আইন দিয়ে দুর্ঘটনা রোধ করা যাবে?

Send
আমীন আল রশীদ
প্রকাশিত : ১৮:৩১, আগস্ট ১০, ২০১৮ | সর্বশেষ আপডেট : ১৯:১৪, আগস্ট ১০, ২০১৮

আমীন আল রশীদবলা হয়, যে দেশের মানুষ যত বেশি বিশৃঙ্খল, সে দেশে তত বেশি আইন লাগে। দেশে বর্তমানে সাড়ে ছয়শ’র মতো আইন আছে। প্রতিটি সংসদ অধিবেশনেই কোনও না কোনও আইন পাস হয় অথবা সংশোধন হয়। আবার এমনও অনেক আইন করা হয় যেগুলো আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা তো দূরে থাক, উল্টো নাগরিককে নানারকম হয়রানির মধ্যে ফেলে বা বিশেষ কোনও গোষ্ঠীকে সুবিধা দেয়। কিন্তু আইনের শাসনের মূল যে স্পিরিট ‘আইন সবার জন্য সমান’—সেটি যে এখনও অধরা, এ বিষয়ে বোধ করি কেউ দ্বিমত করবেন না।
দেশের সাম্প্রতিক আইনের ইতিহাসে তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারার পরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং এরপর এ মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত শব্দ ‘সড়ক পরিবহন আইন’। গত ৭ আগস্ট সোমবার মন্ত্রিসভায় এই আইনের খসড়ার চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়। একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে আইনটি হঠাৎ করেই আলোর মুখ দেখলো। যদিও এটি মোটামুটি চূড়ান্ত হয়েছে ২০১৬ সালেই। দেশের অত্যন্ত প্রভাবশালী পরিবহন খাতের মালিক-শ্রমিকরা এই আইনের প্রধান পক্ষ। ফলে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরতরা বছরের পর বছর ধরে যেরকম একটি যুগোপযোগী সড়ক নিরাপত্তা আইনের দাবি জানিয়ে আসছিলেন, তাতে প্রধান বাধাটি আসে এই পরিবহন মালিকদের তরফেই। যে কারণে আইনটি বারবার আলোচনায় উঠলেও মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদন পাচ্ছিল না। অবশেষে নিরাপদ সড়কের দাবিতে দেশের স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ববিহীন একটি অভূতপূর্ব আন্দোলন গড়ে তুললে সরকার আইনটি পাসের উদ্যোগ নেয়।


