহান খানকে মন্ত্রিসভা রাখা না রাখা নিয়ে সরকারবে বিবেচনা করতে হবে।  মনে রাখতে হবে, দাবি পূরণের যত আশ্বাসই দেওয়া হোক না কেন, শাহজাহান খানকে মন্ত্রিসভায় রেখে সাধারণ মানুষের মন জয় করা যাবে না। এর আগেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেককেই বিভিন্ন বিতর্ক ও সমালোচনার কারণে মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় করেছেন। শেখ হাসিনার প্রথম ক্ষমতার মেয়াদে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রতিমিন্ত্রী আফসার উদ্দিন আহমদ খান, গত মেয়াদে যোগাযোগমন্ত্রী আবুল হোসেন, এই মেয়াদে আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা থেকে বাদ দিয়েছেন। কাজেই মন্ত্রিসভা থেকে শাজাহান খানকে বাদ দেওয়া এবং সড়ক পরিবহনের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কিছু সুস্পষ্ট ঘোষণাই পারে চলমান সংকট থেকে দেশকে উদ্ধার করতে। উল্টা-পাল্টা বক্তব্য দিয়ে, আন্দোলনকারীদের ওপর কলঙ্কলেপন করে, জামায়াত-বিএনপির ভয় দেখিয়ে আন্দোলনকারীদের দুর্বল করতে চাইলে সুফলের চেয়ে কুফলই ফলবে বেশি। কারণ শিক্ষার্থীরা প্রশ্ন করতে শিখে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের প্রধান শক্তি টানা দশ বছর সরকারে। তারপরও দেশে সবকিছুতে শিবির আসে কী করে? আওয়ামী লীগে জামায়াত ঢুকিয়ে, ছাত্রলীগে শিবির ঢুকিয়ে জামায়াত-শিবির জুজুর ভয় দেখানো বুমেরাং হতে পারে। প্রশ্ন আরও আছে। দেশে শিবির বাড়ে, ছাত্রলীগ বাড়ে না কেন? অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের এত বড় স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন থেকে শিবির ফায়দা লুটতে পারলে ছাত্রলীগ তা পারে না কেন? এই আন্দোলনের সৌন্দর্যের দিকগুলো প্রচার না করে কুৎসিত কিছু বিষয় হয়তো স্যাবোটিয়ারদের কাজ, সামনে আনছে কারা? বাচ্চারা যাদের ভণ্ডামির মুখোশ খুলে দিয়েছে, তারা বাচ্চাদের নীতিজ্ঞান শেখালে ওরা সেটা শিখবে কেন?

তারুণ্যের বিক্ষোভের কারণে দেশের পরিস্থিতি এখন অত্যন্ত বিপজ্জনক মোড়ে রয়েছে। সরকারের একটি-দু’টি সিদ্ধান্তই পারে সংকটের সমাধান দিতে। ছল-চাতুরি-ভয়-ভীতি হুমকি-শক্তি প্রয়োগ পরিস্থিতিকে বেসামাল করতে পারে। এর মধ্যেই কিন্তু গুজবের ডালাপালা মেলা শুরু হয়ে গেছে। সরকারকে জব্দ করতে, অস্থিতিশীলতার পালে হাওয়া দিতে অন্ধকারের অপশক্তি ও ষড়যন্ত্রকারীরা মাঠে নেমে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে যা করার, তা করতে হবে দ্রুত, আজই, এখনই। আর প্রধানমন্ত্রীকেই এই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। 

লেখক: কলামিস্ট

/এমএনএইচ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