নিয়ম অনুযায়ী এটি এখন সংসদে যাবে। সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী বিলটি উত্থাপনের পরে এটি যাবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে। সেখানে বিলটি যাচাই-বাছাই হবে। এরপর কমিটি চূড়ান্ত রিপোর্ট দিলে সড়কমন্ত্রী এটি পাসের জন্য সংসদে তুলবেন। তখন সংসদ সদস্যরা এর ওপর বিস্তারিত আলোচনা, এমনকি সংশোধন প্রস্তাবও দিতে পারবেন। এরপর বিলটি পাস হবে এবং রাষ্ট্রপতি স্বাক্ষর করলে এটি আইনে পরিণত হবে। তার মানে নিরাপদ সড়ক আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হলো মানেই যে এটি এখন আইন—এমন নয়। বরং আরও অনেক ধাপ বাকি। তবে সাধারণত মন্ত্রিসভায় চূড়ান্ত অনুমোদনের পরে বিলে খুব বড় কোনও পরিবর্তন হয় না। হয় না এ কারণে যে, আমাদের সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় খুব বেশি সময় দেন না বা তাদের এত সময় নেই। ফলে বিলের ধারা-উপধারা নিয়ে যে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ ও বিতর্ক সংসদকে প্রাণবন্ত করে—সেই দৃশ্য আমরা দেখি না। আবার এমপিদের পদ থাকা না থাকা সম্পর্কিত সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের ভীতিও অনেকের মধ্যে কাজ করে। যে কারণে তারা কোনও বিলের বিপক্ষে খুব বেশি কথা বলেন না। বড় কোনও সংশোধনীও দেন না। অল্প বিস্তর সংশোধনী আসে বিরোধী এবং স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যদের তরফে। অথচ সরকারি দলের এমপিরা চাইলেই যেকোনও বিলের ওপরে সংশোধনী প্রস্তাব দিতে পারেন। জনগুরুত্বপূর্ণ বিল হলে তার ওপর দীর্ঘ সময় আলোচনা করতে পারেন। তাতে ৭০ অনুচ্ছেদ কোনও বাধা নয়। তা সত্ত্বেও এমপিদের মধ্যে ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে এক অদ্ভুত ভীতি রয়েছে। এই বাস্তবতায় আমরা ধরে নিচ্ছি মন্ত্রিসভা সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ নামে নতুন যে আইনের খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে,  বড় কোনও পরিবর্তন ছাড়াই এটি পাস হবে। প্রস্তাবিত এই আইনে কী আছে তা এরইমধ্যে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ফলে তার পুনরাবৃত্তি না করে আমরা কয়েকটা বিষয় নিয়ে একটু আলোচনা করি।
প্রস্তাবিত আইন নিয়ে পরিবহন শ্রমিকদের মূল আপত্তি ইচ্ছাকৃত দুর্ঘটনায় কারও মৃত্যু হলে ৩০২ ধারায় মামলা করা যাবে—যে আইনে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড। যদিও দুর্ঘটনার জন্য দায়ী চালক ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছেন বা কাউকে হত্যা করেছেন, এটি প্রমাণ করা খুবই দুরূহ। কিন্তু তারপরও শ্রমিকরা এই ধারার ঘোর বিরোধী।
গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার করলে সর্বোচ্চ এক মাসের কারাদণ্ড বা ৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে আইনে। সড়কের ফুটপাতের ওপর দিয়ে গাড়ি চালানো নিয়ে নাগরিকদের বিরক্তি অন্তহীন। নতুন আইনে ফুটপাতে গাড়ি চালানো রোধে তিন মাসের কারাদণ্ড বা ৩৫ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
পরিবহন চালকরা অশিক্ষিত এবং তাদের মানবিক মূল্যবোধ নেই- এমন অভিযোগ পুরনো। তাই নতুন আইনে ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি পাস এবং বাসের কন্ডাক্টর বা চালকের সহযোগীকেও কমপক্ষে পঞ্চম শ্রেণি পাস হতে হবে।
এভাবে বিভিন্ন অপরাধের বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে নতুন এই আইনে। তবে নতুন বিষয় ড্রাইভারদের জন্য লাইসেন্সের পয়েন্ট নির্ধারণ। রাস্তায় লাল বাতি অমান্য করা, রং সাইড দিয়ে গাড়ি চালানো, জেব্রা ক্রসিং অমান্য করা, নির্দিষ্ট স্থান ছাড়া পার্কিং করা, সিটবেল্ট না বাঁধা, ওভারটেকিং, রাস্তা পারাপারের স্থানে পথচারীকে রাস্তা পারাপারের সুযোগ না দেয়াসহ ১২টি পয়েন্ট রাখা হয়েছে চালকের জন্য। প্রতিটি অপরাধের জন্য চালকের এক পয়েন্ট করে কাটা যাবে। অর্থাৎ যদি তিনি অপরাধ করার পরে ধরা পড়েন। অনেকের আশঙ্কা, এই ১২ পয়েন্টের কিছু অপপ্রয়োগ হতে পারে এবং রাজধানীর সব এলাকায় যেহেতু পার্কিংয়ের ব্যবস্থা নেই, তাই চালকরা এই পয়েন্টে এসে বিপদে পড়বেন।
আইনের এই ১১ ধারা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আমার এক বন্ধু তার অভিজ্ঞতা বলেছেন, একবার তিনি ব্যাংকে গিয়েছেন। গাড়ি পার্কিং ফুল। অগত্যা তিনি পাশের গলিতে ড্রাইভারকে গাড়ি রাখতে বলেন। কিছুক্ষণ পর ড্রাইভার ফোন করে জানান, সার্জেন্ট গাড়ির কাগজ নিয়ে গেছেন। তিনি নিচে নেমে সার্জেন্টের সঙ্গে কথা বলেন। সার্জেন্টের বক্তব্য, পার্কিং ফুল এটা তার জানার বিষয় না এবং গাড়ি গলিতেও রাখা যাবে না। আমার বন্ধুর প্রশ্ন, আমরা কী গাড়ি মাথায় নিয়ে ঘুরবো?
আরেকটি ঘটনা: একবার এক সার্জেন্ট গাড়ি থামিয়ে কাগজ নিয়ে যান। জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, দূর থেকে আপনার নম্বর প্লেট দেখা যায় না। গাড়ির মালিক বললেন, আমি তো দেখতে পাচ্ছি। সার্জেন্টের বক্তব্য, আপনি দেখলে তো হবে না। আমাকেও দেখতে হবে। এই বলতে বলতে তিনি মামলা দিয়ে দেন। তার মানে সার্জেন্টরা মামলা দেয়ার ধান্দায় থাকেন। তাদের একটা টার্গেট থাকে যে প্রতিদিন ন্যূনতম এত টাকার মামলা দিতে হবে। সুতরাং উদ্দেশ্যই যদি হয় মামলা দেয়া, তাহলে আইনের শাসন নিশ্চিত হবে কী করে? সড়ক পরিবহন আইনের ১১ ধারা অনুযায়ী, যখন পার্কিংয়ের অভাবে বা এরকম ছোটখাটো কারণে চালকরা মামলা খাবেন, তখন দেখা যাবে রাজধানীর ব্যক্তিগত গাড়ির চালকদের পয়েন্ট শুধু কমতেই থাকবে। এটা তাদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক তৈরি করবে। সুতরাং পার্কিংয়ের পর্যাপ্ত স্থান নির্ধারণ এবং কথায় কথায় মামলা দেয়ার প্রবণতা বন্ধ করা না হলে এই আইন আখেরে মানুষের ভোগান্তিরই কারণ হবে।
ব্স্তুত খসড়া আইনটি পড়লে মনে হবে, রাস্তায় প্রতিদিন যে অসংখ্য দুর্ঘটনা ঘটে, তার সবকিছুর জন্য শুধু চালকরাই দায়ী। প্রশ্ন হলো, বিআরটিএ’র ড্রাইভিং লাইসেন্স দেয়ার প্রক্রিয়ায় যদি ত্রুটি থাকে, যদি তারা পয়সা খেয়ে অদক্ষ লোককে লাইসেন্স দেয় এবং সেই ড্রাইভার যদি দুর্ঘটনার কারণ হন, তাহলে তার দায় কি বিআরটিএ’র নয়?
পরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা আর অনিয়মের পেছনে একটা বড় দায় ট্রাফিক পুলিশের। কিন্তু খসড়া আইনে অসৎ পুলিশ কর্মকর্তাদের দায়ী করার কোনও বিধান নেই। রাস্তার ত্রুটি, ত্রুটিপূর্ণ এবং অপ্রয়োজনীয় স্পিডব্রেকার, সড়কে বিপজ্জনক বাঁক ইত্যাদি কারণেও প্রচুর দুর্ঘটনা হয়। তার জন্য চালকের দায় কতটুকু আর রাস্তার এসব ত্রুটি দূর করা যাদের দায়িত্ব, তাদের দায় কতটুকু? কিন্তু খসড়া আইনে তো এ কথা বলা নেই, রাস্তার কারণে দুর্ঘটনা ঘটলে সড়ক ও জনপথ বিভাগ বা স্থানীয় সরকার বিভাগকে এর দায় নিতে হবে।


সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে মালিকরাও দায় এড়াতে পারেন না। শ্রমিকদের দিয়ে অমানুষিক পরিশ্রম করানো, সামান্য বেতন দেয়ার কারণেও দক্ষ ও শিক্ষিত লোকেরা পরিবহন খাতে কাজে আসতে চান না। ফলে অদক্ষ, অশিক্ষিত এবং নেশাগ্রস্ত লোকদের হাতে যখন স্টিয়ারিং, তখন দুর্ঘটনা ঘটবেই এবং পরিবহন মালিকরা কোনোভাবেই এর দায় এড়াতে পারেন না।
সারাদেশের মহাসড়কে প্রচুর অবৈধ যানবাহন, যেমন- নছিমন-করিমন, ভটভটি, ভ্যান ইত্যাদি চলে। আবার প্রচুর মেয়াদোত্তীর্ণ এবং আনফিট গাড়িও চলে। এসব কারণে যদি সড়ক দুর্ঘটনা হয়, তার জন্য দায় কার? সড়ক দুর্ঘটনার জন্য অনেক সময় পথচারীরাও দায়ী। কিন্তু খসড়া আইনে তাদের ব্যাপারে কোনও কথা নেই। ফলে এসব ত্রুটি ও দুর্বলতা নিয়ে সংসদ সদস্যরা বিস্তারিত আলোচনা করবেন বলে আশা রাখি।
তবে দীর্ঘদিন পরে হলেও যেহেতু একটি আইন হচ্ছে, সেখানে সরকারের সদিচ্ছা আছে বলেই আমরা বিশ্বাস করি এবং আইনের সঠিক প্রয়োগ হলে সড়কে মৃত্যুর মহামারি রাতারাতি না কমলেও একটা পরিবর্তনের সূচনা অন্তত হবে। ৪৭ বছর ধরে যে সমস্যা তিল তিল করে গড়ে উঠেছে, সেই সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য অন্তত ৭ বছর তো লাগবে। সেই পরিবর্তনের সূচনাটা আমাদের নতুন প্রজন্ম করে দিয়েছে। আমরা সেই পরিবর্তনকে কতটা এগিয়ে নেবো, তার ওপর নির্ভর করবে আগামীর বাংলাদেশ।
লেখক: সাংবাদিক

/এমওএফ/

*** প্রকাশিত মতামত লেখকের একান্তই নিজস্ব। বাংলা ট্রিবিউন-এর সম্পাদকীয় নীতি/মতের সঙ্গে লেখকের মতামতের অমিল থাকতেই পারে। তাই এখানে প্রকাশিত লেখার জন্য বাংলা ট্রিবিউন কর্তৃপক্ষ লেখকের কলামের বিষয়বস্তু বা এর যথার্থতা নিয়ে আইনগত বা অন্য কোনও ধরনের কোনও দায় নেবে না।

লাইভ

টপ